অন্য পত্রিকা থেকে

আওয়ামী লীগে রক্তক্ষরণ

লুৎফর রহমান: ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে আলোচনা-বিতর্ক শেষ না হতেই নয়া বিতর্কে নাজেহাল আওয়ামী লীগ। টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা দলটির সামনে এখন কঠিন চ্যালেঞ্জ। প্রধান বিরোধী দল ছাড়া নির্বাচন করে মিত্রদের নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর দেশে-বিদেশে বিতর্কের মুখে পড়ে সরকার। কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়েই শুরু হয় অভিনব এক সরকারের পথচলা। সংসদের বিরোধী দলকে সরকারে অংশীদারিত্ব দিয়ে নতুন এক সরকার কাঠামোর পথ দেখায় আওয়ামী লীগ।

অমসৃণ এই পথ চলা যে বড় কঠিন হবে তা দলের নেতারা শুরু থেকেই আঁচ করে আসছেন। জাতীয় নির্বাচনের পর তড়িঘড়ি করে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন দিয়ে গায়ে পড়েই আরেক বিপদ ডেকে আনে ক্ষমতাসীন দল। জাতীয় নির্বাচন একতরফা, ভোটারবিহীন তকমা পাওয়ার পর উপজেলা নির্বাচন গড়ে দখল আর অনিয়মের নজির। ধাপে ধাপে দখল ও অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনা বাড়ায় সদ্য দায়িত্ব নেয়া সরকারকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। একই সঙ্গে এ নির্বাচনের ফল শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়ায় ক্ষমতাসীনদের জন্য। দেশে-বিদেশে এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হলেও এর জবাবে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করার ফুরসত পায়নি ক্ষমতাসীন দল। শেষ ধাপের নির্বাচনের যখন অপেক্ষা তখনই নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় বিপাকে পড়েছে নতুন সরকার।

এ ঘটনায় চরম অস্বস্তিতে পড়েছেন দলের নেতাকর্মীরা। দলে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করতে মধ্যম সারির গুটিকয়েক নেতা এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে রাজনৈতিক কথাবার্তা বললেও দলের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতাই বিব্রত এ ঘটনায়। খোদ একটি এলিট বাহিনীর সঙ্গে দলের এক নেতার সমঝোতায় এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটার অভিযোগ ওঠার পর এ নিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও বেকায়দায় পড়ছেন। এলিট বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ অনেক পুরনো। এ জন্য আন্তর্জাতিক মহল থেকে বারবার সতর্ক করা হয়েছে। এ বাহিনীকে বিলুপ্ত করে দেয়ার পরামর্শও এসেছে। কিন্তু অতীতে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠলেও এসব ঘটনায় নিজস্ব যুক্তি ও কৌশল দিয়ে উতরে যাওয়া হয়।

কিন্তু নারায়ণগঞ্জে নৃশংস খুনের কায়দা, আলামত ও শক্ত অভিযোগের কারণে ওই বাহিনীটির সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে- যা অতীতের অভিযোগগুলোকেও আলোচনায় নিয়ে এসেছে নতুনভাবে। এতে চরম অস্বস্তিতে পড়েছে সরকার ও আওয়ামী লীগ। দীর্ঘ দিন ধরে  নেতিয়ে থাকা দলীয় কার্যক্রমেও গতি আনতে পারছে না দলটি। দলের শীর্ষ নেতারা সরকারকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডে সময় দেয়ায় অনেকটা দল এবং সরকার একাকার হয়ে পড়েছে। এদিকে সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য বৈঠক ডাকা হয়েছে দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের। আজ সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে এ বৈঠক হবে। বৈঠকে দলীয় কর্মসূচি নির্ধারণ ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ঘটনাবলী নিয়ে আলোচনা হবে। আগামী জুনে দলের বিশেষ কাউন্সিল করার বিষয়েও আলোচনা হবে বৈঠকে। কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের নেতৃত্বেও পরিবর্তন আনা হবে। অভিজ্ঞ নেতা আমির হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমেদকে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে প্রেসিডিয়ামে। তবে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে কোন পরিবর্তন আসছে না বলে জানিয়েছে দলীয় সূত্র।

দলের একাধিক প্রেসিডিয়াম সদস্য জানিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জের ঘটনাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনা সরকার এবং দলের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তবে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে দলীয় সভানেত্রী কড়া নির্দেশনা দিয়েছেন। যে কোন মূল্যে দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তিনি দৃঢ় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। এক্ষেত্রে দলের কারও কোন ধরনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া গেলে তাকেও ছাড় দেয়া হবে না।

দলীয় সূত্র জানিয়েছে, উপজেলা নির্বাচন, নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডার, বিরোধী দলের সম্ভাব্য আন্দোলনের বিষয়ে পর্যালোচনা হবে আজকের বৈঠকে। বৈঠকের বিষয়ে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য নূহ-উল আলম লেনিন জানান, বৈঠকে নির্ধারিত কোন এজেন্ডা নেই। দলীয় কর্মসূচি চূড়ান্তকরণ ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনা হবে। এদিকে নারায়ণগঞ্জের ঘটনা নিয়ে দলের অস্বস্তিকর অবস্থা বিরাজ করলেও এ নিয়ে খুব একটা কথা বলছেন না শীর্ষ নেতারা। সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সম্প্রতি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এ ঘটনায় যারা দায়ী তাদের সবাইকে বিচারের আওতায় আনা হবে। আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। দু’দিনে নিহত ছয় পরিবারের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তিনি এ প্রতিশ্রুতি দেন।

দলের আরেক সিনিয়র নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত জানিয়েছেন, রাজনীতির জন্যই নারায়ণগঞ্জের ঘটনার সত্য উদঘাটন করা প্রয়োজন। যদিও নারায়ণগঞ্জের সাত জনের অপহরণের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা এ ঘটনায় বিরোধী দল বিএনপিকে জড়িয়ে বক্তব্য দিয়ে নিজেরাই বিতর্কে জড়ান। তাদের এমন বক্তব্যে প্রতিক্রিয়াও আসে বিভিন্ন মহল থেকে। সর্বশেষ ৩০শে এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদী থেকে নিহত সাত জনের লাশ উদ্ধারের পর ঘটনায় নতুন মাত্রা পায়। নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম সরাসরি দাবি করেন আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেন ছয় কোটি টাকা দিয়ে র‌্যাবের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন আওয়ামী লীগ নেতা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার জামাতা, র‌্যাব ১১-এর তৎকালীন কমান্ডার তারেক সাঈদ মোহাম্মদ নূর হোসেনের কাছ থেকে এই টাকা নিয়েছেন। মন্ত্রীর ছেলে এ ঘটনায় মধ্যস্থতা করেছেন বলেও অভিযোগ করেন শহিদুল।

এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় ছয় নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। নিহত নজরুলসহ অন্যরাও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। নিহত নজরুল ও অভিযুক্ত নূর হোসেন দু’জনই স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠজন। ঘটনার আগে পরের তথ্য জানা ছিল তার। বিরোধীপক্ষ এ ঘটনায় শামীম ওসমানেরও দিকেও সন্দেহের তীর  ছোড়ে। যদিও তিনি এ অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে বেশ কয়েকটি টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেন। প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য দিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে। শেখ হাসিনার প্রথম দফা সরকারে নারায়ণগঞ্জ, ফেনী এবং লক্ষ্মীপুরের তিন নেতার বিতর্কিত কর্মকাণ্ড দলটিকে খাদের কিনারে দাঁড় করিয়ে ছিল। তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর আবার আলোচনায় সেই নারায়ণগঞ্জ। অথচ যে নেতা এবং স্থানের জন্য দলটিকে বারবার বিব্রতকর অবস্থায় দাঁড়াতে হচ্ছে সেখানে কোন সময়ই দলের অবস্থান ভাল ছিল না। অভ্যন্তরীণ কোন্দল, নেতায় নেতায় বিরোধে বিপর্যস্ত এ জেলায় ভোটের অঙ্কে বিরোধী পক্ষের অবস্থান অনেকটা ভাল।

এদিকে নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় জামাতার সংশ্লিষ্টতার কারণে বেকায়দায় পড়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। তাকে নিয়ে বিব্রত দলের হাইকমান্ড। এমন অবস্থায় তিনি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বিবৃতিও দিয়েছেন। দাবি করেছেন, এ ঘটনায় অভিযুক্ত কারও সঙ্গে তার পরিবারের সম্পর্ক নেই। মন্ত্রী এমন বক্তব্য দিলেও তার অবস্থা অনেকটা নড়বড়ে। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, তাকে নিয়ে ভাবছে হাইকমান্ড। এ বার্তা পেয়েই তিনি মন্ত্রিসভার দু’টি বৈঠকে অংশ নেননি। এতে গুঞ্জন ওঠে তার পদত্যাগ নিয়ে। তবে এ পর্যন্ত মন্ত্রী নিজে বিষয়টি স্পষ্ট করেননি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আওয়ামী লীগের একটি সূত্র জানিয়েছে সরকার ও দলের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে মন্ত্রী মায়ার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে তিনি দ্বিধা করবেন না। শেখ হাসিনা অতীতেও দলের নেতা ও মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছেন।

এদিকে দলের সার্বিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে একটি প্রতিবেদন চেয়েছেন দলীয় সভানেত্রী। বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদকদের এ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। সামপ্রতিক উপজেলা নির্বাচন সহ দলের সার্বিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য এ প্রতিবেদনে দেয়ার জন্য বলা হয়েছে। আজকের বৈঠকে সাংগঠনিক সম্পাদকদের এ রিপোর্ট উপস্থাপনের কথা রয়েছে। এ রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে সাংগঠনিক কর্মসূচি প্রণয়ন ও বিতর্কিত নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close