অন্য পত্রিকা থেকে

নেতাদের চরিত্র, ফুলের মত পবিত্র

ড. জিনিয়া জাহিদ:

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনে জড়িত সন্দেহভাজন আসামি আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেনের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত রিপোর্টগুলো অত্যন্ত কৌতুহলের সঙ্গেই পর্যবেক্ষণ করছি। নূর হোসেন একজন জনপ্রতিনিধি। জনগণের ভোটে নির্বাচিত কাউন্সিলর।সমর্থকরা সর্বদাই দাবি করে থাকে, তাদের নেতার চরিত্র ফুলের মত বা তার থেকেও বেশি পবিত্র। জানিনা সে কোন ফুল, তবে নূর হোসেনের মত নেতা যে আমাদের দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতার চরিত্রের মূর্তমান প্রতীক তা বললে বোধহয় অত্যুক্তি হয় না।তো নূর হোসেনের মত চরিত্রের নেতা হতে হলে বেশ কিছু ফর্মুলা মেনে চলা অতীব প্রয়োজন। ভবিষ্যতে যারা নেতা হতে চান, এই ফর্মুলা তাদের নির্ঘাৎ অনেক কাজে দেবে বলেই আমার বিশ্বাস।

ফর্মুলা-১: ডিগবাজি
নেতা হতে গেলে ত্বড়িৎগতিতে ক্ষমতাসীন দলে ডিগবাজি দেবার দক্ষতা থাকা প্রয়োজন। নূর হোসেন নাকি আগে বিএনপি করতেন, পরে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে যোগ দেন। তার মানে এসব নেতা যখন যে দলে ইচ্ছে যেতে পারেন, কোনই সমস্যা নেই।

আগে শত্রুপক্ষে ছিলেন জেনেও এই গোত্রীয় নেতাদের কি কারণে দলে নেয়া হয় তা সত্যি বোধগম্য নয়। এমন তো নয় যে, নূর হোসেনের মত নেতার বড়ই অভাব আওয়ামী লীগে! তারপরও এই ডিগবাজিবাজরা যে দলেই যাক না, বহাল তবিয়তেই ক্ষমতার স্বাদ আস্বাদন করে থাকেন।

ফর্মুলা-২: নিম্ন শিক্ষাগত যোগ্যতা
নিম্ন শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা মুর্খ হলে আরো ভালো নেতা হওয়া যায়। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি টেলি কথোপকথন থেকে নূর হোসেনের মুখেই জানা গেল যে, তার তেমন কোনো পড়াশুনা নেই। অর্থ্যা‍ৎ পুঁথিগত শিক্ষাগত যোগ্যতার অভাব রয়েছে এই কথিত নেতার।

শিক্ষগত যোগ্যতার অভাব অবশ্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে তেমন কোনো ব্যাপার না। আমাদের অনেক রাজনৈতিক দলের শীর্ষ থেকে শুরু করে তৃণমূলের অধিকাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা উল্লেখ করার মত নয়।

যেহেতু আমাদের দেশে শিক্ষাগত যোগ্যতা নেতা হবার জন্য তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, বরং প্লাস পয়েন্ট। কাজেই জীবনেও যারা স্কুলের দরজায় পা রাখেননি বা কোনো ডিগ্রি লাভের দুর্ভাগ্য(!) অর্জন করেন নি, তারা সফল রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখা শুরু করতে পারেন।

ফর্মুলা– ৩: প্রভাব-প্রতিপত্তি
নেতা হতে হলে থাকতে হবে প্রভাব-প্রতিপত্তি। এজন্য থাকতে হবে প্রচুর টাকা। টাকা নেই তো, নেতার দামও নেই। তো প্রশ্ন হল, এই টাকা আসবে কোত্থেকে? বাপের সম্পত্তি বিক্রি করে? বউ এর গয়না বন্ধক রেখে? মোটেও তা নয়। এসব মান্ধাতার আমলের নেতাদের চিন্তাভাবনা ত্যাগ করে ডিজিটাল নেতা হতে চাইলে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও “অল্প পুঁজি বেশি রুজি” নামক মাদকব্যবসা থেকে অর্থ উপার্জন করতে হবে। কারণ এসবই হলো ডিজিটাল নেতাদের পেশা।

পাঠক জেনে রাখুন, এসব পথে আয়-উপার্জন কিন্তু আমাদের নেতাদের জন্য লিগ্যাল। পুলিশ দেখেও দেখবে না, বরং তারা নেতাদের উপার্জনের পথ আরো মসৃণ করে দেবে অল্প কিছু নজরানার বিনিময়ে।

আমাদের আলোচিত নেতা নূর হোসেনও এর ব্যতিক্রম নয়। তিনিও অর্থ উপার্জন করেছেন, টাকার পাহাড় গড়েছেন রাজনীতিকদের জন্য “বৈধ” এ সব উপায়ে।

নেতাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়াতে যেমন টাকা দরকার, তেমনি দরকার অস্ত্র, রক্ত। যে যত বেশি ত্রাস সৃষ্টি করতে পারবে, তার তত বেশি প্রতিপত্তি। নেতার বিরুদ্ধে বেশি তেড়িবেড়ি করলেই গলাকাটা লাশ হতে যে বেশি সময় লাগবে না, এটা এলাকার মানুষদের হাতেঅস্ত্রে (হাতেকলমে) উদাহরণস্বরূপ বুঝিয়ে দিতে হবে।

নূর হোসেন এ ফর্মুলায় যে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন সেটা তো এখন ওপেন সিক্রেট। কত কত অস্ত্রের মালিক যে এই মহান (!) নেতা, তা দেশবাসী পত্রিকার মাধ্যমেই জানছে। কত শত মানুষের যে গলাকাটা পড়েছে, তাও ধীরে ধীরে সবাই জানছে, জানবে।

Nila_nur_hossain_bgফর্মুলা– ৪: সুন্দরী “বান্ধবী”
অতি সফল নেতা হতে হলে নেতাদের অবশ্যই সুন্দরী “বান্ধবী” থাকতে হবে। বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি? এই ফর্মুলার অন্যতম “রাজনৈতিক গুরু” হো. মো. এরশাদের রাজনৈতিক জীবনী পাঠ করলেই বুঝতে অসুবিধা হবে না যে, এক বা একাধিক সুন্দরী “বান্ধবী” না থাকলে নেতা হিসেবে তারুণ্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। আল্লামা(!) সাইদীর কথাই বা ভুলে যাই কেন?

নূর হোসেন এই ফর্মুলার অন্যতম একনিষ্ঠ ফলোয়ার। পত্রপত্রিকায় নূর হোসেনের বান্ধবীকে দেখুন। নূর হোসেনের কাছ থেকে ভালবাসার গোলাপ পেয়ে প্রভাব-প্রতিপত্তি-খুন-খারাবিতে পাল্লা দিয়ে তিনি নূর হোসেনের যোগ্য বান্ধবী হিসেবে এলাকাবাসীর কাছে পরিচিতি লাভ করেছেন।

যোগ্য নেতা হবার লাইনে নূর হোসেনের বান্ধবী কাউন্সিলর নীলা যে অনেক এগিয়ে আছেন তা তার খুন-খারাবি-মাদক-টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজি এসব রেকর্ড থেকেই ভালো বোঝা যায়।

ফর্মুলা -৫: ভ্যানিশ বিদ্যা
সফল নেতা হতে হলে অবশ্যই জাদুকর জুয়েল আইচের মত ভ্যানিশ হবার কৌশল আয়ত্ত্ব করতে হবে। পর্ন তারকা সানী লিওনের মত যখন আপনার ফুলের মত চরিত্রখানি সংবাদপত্রের মাধ্যমে বা মামলা-মোকদ্দমার চক্করে পড়ে উন্মুক্ত হয়ে যাবে, আর সেই সময় যদি আপনার গডফাদার বলুন আর গডমাদার বলুন, আপনার মাথার উপর থেকে তার উষ্ণ হাতটি সরিয়ে নেয়, তবে অবশ্যই আপনাকে ভ্যানিশ হয়ে যেতে হবে।

আমাদের আলোচিত নূর হোসেন কিন্তু সেই বিদ্যায় অত্যন্ত পারদর্শী। তিনি যখন ধানমন্ডি চার নম্বরে বসে ফোনে কথা বলছিলেন আমাদের পুলিশবাহিনী তখন সংবাদমাধ্যমে জানিয়ে দিলেন যে, তিনি দিল্লিতে! এহেন ভ্যানিশ বিদ্যা রপ্ত করতে পেরেছিলেন বলেই তো নূর হোসেন আজ সফল রাজনৈতিক নেতা।

ফর্মুলা আরো বাড়ানো যায়। তবে আগ্রহী ভবিষ্যৎ নেতাদের যেহেতু বিদ্যার দৌড় একটু কম, তাই আপাতত এই কয়টি ফর্মুলা দিয়েই লেখায় ইতি টানছি।

নিবিড় পর্যবেক্ষণ শেষে শুধু এটুকুই বলতে পারি যে, দেশে “নূর হোসেনীয়” ক্যাটাগরির নেতার সংখ্যাই ইদানিং বাড়ছে সর্বত্র। সেই দিন বেশি দেরি নেই, যেদিন দেশের জনগণ এই ক্যাটাগরির ৩০০ জন সংসদ সদস্যকে নির্বাচিত করে দেশ ও জাতির সেবা(?) করার অমূল্য সুযোগ করে দেবেন।

ড. জিনিয়া জাহিদ: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close