জাতীয়

দেশের বন্যা পরিস্থিতি: কোথাও বাড়ছে আবার কোথাও কমছে

শীর্ষবিন্দু নিউজ ডেস্ক: দেশের বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। কোথাও কোথাও পানি কমলেও অনেক স্থানে পানি বেড়েছে। কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ২৫০০ পরিবার পানিবন্দি হয়েছে। তিস্তার প্রবল স্রোতে ভেঙে গেছে প্রায় এক কিলোমিটার বাঁধের রাস্তা। অপরদিকে উজান থেকে নেমে আসা পানিতে সরাইলের ৫টি ইউনিয়ন তলিয়ে গেছে। বগুড়ার বানিয়াজান স্পারে ধস দেখা দিয়েছে।

সুনামগঞ্জে ৮ উপজেলার সর্বত্র পানি কমতে শুরু করেছে। ওদিকে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের মরিচারচর গ্রামের কাছে ব্রহ্মপুত্র নদে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। গত কয়েকদিনে ১৫টি বাড়ি সম্পূর্ণ এবং ৩০টি বাড়ি আংশিক বিলীন হয়ে গেছে। বিস্তারিত আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানোর রিপোর্টে।

রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ৪টি ইউনিয়নে প্রায় আড়াই হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। গত তিন দিনের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর তীব্র স্রোতে এক কিলোমিটার বাঁধ রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় বিদ্যানন্দ ইউপি’র ৫শ’ হেক্টর জমির রোপা-আমন পানির নিচে ডুবে গেছে। পানিবন্দি দুর্গত এলাকা বিদ্যানন্দ ইউপি’র চর বিদ্যানন্দের রফিকুল ইসলাম (৪০), আবদুস সামাদ (৬৫), মোহাম্মদ আলী (৪৫) বলেন, গত চারদিন ধরে চরে পানিবন্দি হয়ে পড়ে আছি। এখন পর্যন্ত কেউ আইসে নাই বাহে! বৌ-পোলাপানদের নিয়ে অতিকষ্টে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকার উপর নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছি। এদিকে অত্র উপজেলায় টানা বর্ষণে কাঁচা তরিতরকারী শাক-সবজি, পটল, ঝিঙা, ঢেঁড়শ, কাঁচামরিচ ক্ষেতে পানি জমায় সেগুলো মরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। অপরদিকে উপজেলায় ৫শ’ হেক্টর জমির রোপা-আমন, প্রায় ৩ হেক্টর জমির সবজি ক্ষেত সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার কথা জানান রাজারহাট উপজেলা কৃষি অফিসার ষষ্টী চন্দ্র রায়।

সরাইল (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি জানান, বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানির তোড়ে সরাইলের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এখনও অব্যাহত রয়েছে পানি বৃদ্ধি। তলিয়ে গেছে অনেক ফসলি জমি ও বীজতলা। ভীষণ শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা। উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রামের লোকজনের চলাফেরার প্রধান বাহন এখন নৌকা। অরুয়াইল পাকশিমুল চুণ্টা শাহজাদাপুর ও পানিশ্বর উত্তর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে সদ্য রোপণকৃত উচ্চ ফলনশীল জাতের কয়েক’শ বিঘা ফসলি জমি।

এ ছাড়া পানি গিলে ফেলেছে শাইল ধানের অধিকাংশ বীজতলা। অরুয়াইলের রানিদিয়া, কাকরিয়া, রাজাপুর, সিঙ্গাপুর, ধামাউড়া, দুবাজাইল বারপাইকা, পাকশিমুলের জয়ধরকান্দি তেলিকান্দি পরমানন্দপুর ফতেপুর হরিপুর বড়ুইছাড়া ষাটবাড়িয়া চুন্টার  লোপাড়া ঘাগড়াজোর নরসিংহপুর বড়বুল্লা শাহজাদাপুরের নিয়ামতপুর ধাওরিয়া শাহজাদাপুর ও পানিশ্বর উত্তরের শোলাবাড়ি, সীতাহরণ বড়ইবাড়ী নাইলা নতুন হাটি গ্রামের লোকজন এখন হয়ে পড়েছে নৌকানির্ভর। ওইসব এলাকার শিক্ষার্থীরা অতিকষ্টে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ এমরান হোসেন বলেন, পানি বৃদ্ধির বিষয়টি আমরা সর্বক্ষণ মনিটরিং করছি। ফসলি জমি ও বীজতলা তলিয়ে যাওয়ার বিষয়ে কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলবো।

বগুড়া থেকে জানান, ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্পার প্রতি বছরই ভাঙনের কবলে পড়ে ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ ও ছোট হয়ে এলেও ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণ। প্রতি বছরই মেরামতের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও সম্পূর্ণ স্পারটি ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। পাউবোর সঙ্গে স্থানীয় এক শ্রেণীর প্রভাবশালী সাব-ঠিকাদাররা এসব কাজের সাথে যুক্ত থাকায় অধিক লাভের কারণে দায়সারাগ্রস্ত মেরামত কাজ হয়। তাই প্রতিবছরই পড়ে ভাঙনের কবলে। আবারও ধসের কবলে বগুড়ার ধুনট উপজেলার যমুনা নদীর ভাঙন রক্ষায় নির্মিত স্পারে বানিয়াজান স্পার। এ নিয়ে ওই স্পার বর্ষা মওসুমে তিন তিনবার ধসের কবলে পড়লো।

জানা যায়, বানিয়াজান স্পারটি এ মাসে ১৭ আগস্ট ধ্বসের কবলে পড়ে। স্পারের মাউথ বেল্টের ঢালাই অংশের দেড়শ’ মিটারের মধ্যে ৫০ মিটার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। আবারও ৫০ মিটার মাউথ বেল্টের ঢালাই অংশে ফাটল ধরেছে। যে কোন মুহূর্তে ওই ৫০ মিটার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। সোমবারে আবারও ওই স্পারে ঢালাই মাউথ বেল্টে পিছনে মাটির স্যাংক ধসের কবলে পড়েছে। প্রায় ২০ মিটার ধসে গেছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, বানিয়াজান স্পারের মাটির স্যাংক যেখানে ধসে গেছে ওই স্থানে এর আগেও প্রায় ৫/৬ বার ধসের কবলে পড়েছিল। প্রতিবছরই ওই অংশে বালির বস্তা ফেলে মেরামত করা হয়। স্পারের ওই অংশে শিমুলবাড়ীর কাছে যমুনার একটি শাখা মূল নদী থেকে পশ্চিম দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সরাসরি স্রোত সেখানে আঘাত করে। এবারও বর্ষা মওসুমের আগে স্পারে ওই স্থানটি মেরামত করা হয়। মেরামত কাজে ঠিকাদারের সাথে সহযোগিতা করেন স্থানীয় দুই ব্যক্তি শহিদুল ও রফিকুল মাস্টার। সাব-কন্ট্রাক্ট নিয়ে শুষ্ক মওসুমে কাজ করার সময় স্পারে ধসের অংশে কাছ থেকে ড্রেজার দিয়ে বালি উত্তোলন করে। ফলে ওই স্থানের গভীরতা বেড়ে যায়। বর্ষা মওসুমে তীব্র স্রোতে এবং ওই স্থানে গভীরতা থাকায় হঠাৎ করেই আবারও ধস নামে।

জানা যায়, ২০০২ সালে ধুনটে বানিয়াজান এলাকায় ৭২৭ মিটার স্পার সাড়ে ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়। ওই স্পারের মাউথ বেল্ট অংশে দেড়শ’ মিটার ইট-সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করা হয়। বাকি অংশ মাটি ও বালি দিয়ে তৈরি করা হয়। স্পারটি তৈরির পর বিগত ১২ বছরে বন্যার সময় স্পারে মাটির অংশে ধস নামায় অন্ততপক্ষে ১৫বার জরুরি ভিত্তিতে কাজ করা হয়। কাজের ব্যয় প্রায় আরও ১৩ কোটি টাকা হয়।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জের ৮টি উপজেলা থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। তবে নিম্নাঞ্চলে এখনও বন্যার পানি রয়েছে। এদিকে, সংবাদ সম্মেলন করে সুনামগঞ্জ জেলাকে বন্যাদুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়েছে বিএনপি ও জাতীয় পার্টি (এ)। বন্যা কবলিত মানুষের মাঝে পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী বিতরণেরও দাবি জানানো হয়। অবিরাম বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলের কারণে কয়েক দিন ধরে পানিবন্দি থাকায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ খাবার পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে বন্যা কবলিত এলাকায়। রয়েছে গো-খাদ্যের সঙ্কট।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, সুরমা নদীর পানি গত মঙ্গলবার সুনামগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমার ৬৪ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। গত ২৪ ঘণ্টায় ৭৫ মি.মি. বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বন্যা কবলিত সুনামগঞ্জকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ। তিনি সরকারের কাছে পর্যাপ্ত ত্রাণ সামগ্রী পাঠানোর দাবি জানান।

গতকাল মঙ্গলবার সংবাদ করে সুনামগঞ্জ জেলাকে বন্যাদুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়েছে বিএনপি। দুপুরে জেলা বিএনপি’র অস্থায়ী কার্যালয়ে এ সাংবাদিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জেলা বিএনপি’র আহ্বয়ক সাবেক সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, সুনামগঞ্জের সবক’টি উপজেলা বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। দুর্ভোগে পড়েছেন পানিবন্দি মানুষ। বন্যাদুর্গত এলাকায় পানিবন্দি মানুষের খাদ্য, খাবার পানি ও গো-খাদ্যের তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। প্রায় ৩৭ হাজার একর জমির রোপা আমন ও বীজতলা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে।

ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি জানান, ব্র্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের তীব্রতা বেড়েই চলেছে। গত ক’দিনের টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে উপজেলায় প্রায় ১০ হেক্টর ফসলি জমি। পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় খরস্রোতা ব্র?হ্মপুত্রে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে গত ক’দিনে ১৫ টি বাড়ি সম্পূর্ণ ও ৩০টি বাড়ি আংশিক বিলীন হয়ে গেছে। নদীভাঙনের মুখে পড়েছে প্রায় দুইশতাধিক পরিবার। উঁচাখিলার সঙ্গে চরাঞ্চলের একমাত্র যোগাযোগের সড়কটিও চলে যাচ্ছে নদীগর্ভে। উপজেলার সবজিভাণ্ডার বলে খ্যাত উঁচাখিলার চরাঞ্চল মরিচারচরবাসী আগ্রাসী ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনের কাছে আজ বড়ই অসহায়।

গত পাঁচ বছরে বটতলা বালুরঘাট হয়ে মরিচারচর যাওয়ার পাকা রাস্তা, মসজিদ, মাদ্‌রাসা, প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ কয়েক হাজার ঘরবাড়ি ও কয়েকশ’ হেক্টর ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অব্যাহত ভাঙনে ইতিমধ্যে  পৈতৃক বসতভিটা, ফসলিজমি ও পূর্ব-পুরুষের কবরস্থান পর্যন্ত রেহাই পায়নি নদীভাঙনের হাত থেকে। ফলে আশ্রয়ের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে ১০ গ্রামের শ’ শ’ পরিবারের লোকজন আজ নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।

গত ক’দিনের টানা বৃষ্টিতে মরিচারচর গ্রামের দপ্তর, মুন্সীবাড়ী, নতুনচর, নামাপাড়া, উত্তরপাড়া গ্রামের ১৫টি পরিবারের ফসলি জমিসহ বসত বাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। ওই এলাকায় আরও ৩০ টি বসত বাড়ি আংশিক নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। প্রতিদিন নদের নতুন নতুন অংশে ভাঙনের সৃষ্টি হচ্ছে। বর্তমানে ভাঙনের আশঙ্কায় রয়েছে উত্তর মরিচারচর, নামাপাড়া, কাশিয়ারচর, বড়ইকান্দি, চর ঈশ্বরদিয়া, গাঙিনাপাড় থেকে শুরু করে বটতলা বালুঘাট, কুটেরচর ও লাটিয়ামারী উজান চরণওপাড়া, ভাটিচরণওপাড়া, যাদুয়ারচর এলাকার গ্রামগুলো।

তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) থেকে সংবাদদাতা জানান, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে তাহিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় বণ্যা দেখা দিয়েছে। নিম্নাঞ্চলের শতাধিক ঘর-বাড়ি, রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজ, স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স তলিয়ে গেছে। আকস্মিক বন্যায় প্লাবিত এলাকার কৃষক ও দিন মজুর পরিবারগুলোর চোখে-মুখে দেখা দিয়েছে হতাশা গো খাদ্য সঙ্কটে বন্যা কবলিত এলাকার গৃহপালিত পশু গরু, ছাগল বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছে। তাহিরপুর উপজেলার শতাধিক গ্রাম, হাট-বাজার, শতাধিক স্কুল ও স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স পানিবন্দি হয়ে আছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে উপজেলার সঙ্গে ৭টি ইউনিয়নের যোগাযোগ ব্যবস্থা। বন্যার পানিতে তাহিরপুর-সুনামগঞ্জ সড়ক ও তাহিরপুর-বাদাঘাট সড়ক ডুবে যাওয়ায় কারণে সড়ক যোগাযোগ একবারেই বিছিন্ন রয়েছে।

উপজেলার- সোহালা, ইছুবপুর, আলীপুর, সাহেবনগড়, ইকরাম, নোয়াগাঁ, লামাগাঁও, ইন্দ্রপুর, মন্দিয়াতা, রতনশ্রী, মারালা, রাজারগাঁও, রামেশ্বরপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াবন্দ, জামালগড়, মাটিয়ান, রসূলপুর, রামসিংহপুর, সাহগঞ্জ, সত্রিশ, পন্ডুব, চিসকা, সীমানা, দুধের আওটা, চারাগাঁও, বাগলী, বীরেন্দ্র নগরসহ শতাধিক গ্রাম পানিবন্দি রয়েছে। পানিবন্দি রয়েছে উপজেলার কুকুরকান্দী, আনোয়ারপুর, নোয়াহাট, লক্ষ্মীপুর, রাচীনগড়, জামালগড়, গাজীপুর, আনন্দগড়, উমেদপুর, শরীফপুর, পাতারগাঁও মাহতাবপুর, পিরিজপুর, ইসলামপুর, লামাগাঁও, রামসিংহপুর, রামজীবনপুর, রতনশ্রী, সূর্য্যেরগাঁও, দুমাল ও সীমান্ত এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো পাহাড়ি ঢল ও বন্যার পানিতে প্লাবিত তাহিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান-ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এ বিষয়ে উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি গত  সোমবার বিকালে এক জরুরি বৈঠক করেন এবং ৩টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

জামালগঞ্জ (সুনামগঞ্জ) থেকে সংবাদদাতা জানান, জামালগঞ্জ উপজেলার দেড় শতাধিক গ্রামে প্রায় ৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৩ হাজার পরিবার। উপজেলার প্রধান সংযোগ সড়ক নতুন পাড়ার মূল সড়কে এখন হাঁটু পানি। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে, আমন ধানের বীজতলা ও কিছু সবজি ক্ষেত। আর এ কারণেই বাজারগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েই চলেছে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ফেনারবাঁক ইউনিয়নের ভেদারপুর, পশ্চিম  ফেনারবাঁক, হঠামারা, উদয়পুর, নাজিমনগর, গজারিয়া, কামধরপুর, রসুলপুর, লালপুর, মাতারগাঁও, রাজাপুর, বীণাজুড়া সহ ২৫টি গ্রামের প্রায় ৬ শতাধিক পরিবার,  সাচনাবাজার ইউনিয়ন চেয়ারম্যান রেজাউল করিম শামীম জানান, তার ইউনিয়নের রক্তিরপাড়, ব্রাহ্মণগাঁও, ফলকপুর, নতুনপাড়া, কুকড়াপশি, নজাতপুর, সুকদেবপুর, রাঙ্গামাটিয়া, সুকদেবপুর নতুনপাড়া সহ ২৫টি গ্রামের প্রায় ১ হাজার পরিবার, বেহেলী ইউনিয়নের হরিণাকান্দি, আহছানপুর, মদনাকান্দি, উলুকানি, আরশিনগর, হরিনগর, বাগানী, প্রকাশনগর, মসলঘাট, রাধানগর পূর্বপাড়া, উমেদপুর সহ ২২টি গ্রামের প্রায় ৪ শ’ পরিবার, ভীমখালী ইউনিয়নের রাজাবাজ, ভাণ্ডা- মাখরখলা, সন্তুজপুর, উগলী, মৌলিনগরসহ ৮-৯টি গ্রামের ২ শতাধিক পরিবার ও সদর ইউনিয়নের নয়াহালট, তেলিয়া ও তেলিয়া লামাপাড়া, শাহপুর নতুনপাড়া, উত্তর কামলাবাজ, গুলেরহাটি, শরৎপুর, কামিনীপুর, মমিনপুর, উমেদপুর, ঝুনুপুরসহ ২৫টি গ্রামের প্রায় ৩ শ’ পরিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত উপজেলার কমিউনিটি ক্লিনিক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও  শিল্পকলা একাডেমিতে প্রায় ২৫টি পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে বলে জানা গেছে।

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, দৌলতপুর, হরিরামপুর, শিবালয় ও ঘিওর উপজেলার নিম্নাঞ্চলগুলো ক্রমেই প্লাবিত হয়ে পড়ছে। এতে  ফসলের ব্যাপক ক্ষতিসহ রাস্তাঘাট ভেঙে যাচ্ছে। পানিবন্দি হয়ে পড়ছে কয়েক হাজার মানুষ। তবে বন্যায় এ জেলার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে  দৌলতপুর উপজেলার বেশির ভাগ এলাকা।

দৌলতপুর উপজেলার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং এলাকাবাসী জানিয়েছে, দৌলতপুরের বাঘুটিয়া, বাচামারা, চরকাটারী ও জিয়নপুর ইউনিয়ন নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল। গত এক সপ্তাহে যমুনা নদীতে পানি বেড়ে যাওয়ায় এসব ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ফসলিজমি প্লাবিত হয়েছে। এতে এসব এলাকার আউশ ও আমন ধান, তিল এবং ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নিম্নাঞ্চলে ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। পানি বৃদ্ধির কারণে  বেশকয়েকটি কাঁচা সড়ক ভেঙে গেছে। কোথাও কোথাও পানিতে তলিয়ে গেছে।

বাঘুটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আকতার হোসেন জানান, তার ইউনিয়নের চরকালিকাপুর, পারুলিয়া, রামনারায়ণ, ইসলামপুর ও বাসাইল গ্রামে অন্তত দুই হাজার হেক্টর ফসলিজমি তলিয়ে গেছে। এতে এসব জমির আউশ, আমন ও তিলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পানিতে পারুলিয়া থেকে বাঘুটিয়াহাট পর্যন্ত এবং শাজাহান মাস্টারের বাড়ি থেকে পারুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত রাস্তা দুটির অধিকাংশ স্থান ভেঙে গেছে।

স্টাফ রিপোর্টার, রংপুর থেকে জানান, তিস্তায় অস্বাভাবিকহারে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় দিশাহারা হয়ে পড়েছে এলাকাবাসী। নদী ভাঙ্গণের ফলে গঙ্গাচড়া এলাকার প্রায় পাঁচ শতাধিক পরিবার নতুন করে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল তিস্তা ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করে দেখা গেছে, ভাঙনের ফলে প্রতিদিন একের পর এক গ্রাম পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। এলাকাবাসীরা তাদের বাড়িঘর, গবাদিপশু ও পরিবারের সদস্য নিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদাসীনতার কারণে তিস্তা ডান তীর বাঁধের প্রতিরক্ষার জন্য দেয়া মার্জিনাল ডাইক বাঁধের আড়াই কিলোমিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। স্থানীয় জব্বার মিয়া, মজিবর মিয়া, জয়নাল মিয়া সহ অন্যদের অভিযোগ আর কিছু দিন ভাঙ্গলে চোখের পলকে হাজার হাজার পরিবারের পানির নিচে তলিয়ে যাবে। গঙ্গাচড়ার আলমবিদিতর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান চেয়ারম্যান মোকররম হোসেন সুজন জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুর্নীতি ও অবহেলার কারণে মার্জিনাল ডাইক বাঁধটি তিস্তার গর্ভে চলে গেছে। এই বাঁধটি মুলত মূল বাঁধের প্রতিরক্ষার জন্য দেয়া হয়েছিল। প্রতিরক্ষা বাঁধ নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় মূল বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। এতে করে ভদভদিপাড়া, ব্যাঙপাড়া, পীরপাড়া, হাজীপাড়াসহ আশপাশ এলাকার প্রায় ৪ হাজার পরিবার ভাঙন হুমকির মুখে পড়েছে।

তিনি আরও অভিযোগ করে পাউবোকে জানানো সত্ত্বেও উদ্যোগ না নেয়ায় এলাকাবাসী বাঁশের বেড়া ও বালির বস্তা দিয়ে বাঁধটি ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড কোন ভূমিকা দেখায়নি। এদিকে রংপুর পানি উন্নয়নের বোর্ডের উপ-সহকারী পরিচালক তবিবুর রহমান জানান, তাদের উদ্যোগে বালু বস্তার দিয়ে ভাঙন রোধে চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, তিস্তায় পানি বাড়ার কারণে তীব্র স্রোতের কারণে এ ভাঙন দেখা দিয়েছে। পানি বৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন এলাকায় বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকার কারণে ভাঙন রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। উপজেলার আলমবিদিতর ইউনিয়নের ব্যাঙপাড়া এলাকায় পাউবো মার্জিনাল ডাইক বাঁধের আধা কিলোমিটার এলাকা ধসে ব্যাঙপাড়ার ৫০ ফুট এবং বৈরাতী আড়াইশ ফুট এলাকার ব্লক পিচিং হয়ে পড়েছে। এছাড়া লালমনিরহাটের কালিগঞ্জ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে প্রায় ৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

উত্তরাঞ্চল প্রতিনিধি জানান, ১৪ দিনের পানিবন্দি বানভাসি মানুষের দুর্দশা দেখতে এসেছিলেন পানি সম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ্‌। শুনলেন না মানুষের কথা, দেখলেন না কতটুকু পানি বাড়িবাড়ি। হেলিকপ্টারে ঢাকা থেকে উড়ে এসে আবার উড়েই চলে গেলেন। তার এ বন্যা দেখার বিষয়টি নিয়ে খোদ ক্ষমতাসীন দলে নানা জনের নান কথা ।

গাইবান্ধার বেশির ভাগ নদ-নদীর পানি আবারও দ্বীতিয় দফা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে নতুন করে ২১ ইউনিয়নের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সে সঙ্গে জেলার চরাঞ্চলের প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় মানুবেতর জীবনযাপন করছে। মানুষের দুর্ভোগ আরও চরম আকার ধারণ করেছে। ১৪ দিন ধরে পানিবন্দি মানুষ গরু-ছাগল একসঙ্গে বাস করায় পরিবেশ অন্য রকম ধারণ করেছে ।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়ে ডুবে গেছে তারাপুর, বেলকা, শ্রীপুর, কাপাসিয়া ইউনিয়নের অন্তত ৪০টি গ্রাম। এসব গ্রামের অধিকাংশ বাড়িঘরে এখন মানুষ নেই। ১৪ দিন পানিবন্দি থেকে হাত-পায়ে ঘা নিয়ে তারা ঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। কেউ উঁচু স্থানে গরু ছাগলের সঙ্গে মাথা গুঁজে আশ্রয় নিয়েছে। উপজেলা ত্রাণ কর্মকর্তা জহুরুল ইসলাম জানান, তিস্তা নদীর ৪টি আশ্রয়ণে এখন মানুষ আর গবাদিপশু গাদাগাদি করে আছে। এসব স্থানে ত্রাণ দিলেও পানির কারণে রান্না করতে পারছেন না।

অপরদিকে, যমুনা নদীর তীরবর্তী সাঘাটা, ফুলছড়ি উপজেলার অন্তত ২২টি ইউনিয়ন প্লাবিত। বন্যা পরিস্থিতির অবস্থা গাইবান্ধা সদর উপজেলার ৪টি ইউনিয়নের অবস্থাও একই। ব্রহ্মপুত্র নদীর চরাঞ্চলজুড়ে এ ৪ ইউনিয়নের অধিকাংশ ঘরবাড়িতে পানি। ব্রহ্মপুত্র নদীর চরাঞ্চলের অধিকাংশ ঘরবাড়িতে গত ১৪ দিন ধরে পানি। আর পানি হয়ে গবাদিপশু নিয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে বাঁধে আশ্রয় নিলেও এখন আর বাঁধেও জায়গা নেই। পানিবন্দি প্রায় ৩০ হাজার মানুষ গত ১৪ দিন ধরে চৌকি উঁচু করে ঘরের মধ্যে বাস করেছেন । কিন্তু আর সম্ভব হচ্ছে না। আর কতো এভাবে গরু ছাগলের সাথে বাস করা যায়। মানুষের সঙ্গে গবাদিপশুর খাবার সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করেছে।

ফলে আর কুলিয়ে উঠতে পারছে না মানুষ ও গবাদিপশু। ঘরে খাবার থাকলেও রান্না করার মতো জায়গা নেই। চারদিকে পানি আর পানি। দীর্ঘদিন পানিবন্দি থেকে চর্মরোগ ছড়িয়ে পড়েছে। হাতে পায়ে দগদগে ঘা নিয়ে পানিবন্দি বন্যার্ত মানুষ যন্ত্রণায় ছটফট করছে সরকারিভাবে কাগজপত্রে মেডিকেল টিম গঠন করে বন্যার্তদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতার কথা বলা হলেও বাস্তবে স্বাস্থ্য বিভাগের কোন লোক বানভাসি মানুষের কাছে পৌঁছেনি। সেরকারিভাবে কোথাও কোথাও বন্যার্ত মানুষের মধ্যে ত্রান সাহায্য পেলেও খুবই অপ্রতুল । অধিকাংশ দুর্গত মানুষের হাতে পৌঁছেনি এক ছটাক চাল ।

গবাদিপশুর খাবার সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করেছে। আর কতদিন পানিতে থাকায় যায় তাই অনেকেই ঘরবাড়িতে তালা লাগিয়ে মালপত্র ও গবাদিপশু নিয়ে নিরাপদে চলে গেছেন। বর্ষালী পাকা ধান কেটে ঘরে তুলতে পারেনি এবং সদ্য রোপণ করা আমন ধান তলিয়ে গেছে পানিতে। গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক এহছানে এলাহী জানান, পর্যাপ্ত পরিমাণে ত্রাণ সরববাহ করা হচ্ছে। যেখানেই দুর্যোগ সেখানেই বন্যার্তদের মধ্যে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে খাবার এবং চাল ডাল ও শুকনো খাবার ।

জেলা প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে আজ দপুরের দিকে গাইবান্ধার বন্যাদুর্গত এলাকায় হেলিকপ্টার নিয়ে দেখতে আসছেন পানি সম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। তবে তিনি বন্যাদুর্গত মানুষের সঙ্গে কথা বলবেন না। তিনি শুধু পানি দেখেই চলে যান। কৌতূহলি মানুষ বুঝতেই পারল না হেলিকপ্টারে কে এলেন,আর কেন এলেন? বিষয়টি শুধু সাংবাদিকদের জানানো হয় জেলা প্রশাসন থেকে।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close