অন্য পত্রিকা থেকে

আশায় বাংলাদেশ: কিছু্ করার নেই ভারতের

জেসমিন পাপড়ি: না হলো তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি, না হলো স্থল সীমানা বণ্টন চুক্তির বাস্তবায়ন। ভারতের পক্ষে বাংলাদেশের সঙ্গে আপাতত কোনটিই করা সম্ভব নয়। এমনটি বলছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, মূলত ভারতের ১৬তম নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে নীতিগতভাবে এসব চুক্তি অনুমোদনের কোন ক্ষমতা নেই মনমোহন সিংয়ের সরকারের।

কূটনৈতিক সূত্র বলছে, কিছুদিন আগে মিয়ানমারের বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত সাইডলাইন বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এসব কথাই জানিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। এ বৈঠকের আগে মিয়ানমার-নেপাল-ভুটান-থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রপ্রধানদের উপস্থিতিতে তিস্তা প্রসঙ্গ তুলেছিলেন হাসিনা। বিষয়টি নিয়ে এর আগে কোন আন্তর্জাতিক মহলে এভাবে আলোচনা না হওয়ায় বিষয়টি মনমোহনের উপর কিছুটা চাপ সৃষ্টি করলেও তাতে কোনো ফল আনতে পারেনি।

এদিকে ঢাকার এক সেমিনারে দেশটির সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার শাহাবুদ্দিন ইয়াকুব কুরায়েশী সাংবাদিকদের বলেছেন, ভারতের সংবিধান অনুযায়ী তফসিল ঘোষণার পর থেকে চলমান সরকারের নীতিগত কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকে না। নিয়মিত কাজগুলোই চালিয়ে যায় প্রশাসন। এসময় দেশটির নির্বাচন কমিশনই অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ করে থাকে। আর এই নিয়মেই নতুন সরকার না আসলে কোনভাবেই তিস্তা বা স্থল সীমান্ত চুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না।

এবারের হিসেবে শেষ মেষ মমতাই জিতলেন। কারণ, তারই কারণে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর হতে হতে হয়নি। বারবার তিনিই এ চুক্তির ক্ষেত্রে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। আর তাই হাসিনাকে কথা দিয়েও কথা রাখতে পারলেন না ভারতের বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং।

এছাড়া ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা সরকারের করা স্থল সীমানা চুক্তির বাস্তবায়নও করতে পারেনি ভারত। সেটি করতে ভারতের প্রয়োজন ছিল সংবিধান সংশোধনের। আর সংশোধনের জন্য বিলটি তোলা হলে দেশটির সংসদে হট্টগোল পর্যন্ত হয়েছে। তবু সফল হয়নি কংগ্রেস সরকার। এ চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে ১০ হাজার একরের মতো ভূমি ছেড়ে দেয়া হচ্ছে-যুক্তি দেখিয়ে মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেসসহ বিজেপি চুক্তিটির বাস্তবায়ন মেনে নিতে পারছে না।

গত ৭ মে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশীদ ভারত-বাংলাদেশ স্থল সীমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত একটি চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ভারতীয় সংবিধান সংশোধনীর জন্য একটি বিল রাজ্যসভায় পেশ করে। কিন্তু বিরোধী পক্ষ হট্টগোল সৃষ্টি করলে বাধ্য হয়ে রাজ্যসভার ডেপুটি চেয়ারম্যান শ্রী পি জে কুরিয়েন অধিবেশন মুলতবি করেন।

এদিকে ভারতের নির্বাচনী হাওয়ায় কংগ্রেসের চেয়ে বিজেপির ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা দেখাচ্ছে দেশটির মিডিয়াগুলো। বাংলাদেশের জন্য এটি আরো বেশি চিন্তার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিজেপি প্রথম থেকে এসব চুক্তির বিরোধিতা করে আসছে। তাই এ দলটি ক্ষমতায় আসলে এসকল চুক্তি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসবে বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা।

তবে একেবারে নিরাশ না করে বরাবরের মতই আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে ভারত। কংগ্রেস সরকারের শেষ মুহুর্তে ভারতের আমন্ত্রণে সম্প্রতি দেশটি সফর করে এসেছেন পররাষ্ট্র সচিব মো. শহিদুল হক। তিনি দেশে ফিরে জানিয়েছেন, যে সরকারই আসুক না কেন ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক অটুট থাকবে। তেমন বার্তাই দিয়েছে দেশটি।

তবে এসব চুক্তি না হওয়ার জন্য শুধু ভারত নয়, দুদেশকেই দুষছেন কূটনীতিক বিশ্লেষকরা। দেশগুলোর যথেষ্ট হোমওয়ার্কের অভাবেই একই বিষয় নিয়ে বারবার সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলেই মনে করেন তারা। এ বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর বলেন, একই বিষয় নিয়ে বারবার সমস্যা তৈরি হওয়ার অর্থ দুদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তাদের এসব বিষয়ে তেমন কোন হোমওয়ার্ক ছিল না। তবে যাই হোক না কেন এ বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি প্রয়োজন। শুধু বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে নয় বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকেই বিষয়গুলো সমাধানের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করা হচ্ছে। ভারতও আশ্বাস দিয়েই যাচ্ছে। তবে প্রতিবেশি হিসেবে কোন সমস্যাই বেশি দিন ঝুলে থাকা উচিত নয়।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসীন বাংলানিউজকে বলেন, তিস্তা চুক্তি ও স্থল সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন না হওয়ার দায় ভারত সরকারকেই নিতে হবে। কারণ, দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার চাইলেও রাজ্যগুলো তা চায়নি। আর রাজ্য সরকারের ‘না চাওয়াকে’ কোনভাবেই পরিবর্তন করতে পারেনি কেন্দ্রীয় সরকার। তার আগেই রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশকে কথা দিয়ে রেখেছে। এক্ষেত্রে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের আন্তরিকতা প্রকাশ পেলেও অ্যভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা দায় এড়াতে পারেনা।

এ চুক্তিগুলো না হওয়া বাংলাদেশের জন্য চিন্তার বিষয় উল্লেখ করে তিনি ‍জানান, ভারতের সরকারে পরিবর্তন আসলে এ বিষয়টি আরো ঝুলে যাবে। অভ্যন্তরীণ স্বার্থই দেশটির সরকারের কাছে মুখ্য। এসব বিষয় সমাধান হওয়ার আগেই মিডিয়াতে বেশি বেশি বলায় বাংলাদেশ সরকারকেও ব্যর্থতার দায়ে দায়ী করেন আমেনা মহসীন।

তবে কূটনীতিকরা বলছেন, চুক্তিগুলো হবে-এমন আশা করা ছাড়া আর পথ নেই বাংলাদেশের। গত ৪ মার্চ বুধবার ভারতের লোকসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে দেশটির নির্বাচন কমিশন। তফসিল অনুযায়ী ৭ এপ্রিল থেকে ভারতের ১৬তম লোকসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলবে।

কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী এবার দেশটিতে নয় দফায় ভোট গ্রহণ হবে। নির্বাচনের দিন ঘোষণার পর থেকেই গোটা দেশে নির্বাচনী বিধি চালু হয়ে যায়। এদিন থেকে বর্তমান সরকার আর কোনো নতুন প্রকল্প ঘোষণা করতে পারবেন না। ভারতের বর্তমান লোকসভা মেয়াদ শেষ হচ্ছে ১ জুন। তাই মে মাসের ৩১ তারিখের মধ্যেই নতুন লোকসভা গঠন করতে হবে।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close