অন্য পত্রিকা থেকে

হুমায়ূনহীন দুই বছর

আদিত্য আরাফাত: ‘যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো এক বরষায়…’ না! নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ আর আসবেন না। পাঠক, দর্শক ও ভক্তানুরাগীদের মন কাঁদলেও হুমায়ূনকে তারা আর পাবেন না। দেখতে দেখতে হুমায়ূনহীন কেটে গেছে দুই শ্রাবণ। দুই বর্ষা। দুই বছর।

২০১২ সালের ১৯ জুলাই বর্ষার রাতে পরিবার-পরিজন, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের অশ্রুধারায় সিক্ত করে পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে এ কলম যাদুকর পাড়ি জমান অজানা ও অদেখা ভুবনে। আজ শনিবার বাংলা সাহিত্যের অন্যতম এই জনপ্রিয় লেখক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্রকারের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী।

২০১২ সালের এই দিনে ক্যান্সার আক্রান্ত চিকিৎসাধীন হুমায়ূন নিউইয়র্কের বেলভ্যু হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যু শুধু দেশে নয়, বিশ্বব্যাপী সব বাঙালির হৃদয়ে গভীর শোকের অন্ধকার ছড়িয়ে দেয়।

হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য ও শিল্পকে ধারণ করে এক বর্ণময় পথে হেঁটেছেন। এ দেশের মননশীল প্রকাশনা শিল্পকে করে গেছেন সমৃদ্ধ। তার গল্প কিংবা উপন্যাসের উদ্দীপক অথবা রহস্যময় বুনটে বিভোর করে রেখেছিলেন পাঠককে।

একইভাবে বিচিত্র বিষয়ের নাটক কিংবা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে শিল্পরসিককে দিয়েছেন অফুরন্ত আনন্দময়তা। আর এভাবেই ক্রমশ সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে জননন্দিত সাহিত্যিক হয়ে উঠেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ।

আজ শনিবার শোকাবহ দিনটিতে তাকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করবে শিল্প প্রিয় বাঙালি। এ আয়োজনে অনেকে-ই হুমায়ূন প্রীতিতে ছুটে যাবেন গাজীপুরের পিরুজালীর নুহাশ পল্লীতে। নুহাশ পল্লী ভরে উঠবে ফুলে ফুলে।

জানা যায়, হুমায়ূন আহমেদের মা থাকছেন মিরপুরের পল্লবীতে ছোট ছেলে কার্টুনিস্ট আহসান হাবীবের বাসায়। সেখানেও মিলাদের আয়োজন করা হয়েছে। ১৯৪৮ সালে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে নানার বাড়িতে জন্ম নেওয়া হুমায়ূন আহমেদ সরকারি কর্মকর্তা বাবার কর্মস্থল পরিবর্তনের সুবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানে শৈশব ও কৈশোর কাটিয়েছেন।

মুক্তিযোদ্ধা বাবার ছেলে হুমায়ূন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি পাস করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি নেন। এর আগে তিনি প্রথমে ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে রসায়ন বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে তার যেমন জনপ্রিয়তা ছিল তেমনি তরুণ শিক্ষক হিসেবে তার খ্যাতি ছিল।

‘নন্দিত নরকে’র পর হুমায়ূন আহমেদ নিয়মিত লিখতে শুরু করেন। পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেন অল্প দিনে। বাংলাদেশে বইয়ের পাঠক সৃষ্টির কিংবদন্তী হিসেবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে তাকে।

শুধু কথাশিল্পী নয়, নির্মাতা হিসাবেও তিনি সিদ্ধহস্ত। শিশুদের জন্যও লিখেছেন প্রচুর।

হিমু, মিসির আলী তার অনন্য সৃষ্ট চরিত্র। হিমুর হলুদ পাঞ্জাবি তরুণদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। হিমু কোনো যুক্তি মানে না। কিন্তু মিশির আলী যুক্তি ছাড়া চলেন না।

যুক্তির নাটাইয়ে বাঁধা মিসির আলীর কাছে কখনো কখনো রূপসী তরুণীদের চেয়ে মাছিটাই বড় হয়ে দেখা দেয়। এর বাইরেও তার অনেক সহজ স্বভাবসূলভ গল্প-উপন্যাস রয়েছে।

নাটক ‘কোথাও কেউ নেই’ দিয়ে তিনি মাতিয়ে তোলেন দর্শক। তার ওই নাটকের চরিত্র বাকের ভাইয়ের ফাঁসির প্রতিবাদে ঢাকায় মিছিল-সমাবেশ-অনশন পর্যন্ত হয়।

নাটকে সফলতার পর হাত দেন সিনেমা নির্মাণে। ‘আগুনের পরশমণি’ দিয়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে দেন হুমায়ূন। পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কার।

মুক্তিযুদ্ধ তার সাহিত্যে যেমন এসেছে তেমনি ছিল তার বানানো নাটক ও ছবিতেও। তার নির্মিত ‘শ্যামল ছায়া’ পেয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

তিনি সাহিত্যের সব শাখায় সৃষ্টি করেছেন রস বোধ। তার গল্প উপন্যাসে দুঃখ বোধের চেয়ে হাসি আনন্দটাই প্রাধান্য পেয়েছে বেশি।

নগর জীবনের কষ্ট, সঙ্ঘাত-সংঘর্ষ, বেকারত্বের অভিশাপ, মানুষের বিচিত্র সব ইচ্ছা উঠে এসেছে তার লেখনীতে। মানুষের ভেতরের না বলা কিংবা বলা অনেক কথাই তিনি সহজ করে বলেছেন তার লেখনীতে।

হুমায়ূন আহমেদ গাজীপুরে গড়ে তোলেন নুহাশ পল্লী। সেখানে নাটক ও সিনেমার শুটিংয়ের পাশাপাশি নিজে অবকাশ যাপন করতেন তিনি।

দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে গড়ে তোলেন সমুদ্রবিলাস নামে একটি রিসোর্ট। যেখানে তিনি শীত মওসুমে জীবনের সুন্দর সময় কাটিয়েছেন।

তিন ভাইয়ের মধ্যে হুমায়ূন ছিলেন বড়। মেজো ভাই মুহম্মদ জাফর ইকবাল সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।

শিক্ষকতা ছাড়াও তিনি কথাশিল্পী, নাট্যকার ও সায়েন্স ফিকশন লেখক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন।

ছোট ভাই আহসান হাবীবও কার্টুনিস্ট ও রম্য লেখক হিসেবে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছেন। তিনি রম্য ম্যাগাজিন ‘উন্মাদে’র সম্পাদক।

হুমায়ূন আহমেদ লেখক শিবির পুরস্কার থেকে শুরু করে একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন।

ভালবেসে প্রথম জীবনে গুলতেকিনকে বিয়ে করেন। ‌ দম্পতির রয়েছে তিন কন্যা- নোভা, শীলা ও বিপাশা এবং ছেলে নুহাশ। তাদের ঘিরে কেটেছে জীবনের বড় সময় কাটলেও হুমায়ূনের এ বিয়ে টিকে নি।

গুলতেকিনের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর হুমায়ূন বিয়ে করেন অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনকে। এ সংসারে  তার নিষাদ ও নিনিত নামে দুই ছেলে আছে। শেষ জীবনে তাদের নিয়েই কেটেছে নন্দিত এ মানুষটির সময়।

তার নির্মিত সর্বশেষ সিনেমা ঘেটুপুত্র কমলা মুক্তি পেয়েছে গত বছর। এছাড়া হুমায়ুনের লেখা শেষ ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘দেয়াল’ ২০১৩ সালের একুশে বই মেলায় প্রকাশিত হয়। যা ওই সময় মেলার সবচেয়ে আলোড়ন সৃস্টিকারী বই হিসেবে স্থান করে নেয়।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close