Featuredঅর্থনীতি

হলমার্ক থেকে সুড়ঙ্গ সোনালী ব্যাংকের ভল্টে

গাজী মহিবুর রহমান:
সোনালী ব্যাংক, নিঃসন্দেহে দেশের একটি পুরাতন এবং ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। দেশের ছয়টি রাষ্টায়ত্ত ব্যাংকের মধ্যে সোনালী ব্যাংক অন্যতম। স্বাধীনতার পরপরই ব্যাংক জাতীয়করণ করা হলে তৎকালীন ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এর নাম পরিবর্তন করে বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছাতেই ব্যাংকটির নামকরণ করা হয় সোনালী ব্যাংক। দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে প্রতিষ্ঠানটির একেবারে যে সুনাম ছিল না এ কথা বলা ঠিক হবে না। প্রতিষ্ঠানটি ঐতিহ্যের ধারা বজায় রেখে ভালোই চলছিল।

ব্যাংকটির অধিকাংশ শাখা বর্তমানে অনলাইন ব্যাংকিং এর আওতায় চলে এসেছে। তারপরও আধুনিক ব্যাংকিং জগতে মানিয়ে নিতে ব্যাংকটির অনেক সেকেলে কর্মকর্তা, কর্মচারীরা হিমশিম খাচ্ছেন সেটা ব্যাংকের কোন শাখায় লেনদেন করতে গেলে স্পষ্টতই চোখে পড়ে। সাম্প্রতিককালে ব্যাংকের ভল্ট থেকে ষোল কোটি টাকা চুরি যাওয়ার সেই বহুল আলোচিত সোনালী ব্যাংকের কিশোরগঞ্জ শাখায় এখনো টাকা গণনার একটি মেশিন নেই। আর এজন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় টাকা তুলতে কিংবা জমা দিতে আসা গ্রাহকদের। ভোগান্তি যেন সোনালী ব্যাংকের এই শাখার গ্রাহকদের নিয়তি।

সোনালী ব্যাংক নামটি শুনলেই এখন মানুষের গা শিউরে উঠে, কপালে ভাজ পড়ে। গত কয়েক বছর ধরে একের পর এক অবিশ্বাস্য ঘটনার শিরোনাম হয়েছে সোনালী ব্যাংক। বিশেষ করে ২০১২ সালে হলমার্ক কেলেংকারির পর থেকে ব্যাংকটির অব্যবস্থাপনা সর্বমহলে সমালোচিত হয়। হলমার্ক কেলেংকারীর রেশ কাটতে না কাটতেই গত ২৬ জানুয়ারি পাশের একটি বাসা থেকে সুড়ঙ্গ করে অতিদুঃসাহসিক কায়দায় কিশোরগঞ্জ সোনালী ব্যাংকের ভল্ট থেকে ১৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা চুরির লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে।

এ ঘটনায় টাকাসহ হাবিব ওরফে সোহেলকে ঘটনার তিনদিনের মধ্যেই র‌্যাব গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। তারই দেওয়া তথ্য অনুসারে ঘটনার কয়েকদিন পর এই ঘটনার মূল প্ররোচনাকারী তার কথিত মামা শ্বশুর সিরাজকে যখন ভৈরব রেলস্টেশন থেকে র‌্যাব গ্রেফতার করেছে, ঠিক তখনই বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টে দেখলাম অনলাইন হ্যাক করে সোনালী ব্যাংকের দুই কোটি টাকা লুট করে নিয়ে গেছে কে বা কারা। ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলন-২০১৪ চলাকালে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এম আসলাম এই তথ্য নিশ্চিত করেন। অনুষ্ঠানে স্বয়ং অর্থমন্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। যেমনটা শুরুতেই বলছিলাম আধুনিক ব্যাংকিং জগতে নিজেদের খাপ খাওয়াতে হিমশিম খাচ্ছে সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তারা, তারই প্রমাণ মিলল ইন্টারনেট তথা অনলাইন হ্যাক করে টাকা ট্রান্সফারের এই ঘটনার মধ্য দিয়ে।

এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আবারো সেই কিশোরগঞ্জের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো বগুড়ায়। গত ৮ মার্চ সুড়ঙ্গ করে বগুড়ার আদমদীঘি শাখা সোনালী ব্যাংকের ভল্ট থেকে সাড়ে বত্রিশ লাখ টাকা চুরি করে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। এই লেখাটি যখন লিখছি তখন পর্যন্ত সেই টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। যদিও সৌভাগ্যবশত কিশোরগঞ্জের সোনালী ব্যাংকের ভল্ট থেকে চুরি যাওয়া বিশাল অংকের টাকা দ্রুততম সময়ের মধ্যেই উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিল র‌্যাব।

একের পর এক এ ধরনের ঘটনা ব্যাংকের যেমন ইমেজ নষ্ট করেছে একই সঙ্গে ব্যাংকের গ্রাহক তথা সাধারণ মানুষের মধ্যে সোনালী ব্যাংকের ব্যাপারে এক ধরনের আস্থার সংকটও যে তৈরি হয়েছে এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। অথচ একটি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য প্রথমেই যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো আমানতকারীদের কিংবা গ্রাহকদের ওই ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উপর আস্থা। সোনালী ব্যাংকের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান এখন চরমভাবেই আস্থার সংকটে ভুগছে। যদিও ইতোমধ্যেই ব্যাংকের নিরাপত্তা, কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট উপর মহল থেকে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সূত্র বলছে, ব্যাংকটির অব্যবস্থাপনা দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে কাজ করছে সরকার। ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা, কর্মচারীদের হীন স্বার্থে এমন একটি ঐতিহ্যবাহী ব্যাংক আজকে কোটি কোটি টাকা ঋণ খেলাপির কবলে পড়েছে। যাচাই বাছাই না করে ঋণ প্রদান, হীন স্বার্থে হলমার্কের মতো অনেক প্রতিষ্ঠানকেই তাদের সামর্থ্য বিবেচনা না করেই প্রদান করা হয়েছে বিশাল অংকের ঋণ যার দরুন আজকে কোটি কোটি টাকার ঋণ ঝুঁকিতে রয়েছে ব্যাংকটি। শুধু তাই নয় অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেও ব্যাংকটিকে মাশুল গুণতে হচ্ছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে ঋণ প্রদান পর্যন্ত রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব।

সেটা সব সরকারের আমলেই চোখে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়েও আমরা দেখলাম ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদ থেকে শুরু করে সর্বত্রই রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব। এমনকি হলমার্ক কেলেঙ্কারির সময়েও দেখেছি কয়েকজন হাইপ্রোফাইল রাজনীতিকের নাম উঠে এসেছিল, যদিও পরবর্তীতে তাদেরকে যেকোন ভাবেই হোক বাদ দেওয়া হয়েছে।

দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ঘটে যাওয়া লোমহর্ষক ঘটনা পাশের বাসা থেকে সুড়ঙ্গ করে কিশোরগঞ্জের সোনালী ব্যাংকের ভল্ট রুমে রাখা ১৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা  চুরির নায়ক সোহেল উরফে হাবিব এর কি সাজা হতে পারে এ নিয়ে মানুষের মধ্যে কৌতুহলের শেষ নেই। হাবিব উরফে সোহেল এখন কারাগারে আছে। মামলাটি র‌্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়াও চলছে। এমন একটি বিচারাধীন বিষয় নিয়ে মন্তব্য না করাটাই সমীচিন। তবে এটুকু বলা নিশ্চয়ই অত্যুক্তি হবেনা যে, এধরনের ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। হলমার্ক কেলেঙ্কারির নায়ক তানভীরও কারাগারে বন্দি। চলছে তার বিচার প্রক্রিয়াও। কিন্তু এই ঘটনায় যারা সংশ্লিষ্ট বা পেছনের কারিগর তারা ঠিকই রয়ে গেছে দৃষ্টির আড়ালে।

হলমার্ক কেলেঙ্কারির মধ্য দিয়ে সোনালী ব্যাংকের অব্যবস্থাপনা মানুষের কাছে দৃশ্যমান হয়েছিল। হলমার্ক কেলেঙ্কারীর পর নবনিযুক্ত পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ব্যাংকিং সেক্টরে চার হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি তেমন বড় কিছু নয়। অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্য নিয়ে তখন মিডিয়াসহ খোদ সরকারি দলের মধ্যেই সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। তখন অবশ্য অর্থমন্ত্রী নতুন পরিচালনা পরিষদকে জালিয়াতি ও চুরি ঠেকাতে সতর্কতার সঙ্গে কাজ করারও পরামর্শ দিয়েছিলেন।

কিন্তু হলমার্ক কেলেঙ্কারির পর থেকে একের পর এক এই ধরনের ঘটনা ব্যাংকটিকে অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি মানুষের আস্থার জায়গাটিতে চরমভাবেই আঘাত করেছে। আস্থার সংকট দূর করে ব্যাংকটির সেই সোনালী অতীত ফিরে আসবে, ব্যাংকটিকে আর কোন হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে পড়তে হবেনা, আর কোন সুড়ঙ্গ ব্যাংকের ভল্টের দিকে যাবেনা, আর কোন অনলাইন হ্যাকিং এর ঘটনা ঘটবেনা এবং উল্লেখিত ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত সব দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে এমনটাই প্রত্যাশা করে দেশের আপামর জনগণ।

গাজী মহিবুর রহমান: কলাম লেখক

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close