অন্য পত্রিকা থেকে

কূটনীতির মাঠে এবার মুখোমুখি বাংলাদেশ-জাপান

জেসমিন পাপড়ি: দীর্ঘদিনের বন্ধু জাপান এবার বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বির ভূমিকায়। আগামী ২০১৫ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদ নির্বাচনে মুখোমুখি দুই বন্ধু প্রতীম দেশ। এ পদটিতে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে মাত্র একটি দেশ নির্বাচিত হবে। আর এবার এ অঞ্চল থেকে বাংলাদেশ ও জাপান দুদেশই আগ্রহ দেখিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।

আগামী ২০১৫ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭০তম অধিবেশনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের জন্য জাপান জোর প্রচারণা চালাচ্ছে। সমর্থন পেতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দেশও সফর করছেন। তবে বাংলাদেশ এখনো সেভাবে প্রচারণা শুরু করেনি বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র। এমনকি চলতি মাসে জাতিসংঘ সাধারণ সভা উপলক্ষ্যে যখন বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের নেতারা এক হবেন সেখানেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ কোন প্রচারণার পরিকল্পনার কথা জানা যায়নি।

বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু জাপানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ পদটির নির্বাচন থেকে বাংলাদেশ প্রার্থীতা প্রত্যাহার করতে পারে বলেও শোনা যাচ্ছে। কূটনীতিক সূত্র বলছে, এ পদটিতে নির্বাচিত হওয়া বাংলাদেশের জন্য যেমন সম্মানজনক, তেমনি অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রেও পদটির গুরুত্বও আছে।

বাংলাদেশের জন্য এ পদটির গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে জাতিসংঘের ‘নিরাপত্তা পরিষদের রাজনৈতিক অর্থনীতি: অর্থ ও প্রভাব’ বইয়ে জেমস রেমন্ড ভ্রিল্রান্ড এক্সল ড্রেহার লিখেছেন, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে ১৯৭২-১৯৭৮ সাল পর‌্যন্ত পাঁচ বছরে বিশ্ব ব্যাংক মাত্র এক থেকে সাতটি প্রজেক্ট অনুমোদন দেয়। কিন্তু ১৯৭৯-১৯৮০ সালে প্রথমবার নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য পদে থাকার পর বিশ্বব্যাংকের প্রজেক্টের সংখ্যা নয় থেকে এগারতে উন্নীত হয়। ১৯৯৯ সালেও বাংলাদেশ আরো বিশ্বব্যাংকের আরো ১১টি প্রজেক্ট পায়। এবছর দ্বিতীয়বারের মত ২০০০-২০০১ সালের জন্য নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য পদ লাভ করে বাংলাদেশ।

এদিকে প্রতিদ্বন্দ্বি হলেও দুদেশই একে অপরের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছে। আসন্ন বাংলাদেশ সফরেও সময় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য পদের ভোটে জাপানের পক্ষে সরকারের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করবেন শিনজো আবে। বাংলাদেশের সমর্থন চাইবেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। একই কারণে তিনি বাংলাদেশ সফর শেষে শ্রীলঙ্কাও সফর করবেন। ৭ সেপ্টম্বর ঢাকা সফর শেষে তার কলম্বো যাওয়ার কথা রয়েছে।

গত মে মাসে জাপান সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানান, শিনজো আবে’র বাংলাদেশ সফরের সময় নিরাপত্তা পরিষদের নির্বাচন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, জাপানের পররাষ্ট্র নীতির অংশ হিসেবে এ অঞ্চলে চীনের কর্তৃত্ব প্রতিহত করে নিজেদের প্রভাব অব্যাহত রাখতে বদ্ধ পরিকর দেশটি। এজন্য এ পদে জয় চায় তারা।

তাছাড়া এবার অস্থায়ী পদটি অর্জন করে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে চায় ১০বার নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হওয়া জাপান। কারণ, ১৯৭৮ সালে একই পদে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের কাছে হেরেছিল এশিয়ার অর্থনৈতিক এই পরাশক্তি। ৩৬ বছর পর আবারও সেই দুটি দেশ একই পদের জন্য লড়বে।

কুটনীতিকিরা বলছেন, তখনকার জাপানের চেয়ে এখনকার জাপান আরো শক্তিশালী। তবু গতবারের মত এবারও এই শক্তিশালী জাপানকে পরাজিত করার ক্ষমতা আছে বাংলাদেশের। বিশেষ করে চীনের মাধ্যমে আফ্রিকার দেশগুলোর সমর্থন সহজেই পাবে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়াও ইতিমধ্যে বাংলাদেশকে এ পদের জন্য সমর্থন দিয়েছে।

একটি কূটনৈতিক সূত্র বলছে, রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশ এ পদে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করতে পারে। তেমন ইঙ্গিতও জাপানকে দেওয়া হয়েছে। কারণ, গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি জাপান নতুন সরকারকে সমর্থন দেয়। বিপুল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিও আসে দেশটি থেকে। এমন অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরে নিরাপত্তা পরিষদের পদের জন্য সমর্থনও চায় দেশটি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিষয়টি অস্বীকার করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাংলানিউজকে বলেন, বাংলাদেশ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী পদের আগামী ২০১৬-২০১৭ সালের মেয়াদের জন্য লড়বে। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ সভায়। তাই বলা যায়, প্রচারণা চালানোর যথেষ্ঠ সময় আছে।

জাপান শক্তিশালী দেশ হয়েও কেন এত আগে থেকে প্রচারণায় নেমেছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা দেশটির সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যাপার।

এ বিষয়ে এই মন্ত্রণালয়ের আরেক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, জাপান এবং বাংলাদেশ অকৃত্রিম বন্ধু। সকল আন্তর্জাতিক সংগঠনে দেশদুটি একে অপরকে সমর্থন দিয়ে আসছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না। ২০১৫ সালের জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচন দুদেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে না।

এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক কুটনীতিক বাংলানিউজকে বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের আফ্রিকা অঞ্চলে থেকে নির্বাচিত অস্থায়ী সদস্যদেশ চাদ। এ অঞ্চলে চাদের প্রতিদ্বন্দ্বি ছিল নাইজেরিয়া এবং জাম্বিয়া। জাম্বিয়া প্রার্থীতা প্রত্যাহার করলে নাইজেরিয়াকে হারিয়ে অস্থায়ী সদস্যপদ লাভ করে চাদ। এটি সম্ভব হয়েছিল দেশটির ব্যাপক প্রচারণা চালানোর ফলে।

দীর্ঘদিন পরপর কোন দেশ এই সম্মানজনক পদটির জন্য লড়তে পারে। কোন কারণে এবার প্রার্থীতা প্রত্যাহার করলে এ পদে প্রার্থীতার জন্য বাংলাদেশকে ২০২৫ সাল অপেক্ষা করতে হবে। তাই আমাদেরকে ২০১৫ সালের নির্বাচনের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারণায় নামা উচিত বলে অভিমত দেন এই কুটনীতিক।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মোট সদস্য ১৫টি দেশ। এদের মধ্যে পাঁচটি স্থায়ী এবং ১০টি দেশ অস্থায়ী সদস্য। প্রতি দুবছর পরপর অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যরা হল যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য এবং চীন, যাদের এদের ভেটো ক্ষমতা আছে।

সূত্র: বাংলানিউজ২৪

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close