লন্ডন থেকে

লন্ডনে ভাষা দিবসে মানুষের ঢল নেমেছিল শহীদ মিনারে

নিউজ ডেস্ক: যথাযোগ্য মর্যাদায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন করেছেন ব্রিটেনের প্রবাসী বাংলাদেশীরা। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণ করতে একুশের প্রথম প্রহর থেকেই পূর্ব লন্ডনের আলতাব আলী পার্কস্থ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেমেছিল জনতার ঢল।

দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হওয়ায় এই দিবসের কারিগর বাঙালির ভাষা শহীদদের স্মরণ করতে অন্য ভাষাভাসি মানুষজনও সমবেত হয়েছিলেন পূর্ব লন্ডনের শহীদ মিনারে। ব্রিটেনে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মোহাম্মদ মিজারুল কায়েস ও টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল’র নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমানের পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে রাত ১২টা ১ মিনিটে ভাষা শহীদদের স্মরণের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।

হাইকমিশনার ও মেয়রের পর পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার কমিটি, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ, যুক্তরাজ্য বিএনপি, জাতীয় পার্টি, লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, লেবার পার্টি, কনজারভেটিভ পার্টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি, যুক্তরাজ্য জাসদ, কমিউনিস্ট পার্টি, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানসমূহ।

রাত সাড়ে ১১টার পর থেকেই বিভিন্ন সংগঠন মিছিল সহকারে শহীদ মিনারে সমবেত হতে থাকে। স্থানীয় কাউন্সিল কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে এ সময় শহীদ মিনারের নিরাপত্তায় নেওয়া হয় বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা। নিরাপত্তাকর্মীদের সহায়তায় বিভিন্ন সংগঠন সারিবদ্ধভাবে এগিয়ে গিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করলেও স্লোগান পাল্টা স্লোগানে শহীদ মিনারের পরিবেশ একসময় উত্তপ্ত হয়ে উঠে। যুক্তরাজ্য যুবলীগ ও যুক্তরাজ্য বিএনপি’র কর্মীরা শহীদ মিনারে ছিলেন দলীয় স্লোগানমুখর। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে এই উত্তেজনা হাতাহাতি পর্যন্ত গড়ায়। অবশ্য নিরাপত্তা কর্মীদের হস্তক্ষেপে এটি তেমন সম্প্রসারিত হয়নি।

ছোট ছোট ছেলে-মেয়েসহ অনেক দম্পতিও এসেছিলেন শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা মাথায় বেঁধে নতুন প্রজন্মের অনেক ব্রিটিশ-বাংলাদেশীও শহীদ মিনারে এসেছিলেন তাদের শেকড়ের সন্ধানে। শ্বেতাঙ্গ অনেকেও এসেছিলেন বাঙালির ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে।

এদিকে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে শুক্রবার বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে ভাষা শহীদদের স্মরণে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা অনুষ্ঠান। বাংলাদেশ হাইকমিশন ও যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংষ্কৃতিক সংগঠন ভিন্ন ভিন্ন ভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। শুক্রবার স্থানীয় সময় সকালে বাংলাদেশ হাইকমিশনে অনুষ্ঠিত হয় একুশের বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রীর বাণী পাঠ করে শোনানো হয়।

অনুষ্ঠানে একুশের প্রেরণায় বিশ্ব মাতৃভাষা সংরক্ষণ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উথ্থাপন করেন বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম-এর স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, সাংবাদিক সৈয়দ আনাস পাশা। প্রবন্দের ওপর আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন হাইকমিশনার মোহাম্মদ মিজারুল কায়েস, বিশিষ্ট সাংবাদিক বুলবুল হাসান ও বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সংগঠক খাদিজা রহমান প্রমুখ।

মূল প্রবন্ধে বিশ্ব মাতৃভাষা সংরক্ষণে একুশের প্রেরণার গুরুত্ব তুলে ধরে বলা হয় ‘ভাষা এমনই একটি বিষয়, যা যন্ত্রের মতো কোনো সুরক্ষিত ভাণ্ডারে পুঞ্জীভূত করে রেখে সংরক্ষণ করা যায় না। ভাষা অনেকটা ব্যবসায়িক পণ্যের মতো। এ যেন প্রচারেই প্রসার। প্রচার ও বহুল ব্যবহারের মাধ্যমেই আমাদের ভাষা সংরক্ষণ করতে হবে।

প্রবন্ধে বলা হয়, ‘প্রিয় মাতৃভাষা বাংলাকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেয়ার মাধ্যমে বাংলা ভাষার উৎপত্তি, ইতিহাস, বিস্তৃতির ক্রমবিকাশ বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মানুষের কছে এমনভাবে পৌঁছে দিতে হবে, যাতে একুশের অনুপ্রেরণায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বিলুপ্তির দিকে ধাবিত হওয়া ভাষাগুলো সংরক্ষণ করা যায়’।

মূল প্রবন্ধে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত তুলে ধরে বলা হয়, ‘২০০৫ সালের ইউনেসকোর ইথোনলগের হিসেব অুনযায়ী পৃথিবীতে মোট ভাষা আছে ৬৯১২টি। এরমধ্যে ৩২.৮% অর্থাৎ ২২৬৯টি এশিয়া এবং ৩০.৩% ২০৯২টি আফ্রিকা মহাদেশে। ২০০৮ সালের একটি গবেষণা মতে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মানুষ কথা বলেন এমন ১০টি ভাষা হলো, যথাক্রমে ম্যান্ডারিন (এক বিলিয়নেরও বেশি), ইংলিশ (৫০৮ মিলিয়ন), হিন্দী (৪৯৭ মিলিয়ন), স্পেনিশ (৩৯২ মিলিয়ন), রাশিয়ান (২৭৭ মিলিয়ন), এরাবিক (২৪৬ মিলিয়ন), বাংলা (২১১ মিলিয়ন), পর্তুগিজ (১৯১ মিলিয়ন), মালে-ইন্দোনেশিয়ান (১৫৯ মিলিয়ন) এবং ফ্রেঞ্চ (১২৯ মিলিয়ন)। ইন্ডিয়া, ব্রাজিল, মেক্সিকো, অষ্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া, পাপানিউগিনি ও ক্যামেরুন পৃথিবীর এই ৮টি দেশে এখনও ৫০ ভাগেরও বেশি বিশ্ব ভাষার অস্থিত্ব টিকে আছে।

যেসব অঞ্চলের বেশ কিছু ভাষা দ্রুত বিলুপ্তির পথে ধাবিত হচ্ছে তার মধ্যে ইস্টার্ন সাইবেরিয়া, সেন্ট্রাল সাইবেরিয়া, নর্দান অস্ট্রেলিয়া, সেন্টাল আমেরিকা এবং নর্থওয়েষ্ট প্যাসিফিক প্লাটো অন্যতম। ইউনেস্কো বিশ্বে এখনও ঠিকে আছে এমন ভাষাগুলোকে মোট ৫টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছে। এগুলো হলো সেইফ (নিরাপদ), ভালনারেবল (দুর্বল), ডেফিনিটলি ইনডেনজার্ড (স্পষ্ট বিপন্ন), সেভারলি ইনডেনজার্ড (গুরুতর বিপন্ন) ও ক্রিটিক্যালি ইনডেনজার্ড (সংকটজনক বিপন্ন)। সম্পূর্ণ নিরাপদ ভাষাগুলোকে সেইফ ক্যাটাগরী, বাড়ীর বাইরে শিশুরা কথা বলতে ব্যবহার করে না এমন ভাষাগুলোকে ভরনারেবল, শিশুরা কখনই কথা বলতে ব্যবহার করে না এটিকে ডেফিনিটলি এনডেনজার্ড, শুধুমাত্র প্রবীণরা কথা বলতে ব্যবহার করেন এমন ভাষাকে সেভারলি এনডেনজার্ড এবং প্রবীণদের মধ্যে স্বল্প সংখ্যক মানুষ কথা বলেন এমন ভাষাকে ক্রিটিক্যালি এনডেনজার্ড ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে।

প্রবন্ধে ভাষাবিদ মাইক্যাল ই ক্রাউসের মন্তব্য উল্লেখ করে বলা হয়, আরো ১০০ বছর শিশুরা কথা বলবে এমন ভাষাগুলোই হলো ‘সেইফ’ ভাষা।  আর শিশুরা আগামী ১০০ বছর পরযন্ত কথা বলার সম্ভাবনা নেই যে ভাষায় সেটি হলো ইনডেনজার্ড বা বিপন্ন ক্যাটাগরির ভাষা।  পৃথিবীর ৬০ থেকে ৮০ ভাগ ভাষার অবস্থান এই ইনডেনজার্ড বা বিপন্ন ক্যাটাগরির মধ্যেই রয়েছে বলে প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়।

বিশ্ব মাতৃভাষা রক্ষায় একুশ-এর প্রেরণার শক্তিমত্তার কথা উল্লেখ করে প্রবন্ধে বলা হয়, একুশকে নিয়ে বিশ্ব মাতৃভাষা রক্ষার আগামী আন্দোলনে বাংলাদেশকেই প্রধানতম ভূমিকা রাখতে হবে। কারণ একুশের বদৌলতে বাংলার সম্মান আজ বিশ্বব্যাপী। সিয়েরা লিওন, অস্ট্রেলিয়াসহ আরো অনেক দেশ ইতোমধ্যে বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার স্বীকৃতি দিয়েছে। এককথায় ভাষাশহীদদের কল্যাণে একুশে ফেব্রুয়ারি, বাংলা ভাষা আজ বিশ্ব দরবারে পরিচিত। আর তাই বিশ্ব মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলনে বাংলাদেশকে অবশ্যই সামনের সারিতে থাকতে হবে।

মূল প্রবন্ধের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে হাইকমিশনার মিজারুল কায়েস বলেন, বাঙালির দুটো অর্জন বিশ্ব ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একটি ভাষা আন্দোলন আর আরেকটি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শাসনামল পরবর্তী সময়ের প্রথম রাষ্ট্রের জন্মদান, যে রাষ্ট্রটি বাংলাদেশ। তিনি বলেন, একুশ’-এর প্রেরণা যে কত শক্তিশালী তার প্রমাণ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে জাতিসংঘ কর্তৃক এই দিনটির স্বীকৃতি। সুতরাং এই দিনের অনুপ্রেরণা নিয়ে বিশ্বের বিপন্ন প্রায় মাতৃভাষাগুলো সংরক্ষণের নতুন আন্দোলন যদি বাংলাদেশের নেতৃত্বে শুরু হয়, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমরা অনেকেই সেই দিনটির অপেক্ষায় আছি।

আঞ্চলিক ও সংখ্যালঘু ভাষা রক্ষায় ইউরোপের সেটস চুক্তির কথা উল্লেখ করে প্রবন্ধে বলা হয়, ১৯৯২ সালে ইউরোপীয়ান কাউন্সিলের তত্বাবধানে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে সম্পাদিত সেটস নামের  ঐ চুক্তিতে ঐতিহাসিক, আঞ্চলিক ও সংখ্যালঘু ভাষাগুলোর প্রচার ও সংরক্ষনের কথা বলা হয়েছে। প্রবন্ধে অভিমত ব্যক্ত করে বলা হয়,  বিশ্বের কোন একটি মাত্র অঞ্চলের ভাষা নয়, পুরো বিশ্বের আঞ্চলিক ও সংখ্যালঘু ভাষা রক্ষায় সেটস চুক্তির মতো আরও কারযকর চুক্তির প্রয়োজন রয়েছে। এক্ষেত্রে জাতীসংঘকে উৎসাহী করতে বাংলাদেশ একটি ভূমিকা রাখতে পারে। জাতীসংঘের সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের সফলতা অর্জন এ ধরনের উদ্যোগে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমর্থন পেতে অবশ্যই সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close