অন্য পত্রিকা থেকে

হ্যালো দুদক থেকে বলছি…

আদিত্য আরাফাত: হ্যালো, দুদক থেকে বলছি, (নাম উল্লেখ করে) চিনতে পারছেন…

অভিযুক্ত: জি… জি… স্লামালাইকুম। নাম্বার সেভ করা আছে ভাই..ভালো আছেন?

দুদক কর্মকর্তা: হ্যা, আপনার তো কোনো খবর নাই…যোগাযোগও করেন না। নোটিশ-টোটিশ (জিজ্ঞাসাবাদের জন্য) পাঠানোর সময়ও হয়ে গেলো…।

অভিযুক্ত: না, আমি আসলে ব্যস্ত ছিলাম ভাই। সহসা আসবো…

দুদক কর্মকর্তা: কবে? আপনেতো আর ওরে (একব্যক্তির নাম উল্লেখ করে) কিছু বললেন না।

অভিযুক্ত: কাল পরশু ফোন দিয়ে আসবো ভাই। আপনার সাথে বসে কথা বলবো।

দুদক কর্মকর্তা: কাল বিকালে ফোন দিয়েন। সন্ধ্যায় বসা যাবে।

অভিযুক্ত: কিছুটা কমাতে হবে ভাই। অনেক তো…ব্যবসার অবস্থাও ভালো না।

দুদক কর্মকর্তা: যাই হোক আমি এগুলা নিয়া ফোনে কথা বলতে চাই না। সামনাসামনি বসে কথা বলুন। দেখি কি করা যায়।

উপরের কথোপকথন গোয়েন্দাদের হাতে আসা একটি টেলিফোন আলাপের ট্রান্সক্রিপশন।

অভিযুক্ত এক ব্যক্তিকে এভাবেই ভয়-ভীতি দেখিয়ে অবৈধ অর্থের বিষয়ে কথা বলছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)একজন কর্মকর্তা। একটি গোয়েন্দা বিভাগের কাছে ইতিমধ্যে দুদকের একডজন কর্মকর্তার মোবাইলে অবৈধ অর্থলেনদেনের কথোপকথনের এমন রেকর্ড রয়েছে। সেসব রেকর্ডে তারা যে বিভিন্ন জনের কাছে ভয়-ভীতি দেখিয়ে অবৈধভাবে অর্থ হাতিয়েছেন তা স্পষ্ট হয়েছে। যেকোনো সময় এসব রেকর্ড দুদক চেয়ারম্যান মো: বদিউজ্জামানের কাছে জমা হতে পারে বলেই বাংলানিউজকে জানিয়েছে গোয়েন্দাসূত্র।

সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রটি জানায়, যাদের রেকর্ডে ঘুষ লেনদেনের বিষয়ে কথোপকথন রয়েছে ওই তালিকার বেশিরভাগই দুদকের উপ-পরিচালক এবং সহকারী পরিচালক পদ মর্যাদার। যাদের বড় অংশই দুদকের প্রধান কার্যালয়ের। এসব কারণে দুদকের অর্ধ শতাধিক কর্মকর্তা বর্তমানে গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছেন বলেও জানায় সূত্রটি।

দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধই যাদের কাজ তারা বিভিন্নভাবে জড়িয়ে পড়ছেন দুর্নীতিতে। অবৈধ সম্পদের নোটিশ, অনুসন্ধান, মামলা ও চার্জশিটের ভয় দেখিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একশ্রেণির কর্মকর্তা বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা। আর এতে বিতর্কের মুখে পড়ছে রাষ্ট্রীয় দুর্নীতিবিরোধী  সংস্থাটি।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ(টিআইবি) এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বাংলানিউজকে বলেন, বিভিন্ন কারণেই দুদকের কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে দুদক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ সংস্থাটির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে সংকটের মুখে ঠেলে দেবে। দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ হওয়ামাত্র দুদকের উচিত জড়িত কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া।

সম্প্রতি ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে দু’জন কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা তো ফৌজদারি অপরাধ। আমরা শুনেছি ওই দু’জনের ঘুষ নেওয়ার অডিও রেকর্ড দুদকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছেও রয়েছে। যদি এটা সত্য হয় তাহলে, দুদকের কাছে ঘুষ নেওয়ার তথ্য প্রমাণ থাকলে কার্য্কর আইনি ব্যবস্থা দুদকই নিতে পারতো।

চলতি মাসে দুদকের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ আসে কমিশনে। রাজধানীর গুলশানের ব্যবসায়ী মোবারক হোসেনকে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে রেহাই দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে ৩৭ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠে দুদকের প্রধান কার্যালয়ের অনিষ্পন্ন সেলের উপ-পরিচালক গোলাম মোস্তফা ও সমন্বিত জেলা কার্যালয় বগুড়ার উপ-পরিচালক জাহিদ হোসেনের বিরুদ্ধে। অভিযোগের সঙ্গে ওই দুই কর্মকর্তার কথোপকথনের অডিও রেকর্ডের সিডি দুদকের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে থাকায় গত ১৭জুন ওই দুই কর্মকর্তাকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে অভিযোগ সম্পর্কে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে। এদিকে অনিয়ম ও বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে গতমাসে দুদকের উপ-পরিচালক মো. আহসান আলী এবং শফিকুল ইসলামকে বাধ্যতামূলক অবসরে যেতে হয়েছে।

দুদক কর্মকর্তাদের দুর্নীতির বিষয়ে বাংলানিউজের কথা হয় সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো: বদিউজ্জামানের সঙ্গেও। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, নিজেদের মধ্যে কেউ দুর্নীতি করছে কি-না সেটা দেখার জন্য আমাদের অভ্যন্তরীণ কমিটি রয়েছে। এ কমিটি সক্রিয়। এ পর্যন্ত যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত পাঁচ বছরে নিজেদের ৭৬ জন কর্মীর বিরুদ্ধে নিজস্ব আইনে মামলা দায়ের করেছে দুদক। এর মধ্যে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ৪৭ জনের শাস্তিও হয়েছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে ওই ৭৬ জনের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ পেয়ে প্রথমে অনুসন্ধান চালানো হয়। পরে দুদক আইনে বিভাগীয় মামলা করা হয় এবং এসব মামলার তদন্ত করে ‘দুদকের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি দমন কমিটি’। তবে গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে সিআইডি কর্মকর্তাদেরও অনুসন্ধান ও তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২৬ জনকে দেওয়া হয় গুরুদণ্ড আর ২১ জনকে দেওয়া হয় লঘুদণ্ড। বাকি ২৯ জনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের খালাস দেওয়া হয়। এর বাইরে আরো অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে।

 

shabuddinদুদক কমিশনার (তদন্ত) মো: সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বাংলানিউজকে বলেন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করা হয়। সেই তদন্তে দোষ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া হয় না।

সম্প্রতি দু’জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ামাত্র আমরা ওই দুজনের বিরুদ্ধে (উপ-পরিচালক গোলাম মোস্তফা ও জাহিদ হোসেন) বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করেছি। পাশাপাশি তাদের সাত কার্যদিবসের মধ্যে অভিযোগ সম্পর্কে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে। নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে দুদকের পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট যে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি দমন কমিটি রয়েছে তার সভাপতি পদাধিকার বলে দুদক চেয়ারম্যান।

বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে সম্প্রতি গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে যে অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে, তাদেরসহ সব কর্মীর ওপর কড়া নজরদারি রাখতে দুদক পরিচালক সাহিদুর রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তাদের কোনো অনিয়ম-দুর্নীতির গন্ধ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দুদক চেয়ারম্যানকে অবগত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

দুদকসূত্র জানায়, গত পাঁচ বছরে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় এরই মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় অথবা ফৌজদারি মামলা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন দুদকের উপ-পরিচালক (ডিডি) আহসান আলী, এস এম সাবি্বর হাসান, রামমোহন নাথ, এ কে এম ফজলুল হক, সফিকুর রহমান ভূঁইয়া, ঢালি আবদুস সামাদ, রঞ্জন কুমার মজুমদার, সহকারী পরিচালক (এডি) সাইদুর রহমান, আবদুর রহিম জোয়ার্দার, আবু নছর, জাকির হোসেন, সহকারী পরিদর্শক মাহবুবুর রহমান, কোর্ট সহকারী (এএসআই) সারোয়ার হোসেন, মোহাম্মদ শাহজালাল, ওবায়দুল্লাহ ইবনে খালেক, কনস্টেবল ফারুক আহম্মদ, খসরু জাহান, মোশায়েকুর রহমান, আবু সাঈদ, অমিত কুমার দাস, আবদুল মোতালিব মিয়া, শহিদুর রহমান ভূঁইয়া, গোলাম রব্বানী, গাড়িচালক গুলজার হোসেন, ছামাদ ভূঁইয়া, আহমেদ হাসনাত প্রমুখ।

 

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close