যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে

বাংলাদেশে শ্রমিকের অধিকার ও নিরাপত্তা চায় মার্কিন সিনেট

শিহাবউদ্দীন কিসলু: বাংলাদেশে শ্রমিক অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে মার্কিন সিনেট। গত মঙ্গলবার সিনেট ফরেন রিলেশন্স কমিটির পূর্ব নির্ধারিত ‘প্রসপেক্ট ফর ডেমোক্রেটিক রিকনসিলিয়েশন অ্যান্ড ওয়ার্কার্স রাইটস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক শুনানিতে সিনেট এ সিদ্ধান্তের কথা জানায়।

এ সময় ‘বাংলাদেশে থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া সমস্যার সমাধান নয়’ বলে মন্তব্য করেন যুক্তরাষ্ট্র সিনেট ফরেন রিলেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান রবার্ট মেনেন্দেস। তিনি বলেন, কেবল বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের সর্বত্র জন্যই শ্রমিক অধিকার, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে অভিন্ন আন্তর্জাতিক মান বাস্তবায়নই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য।

তিনি বলেন, যারা মনে করবেন, বাংলাদেশ থেকে অন্য কোথাও গিয়ে ব্যবসা করবেন, সেক্ষেত্রেও তাদের একই শর্তাবলী মানতে হবে। এ কারণে সবার জন্য অভিন্ন আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণে বদ্ধপরিকর যুক্তরাষ্ট্র।
রবার্ট মেনেন্দেস বলেন, বাংলাদেশে বাণিজ্য বন্ধ করা আমাদের লক্ষ্য নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের মতো আমিও মনে করি, এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্যে বাংলাদেশের উপর চাপ অব্যাহত রাখতে হবে এবং এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে কাজ করতে হবে।

শুনানিতে ভূমিকা বক্তব্য ছাড়া পুরো প্রশ্নোত্তরপর্ব জুড়েই ছিল বাংলাদেশের শ্রমিক অধিকার, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য এবং ইউনিয়ন করার অধিকার প্রসঙ্গ। ‘প্রসপেক্ট ফর ডেমোক্রেটিক রিকনসিলিয়েশন অ্যান্ড ওয়ার্কার্স রাইটস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক শুনানিতে রয়েছে দুটি পৃথক প্যানেল।

প্রথমটিতে দক্ষিণ ও মধ্যএশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই, যুক্তরাষ্ট্র লেবার ডিপার্টমেন্টের (ব্যুরো অব ইন্টারন্যাশনাল লেবার অ্যাফেয়ার্স) ভারপ্রাপ্ত সহযোগী আন্ডার সেক্রেটারি এরিক বিয়েল ও সহকারী ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ ফর লেবার  লুইস কারেশ অংশগ্রহণ করেন। দ্বিতীয় প্যানেলে ওয়ার্কার্স রাইটস কনসোর্টিয়ামের স্কট নোভা, অ্যালায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স সেফটির বোর্ড অব ডিরেক্টরসের চেয়ারম্যান অ্যালেন টাশার এবং বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার অংশ নেন।

দক্ষিণ ও মধ্যএশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই শুনানির ভূমিকা বক্তব্যে বলেন, রাজনৈতিক সংকট বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের রয়েছে সাফল্য। বার্ষিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও উন্নয়নের সফল গল্প। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ৩য় বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, ৭ম বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ, মডাটরেট সেক্যুলার ডেমোক্রেসি, যা আমরা সমর্থন করি।

তিনি বলেন, শ্রমিক অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়টির সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে- সুশাসন ও গণতন্ত্রের। দেশাই বলেন, ইতোমধ্যে ১৯৫টি ইউনিয়ন নিবন্ধিত হয়েছে। এর মধ্যে ৯০টি ইউনিয়ন অত্যন্ত শক্তিশালী এবং পাঁচটি অপেক্ষাকৃত দুর্বল। তিনি বলেন, কেবল ২০১৩ সালেই ১০০টি ইউনিয়ন নিবন্ধিত  হয়েছে,  যা ইতিবাচক।

তবে এই অগ্রগতি যথেষ্ট নয় স্বীকার করে নিশা দেশাই বলেন, রাতারাতি এমন পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়। তবে লক্ষ্য অর্জনে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের অভাবনীয় সমন্বয়ে আমরা আশাবাদী। ভবিষ্যতে আগুন-সুরক্ষা (ফায়ার সেফটি), ভবন সুরক্ষাসহ (বিল্ডিং সেফটি) শ্রমিক অধিকার, স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রদান ও  শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। নিশা দেশাই আরো বলেন, বাংলাদেশেকে পরিহার করে নয় বরং শ্রমিক অধিকার ও নিরাপত্তাসহ সার্বিক পরিস্থিতির উন্নয়নে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকারি পর্যায়ে কাজ করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশে প্রধান বিরোধীদলের অংশগ্রহণ ছাড়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জনগণের আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলন না হওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধ সত্ত্বেও প্রধান দুই দলের মধ্যে অর্থবহ সংলাপের অভাব পরিলক্ষিত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অসন্তোষের কথা উল্লেখ করেন নিশা দেশাই। এছাড়া নিটর ডারবিনের সঙ্গে গ্রামীণ ব্যাংক ও মুহম্মদ ইউনূসের বিষয়ে আলোচনার সময় বাংলাদেশ সরকারের পদক্ষেপের সমালোচনা করে তার অসন্তোষের বিষয়টি তুলে ধরেন প্রশ্নোত্তর পর্বে।

নিশা দেশাই বলেন, ইউএসএইডসহ বিভিন্ন সংস্থার ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় বাংলাদেশ সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (মিলেনিয়াম ডেভলপমেন্ট গোল) অর্জনের পথে এগিয়ে চলছে। খাদ্য নিরাপত্তা ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস করাসহ অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ এমডিজি অর্জনে ইতোমধ্যেই সফল হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে সফরকালীন সময়ে অবাধ নিরপেক্ষ সবার অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের তাগিদ দিয়েছিলাম।

তিনি কমিটির চেয়ারম্যানকে বলেন, স্পষ্টভাবে বলতে চাই, নতুন নির্বাচনের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ শুধু অবাধ নিরপেক্ষ এবং সবার অংশগ্রহণের প্রক্রিয়াকে নিশ্চিত করা। যুক্তরাষ্ট্র কারো পক্ষ নেয়নি বা কারো পক্ষে সহায়ক ভূমিকা রাখেনি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নেতৃত্ব কারা দেবেন তা জনগণই নির্ধারণ করবে। ৫ জানুয়ারি তার প্রতিফলন ঘটে নি। আর সহিংসতাও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিরোধী দল আন্দোলনের নামে যেভাবে সহিংসতা করেছে ও সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন করেছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্র তার ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।

তিনি বলেন, এ পরিস্থিতি বাংলাদেশের দীর্ঘ মেয়াদী স্থিতিশীলতাকে ক্ষুণ্ন করে। এছাড়াও বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত রিপোর্টে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র। তিনি আরো বলেন, শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও কর্মস্থলে  নিরাপত্তার উন্নয়ন ঘটাতে আমরা অব্যাহতভাবে বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি।

এক্ষেত্রে উভয় প্যানেলের সদস্যরা সংশ্লিস্ট ব্র্যান্ডনেম ব্যবসায়ী  প্রতিষ্ঠানগুলোর সনদ স্বাক্ষরের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান এতে স্বাক্ষর করলেও এখনো অনেকের করা বাকি রয়েছে।
ফায়ার সেফটি, বিল্ডিং সেফটিসহ শ্রমিক অধিকার, স্বাস্থ্য ও  শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সহায়তা দিতে হবে এবং দায়বদ্ধ থাকতে হবে।

জিএসপি পুনর্বহালে আগামী ২ মে আবারও পরিস্থিতি পর্যালোচনার কথাও বলেছেন ভারপ্রাপ্ত সহযোগী আন্ডার সেক্রেটারি এরিক বিয়েল। দেশের অগ্নিকাণ্ডে নিহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্র্যান্ডনেম প্রতিষ্ঠানগুলোর অনীহার কথা তুলে ধরেন বাংলাদেশের কল্পনা আক্তার। তিনি বলেন, জিএসপি সুবিধা বন্ধের পরে গত এক বছরে বাংলাদেশ সরকার অনেকাংশেই উদারনীতির বাস্তবায়ন করেছে।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close