রাজনীতি

এরশাদের পদত্যাগের জোর গুজব: জাপা নেতাকর্মীরা হতাশ

শীর্ষবিন্দু নিউজ: জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের পদ থেকে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পদত্যাগ করেছেন বলে জোর গুজব শোনা যাচ্ছে। তবে এ নিয়ে দলটির নেতারা কেউই কিছু বলছেন না। এমনকি রহস্যজনক আচরণ করছেন খোদ এরশাদও।

দলীয় সূত্র বলছে, সোমবার সকালে এরশাদ তার একজন ব্যক্তিগত স্টাফকে দিয়ে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পার্টির নতুন মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলুর কাছে পৌঁছে দেন। ওই চিঠি পৌঁছে দেওয়ার কথা স্বীকার করে এরশাদের ওই স্টাফ বলেন, ওটা পদত্যাগপত্র বলে শুনেছি। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য চেষ্টা করেও জিয়াউদ্দিন বাবলুকে পাওয়া যাচ্ছে না। এ নিয়ে মুখ খুলছেন না অন্য কোন নেতাও। এমনকি এ বিষয়ে খোলাসা হতে এরশাদকে ফোন দিলে তিনি কৌতূক করে বলেন, আমি পদত্যাগ করেছি, তাই নাকি?

সূত্রের দাবি, রোববার দলের যৌথসভায় প্রেসিডিয়াম সদস্য ও বিরোধী দলীয় নেতা রওশনসহ আরো ক’জন সিনিয়র নেতা এরশাদের ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এরপর সকাল নাগাদ এরশাদ তার পদত্যাগপত্র মহাসচিবের কাছে পাঠিয়ে দেন। এদিকে, দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা। এরশাদের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করতে পারছেন না কেউই। সুযোগ পেলেই নেতাকর্মীরা এরশাদের সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠছেন।

এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে জাতীয় পার্টি অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে বলে মনে করছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। অনেকেই দলত্যাগে প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে অনেকেই অন্য দলে পাড়ি জমিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক প্রেসিডিয়াম সদস্য জানিয়েছেন, আগে নেতাকর্মীরা দেখা করতে এলে পার্টিকে শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা করতেন। পরামর্শ চাইতেন, কিভাবে দলকে শক্তিশালী করবেন। কোথায় কমিটি নেই, কোন কমিটির কোন নেতা নিষ্ক্রিয়, কোন কমিটি পুনর্গঠন করা প্রয়োজন এসব বিষয়ে আলোচনা হতো। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে।

এখন তৃণমূল হোক আর কেন্দ্রের নেতা হোক দেখা হলেই পার্টির চেয়ারম্যানের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ছেন। পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দল গঠনের চেয়ে এরশাদের সমালোচনা বেশি হচ্ছে। সবার মনেই হতাশা বিরাজ করছে। বেশিরভাগ নেতাকর্মীই মনে করছেন, এরশাদের বয়স বেশি হয়ে গেছে। যে কারণে কখন কি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তার ঠিক ঠিকানা নেই। নির্বাচনে অংশ নেওয়া নিয়ে এরশাদের নানা রকম নাটকীয়তায়ও সন্তুষ্ট ছিলেন না নেতাকর্মীরা। তারা মনে করেন, নির্বাচনে যাওয়া-না যাওয়া নিয়ে নাটকীয়তার কারণে দল ও তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

অনেকে দাবি করেছেন, এরশাদ যদি নাটক না করতেন তাহলে জাপা অন্তত ১শ’ আসন পেতো। তাদের মত হচ্ছে, নেগেটিভ ভোটে ক্ষমতার পালাবদল হয়। আর নেগেটিভ ভোটেই জাপাই ১শ’ আসন পেতো। আর তেমনটি হলে সারা দেশে দলকে শক্তিশালী করা যেতো। কিন্তু সে সুযোগ এরশাদ নিজ হাতেই নষ্ট করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী। নির্বাচনকালে নানা নাটকীয়তায় একটি পক্ষ এরশাদকে চূড়ান্তভাবে সমর্থন দিয়ে গেছেন। যদিও সে সংখ্যা ছিল নগণ্য। কিন্তু তৃণমূলের কর্মীরা বলতে গেলে এরশাদের পক্ষে একাট্টা ছিলেন।

কিন্তু নির্বাচন পরবর্তী এরশাদের ভূমিকায় তৃণমূলে চিড় ধরেছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর দূত পদ গ্রহণ এবং প্রধানমন্ত্রীর চিঠি দিয়ে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনকে এরশাদের রাজনৈতিক মৃত্যু বলে মনে করছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। রাজধানীর খিলগাঁও জাতীয় পার্টির এক নেতা জানিয়েছেন, পার্টির চেয়ারম্যানের বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণে তারা জনগণের কাছে হাসির পাত্র হয়েছেন। ওই নেতা প্রশ্ন রেখে বলেন, এরশাদ নির্বাচনে যাননি, জোর করে তাকে নির্বাচনে রাখা হয়েছে- এ কথা বলে আসছিলাম। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর দূত করার পর এরশাদ তাকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করায় এখন আর সে কথা বলা যাচ্ছে না। জনগণ এখন সবটাকেই নাটক বলে মনে করছে।

নির্বাচন নিয়ে যখন নানামুখী সংকটের মধ্যে জাতীয় পার্টি, ঠিক তখনই মহাসচিব পরিবর্তনের বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখছেন না কেউই। বিশেষ করে যাকে মহাসচিব করা হয়েছে, তাকে নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম অস্বস্তি রয়েছে। বর্তমান মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু নেতাকর্মীদের কাছে আওয়ামী লীগের লোক হিসেবে চিহ্নিত। রংপুরের এক নেতা মন্তব্য করেছেন, যাকে মহাসচিব করা হয়েছে, তার সঙ্গে নেতাকর্মীদের কোনো সম্পর্ক নেই। রংপুর মহানগর জাতীয় পার্টির এক নেতা মন্তব্য করেছেন, জাতীয় পার্টির এ করুণ অবস্থার জন্য হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নিজেই দায়ী। তিনি নিজেই দলকে ধ্বংস করে দিয়ে যাচ্ছেন।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সম্প্রতি এক সভায় বলেছেন, জাতীয় পার্টিতে সংকট যাচ্ছে। তবে তা কেটে যাবে শিগগিরই। গত নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন এরশাদ। তার সে নির্দেশ শুনে একটি অংশ মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। তাদেরকে তিনি ওই সভায় ডেকেছিলেন ইমানুয়েল সেন্টারে। রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তাদের উদ্দেশ্যে এরশাদ বলেন, তোমরা হতাশ হয়ো না। যারা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছেন তাদেরকে সরকারের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা আদায় করে দেওয়া হবে।

ওই দিন এরশাদ বলেন, ব্যাংক-বীমায় অনেক পদ রয়েছে। সেখানে বঞ্চিত নেতাদের বসানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবেন তিনি। ওই সভার পর পরই ১৩ জন এরশাদ নেতার নামের তালিকাও দেন প্রধানমন্ত্রীকে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ওই তালিকার কোনো নেতাকেই কোনো পদ দেননি। যে কারণে হতাশা বেড়েছে ওই সব নেতাদের মধ্যেও। সংসদ সদস্যরা এখন এরশাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন না। এমন কি যৌথসভায় ডাকলেও মাত্র ৩ জন এমপি উপস্থিত হয়েছিলেন। তখন এরশাদ আক্ষেপ করে বলেছিলেন, তোমরা ফিরে আসো, না হলে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। এ অবস্থায় রোববার আবার ডাকা হয়েছে যৌথসভা। সভায় সংসদ সদস্য ও প্রেসিডিয়ামের সদস্যদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close