Featuredযুক্তরাষ্ট্র জুড়ে

নজরদারির ভয়, কেউ দেখল কি চেয়ে

শীর্ষবিন্দু অনলাইন ডেস্ক |

কেউ আমাদের দেখছে, এই অনুভূতিতেই পাল্টে যায় আমাদের আচরণ।অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের যদি কিছু শিখিয়ে থাকে তা হলো ডিজিটাল দুনিয়ায় কতটা সতর্কতার সঙ্গে আমরা নিজেদের উপস্থাপন করি। আমাদের তথ্য দিই এ ভাবনা নিয়ে যে আমাদের টুইটার ফিড, ফেসবুক স্ট্যাটাস, ব্লগ বা লিঙ্কডইন প্রোফাইলে কারা কীভাবে নজর বুলাবেন। কলেজ ভর্তির কর্মকর্তারা তাদের অনলাইনে খুঁজে বের করতে পারেন এই ভেবে পশ্চিমা দেশে হাইস্কুলের ছাত্ররাও সতর্ক থাকে আর চাকরির আবেদনের পর প্রার্থীরা ফেসবুক প্রোফাইলের বিব্রতকর ছবি মুছে দেওয়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এভাবে অনলাইনে আমাদের কর্মকাণ্ড আমাদের ভাবমূর্তি ব্যবস্থাপনার চর্চা-ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
কিন্তু, আমাদের দিকে উত্সুক চোখের দৃষ্টির সাপেক্ষে নিজেদের সেরাটা উপস্থাপনের এই প্রবণতা প্রযুক্তি যুগে মানুষের যুক্ত হওয়াটা কোনো নতুনতর বৈশিষ্ট্য নয়। আমাদের অনেকেই কি জীবনের নানা পর্যায়ে বহুবার নিজেকে শুধরে নিইনি, যখন আমরা বুঝতে পেরেছি, আমাদের কর্মকাণ্ড অন্যরা বিচার করবে, আমাদের ভাবমূর্তি সমালোচিত হবে। বস্তুতই, আমরা এ বিষয়ে এতটাই সতর্ক যে, কেবল একজোড়া চোখের ড্রইং বা ছবিও আমাদের সিদ্ধান্ত পাল্টে দিতে পারে। এমনকি প্রথম দেখায় এ বিষয়ে সচেতনভাবে সতর্ক না হলেও এ প্রতিক্রিয়া ঘটতে পারে।

প্রায় সাড়ে ৩০০ শিশুর ওপর ১৯৭৬ সালে এ বিষয়ে একটি গবেষণা চালিয়েছিলেন যুক্তরাজ্যের মনোবিজ্ঞানীরা। হ্যালোইন উত্সবের রাতে চকোলেট-ক্যান্ডি সংগ্রহ অভিযানে বেরোনো শিশুদের ওপর এ পরীক্ষা চালানো হয়। ১৮টি বাড়ির ভেতর লুকিয়ে মনোবিজ্ঞানীরা সেজেগুজে মিষ্টি কুড়োতে আসা শিশুদের জন্য তৈরি হয়ে ছিলেন। কড়া নাড়ার পর দরজা খুলে দিয়ে শিশুদের সঙ্গে দুয়েকটা কথাবার্তার পর তাঁরা শিশুদের বলেন যে চকোলেট-ভর্তি ঝুড়ি থেকে মাত্র একটিই চকোলেট বেছে নিতে পারবে ওরা। গবেষকেরা এ পর্যায়ে শিশুটিকে ঝুড়ির সামনে একা ছেড়ে আড়ালে চলে যান। কিন্তু চকোলেটের ঝুড়ির সামনে একটা আয়না রাখা থাকে এবং আরেক মনোবিজ্ঞানী লুকিয়ে থেকে এ সময় শিশুদের আচরণ লক্ষ করতে থাকেন। গবেষকেরা লক্ষ করেছেন, আয়নায় চোখ পড়ে গেলে শিশুরা চুরি করে একের বেশি বা মুঠো-ভর্তি করে চকোলেট-ক্যান্ডি নেওয়া থেকে বিরত থাকে।বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এই পোস্টারেই কমে গিয়েছিল বাইসাইকেল চুরি।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এই পোস্টারেই কমে গিয়েছিল বাইসাইকেল চুরি।

মনোবিজ্ঞানীরা দেখতে পান, এমনকি বিশেষ সাজ পোশাকে ঢাকা নিজের চোখে চোখ পড়ে গেলে বা নিজের চেহারাটা দেখে ফেললেও শিশুরা সতর্ক আচরণ করতে শুরু করে। মানুষের সহজাত আচরণগত এ বিষয়টিকেই একটু ভিন্নভাবে পর্যালোচনা করেছেন যুক্তরাজ্যের নিউ ক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। তাঁরা দেখতে পান, কেবল এক জোড়া চোখের ছবিই ক্যাম্পাসে বাইসাইকেল চুরির ঘটনা কমিয়ে দিতে সক্ষম। বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিষয়ক তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে তাঁরা এমন তিনটি স্থান খুঁজে বের করেন যেখান থেকে সবচেয়ে বেশি বাইসাইকেল চুরি হয়ে থাকে। এরপর ওইসব স্থানে এবং আশপাশে কিছু পোস্টার সেঁটে দেন তাঁরা। পোস্টারে বড় করে একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের চোখের ছবিসহ লেখা ছিল, ‘সাইকেল চোরেরা: আমরা তোমাদের ওপর নজর রাখছি।’ পোস্টারের নিচের দিকে স্থানীয় পুলিশ বিভাগের লোগোসহ ছোট্ট করে লেখা ‘অপারেশন ক্র্যাকডাউন’।

নিউ ক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ে এই প্রচারাভিযানে দুর্দান্ত ফল পাওয়া গিয়েছিল। পরের কিছুদিনের মধ্যেই ক্যাম্পাসে বাইসাইকেল চুরির ঘটনা প্রায় ৬২ ভাগ কমে যায়। অবশ্য, একই সময়ে দুর্ভাগ্যজনকভাবে নিকটবর্তী অন্যান্য এলাকায় বাইসাইকেল চুরির ঘটনা প্রায় একই হারে বেড়েছিল। অর্থাত্ চোরেরা এলাকা বদলে ফেলেছিল। তবে, সেই যা-ই হোক, নজরদারির ভীতি কীভাবে এবং কতটা প্রভাব ফেলতে সক্ষম, এ ঘটনা থেকে সহজেই তা অনুমান করা যেতে পারে।

আসলে, পাছে কেউ দেখল কি চেয়ে এই ভয়ে সব সময়ই ভীত আমরা। এটা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিরই অংশ। অন্যরা কীভাবে দেখছেন সেই বিষয়ে সচেতন থাকি আমরা। অন্যের কাছে এমন মাপামাপিতে পড়ার আভাস পেলেই নিজেদের অজান্তেই আমাদের আচরণ পাল্টে যায়। এমনকি তা একটা পোস্টারে ছাপানো এক জোড়া চোখের ছবি হলেও।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close