অন্য পত্রিকা থেকে

এমন বেকায়দায় কখনো পড়েননি এরশাদ

শেখ সাবিহা আলম |

জীবনে এমন বেকায়দায় পড়েননি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক ‘প্রেসিডেন্ট’ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। দল, সরকার, বিরোধী রাজনৈতিক দল—সবার কাছে তিনি অনাস্থার পাত্র।
দলের নেতা-কর্মীদের আস্থা হারিয়ে এরশাদ এখন অনেকটাই একঘরে। যাঁরা একসময় তাঁর একান্ত অনুগত ছিলেন, তাঁরাও আর তাঁকে বিশ্বাস করতে চাইছেন না। অন্যদিকে স্ত্রী রওশন এরশাদ নিজের মতো করে দল চালাচ্ছেন।

এদিকে মঞ্জুর হত্যা মামলার রায়ের দিন ধার্য হওয়ার এক দিন পর ‘প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত’ এরশাদ বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছেন, অতীতের গ্লানি ভুলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে তিনি কাজ করবেন।
জানা গেছে, এরশাদের নির্দেশ অমান্য করে যাঁরা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁরা প্রকাশ্যে বলছেন এরশাদই দলের নেতা। তাঁরা এরশাদের কথামতোই চলছেন এবং চলবেন। কিন্তু আদতে তাঁরা এখনো দলের চেয়ারম্যান এরশাদের সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করেননি।

এদিকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ১৫ জানুয়ারি এরশাদ কাকরাইলে জাতীয় পার্টির অফিসে যান। সেখানে তাঁকে বয়কট করেন তাঁর ‘অনুগত’ নেতা-কর্মীরা। যুবসংহতির সভাপতি রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া ছাড়া সে সময় এরশাদের সঙ্গে কেউ ছিলেন না।

এরশাদকে সিএমএইচে চিকিত্সা দেওয়ার সময় দলের নিয়ন্ত্রণ নেন তাঁর স্ত্রী ও দলের সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠ সদস্য রওশন এরশাদ। তাঁর নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির একটি অংশ নির্বাচনে যান। বরাবর বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল এই নেত্রী শুধু দলকে নির্বাচনেই নিয়ে যাননি, তিনি কাজী জাফর আহমেদকে ফিরিয়ে আনারও উদ্যোগ শুরু করেছেন। বিভিন্ন সময়ে যাঁরা রওশনের জন্য ক্ষতির কারণ হয়েছেন তাঁদেরও দূরে সরিয়ে দিয়েছেন তিনি। তবে তাঁর এই কর্তৃত্ব এরশাদ মেনে নিতে পারছেন না বলেও দলের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে।

এসব বিষয়ে জানতে এরশাদের সঙ্গে যোগাযাগ করা হলে সব শুনে তিনি বলেন, ‘সরি, নট নাউ’ (দুঃখিত, এখন না)। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য যোগাযোগ করা হয় জাতীয় পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দলের চেয়ারম্যান কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন কি না, সেটা মহাসচিবের কাছে জানতে চান? সরি, আমি কথা বলতে পারব না। থ্যাংক ইউ।’

উল্লেখ্য, গত বুধবার বিকেলে সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা কে হবেন তা নিয়ে জাতীয় পার্টির সাংসদেরা বৈঠক করেন। ওই বৈঠকের কথা জানানো হয়নি রুহুল আমিন হাওলাদারকে। হাওলাদার অবশ্য বলেছেন, ‘আমাকে খুঁজে হয়তো পায়নি। যোগাযোগ করতে পারেনি।’ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি একদিকে প্রচার চালিয়ে গেছেন। অন্যদিকে এরশাদকে বুঝিয়েছেন তিনি নির্বাচনে নেই। এ কারণে সরকারেও তাঁর জায়গা হয়নি। আবার রওশন শিবিরেও যোগ দিতে পারছেন না। এমনকি রওশনের বাসায় সংসদীয় দলের সভাতেও তিনি ডাক পাচ্ছেন না।

জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘নির্বাচনকে ঘিরে স্যারের (এরশাদ) সঙ্গে একটা মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে।’ তাঁর দাবি, শিগগিরই এই দূরত্ব ঘুচে যাবে।

তবে এরশাদের ‘ভক্ত’ এবং জাতীয় পার্টির দীর্ঘদিনের এক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এ কথা সত্যি দলের অবস্থা তাইরে-নাইরে। স্যার কোথাও নেই। সব রওশন ম্যাডামের হাতে। তবে একটা কথা আছে না—ওল্ড ওয়াইফ আর কোল্ড কফি কখনো বিট্রে করে না। তাঁর অনুরোধেই এরশাদকে বিশেষ দূত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। আশা করি, স্যারের হাতে সব ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন ম্যাডাম।’

পথহারা এরশাদ: জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর বেশ কয়েকজন সদস্য বলেছেন, নির্বাচন নিয়ে ক্ষণে ক্ষণে মত বদলানোয় বিপাকে পড়েছেন এরশাদ। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার আগ পর্যন্ত এরশাদ সরকারকে যথেষ্ট চাপে রাখতে পেরেছিলেন। তিনি বেশ কিছু শর্তও দিয়েছিলেন। তাঁর অন্যতম ছিল রংপুর-৬ আসন থেকে জি এম কাদেরকে জিতিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি। শেখ হাসিনা রংপুর-৬ আসন ছেড়েও ছিলেন। কিন্তু দিন কয়েক আগে ওই আসন থেকে মনোনয়নপত্র তুলেছেন শিরীন শারমিন চৌধুরী। এখন ভাইকে মন্ত্রিত্ব দেওয়ার কথা বলছেন।

প্রধানমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্য বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতা মন্ত্রী পদমর্যাদার। শেখ হাসিনা চেয়েছিলেন রওশনকে বিরোধীদলীয় নেতা করবেন আর একজনকে মন্ত্রিত্ব দেবেন। অনেক চেষ্টা, তদবিরের পর মন্ত্রিসভায় তিনজনকে ঢোকানো গেছে।’ নতুন করে আর কাউকে মন্ত্রিসভায় জায়গা দেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দেন ওই নেতা।

এ ছাড়া এরশাদ তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যে নিজেকে ‘নির্ভীক সৈনিক’ বলে দাবি করলেও তিনি বরাবর জেলকে ভয় পান। প্রায় ১৮ বছর ধরে চলা আবুল মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের রায়ের দিন ধার্য করা হয়েছে ১০ ফেব্রুয়ারি। আদালতের এই সিদ্ধান্তের এক দিন পর এরশাদ ঘোষণা দিয়েছেন অতীতের গ্লানি ভুলে তিনি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হয়ে দেশের জন্য কাজ করবেন।

এ দিকে এরশাদের কথা মেনে যাঁরা নির্বাচনে অংশ নেননি, মনোনয়নপত্র তুলে নিয়েছেন, তাঁরা বেজায় ক্ষুব্ধ। এরশাদ নিজে সাংসদ হয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হয়েছেন। যাঁরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন, সিএমএইচ থেকে বেরিয়ে এসে এরশাদ তাঁদের পেছনে ধরনা দিচ্ছেন। এসব নিয়ে ওই অংশ খুবই ক্ষুব্ধ।

গত ১৫ জানুয়ারি এরশাদ হঠাত্ বাড়ি থেকে বেরিয়ে কাকরাইলে জাতীয় পার্টির অফিসে যান। সেখানে সময় কাটান যুবসংহতির সভাপতি রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়ার সঙ্গে। বরাবর রওশনবিরোধী রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া এরশাদকে সিএমএইচে নিয়ে যাওয়ার পর রওশন এরশাদের আনুকূল্য পাওয়ার চেষ্টা করেন। রেজাউল একপর্যায়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে বাধ্য হন। কিন্তু তাঁর শ্বশুর জিয়াউল হক মৃধা ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে জিতে আসেন। সিএমএইচে ‘চিকিত্সাধীন’ থাকার সময় যুবসংহতির বেশ কিছু নেতা-কর্মী পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে এরশাদ মুক্তির আন্দোলন করেছেন। তাঁদের ধারণা ছিল, এরশাদ সিএমএইচ থেকে বেরিয়ে তাঁদের খোঁজ নেবেন। কিন্তু তিনি নেননি।

সত্যিকারভাবে এরশাদের অবস্থা কী, সে সম্পর্কে তাঁর কোনো ভাষ্য পাওয়া যায়নি। তবে ৩ ডিসেম্বর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে এরশাদ সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমরা আমার সম্পর্কে আর কিছু লিখো না।’ ওই সংবাদ সম্মেলনে তিনি ১৮ বছর ধরে চলা মঞ্জুর হত্যা মামলা সম্পর্কে তাঁর হতাশার কথা বলেন। এরশাদ আরও বলেন, তিনি না থাকলে দল কে পরিচালনা করবে। তিনি বিকল্প তৈরি করে যেতে পারেননি, এটি তাঁর ব্যর্থতা।

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close