ফিচার

লাল ক্যামরি লং ইউটার্ন

তোফায়েল কামাল:

সস্তা ক্লাব বলতেই ইয়র্ক যেতে চায় ও। রাত বারোটার পর রাফা কমিউনিটি থেকে ওকে পিক করি। এখানকার মেয়েরা বেশি যায় মেট্রোপলিটনের আই টু ক্লাবে। মাঝেমধ্যে এর ব্যতিক্রম ঘটে। আর ও সেই ব্যতিক্রম একজন। রাফা থেকে মেইন রোডে এসে একটা ইউটার্ন নিয়ে প্রথম লেফট টার্ন নিলে ডানে পড়ে ইয়র্ক। এখানে পার্কিং নেই। তাই ওকে দ্রুত নেমে যেতে বলি। গলায় ব্যবসায়িক সৌজন্যের অনুরোধ। এই একটা কাজে কোনোদিন হৃদয়ের নির্যাস উঠে আসে নি। এটি পেশাগত। জন্মগতভাবেই যে এরকম ছিলাম না, তা এখানে আসার পর বুঝি। ও আমাকে সহযোগিতা করে। দ্রুত নেমে যাবার আগে একটা নোট ছুঁড়ে ফেলে রেখে যায়। ডানদিকের সিট থেকে নোট তুলে পকেটে রাখার আগে পৌঁছে যাই খালিদ বিন ওয়ালিদ স্ট্রিটের সাগর পাড়ের ছোট সিগনালে। রেড লাইট জ্বলছে। এটি হচ্ছে শহরের দীর্ঘতম সিগনাল। সাগরপাড় থেকে মাকতুম ব্রিজ পর্যন্ত অপরদিকের রাস্তা ক্লিয়ার না হলে সবুজ লাইট জ্বলবে না। বিরক্তি আর ক্লান্তি নিয়ে বসে থাকার সিগনাল। এর অন্যতম কারণ হতে পারে পাশের তিন লেন খোলা থাকা। বামের এই এক লেন আর ওই কানা লাইট চোখে দেখে না। সেন্সরড লাইট। অনেক সময় আমাদের সাদা লাইন ক্রস করে যাওয়ার পর লাইট সাহেব বুঝতে পারেন, এখানে কেউ আছে।

হাওয়ার্ড জনসনের আলোকসাইন চোখে হঠাৎ ঝাপসা হয়ে এলো। জুনের ভ্যাপসা গরম। টয়োটা ক্যামরির এসিও কাজ করছে না। হিউমিডিটি বারবার সামনের গ্লাস ভিজিয়ে দিচ্ছে। সবুজ লাইট জ্বলে উঠলো। পেছন থেকে পিৎ করে উঠলো একজন। ও যে ইজিপসিয়ান হবে আমার সেন্টার মিরর তাই বলছে। ততক্ষণে ইউটার্ন নিয়েছি। সোজা ডানের শেষ ট্র্যাক ধরে সার্ভিস লেনে ঢুকে পড়ি। রয়্যাল এসকট হোটেলের রোড এটি। ট্রাফিক লাইট এড়ানোর স্লিপওয়ে। দুটি লেবানিজ তরুণি লবিতে লাল গালিচায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওদের জুতোর উঁচু হিল নিতম্ব দোকানে সাজিয়ে রাখা তরমুজের ডেকোরেশন মনে হচ্ছে। চোখ থেকে এ দৃশ্য মনে ঠাঁই নেবার মতো বিষয় নয়। এরকম হাজারটা চনমনে দৃশ্য প্রতিদিন রাতে চোখ থেকে কোথায় হারিয়ে যায়। এ প্রশ্ন কোনোদিন মনে জাগে নি। সার্ভিস লেন থেকে বেরিয়ে মূল সড়কে উঠেছি— ঝুম করে বৃষ্টি নামলো। মনে করার চেষ্টা করছিলাম কত বছর পর বৃষ্টি এলো। বৃষ্টি প্রকৃতির মিউনিসিপলিটি, মনেরও। বৃষ্টি ছুঁয়ে দেখার জন্য পার্কিং খুঁজছিলাম। মধ্যরাতে গাড়িঘুম বেড়ে যায়। পাশাপাশি গাড়িগুলো শুয়ে থাকে। এদের পাশে একটু আশ্রয় খুঁজছিলাম। পেলাম না। এখানের বৃষ্টির আয়ু খুব কম। অভিজ্ঞতা তাড়া দিচ্ছিল। একটা বাসস্টপের শেষ মাথায় হ্যাজার্ড লাইট অন করে দাঁড়ালাম। 

বৃষ্টি টিনের চালে দাঁত বসালে শব্দ যেমন হয়, ক্যামরির ছাদে এরকম শব্দ হচ্ছে। গাড়ি থেকে নেমে বৃষ্টির দিকে হাত বাড়ালাম। ভেজা হাত মুখে লাগালাম। প্রশান্তির বহর মাথার পেছন দিকে ঘাড় বেয়ে নেমে যাচ্ছে মনে হলো। ট্রাফিক লাইটে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলো আমাকে দেখছে। কেউ কেউ হাসছে। গাড়ির ভেতর থেকে শিসার ধোঁয়া ছেড়ে দিচ্ছে বৃষ্টিতে। ধোঁয়ার নীল শক্তি বৃষ্টি ভেদ করে উপরে ওঠে যাচ্ছে। এখানে বৃষ্টি হলে আনন্দ বেড়ে যায়। রাতের ঘুমিয়ে থাকা গাড়িগুলো জেগে ওঠে। কাজাখ মেয়েদের রেট বেড়ে যায়। বৃষ্টিতে ভেজার ইচ্ছা হলেও উপায় নেই। গায়ে ইউনিফর্ম। লাল ক্যাবটার দিকে তাকালাম। ও বৃষ্টিতে আরো লাল হয়ে গেছে। ওর সৌভাগ্যে ঈর্ষা হলো। তবুও ভালো লাগছে ওর ভেজা দেখে। ও আমাকে অনেক দিয়েছে। আমার জীবনের পরিবারের সদস্য হয়ে ও কখন যে বন্ধু হয়েছে বুঝতে পারি নি। বৃষ্টি না নামলে এই বোধ কখনো খুঁজে পেতাম বলে মনে হয় না। বৃষ্টি মানুষের বোধকে এতো প্রভাবিত করতে পারে অনাবৃষ্টির দেশে বাস না করলে বোঝা যায় না। ফোনের জন্য গাড়িতে ফিরে এলাম। দুটো কল মিসড দেখাচ্ছে। দেশের ফোন। পাস খুঁজে একটা হ্যালো কার্ড পেয়ে গেলাম। ওটা প্রায়ই পকেটে থাকে। পরিবার আর প্রেমের জন্য ওই কার্ড পকেটে থাকতে হয়। ওপাশের কণ্ঠকে বললাম বৃষ্টি হচ্ছে। সে বললো, তাহলে তো তোমার মেরুদণ্ড শিরশির করছে। হাসলাম। উপায় নেই, অন ডিউটি। আমার কথায় ওর হাসি শুনতে পেলাম। দেশে ফেরার তাড়া দেয় সে আবারো। গাড়ির জানালা খুলে বৃষ্টির দিকে আবার হাত বাড়াই। বৃষ্টি অসম্মতি জানায়। চলে যাচ্ছে সে। 

চার বছর পর দেশে ফিরি। ওর সঙ্গে দেখা হয়। বিয়েটাও হয়ে যায়। ও থাকে ওর মায়ের সঙ্গে। আমার আর প্রবাসে পাড়ি দেয়া হয় না। আবার বেকার হয়ে পড়ি। সবরকমের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় ও। সংসারের স্বাদ থেকে মুক্ত জীবন নিয়ে চলতে থাকি। একদিন পাবলিক লাইব্রেরির সামনে ওর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। সঙ্গে আরো দুজন। চিনি না। বোরকায় ওর মুখ আবৃত। চোখগুলো হাসছে। আমার পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে ও। দ্বিধার ভেতর থেকে যখন বেরিয়েছি, ততক্ষণে ও অনেক দূর চলে গেছে। কথা বলার ইচ্ছে হয়েছিল। ওর হয়নি দেখে চুপসে গেছি। এভাবে ও চলে যাবে বুঝতে পারিনি। যখন ও আমার কাছ থেকে অ্যাবাউট তিনশো মিটার দূরে চলে গেছে— মনে পড়লো সেই বৃষ্টির রাত। পুরনো সেই শিরশির। লাল ক্যামরির চেহারাটা ভেসে ওঠলো চোখে। সেদিনের বৃষ্টিচোখে তাকিয়ে থাকি আমার পুরনো স্ত্রীর দিকে। কখনো যে মেনে নেয়নি আমাকে।
Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close