ফিচার

ভূরাজনীতি: মধ্যপ্রাচ্যে ফাটল ধরেছে

ইরাকের উত্তরাঞ্চল থেকে ভীতিকর খবর পাওয়া যাচ্ছে। একই সঙ্গে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে যে ব্যাপক নরহত্যা চলছে, তাতে বোঝা যায় মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যেসব আঞ্চলিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, আজ ১০০ বছর পর সেগুলো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের আজকের যে মানচিত্র, সেটা প্রণয়নে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। যুদ্ধ চলার সময়ই কূটনীতিক স্যার মার্ক সাইকস এবং ফ্রাঙ্কোইস জর্জ পাইকটের প্রণীত একটি ঐকমত্যে স্বাক্ষর করে ওই শক্তিগুলো। তারা এর মাধ্যমে পূর্ব-ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়। আর সেটা করতে গিয়ে তারা এ অঞ্চলের ইতিহাস, নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য এবং ধর্মীয় অনুভূতি ও স্থানীয় জনগণের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাকে পদদলিত করে।

এর মাধ্যমে আজকের ইরাক, সিরিয়া ও লেবানন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠে। পশ্চিমা রাষ্ট্রব্যবস্থার আদলে এই রাষ্ট্রগুলো গড়ে উঠেছে। তাদের নেতারা এই ব্যবস্থা রক্ষা করেছেন, সীমান্ত অক্ষুণ্ন রেখেছেন, যেন এটাই সবচেয়ে ভালো পন্থা। কোনো শাসকেরই, বিশেষত কর্তৃত্বপরায়ণ শাসকদের এমন ইচ্ছা ছিল না যে তাঁরা এই ঐকমত্যকে খাটো করবেন। পশ্চিমাদের চাপিয়ে দেওয়া ব্যবস্থা এখন ভেঙে পড়ছে। জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন না ঘটালে কোনো রাষ্ট্রই টিকে থাকতে পারে না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক দখলের মাধ্যমে শুধু সাদ্দাম হোসেনেরই পতন ঘটেনি, এর মাধ্যমে সংখ্যালঘু সুন্নি শাসনেরও অবসান ঘটেছে, ব্রিটিশরা যেটা কয়েক প্রজন্ম আগে প্রতিষ্ঠা করেছিল। এরপর শিয়ারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার পর পশ্চিমা ধাঁচের নির্বাচনের মাধ্যমে দেশটিতে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করে।

ইরাক আগে যেমন একক আরব রাষ্ট্র ছিল, এখন আর সে রকম নেই। রাষ্ট্রটি আবার আগের জায়গায় যাবে কি না, সে বিষয়েও যথেষ্ট সন্দেহ আছে। উত্তরে যে আঞ্চলিক কুর্দি সরকার রয়েছে, সেটা বিধিগতভাবে না হলেও কার্যত একটি রাষ্ট্রের রূপ লাভ করেছে। তাদের নিজস্ব সেনাবাহিনী আছে, সীমান্তরক্ষী আছে এবং তাদের ভূখণ্ডে যে প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, সেটাও তাদের দখলে আছে। কুর্দিস্তান রিজিওন অব ইরাকের রাজধানী আরবিলে যেসব বিদেশি কনসুলেট আছে, সেগুলো কার্যত দূতাবাস হিসেবে কাজ করে।

সিরিয়ায় শান্তিপূর্ণভাবে গণতন্ত্রকামী আন্দোলন শুরু হয়েছিল, কিন্তু সেটা খুব দ্রুতই আলাওয়াইট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংখ্যাগুরু সুন্নিদের সশস্ত্র আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। এর নেতৃত্বে রয়েছে আসাদ পরিবার। তাদের অবস্থা ইরাকের মতোই, এই রাষ্ট্রটি কীভাবে ঐক্যবদ্ধ আরব জাতি রাষ্ট্রে পরিণত হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

ইরাক ও সিরিয়ায় রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের বিভক্তির কারণে নতুন খেলোয়াড়ের জন্ম হয়েছে, ইসলামিক স্টেট বা আইএস। তারা সাইকস-পাইকট ঐকমত্যের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সিরিয়া ও ইরাকের ভূখণ্ড দখল করে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

আইএস হচ্ছে আল-কায়েদার একটি ভগ্নাংশ। তারা হয়তো একটি আন্তসীমান্তীয় রাষ্ট্র গঠনে সক্ষম হবে না, কিন্তু তাদের নৃশংস আচরণ ও ইসলামি ভাবাদর্শের কারণে রাষ্ট্রের পুরোনো সীমা ও যে রাষ্ট্রের কল্পনা তারা করছে, কোনোটাই আর ধোপে টিকবে না। আর তারা সম্প্রতি লেবাননে প্রবেশ করেছে, সেখানকার সম্প্রদায়গত ভারসাম্য ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে, এর ফলে সেটাও বিনষ্ট হতে পারে।

পশ্চিমাদের আরোপিত রাষ্ট্রব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য স্থানেও ভেঙে পড়ছে। যেমন ১৮৯০-এর দশকে ব্রিটিশদের প্রতিষ্ঠিত বহুজাতিক রাষ্ট্র সুদানেও দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলছে। একটি দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ২০১১ সালে দক্ষিণ সুদান সুদানের মূল অংশ থেকে বিভক্ত হয়ে স্বাধীন হয়। এর মাধ্যমে সেখানকার খ্রিষ্টান ও সর্বপ্রাণবাদী জনগণ আরব/মুসলিম জোয়াল থেকে মুক্ত হয়। কিন্তু দারফুরে এখনো রক্তপাত চলছে, আর দক্ষিণ সুদানকেও স্থিতিশীল রাষ্ট্র হতে গেলে আরও বহুদূর যেতে হবে।

লিবিয়াও ভেঙে পড়ছে। দেশটির দুটি প্রদেশ ত্রিপোলিতানিয়া ও সাইরেনাসিয়ার মধ্যে ব্যাপক সাংস্কৃতিক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তাদের জোর করে ‘লিবিয়া’ রাষ্ট্রের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, ইতালীয়রা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগে অটোমানদের কাছ থেকে এই রাজ্য দুটিকে ছিনিয়ে নেয়। ২০১১ সালে মুয়াম্মার আল গাদ্দাফির হত্যার পর লিবীয়রা এখনো একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন করতে পারেনি—গাদ্দাফির পর দেশটিতে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী এসেছেন। দেশটির সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিভাজনের প্রেক্ষাপটে পশ্চিমারা যে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কথা বলছে, তার কোনো প্রাসঙ্গিকতা থাকে না।

এ অঞ্চলে মিসরই একমাত্র ব্যতিক্রম। দেশের ভেতরে যত দুঃখ-কষ্ট থাকুক না কেন, মিসরে যে কোনো বিভাজন নেই, তা সত্য। মিসরের নাড়ি দেশটির ইতিহাসে পোঁতা রয়েছে, জনগণের সচেতনতার মধ্যে তা নিহিত রয়েছে। সেখানে খ্রিষ্টানদের নানা রকম সমস্যা থাকলেও তারা যে সংখ্যাগুরু মুসলমানদের মতোই মিসরীয় নাগরিক, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

কিন্তু এই মিসরও মধ্যপ্রাচ্যে প্রচলিত একটি ধরন অনুসরণ করছে। আলোকায়নের মাধ্যমে যে উদার ও গণতান্ত্রিক শক্তির উদ্ভব হয়েছিল, তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে পশ্চিমে সেকু্যলারিজমের উদ্ভব হয়েছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে কর্তৃত্বপরায়ণ শাসকেরা সেটা আরোপ করেছেন: ইরানে শাহ, তুরস্কে আতাতুর্ক, ইরাকে সাদ্দাম, সিরিয়ায় আসাদ, মিসরে নাসের ও মোবারক। এ কারণেই সিরিয়ার খ্রিষ্টান ও ড্রুজ সংখ্যালঘুরা এখন আসাদকে সমর্থন করছে বা মিসরের খ্রিষ্টানরা সামরিক শাসনকে সমর্থন করছে। সেখানে গণতন্ত্রের মাধ্যমে সংখ্যাগুরুদের শাসন মানে মুসলিম কর্তৃত্ব, সেটা তারা মেনে নেবে না।

ইউরোপেও বছরের পর বছর ধরে সহিংস প্রকৃতির ধর্মীয় ও জাতীয় আন্দোলন হয়েছে, যার চূড়ান্ত রূপ দেখা গেছে দুটি বিশ্বযুদ্ধের সময়। তারপর সেখানে একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের হয়তো আরও কম সময় লাগবে, ইউরোপের মতো এত সহিংসতাও সেখানে হবে না। কিন্তু পশ্চিমের আদলে জাতিরাষ্ট্র গঠনের যে ধারণা, সেটা শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা আত্মাভিমানে পরিণত হতে পারে। প্রয়াত সাহিত্যতাত্ত্বিক ও বুদ্ধিজীবী এডওয়ার্ড সাঈদ হয়তো এটাকে পিতৃতান্ত্রিক প্রাচ্যবাদ হিসেবে আখ্যা দিতেন।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

শ্লোমো আভিনেরি: জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close