Featuredফিচার

ভারতীয় আগ্রাসন : বিপর্যস্ত বাংলাদেশ

ভূমিকা : বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। ১৯৭১ সালে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা, চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। আর স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের ভূমিকা সম্পর্কে সকলে ওয়াকিফহাল। ‘দক্ষিণ এশিয়ায় আধিপত্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদী দখলদার শক্তি হিসাবে আবির্ভাব হওয়ার হীন স্বার্থে ভারত মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেছে। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে ভারত আমাদের সাহায্য করেছিল একথা অস্বীকার করার উপায় নেই, কিন্তু ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন শক্তিশালী দেশ হিসাবে দেখার লক্ষ্যে নয়, বরং শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান ভেঙ্গে একটি আশ্রিত রাষ্ট্র হিসাবে পাবার লক্ষ্যে ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করেছিল। তার বড় প্রমাণ ৭১-এ ভারত নিজের হাতের মুঠোয় পেয়ে মুজিবনগরের অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারকে ভারতের সাথে  গোপনীয় অসম ৭ দফা চুক্তি করতে বাধ্য করেছিল। এ চুক্তি ৭ দফা চুক্তি নামে খ্যাত।

চুক্তির শর্তসমূহ :

দফা-১ : যারা সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে, শুধু তারাই প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে নিয়োজিত থাকতে পারবে। বাকীদের চাকরিচ্যুত করা হবে এবং সেই শূন্য পদ পূরণ করবে ভারতীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তারা।

দফা-২ : বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশে অবস্থান করবে (কিন্তু কতদিন অবস্থান করবে তার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি)। ১৯৭২ সালের নভেম্বর মাস থেকে আরম্ভ করে প্রতি বছর এ সম্পর্কে পুনঃ নিরীক্ষণের জন্য দু’দেশের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

দফা-৩ : বাংলাদেশের কোন নিজস্ব সেনাবাহিনী থাকবে না।

দফা-৪ : অভ্যন্তরীণ আইন শৃংখলা রক্ষার জন্য মুক্তিবাহিনীকে কেন্দ্র করে একটি প্যারামিলিশিয়া বাহিনী গঠন করা হবে।

দফা-৫ : সম্ভাব্য ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে অধিনায়কতব দিবেন ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান, মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক নন এবং যুদ্ধকালীন মুক্তিবাহিনী ভারতীয় বাহিনীর অধিনায়কত্বে থাকবে।

দফা-৬ : দু’দেশের বাণিজ্য হবে খোলা বাজার (open merket) ভিত্তিক। তবে বাণিজ্যের পরিমাণ হবে বছর ভিত্তিক এবং যার পাওনা সেটা স্টালিংয়ে পরিশোধ করা হবে।

দফা-৭ : বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের প্রশ্নে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলবে এবং ভারত যতদূর পারে এ ব্যাপারে বাংলাদেশকে সহায়তা দিবে।

অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে উক্ত সাত দফা গোপন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। ফলশ্রুতিতে মুক্তিযুদ্ধ শেষে মিত্রবাহিনী প্রায় ৬০ হাযার কোটি টাকার মালামাল এবং মিল-কারখানার যন্ত্রপাতি লুট করে সদ্য স্বাধীনতা অর্জনকারী শিশু রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণরূপে পঙ্গু করে পরনির্ভরশীল করার হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। ফলে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করা ছাড়া বাংলাদেশ সরকার বা মুক্তিযোদ্ধাদের করার কিছুই ছিল না।

কৃষিক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ধ্বংস করার জন্য শুরু হয় পানি আগ্রাসন। চালু করা হয় ‘ফারাক্কা বাঁধ’ নামক এক মরণফাঁদ। যার প্রভাবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ আজ ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। শুরু হয়েছে মেরুকরণ প্রক্রিয়া। প্রতিবেশী দেশটির সীমান্ত ঘিরে ১০/১২ কিঃ মিঃ অভ্যন্তরে হাযার হাযার ফেন্সিডিল তৈরীর কারখানা স্থাপিত হয়েছে, যার একমাত্র উদ্দেশ্য বাংলাদেশের কোমলমতি তরুণদের নেশাগ্রস্ত করে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেওয়া। যাতে বাংলাদেশ মেধা ও নেতৃত্বশূন্য হয়ে পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে।[2]

ইসরাঈলের সাথে ভারতের সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরের পর হতে খুব জোরালো ও অব্যাহতভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ উপস্থাপিত হচ্ছে। এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হচ্ছে, সন্ত্রাসবাদের অজুহাতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে প্রতিবেশী দেশের (ভারত) সামরিক হস্তক্ষেপ জায়েয করা যেমনটি আফগানিস্তান ও ইরাকে করা হয়েছে। এতদ্ব্যতীত সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, অর্থনৈতিক আগ্রাসন, পানি আগ্রাসন, বোমাবাজি, তথ্য সন্ত্রাস ও নির্বিচারে সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যাসহ সর্বগ্রাসী ভারত তার আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে বাংলাদেশে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। সুজলা-সুফলা, শষ্য-শ্যামলা ছোট্ট এ দেশটি আজ সত্যিই প্রতিবেশী দেশের গভীর ষড়যন্ত্রের জালে আবদ্ধ। কেননা আমরা সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের জালে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েছি, যার অনেকগুলো মরণফাঁদের মধ্যে একটি বোমাবাজি। যার যুগকাষ্ঠে আমরা নিজেরাই বলির পাঠায় পরিণত হচ্ছি। হয়ত সেদিন বেশী দূরে নয়, যেদিন কেবল খেয়ে পরে বেঁচে থাকার জন্য আমাদের প্রাণপ্রিয় দেশ-জাতি-ধর্মকে অন্যের পাদপাদ্যে অর্ঘ হিসাবে দিতে হতে পারে। ইতিমধ্যে এ সমস্ত কথা দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রেও প্রকাশিত হয়েছে। যেমন ভারতের স্বাধীনতা দিবসে আসামে যে বোমা ফাটানো হয় সেটি শাহজালাল মাযার প্রাঙ্গনে বিস্ফোরিত বোমার সাথে মিল রয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, সীমান্তের ওপার হতে বাংলাদেশে বোমা আসছে। প্রতিবেশী দেশের বোমা তো আর পায়ে হেঁটে আসতে পারে না। এর জন্য চাই উপযুক্ত বাহক এবং এদেশীয় এজেন্ট, যারা এই বোমার উপযুক্ত ব্যবহার করবে। উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশে তাদের বংশধরদের ক্ষমতায় বসানো (প্রাগুক্ত, পৃঃ ২৭)

উল্লেখ্য যে, স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের প্রাণপ্রিয় এ দেশটিকে সম্পূর্ণরূপে পরনির্ভরশীল করার জন্য গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারত। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের সম্মানিত শাসকবর্গ বারবার এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রকারীদের সাথেই হাত মিলিয়ে বেশ উদারতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে। অথচ আল্লাহ তা‘আলা কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন কাফির মুশরিকদের সাথে বন্ধুত্ব করতে। তিনি বলেন, لَا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللَّهِ فِي شَيْءٍ ‘মুমিনগণ যেন মুমিনদের ব্যতীত কাফেরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যে কেউ এরূপ করবে তার সাথে আল্লাহর কোন সম্পর্ক থাকবে না’ (আলে ইমরান ৩/২৮)

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন :

ইসলামী আন্দোলনের উর্বর এই দেশটিকে সম্পূর্ণরূপে পঙ্গু করার জন্য ভারত গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। বিশেষ করে সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তা ভয়ংকারূপ নিয়েছে ।

সংস্কৃতি মানুষের বাহ্যিক রূপ। মূলতঃ মানুষের ভিতরকার অনুশীলিত কৃষ্টির বাহ্যিক পরিশীলিত রূপকে সংস্কৃতি বলা হয়। সংস্কৃতি একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ, যা মানুষের সার্বিক জীবনাচারকে শামিল করে।[3] সংস্কৃতি একটি জাতির পরিচিতির মৌলিক উপাদান। এর মাধ্যমে কোন জাতির জাতিসত্তা আলাদারূপে পরিস্ফুটিত হয়। কোন জাতির স্বকীয়তা, জাতীয়তা, সামাজিক এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ তার সংস্কৃতির উপর নির্ভর করে। তেমনি সংস্কৃতিতে বিজাতীয় আগ্রাসন একটি জাতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়। জাতির উন্নয়নে শিক্ষা আমদানি করা যায় বটে কিন্তু সংস্কৃতি আমদানি করলে জাতিসত্তা হারিয়ে যায়। আজকে স্যাটেলাইটের যুগে কোন জাতিকে পঙ্গু করে দেয়ার জন্য তার অর্থনীতি, রাজনীতি এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের বিলোপ সাধনের জন্য সাংস্কৃতিক আগ্রাসনই যথেষ্ট। যা ওপেন সিক্রেট।

সাম্রাজ্যবাদীদের হাত সম্প্রসারণের জন্য আজ আর ব্যবসাকে পুঁজি করার প্রয়োজন পড়ে না। নিজের ঘরে বসে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কালো থাবা বিস্তারই যথেষ্ট। এক্ষেত্রে স্যাটেলাইট মিডিয়া এ কাজটি অনেক সহজ করে দিয়েছে। তবে যদি নিজেদের সাংস্কৃতিক ভিত মজবুত ও উন্নত হয় এবং নিজেদের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত হয়, তাহলে তাদের ষড়যন্ত্রের  মোকাবেলা করা খুব কঠিন কাজ নয়। প্রয়োজন শুধু দৃঢ় মানসিকতা আর সংঘবদ্ধ শক্তিমত্তা।

বাংলাদেশ আমাদের প্রাণপ্রিয় স্বাধীন মাতৃভূমি। আমাদের এ স্বাধীনতা বহু মূল্যে অর্জিত হয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে এক রক্তক্ষয়ী ইতিহাস, এক জীবন্ত মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু আজকে এই স্বাধীন দেশটি বিভিন্নমুখী সমস্যা এবং বিজাতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসনে জর্জরিত। ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ ও স্বার্থপরতা আমাদের এই স্বাধীন দেশকে করেছে বিপদগ্রস্থ। পরিণত হয়েছে দুর্নীতিগ্রস্ত এক অকার্যকর দেশে। শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা এবং দল ও পরিবার কেন্দ্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচীতে দেশ আজ অশান্তিতে সর্বোচ্চ স্থান দখল করেছে। অন্যদিকে দেশের শান্ত ও কোমল হৃদয়ের মুসলিম মানুষগুলোকে ধর্মীয় প্রতিহিংসার বস্ত্ততে পরিণত করেছে। বাঙ্গালী মুসলিম জাতিসত্তাকে ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারত তার মারদাঙ্গা সংস্কৃতি ও তথাকথিত আধুনিক উন্নত সংস্কৃতির বুলি প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এক অনাকাঙ্খিত ও অনিবার্য বিপর্যয়ের গহবরে নিক্ষেপ করতে সদা তৎপর। অন্যদিকে সর্বগ্রাসী ভারত অদৃশ্যে থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্রের কলকাঠি নাড়ছে। পাশাপাশি এদেশের মুসলমানদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও আধিপত্য বিস্তার করেছে। এজন্য নির্দ্বিধায় বলা যায়, ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে মিড়িয়া আগ্রাসনে মধ্যপ্রাচ্যে যেমন ইসরাঈল, সমগ্র বিশ্বজুড়ে যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তেমনি দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় আধিপত্য সহনীয়, গ্রহণযোগ্য এমনকি প্রশংসনীয় করতে অসংখ্য পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। আমাদের দেশটিকে কবযায় রাখতে গিয়ে এককালে নিজেদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ব্যয় করেছিল বৃটিশরা। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল বাজার দখল। আর ভারতও সামান্য কিছু অর্থ ব্যয় করে ঐ একই উদ্দেশ্য সাধন করছে। বৃটিশের সামনে সমস্যা ছিল তারা অধিকহারে আত্মবিকৃত দালাল পায়নি। ফলে হাজী শরীয়তুল্লাহ, তিতুমীর, দুদুমিয়াদের বিরুদ্ধে তাদের নিজেদেরকেও রক্ত ঢেলে লড়তে হয়েছে। অথচ ভারতের সৌভাগ্য হল তাদের হয়ে আজ এদেশের অনেকেই মীরজাফরী করছে। আত্মবিকৃতি করছে বিজাতীয় দোসরদের কাছে। যার মৌলিক কারণ তাদের চালু করা প্রবল মারদাঙ্গা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশী হয়েও তারা আজ ভারতীয়দের চেয়েও বেশী ভারতীয়। নষ্টা লেখিকা তসলিমা নাসরিন হল তার জাজ্বল্য প্রমাণ। সে যা লিখেছে তা খুব কম সংখ্যক ভারতীয় লেখার সাহস করেছে। এজন্য সে বাংলাদেশ থেকে তাড়িত হলেও ভারতে ঠিকই পুরস্কৃত হয়েছে।

সুধী পাঠক! আধুনিক সংস্কৃতির (Modern culture) নামে তথাকথিত ভারতীয় হিন্দি-বাংলা চলচ্চিত্রের কারণে গণধর্ষণ, হত্যা-রাহাজানী, গুম ইত্যাদি বেড়েই চলেছে। ভারতীয় হিন্দি-বাংলা-তেলেগু-মালয়ালম ইত্যাদি চলচ্চিত্রের বৈশিষ্ট্যের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে ভারতীয় লেখক অমিতাভ চট্টোপাধ্যায় তার ‘চলচ্চিত্রে অপসংস্কৃতি’ নামক নিবন্ধে চলচিচত্রের কুপ্রভাব তুলে ধরেছেন এভাবে :

১. যৌনতা, যা সর্বকালে সর্বদেশে মানুষের চেতনাকে ভোতা করার মহৌষধ।

২. অর্থ-সম্পদের প্রতি, আরামের রঙ্গিন জীবনের প্রতি ও লাস্যময়ী নারীর প্রতি তীব্র লোভের উদ্রেক।

৩. উৎকট এক বিজাতীয় সংস্কৃতিকে দেশীয় সংস্কৃতির জায়গায় চালানোর চেষ্টা।

৪. নারী যৌবনের ভোগ্যবস্ত্ত। পরে সেবিকা মাত্র।

ড. রশ্মি তার একটি সার্ভে দ্বারা দেখিয়েছেন যে, ভারতীয় চলচ্চিত্রে শতকরা ৮২ ভাগ ছবিতে নারী-পুরুষের তুলনায় নিকৃষ্ট জীব, ১৭ ভাগ ছবিতে সমকক্ষ ও মাত্র একভাগ ছবিতে নারীর স্থান উঁচুতে।

বলা বাহুল্য, আজকে বাংলাদেশের উদ্ভট কাহিনীর মারদাঙ্গা ছবি, স্বল্প পোশাকের নায়িকা নির্ভর নগ্ন ও অর্ধনগ্ন স্টাইল এবং যাবতীয় অশ্লীলতায় ভরপুর যেসব ছবি নির্মিত হচ্ছে তা অনেকাংশে ভারতীয় চলচ্চিত্র দ্বারা প্রভাবিত। বাংলাদেশ তাদের অনেক চলচ্চিত্রের অনুকরণ করে থাকে। শুধু তাই নয় বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে টিভি সিরিয়াল নির্মিত হচ্ছে ভারতীয় টিভি সিরিয়ালের আদলে। একটা সময় ছিল, যখন সংস্কৃতির নোংরা দৃশ্য দেখে নাক ছিটকাতেন সমাজের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পিতা-মাতারা। নিজ সন্তানদেরকে তার করাল আগ্রাসন থেকে নিরাপদে রাখার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করতেন। কিন্তু এখন কষ্ট করে আর প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে ছবি দেখতে হয় না। প্রত্যেক ঘরে ঘরেই এখন রীতিমত প্রেক্ষাগৃহ তৈরী হয়েছে। যা সত্যিই সেলুকাস বৈকি।

টেলিভিশন একটি শক্তিশালী প্রচার মাধ্যম। এটি বিজ্ঞানের আশীর্বাদকে কাজে লাগিয়ে একটি জাতির ধ্যান-ধারণা, চিন্তা চেতনা ও উন্নত চরিত্র সৃষ্টিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ পীস টিভি (Peace TV)। এই চ্যানেল বিশ্বময় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ডা. যাকির নায়েক কর্তৃক পরিচালিত পীস টিভির (Peace TV) মাধ্যমে মানুষ জানতে পারছে সঠিক ইসলামকে। বর্তমানে এ চ্যানেল অমুসলিমদের কাছেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

শুধু তাই নয়, ইসলাম ধর্মসহ বিভিন্ন ধর্মে অনুপ্রবিষ্ট বিভিন্ন ভ্রান্ত ধারণা, ইযম-মতবাদ, তরীকা, শিরক-বিদ‘আত ও সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এক ভয়ংকর মারণাস্ত্র এই পীস টিভি  (Peace TV)। প্রশ্ন হল, আমাদের দেশের টিভি চ্যানেলগুলো কি জাতির কল্যাণে সঠিক ভূমিকা পালন করছে? অশ্লীল নাটক, সিনেমা, বিজ্ঞাপন, বিজাতীয় অনুষ্ঠান ও মাঝে মাঝে ইসলাম ধর্মের নামে বিভিন্ন মাযহাব-তরীকা, ইযম-মতবাদ ও শিরক-বিদ‘আতে পরিপূর্ণ অনুষ্ঠান প্রচার করছে। এতে করে জাতির মনন-চিন্তা আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। পাশাপাশি মানুষ ধর্মীয়ভাবে বিভ্রান্ত ও প্রতারিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে ভারতীয় বিভিন্ন টিভি চ্যানেল। চরম আশঙ্কার খবর এই যে, স্বয়ং বাংলাদেশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় দেশে ভারতীয় অসংখ্য চ্যানেল দেখানো শুরু হয়েছে।

আর এতে করে বছরে হাযার হাযার কোটি টাকা ব্যয় করছে বাংলাদেশ সরকার। টিভি ক্যাবল ব্যবসায়ীদের এক জরীপে বলা হয়েছে, বর্তমান দেশে ২৭২ টির মতো টিভি চ্যানেল রয়েছে। এর মধ্যে ৪০ টির মতো টিভি চ্যানেল এদেশীয় সরকার জনগণের টাকায় কিনে নেয়, যার সবগুলোই ভারতীয় (!)। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের চ্যানেল এইচ বিও (HBO) এখন ভারত থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয় বলে পেমেন্টটাও সেখানে করতে হয়।

অথচ বাংলাদেশে আজো অনেক মানুষ রয়েছে, যারা ক্ষুধার তাড়নায় নিজের ঔরসজাত সন্তানকে বিক্রি করতে বাধ্য হয়, দারিদ্রের নির্মম কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে সূদী ব্যাংক ও এন.জিও-এর নিকটে ধরণা দেয়। যে দেশের মানুষ স্থায়ী বাসস্থানের অভাবে রেললাইনের ধারে, রাস্তার পাশে, এমনকি গাছ তলায় পর্যন্ত রাত কাটায় না খেয়ে। অথচ সে দেশের সরকার বছরে হাযার হাযার কোটি টাকা ব্যয় করছে শুধুমাত্র মনোরঞ্জনের খোরক পুরণে। এ খবর চরম আশঙ্কা ও দুঃখজনক বৈকি!

তাই বলা যায়, ভারতীয় চ্যানেলগুলোর প্রভাবে হিন্দি আগ্রাসনে বিপর্যস্ত দেশজ সংস্কৃতি। ভারতীয় সংস্কৃতির চলমান আগ্রাসন নতুন প্রজন্মকে নিজস্ব সংস্কৃতি বলয় থেকে দূরে নিক্ষেপ করছে। সামাজিক যোগাযোগের জনপ্রিয় ওয়েবসাইট ফেসবুকে (Facebook) পাঁচ হাযারেরও বেশী তরুণ-তরুণীর প্রোফাইল দেখে জানা গেছে, যে দেশের জনগণ বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি লাভের জন্য রক্ত দিয়েছে, জীবন দিয়েছে, সে দেশের নতুন প্রজন্মের নিকট প্রিয় সিনেমার তালিকায় হিন্দি সিনেমার আধিপত্য। ভারতীয় রাজনৈতিক ও কলাম লেখক শশী থারু তার এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, বলিউড হল সফ্ট পাওয়ার। এ পাওয়ার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মত কামানের গোলা বর্ষণ করে না ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের রূমে যে বাক্সটি (TV)  রয়েছে তার ভিতর দিয়ে সংস্কৃতির গোলা বর্ষণ করে। আর সে গুলো বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে তছনছ করে দেয়।

সম্মানিত পাঠক! উক্ত ভারতীয় রাজনৈতিক নেতার বক্তব্যের মধ্য দিয়েই ভারতের নগ্ন সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের স্বরূপ স্পষ্টরূপে ফুটে উঠেছে। সংস্কৃতির আগ্রাসনের রূপ তুলে ধরে মারাঠি রাজনৈতিক নেতা শঙ্কর রাও দেও ভারতের লোকসভায় বলেছিলেন, নেহেরু শুধু সংস্কৃতির কথা বলেন। কিন্তু ব্যাখ্যা দেন না। সংস্কৃতি বলতে তিনি কী বুঝাতে চাচ্ছেন। আজ বুঝলাম, সংস্কৃতি মানে হলো বহুর উপর স্বল্পের আধিপত্য। ভারতে হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার পর তিনি এ বক্তব্য রেখেছিলেন। বাংলাদেশের কোন টিভি চ্যানেল ভারতে দেখানো হয় না। এর জন্য বাংলাদেশের বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। অথচ বাংলাদেশ সরকার তাদের সব চ্যানেলগুলো কিনে দেখায়। সাথে সাথে ভারতীয় বিজ্ঞাপনও প্রদর্শিত হচ্ছে। ফলে এদেশে তাদের একটি বড় ব্যবসায়িক বাজার তৈরী হয়েছে। এ থেকে বাংলাদেশ সরকার বা জনগণ কোনভাবেই লাভবান হচ্ছে না। তাহলে একটি স্বল্পন্নোত দেশ হয়ে আমাদের বিজ্ঞ (?) সরকার বছরে হাযার কোটি টাকা ব্যয় করে তাদের সব চ্যানেল দেখাবে কেন? হায়রে দলীয় সরকার! হায়রে গণতন্ত্র!

সুধী পাঠক! আধুনিক সংস্কৃতির (Modern cultue) নামে আমরা কি ক্রমশঃ বিজাতীয় সংস্কৃতি ও হীন রাজনৈতিক অশুভ দুরভিসন্ধিমূলক ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ছি না? আমরা কি ক্রমশঃ মুসলিম সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, আচার-আনুষ্ঠান নিঃশেষ করে ফেলছি না? বর্ষবরণ, মঙ্গলপ্রদীপ, মঙ্গলঘট, কপালে টিপ, শিখা চিরন্তন, শিখা অনির্বাণ, কবরে ফুল দিয়ে সম্মান প্রদর্শন, কিছুক্ষণ নিরবতা পালন ইত্যাদি হিন্দু সংস্কৃতিকে নিজেদের সংস্কৃতি মনে করে নিজস্ব স্বকীয়তা ও নিজস্ব সংস্কৃতি বিলীন করছি না? বাংলাদেশী মুসলমানদের কি নিজস্ব কোন সংস্কৃতি বা স্বাতন্ত্র্যবোধ নেই? অবশ্যই আছে। পবিত্র কুরআন এবং ছহীহ সুন্নাহ তার জাজ্বল্য উদাহরণ। অমুসলিম বিদ্বানদের মুখেও মুসলমানদের সুস্থ সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা যায়।

এ সমন্ধে একজন হিন্দু ব্যক্তি শ্রী গোপাল হাওলাদার মন্তব্য করেন, ভারতীয় সংস্কৃতি মুসলমানদের বিবেককে আত্মসাৎ করিতে পারিল না, তাহার কারণ মুসলমান ধর্ম সেই প্রয়াস ব্যর্থ করিয়া দিল। ইসলামের একেশ্বরবাদ তত্ত্বের বেশী পরওয়া করে না। কোন বিচার বিশ্লেষণের সূক্ষ্মতা সহ্য করে না। ইসলাম সেমেটিক গোষ্ঠীর ধর্ম। তাহার হিসাবপত্রও সেই গোষ্ঠীর মতোই একেবারে পরিষ্কার। হিন্দু ধর্ম বলিতে পারে একমেবাদ্বিতীয় সর্বথলিদ্বংব্রক্ষ। আর ইহার পরে ব্যাখ্যা দ্বারা শুধু দ্বিতীয় কেন পাথর, পশু, মানুষ, যে কোন জিনিসকেই দৈব্যশক্তির আধার বলিয়া পূঁজা করিতে হিন্দুদের বাঁধে না। ইসলামে এই রূপ তত্ত্ব কথার ও গোঁজামিলের স্থান নেই[।

বাংলা সাহিত্যের প্রবাদ পুরুষ ‘অন্নদা শঙ্কর রায়’ হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতি ও বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতির রূপায়ন এবং জাতিগত সত্ত্বা বিকাশের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘হিন্দুর বিকাশ হবে হিন্দুত্বের ভিতর দিয়ে, আর বাঙ্গালির বিকাশ হবে বাঙালিত্বের ভেতর দিয়ে। বেশ তাহলে মুসলমানদের বিকাশ হবে কিসের ভেতর দিয়ে? সে তো হিন্দু নয় সেটা তো সুস্পষ্ট। কিন্তু সেও তো বাঙ্গালি। তার (মুসলমানের) বাঙালিত্ব কি একটু স্বতন্ত্র নয়? অবিকল হিন্দু ধাঁচের? বাঙালি সংস্কৃতির নামে হিন্দু সংস্কৃতি চাপিয়ে দিতে গেলে একজন মুসলমান তো প্রতিবাদ করবেই। সে তো বলবেই আমরা বাঙালি নই, আমরা মুসলমান। কথাটা আমি যেমন মুসলমানের মুখে শুনেছি তেমনি হিন্দুর মুখেও শুনেছি। ওরা মুসলমান আমরা বাঙ্গালি। এটা তো আমাদেরই স্বখাত সলিল। ইংরেজদের কাটা খাল নয়। খালটা বাড়তে বাড়তে পদ্মা নদীর চেয়েও প্রশস্ত ও গভীর হয়েছে। আজ বাংলাদেশের জল, স্থল, অন্তরীক্ষ ভিন্নধর্মী সংস্কৃতির আগ্রাসনের হাতে সঁপে দিয়ে নিশ্চুপ বসে থেকে এবং পড়শী সংস্কৃতির প্রভুত্ব মাথায় তুলে নিয়ে আত্মনিমগ্ন থেকে আমরা শুধু আমাদের দেশ ও জাতির অস্তিত্ব-কেই হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছি না, ধর্মকেও জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছি।

ইদানিং বাঙালি সংস্কৃতির নামে যে সংস্কৃতির কথা বলা হচ্ছে, তা আসলে এদেশের মাটি ও মানুষের সংস্কৃতি নয়, এদেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি নয়। এটি মঙ্গলপ্রদীপ মার্কা সংস্কৃতি। ভাষার প্রেক্ষিতে বাঙালি আমাদের একটি অন্যতম পরিচয়। বাংলাদেশী অস্তিত্বে বাঙালি মুসলমান আছে, বাঙালি হিন্দু আছে, বাঙালি বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান আছে। আরো আছে বিভিন্ন উপজাতি। কিন্তু বাঙালির নামে আমাদের সকল পরিচয় মুছে দেয়ার প্রবণতা একটি ভয়ংকর অপতৎপরতা। বাঙালি সংস্কৃতির অপতৎপরতায় আজ বাংলাদেশী মুসলমানদের নিজস্ব সংস্কৃতি বিলীন হওয়ার পথে। বর্তমানে বাংলাদেশের কিছু মানুষ বুদ্ধিজীবী (!) হবার কারণে অন্য সকলকে ১লা বৈশাখের অনুষ্ঠান দিয়ে একথা বুঝাবার চেষ্টা করেছেন যে, ১লা বৈশাখ বাঙালির জাতীয় সংস্কৃতি হতে পারে।

কিন্তু ১লা বৈশাখসহ বাংলা বর্ষটি হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য তাদের সংস্কৃতি। কিন্তু মুসলমানদের জন্য তা আসলে কোন সংস্কৃতি হতে পারে না বরং তাতে বড় ধরণের শিরক আছে। তেমনিভাবে জাতীয় পতাকা জাতীয় গৌরবের নির্দশন, তাকে উন্নত রাখাই হচ্ছে তার মর্যাদা। পতাকার উল্লিখিত সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে ছাহাবীগণ (রাঃ) ও তাবেঈগণ অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, কিন্তু জাতীয় পতাকাকে কোন ক্রমেই অবনমিত হতে দেননি। কিন্তু তাই বলে তাঁরা কেউ পতাকার সম্মানার্থে দাঁড়াতেন না। কিংবা তাকে অভিবাদন করতেন না। প্রতীকের জন্য দাঁড়ানো আর তাকে সালাম করা জড়পূজকদের সংস্কৃতি হতে পারে কিন্তু ইসলামী আদর্শের ঘোর পরিপন্থী।

এসব বাঙালি সংস্কৃতি বা আধুনিক সংস্কৃতির আড়ালে হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতির সাথে মুসলমানদের সংস্কৃতি বা জীবনাচরণ একই স্রোতে ধাবমান কোন বিষয় নয়। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের তীব্র আকাঙ্খাই সংস্কৃতির একমাত্র কার্যকর নিয়ন্ত্রক শক্তি। এই নিয়ন্ত্রক শক্তির অনুপস্থিতি মানুষকে এমন সব কর্মকান্ডে উদ্ভাবন ও অনুশীলনে প্ররোচিত করে সেগুলোকে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে সংস্কৃতি বলে প্রচার করা হলেও আসলে সেগুলো সংস্কৃতি নয় বরং অপসংস্কৃতি।

এসব অপসংস্কৃতির নামে সংস্কৃতি পালন ইসলাম ধর্মে জঘন্য অন্যায়। মুসলমানদের এই বিজাতীয় অনুরাগ এটা তাদের চরম অধঃপতনের লক্ষণ ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে? ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারতের নগ্ন সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফলে বাংলার মুসলিম সমাজ আজ ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। অথচ মুসলমানদের রয়েছে এক উন্নত ও স্বতন্ত্র সংস্কৃতি। বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সংস্কারক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদেরই অবিসংবাদিত নেতা। ইসলামী সংস্কৃতির প্রভাব কত সুদূরপ্রসারী তা নিম্নের আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয়, যিনি এসেছিলেন দক্ষিণ আরবের মক্কা নগরীতে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে। সময়টা ছিল অন্ধকার যুগ। মক্কা ছিল পৃথিবীর পশ্চাৎপদ অঞ্চলের অন্যতম। ব্যবসা-বাণিজ্য, জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে শিল্পকলা ও সুকমারবৃত্তির সাথে তেমন কোন যোগাযোগ ছিল না এ অঞ্চলের মানুষের। মানুষগুলো ছিল উচ্ছৃংখল, ব্যভিচারী, নীতিভ্রষ্ট, নীতিহীনতা, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষই ছিল তাদের নিত্য দিনের সঙ্গী। এমনি এক পাশবিক পরিবেশে আল্লাহ তা‘আলা পাঠালেন পৃথিবীর সর্বশেষ সংস্কারক, নবীগণের শ্রেষ্ঠ নবী, মানুষের শ্রেষ্ঠ মানুষ, মনুষ্যত্বের উৎকর্ষ ও মূর্তপ্রতীক মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে। যিনি মানুষের বিবেকের মালিন্য দূর করলেন আর ক্বিয়ামত পর্যন্ত অবিকৃত থাকার গ্যারান্টি দিয়ে রেখে গেলেন অমূল্য সংস্কারক গ্রন্থ আল-কুরআন।

তাই আজ সময় এসেছে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের একনিষ্ঠ অনুসারী হয়ে মুসলমানদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধারণ করা এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও মিডিয়াকে ব্যবহার করা। স্যাটেলাইটের এ যুগে মিডিয়ার প্রচারণাকে মিডিয়া দিয়েই প্রতিহত করতে হবে। এই কৌশল আজ মুসলমানদেরকে আয়ত্ব করতেই হবে। পাশ্চাত্যের সুপ্রসিদ্ধ ধর্মবিষয়ক পন্ডিত Muhammad (sm) the biography of a prophet-এর নন্দিত রচয়িতা ‘কারেন আর্মস্টং’ বলেন, একুশ শতকে মুসলমানরা এ রকম একটা স্টাটেজি ছাড়া পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ নিয়ন্ত্রিত মিড়িয়ার যুদ্ধকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। মুসলমানদের মিডিয়াকে ব্যবহার করা উচিত ইহুদীদের মত। মুসলমানদের লবিং করতে জানতে হবে। মুসলমানদের একটি মুসলিম ‘লবি গ্রুপ’ সৃষ্টি করতে হবে, যাকে সমন্বিত প্রচেষ্টা গ্রহণ’ বলা যেতে পারে। এটা এমন একটা প্রচেষ্টা, এমন একটা সংগ্রাম, যেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি আপনি মিডিয়াকে পরিবর্তন করতে চান, তাহলে মানুষকে আপনার বোঝাতে হবে যে, ইসলাম রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ শক্তি। মুসলিম উম্মাহকে এই নবতর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার বিকল্প কোন পথ নেই।

সংস্কৃতি মানুষের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সংস্কৃতি ছাড়া জীবন অচল। অধুনা বিশ্বের শিক্ষিতদের অনেকেই মনে করেন মুসলমানদের কোন সংস্কৃতি নেই। আসলে এটা ঠিক নয়। মুসলমানদের সংস্কৃতি প্রতিদিন ভোরে ঘুম ভাঙার পর শুরু হয় এবং শেষ হয় সংস্কৃতির ভিতর দিয়েই। তাই আসুন! আমরা প্রকৃত সংস্কৃতিবান হই। পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ও ব্রাক্ষ্মণ্যবাদী ভারতীয় সংস্কৃতির বিভীষিকাময় রাজ্য ছেড়ে মুসলিম সংস্কৃতি পালনে উদ্বুদ্ধ হই। আমাদের জীবন, সমাজ ও দেশ সেই সংস্কৃতির আলোকচ্ছটায় আলোকিত হয়ে উঠুক। ইহকালীন ও পারলৌকিক জীবন হোক সুখময়। আল্লাহ আমাদের সহায় হৌন-আমীন!!

 

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close