Featuredইসলাম থেকে

ফেরারী নারী – ১

wpid-fhc_logo_no_type_.jpg

ভূমিকা:
নারী জাতি হিরন্ময়ী। বিপ্লবী অগ্রযাত্রার দুর্দমনীয় সহযাত্রী। পুরুষের অলঙ্কার, দুঃসময়ের প্রশান্তিদায়ী, দুর্যোগের অনুপ্রেরণা, সমাজসভ্যতার ধারা অক্ষুণ্ন রক্ষাকারী কন্যা, জায়া জননী ও মা। পুরুষের অগ্রযাত্রা বেগবান ও স্বতঃস্ফূর্ততা রক্ষার অক্লান্ত রণসঙ্গী। নারী এক চেতনা, কর্মস্পৃহা রচনায় শাণিত অনুপ্রেরণা। ভোগের পণ্য নয়; সৃষ্টির অপার মহিমা। স্বপ্ন, আশা, ভালোবাসা এবং উন্নত সভ্যতার সূতিকাগার। নারী কেবলই জননী কিংবা ধাত্রী নন, গতিময় অভিসারী সমাজের সহযাত্রী। নারী আছে কাব্য-কবিতায়, সমাজ বিনির্মাণের সৃষ্টিশীল গল্পে- স্বমহিমায়। যুগ পরম্পরায় তাদের কীর্তির সরব উপস্থিতি কর্মোদ্দীপনার সুরে ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। নারী শুধু রমণীই নয়, ইতিহাসের জননী। ইতিহাসের হাজারও রওনকে নারীর আছে নিদাগসম প্রখরতা, অগ্নিঝরা বিদ্রোহী কাব্যে গতির ঊর্মিমালা। নারী উপমা-উৎপ্রেক্ষার স্তম্ভ, অনুজ প্রজন্মের আলোকচ্ছটার প্রতিবিম্ব। নারী দুর্গম গিরিখাদে পুরুষের উদ্দীপনা, দরিদ্রক্লিষ্ট গৃহকর্তার সান্ত্বনার আসমানসম শামিয়ানা।

আবৃত নারী সম্ভ্রমপ্রাচীর, যার আড়ালে রক্ষিত হয় নারীসত্তার সতীত্ব। হাওয়া, সারা, হাজেরা, রহিমা, আছিয়া, মারয়াম, খাদিজা, আয়েশা, আছমা, ফাতেমা, হাফসা, উম্মে সালমা, যয়নব, উম্মে কুলসুম, রোকাইয়া, উম্মে হানী সভ্যতার একেকটি স্তম্ভ, পরিশীলিত জীবনের জীবন্ত সুরাইয়াসম উজ্জ্বল নক্ষত্র।
এঁরা যুগের সেরা উপহার। রত্নগর্ভা, রত্নপ্রসবিত এবং রত্নবিস্তারিণী। জগতে যত মনীষী এসেছেন তারা সকলেই মায়ের পেট চিড়েই এসেছেন। মায়েদের অকৃপণ স্নেহ-প্রীতি, স্তন্যদান এবং অকৃত্রিম মায়া-মমতার বদৌলতেই একজন সন্তান পরবর্তীতে দেশ ও মানবতার জন্য নিবেদিত হতে পেরেছেন। সুতরাং সমাজ-সভ্যতার ভীত নির্মাণের জন্য ওই ব্যক্তিকে যতটুকু না মর্যাদা দেব, তারচেয়ে বেশি মর্যাদা দেব ওই নারীকে, যার গর্ভে তার আগমন ঘটেছে, বুকের দুধে প্রতিভা সৃষ্টি হয়েছে এবং অকৃত্রিম আদর-স্নেহে বেড়ে ওঠা হয়েছে।
প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের অধিকারী নারী আবৃতবসনেও যে দীপ্তিময় ও প্রখর, তা উলঙ্গ সূর্যের দীপ্তি কিংবা বিবস্ত্র পূর্ণিমার উজ্জ্বলতাকেও ম্লান করে দেয়। মহীয়সী যেবুন্নেছা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তখন ইরান এবং হিন্দুস্তান ছিল ফার্সি সাহিত্যের উর্বরভূমি। হিন্দুদের ভাষায় তীর্থস্থান। কত কাব্যপ্রতিভা যে এই দুই নগরী থেকে জন্ম নিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। একবার সব প্রতিভা যেন থমকে গেল। কবিতার একটি অংশ নির্মাণে সকল কথাশিল্প ব্যর্থ হল। ইরানের সেরা কবিরা কবিতার এক চরণ লিখে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরের চরণ রচনা করতে ব্যর্থ হলেন। ঘষামাজার মধ্যে কেটে গেল বেশ কিছুদিন। কিন্তু কিছু থেকেই কিছু হয় না। সন্তোষজনক দ্বিতীয় চরণ রচনা করতে কেউ সক্ষম হন না। শেষ পর্যন্ত ওই চরণ লিখে পাঠিয়ে দেওয়া হলো হিন্দুস্তানে। দিল্লির প্রতিথযশা কবিগণ থমকে গেলেন। দ্বিতীয় চরণ রচনা করবেন কি, প্রথম চরণের মন্ত্রমুগ্ধতাই তাদেরকে আচ্ছন্ন করে রাখল। তাদের সুতীক্ষ্ন কলমের ডগায় যেন মরিচা ধরেছে! গোটা ইরান ও দিল্লির বিশ্বসেরা কবিগণ ব্যর্থ হলেন। কবিদের কাব্যিক নান্দিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে লাগল। তাদের সে কী শরম! উভয় দেশের কবিদের তখন রক্ষা করতে এলেন এক ‘বন্দি’ ‘আবদ্ধ’, ‘পশ্চাদপদ’ নারী! বাদশাহ আলমগীরের কন্যা হাফেজা আলেমা মহীয়সী যেবুন্নেছা কবিতার প্রথম চরণ চেয়ে পাঠালেন। তাতে এক নজর পড়তেই তার কাব্যসত্তা প্রবলভাবে সক্রিয় হয়ে উঠল। তিনি খাতা-কলম হাতে নিয়ে দ্বিতীয় চরণ লিখে ফেললেন। কয়েকবার তা ঘষামাজা করে পাঠিয়ে দিলেন দিল্লির রাজদরবারে। যেবুন্নেছার লেখা কবিতার দ্বিতীয় চরণ গোটা দিল্লিকে স্তম্ভিত করে দিলো। প্রথম চরণের সঙ্গে এত সাদৃশ্যপূর্ণ দ্বিতীয় চরণ দেখে দেশের বাঘা বাঘা কবিরা হতভম্ব হয়ে গেলেন। এই বুঝি আবরণের প্রভাব! বন্দিত্বের অবারিত প্রতিভা!
দ্বিতীয় চরণ ইরানে পাঠানো হলে তারা ততোধিক বিস্মিত হলেন এবং কবির নারীত্বের পরিচয় তাদেরকে আরো উদগ্রীব করে তুলল। তারা লিখলেন, হে জ্যোৎস্নামুখী! আপনি আমাদেরকে দিদার দিন! আপনার পূর্ণিমার উজ্জ্বলসম কবিতা আমাদেরকে বিমোহিত করেছে।
জবাবে ওই আব্রু-আবৃত নারী লিখলেন, ‘আমি লুকিয়ে আছি আমার কাব্য প্রতিভায়। যে আমাকে দেখতে চায় সে যেন আমাকে দেখে আমারই কবিতায়।’ এভাবেই কাব্যখ্যাতি পান যেবুন্নেছা। তার রচিত ‘জেব-ই-মুনশোয়াতে’ আছে সত্যিকার কাব্যপ্রতিভার চিহ্ন। বিখাত ফার্সি কাব্যগ্রন্থ ‘দিওয়ানে মখফির’ রচয়িত্রীরূপেও আছে এই মহীয়সী নারীর নাম। কিন্তু সবকিছুই হতো পর্দার পবিত্রতা ও শুদ্ধতার আঙিনায়।

তাই তো বলি, আবৃত নারী উজ্জ্বল পূর্ণিমার চেয়েও দীপ্তিময়! যুগে যুগে এই আবৃত নারীরাই কীর্তি স্থাপন করেছেন, পর্দার আড়ালে থেকেই রচনা করেছেন সভ্যতার সুদর্শন মিনার। পক্ষান্তরে অনাবৃত নারী গড়েনি ভালো কিছু। বরং খুলে ফেলেছে সভ্যতার একেকটি ইট। তারা হয়েছে ভোগের পাত্র, পুরুষকে করেছে কামুক এবং চরিত্রহীন। বস্তুত পর্দার নারীই ফুলেল নারীসত্তা।
আর এই ফুলেল নারীসত্তা কিছু কীট ও গোবরের পোকা কলঙ্কিত করতে চায়। তারা কারা? যারা নারীর নিয়ন্ত্রিত ও শালীন জীবনাচারের বিরোধী তারাই সেই নর্দমার কীট, গোবরের পোকা! নারীদের সচেতন করা এবং এই গোবরে পোকাদের বিরুদ্ধেই আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস- ফেরারী নারী!

গ্রন্থটি প্রকাশে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সহযোগিতা করেছেন মাওলানা মাহবুবুর রহমান, মুফতি মাকসুদুর রহমান, মোস্তফা কামাল এবং আমার সহধর্মিনী আছমা উম্মে আনাছ। তাদের সকলের জন্য থাকল বিশেষ কল্যাণ কামনা।

সব নারীসত্তায় বিকশিত হোক এই শুদ্ধতা
‘হাঁটু জলে নেমে কন্যা হাঁটু মাছন করে, তাই না দেখে সেই কন্যার প্রেমে গেছি পড়ে, ভালোবাসবে সে কি আমারে’ ওয়াসিমের এমন গান যখন বাজছিল, সিনেমায় শাবানা তখন হাঁটুর পর কাপড় তুলে হাটু মাছন করছিলেন। পুরনো দিনে অনেক ভালো সিনেমার পাশাপাশি শাবানা এমন অনেক ছবিতেই অভিনয় করেছেন। কিন্তু আজ এগুলো দেখে শাবানা নিজে নিজে যারপর নাই বিব্রত হন।

এমনিতেই শাবানা কোনো অশ্লীল ছবি বা দৃশ্যে অভিনয় করেননি। তার অভিনীত ছবিগুলো ছিল তুলনামূলক অশ্লীলতামুক্ত। তারপরও নিজের ছবি ও চরিত্র সম্পর্কে শাবানার এই উপলব্ধি প্রমাণ করে তার বদলে যাওয়ার মাত্রা। শাবানার এই বক্তব্য এরই মধ্যে ঢালিউড ও তার এককালীন সহ অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের মাঝে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। যারা সৎ ও নারীজীবনের শুদ্ধতার পথে চলতে চান এবং চলা পছন্দ করেন তাদের জন্যও আশার বাণী হয়ে দেখা দিয়েছে শাবানার এই অভিব্যক্তি।

শুধু এখানেই শেষ নয়, বদলে যাওয়া শাবানা তার বৈপ্লবিক পরিবর্তিত অনুভূতি থেকে দেশের গণমাধ্যমগুলোর কাছে অনুরোধ করেছেন, তার ছবিগুলো যেন আর গণমাধ্যমে প্রদর্শন না করা হয়। তিনি এও বলেছেন, ‘তবে বাণিজ্যিক কারণে যদি তা সম্ভব না হয় অন্তত রমযান মাসে যেন তার কোনো চলচ্চিত্র কোনো গণমাধ্যমে প্রদর্শন না করা হয়।’
চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি শিল্পী শাবানা দীর্ঘদিন ধরেই আমেরিকায় প্রবাস যাপন করছেন। আমেরিকার আধুনিক জীবনেও নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন হিজাব ও শালীনতার শুদ্ধতায়। বাংলা কমিউনিটির কোনো অনুষ্ঠানেও খুব একটা দেখা যায় না শাবানাকে। একান্ত ঘনিষ্ঠজন ছাড়া কারও অনুষ্ঠানে হাজিরও হন না তিনি। এক ঘরোয়া আড্ডায় শাবানা জানিয়েছেন, এখন এই বয়সে এসে নিজের এই চরিত্রগুলো দেখলে বিব্রত হতে হয়। এ ছাড়া আমি নিজেও আমার লাইফস্টাইল বদলে নিয়েছি।’

শাবানা আজ তার লাইফস্টাইল পরিবর্তন করে বড় বাঁচা বেঁচে গেলেন। তিনি এতদিন যা করেছেন তা নিঃসন্দেহে গুনাহে জারিয়া (চলমান গুনাহ)। আর গুনাহসমূহের মধ্যে গুনাহে জারিয়া খুবই ভয়ানক ও পরকালবিনাশী পাপ। একারণেই গুনাহে জারিয়ার ব্যাপারে বান্দাকে বেশি সচেতন করা হয়েছে। মানুষ ব্যক্তিগত অনেক বড় অপরাধ করেও নিমিষেই আন্তরিক তাওবার মাধ্যমে সেই পাপ থেকে রেহাই পেতে পারে। কিন্তু একটা গুনাহে জারিয়ার দায় শোধ করা খুবই কঠিন। মুনযির ইবন জারীর থেকে বর্ণিত, তাঁর পিতা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
« مَنْ سَنَّ سُنَّةً حَسَنَةً فَعُمِلَ بِهَا كَانَ لَهُ أَجْرُهَا وَمِثْلُ أَجْرِ مَنْ عَمِلَ بِهَا لاَ يَنْقُصُ مِنْ أُجُورِهِمْ شَىْءٌ ، وَمَنْ سَنَّ سُنَّةً سَيِّئَةً فَعُمِلَ بِهَا كَانَ لَهُ وِزْرُهَا وَمِثْلُ وِزْرِ مَنْ عَمِلَ بِهَا لاَ يَنْقُصُ مِنْ أَوْزَارِهِمْ شَىْءٌ ».
‘যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের প্রচলন ঘটাবে এবং অন্যরা সেটার অনুসরণ করবে তবে তার জন্য এর প্রতিদান লেখা হবে এবং এর অনুসরণকারীর অনুরূপ নেকীও লেখা হবে। অথচ তাদের প্রতিদান থেকে এতটুকু কমানো হবে না। অনুরূপ যে ব্যক্তি কোনো পাপ কাজের প্রচলন ঘটাবে এবং অন্যরা সেটার অনুসরণও করবে তবে সেই পাপের অন্য প্রচলনকারীর আমলনামায় যুক্ত হতে থাকবে। অথচ যে পাপ করবে তার পাপের সামান্য অংশও তাতে হ্রাস পাবে না।’ [ইবন মাজাহ্ : ২০৩; সহীহ ইবন হিব্বান : ৩৩০৮]

এক হাদীসে ইরশাদ হয়েছে-
« وَمَا مِنْ دَاعٍ يَدْعُو إِلَى ضَلاَلَةٍ إِلاَّ كَانَ عَلَيْهِ مِثْلُ أَوْزَارِهِمْ لاَ يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أَوْزَارِهِمْ شَيْئًا ».
‘যে ব্যক্তি পাপের দিকে আহ্বান করবে সেই পাপের দায়ভার তার ওপরেও বর্তাবে। অথচ পাপকারীরও পাপের মধ্যে কোনো ঘাটতি হবে না।’ [মুয়াত্তা মালেক : ৫১৩, সহীহ]
এই হাদীসের আলোকে বিখ্যাত হাদীস ভাষ্যকার ইমাম নববী রহিমাহুল্লাহ বলেন, এই হাদীসে ভালো কাজের প্রচলন ঘটানোর প্রতি তাগিদ এবং মন্দকাজের প্রচলন ঘটানোর ভয়াবহতা উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি কারো কৃতপাপ অন্যরা অনুসরণ করতে থাকলে এবং তা যতদিন চলবে ততদিন সে ওই পাপের ভাগী হবে। এমনকি কেয়ামত পর্যন্ত চললে পাপও হবে কেয়ামত পর্যন্ত। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে, শুধু মৃত্যুর পরেই নয়, জীবদ্দশাতেও সেই পাপগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আমলনামায় যুক্ত হতে থাকবে।

ইমাম নববী রহিমাহুল্লাহ বলেন,
معناه إن سنها سواء كان العمل في حياته أو بعد موته والله اعلم
‘হাদীসের ব্যাখ্যা হচ্ছে, যে ব্যক্তি পাপ করে ও পাপের প্রচলন ঘটায় এবং অন্যরা তার অনুসরণ করে তবে তার জীবদ্দশা ও মরণের পর তার আমলনামায় ওই পাপ যুক্ত হতে থাকে।’ [শরহে নববী]
কাযী ইয়াজ রহিমাহুল্লাহ বলেন,
وهذا أصل فى أن المعونة على مالا يحل لاتحل ، قال الله تعالى : وَلاَ تَعَاوَنُواْ عَلَى الإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ  وقد جعل الدال على الخير كفاعله  وهكذا الدال على الشر كفاعله
‘এটাই মূলনীতি যে, হারাম কাজে কাউকে সহযোগিতা করা বৈধ নয়। কেননা আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন, তোমরা একে অপরকে পাপের কাজে সহযোগিতা করবে না। আর আল্লাহ তা‘আলা ভালো কাজের সহযোগীকে ভালোকাজের কর্তা এবং অনুরূপভাবে খারাপ কাজের সহযোগীকে খারাপ কাজের কর্তার অনুরূপ আখ্যায়িত করেছেন।’ [ইকমালুল মু‘লিম]
জনৈক কবি বলেন,
وَالمَرْءُ في مِيزانِه أتْباعُهُ
‘মানুষ কেয়ামতের ময়দানে তার আমলনামায় স্বীয় অনুসারীদেরকে দেখতে পাবে।’

বিব্রত ও পরিবর্তিত মানসিকতার শাবানা পাপের যে ধারা চালু করেছিলেন এর ভয়াবহ পরিণামের কথা চিন্তা করে তিনি তা থেকে আজ পালানোর চেষ্টা করছেন। তার এই পলায়নপরতা তীব্র ও গতিময় হোক, আমরা সেটাই কামনা করি। তবে দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, শাবানার ব্যক্তিগত অভিমতের ওপরে দেশীয় টিভি চ্যানেলগুলোর কারো কাছ থেকেই তেমন কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। তাই তো তিনি আকুলভাবে আবেদন জানাচ্ছেন, অন্তত রমজান মাসের সম্মানেও যেন তার ছবিগুলো প্রকাশ না করা হয়। কিন্তু অর্থলিপ্সায় বিভোর গণমাধ্যম কি সাড়া দেবে তার মানবিক আবেদনে? বিশেষত বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের নৈতিকতার কাঠিটা যে তলানীতে ঠেকেছে তাতে তার এই পরকালীন ভাবনার সঙ্গে একাত্ম হয়ে ব্যবসায়ীদের সাড়া দেওয়াটা কেন যেন আমার কাছে অসম্ভবই মনে হয়।
কিন্তু যারা শাবানার ভক্ত বলে দাবি করেন, তারা কি পারবেন শাবানাকে পাপের হাত থেকে বাঁচাতে? যারা ভক্ত বলে দাবি করে তার ছবিগুলো পরম আগ্রহ ভরে সিনেমা হলে কিংবা টিভির সামনে বসে দেখেছেন, আজ তার বিনীত আবেদন এবং পাপ থেকে বাঁচার আকুতির সম্মানেই না হয় ছবিগুলো দেখা বাদ দিন। এভাবে সবাই যদি তার ছবিগুলো বয়কট করেন তবে মুনাফাখোর মিডিয়া ব্যবসায়ীরা চাইলেও তার পাপের বোঝা দীর্ঘ করতে পারবেন না। ভক্তি ও ভক্তের পরীক্ষা আসলে এখানেই। একজন পরিবর্তিত ও নতুন পথ পাওয়া নারীকে পাপ থেকে বাঁচাতে সহযোগিতা করা কি অপর মুসলমানের কর্তব্য নয়?

আমরা বিশ্বাস করি, একজন ফেরারী নারীর ঘরে ফেরাটা সকল মুসলিমের জন্য শুভ সংবাদ। এই সংবাদটার মর্ম সকলের হৃদয়ে আকুলতা সৃষ্টি করুক, অন্যদেরও ঘরে ফেরার আগ্রহ তীব্র হোক এবং ঘরফেরত নারী তার আপন নীড়ে থিতু হওয়ার স্বাদ অনুধাবন করুক- এই প্রত্যাশা করি মনেপ্রাণে।

নরকচিতায় হকের ঝাণ্ডাবাহী একজন সাহসী কুলকার্নি
বলিউডের এক সময়কার জনপ্রিয় অভিনেত্রী দীর্ঘদিন ধরে অভিনয় থেকে দূরে অবস্থান করে দর্শকদের রীতিমতো হতাশ করছিলেন। দর্শকরা সময়ের এই হিট নায়িকার শুভ প্রত্যাগমনের দিন গুণছিল। কবে তিনি মিডিয়ার মুখোমুখি হয়ে ‘ফিরে আসার সময় হলো’ বলে একটা সাক্ষাৎকার দিবেন ভেবে দর্শকরা রুদ্ধশ্বাসে প্রতীক্ষা করছিল। তিনি সেই সাক্ষাতকার দিলেন বটে কিন্তু তাতে শুধু ভারতবাসীই নয়; বিশ্ববাসীও সমান চমকে উঠেছেন। নব্বইয়ের দশকের এই জনপ্রিয় নায়িকা জানালেন, তিনি মুসলিম হয়েছেন! এমনকি দুইবছর আগে তার স্বামীও মুসলিম হয়েছেন!

বিশ্ববাসীকে হতবাক করে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি জানার চেষ্টা করছি আসলে মানুষের মূল গন্তব্য কোথায়? আমরা আসলে কী? আমাদের কী করা উচিত? সেই চেষ্টা থেকেই আমি হিন্দু ধর্ম থেকে মুসলিম হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

আবার চলচ্চিত্রে ফেরা সম্পর্কে বলেন, ঘি আবার দুধে পরিণত হতে পারে। ঋষি বাল্মিকি ফিরে আগের ভিল্লা হতে পারে। নায়ক শাহরুখ, আমির, সালমানও বদলে যেতে পারে। কিন্তু মমতাকে আর মিডিয়ার পর্দার সামনে পাওয়া যাবে না। এটা একেবারেই অসম্ভব।’ [তথ্যসূত্র : পার্বত্য নিউজ, খবরনামা]

এমন একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রীর আলোর পথে ফিরে আসা সত্যিই মুগ্ধকর, আশাজাগানিয়া। আরো অবাক বিষয় হচ্ছে তাঁর সাহসিকতা ও মনোবলের দৃঢ়তা। তিনি বলছেন, ‘মমতাকে আর মিডিয়ার পর্দার সামনে পাওয়া যাবে না। এটা একেবারেই অসম্ভব।’

মমতা যেন হাদীসের বাক্যেরই প্রতিধ্বনি করছেন। আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
« ثَلاَثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ حَلاَوَةَ الإِيمَانِ أَنْ يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا ، وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لاَ يُحِبُّهُ إِلاَّ لِلَّهِ ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِى الْكُفْرِ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِى النَّارِ » .
‘তিনটি বস্তু যার মধ্যে পাওয়া যাবে সে ঈমানের স্বাদ গ্রহণ করতে সক্ষম হবে। এক. আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার কাছে অন্য সবকিছুর চেয়ে প্রিয় হওয়া। দুই. মানুষকে একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্যই ভালোবাসা এবং তিন. কুফর থেকে ফিরে আসার পর পুনরায় কুফরে ফিরে যাওয়াকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতোই অপছন্দ করা।’ [বুখারী : ১৬; মুসলিম : ৬০]

বস্তুত আল্লাহ তা‘আলা যখন কারো অন্তর খুলে দেন তখন তার জন্য পৃথিবীর যাবতীয় চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা সহজ ও সম্ভব হয়ে ওঠে। পৃথিবীর সকল তাগুতী শক্তির কাছে তিনি থাকেন অদম্য, অপ্রতিরোধ্য। সচেতন নাগরিকমাত্রই জানেন হিন্দুস্তান একটি অতি উগ্র হিন্দুত্ববাদী দেশ, যেদেশের বাসিন্দারা মুসলিমদেরকে সহ্য করতে পারে না, এমনকি কোনো মুসলিম তাদের গাড়ি-বিমানে উঠে আল্লাহ তা‘আলার নাম নেয়াও বরদাশত করে না। পাঠকদের মনে আছে কিনা জানি না, কিছুদিন আগে বাংলাদেশের এক উড়োজাহাজ কোম্পানির হিন্দুস্তানী মালিক তাদের এয়ারবাসে ‘ইনশাআল্লাহ’, ভ্রমণের দু‘আ ‘বিসমিল্লাহ ওয়া মাজরিহা’ তথা ইসলামী আচরণ ও যাবতীয় দু‘আ-দরূদ নিষিদ্ধ করেছিল। ভারতের শাসনক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে এবং নাগরিকরাও পছন্দ করে এমন লোকদেরকে, যারা মুসলিম শিশু বাচ্চাকে তার মায়ের পেট থেকে কেটে বের করে মায়ের সামনে টুকরো টুকরো করতে পারে। এমন উগ্র হিন্দুদেরকে ভারতবাসী শ্রদ্ধা করে, যারা মুসলিম নারী-পুরুষকে জোর করে পেট্রোল খাইয়ে গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং পেট্টোলবাহী জীবন্ত মানুষটার তাজা দেহ ভস্মিভূত হওয়ার তীব্র ও ভয়ানক করুণ দৃশ্য দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। ভারতে প্রায় পঞ্চাশটির মতো এমন উগ্র ও হিংস্র সংগঠন, সংস্থা ও রাজনৈতিক দল আছে যারা সর্বদা মুসলিমের রক্ত, লাশ ও অগ্নিদগ্ধ পোড়া দেহের গন্ধে নিজেদেরকে আপ্লুত দেখতে চায়। গুজরাটের দাঙ্গা, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের চিত্র এবং বিশ্ব ইতিহাসের বড় বড় সব দাঙ্গার জন্ম দেওয়া হিন্দুস্তান সেগুলোর রাজসাক্ষী।
সুতরাং এমন একটি উগ্রবাদী ও কট্টর হিন্দুরাষ্ট্রে খোদ হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে একজন জনপ্রিয় ও দর্শকনন্দিত অভিনেত্রীর আলোর পথে আসা এবং প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দেওয়া নিতান্ত সাধারণ ব্যাপার নয়। আজকের মমতা, আমার বোন, মুসলিমের এক নতুন সদস্য যেন ফিরআউনের জাদুকরদের মতোই সাহসী হয়ে উঠেছেন। জাদুকররা বিশাল-বিস্তৃতি মাঠে আল্লাহ হওয়ার দাবিদার ফিরআউন ও তার বিশাল বাহিনীর সামনে হকের দাবি নিয়ে দণ্ডায়মান এক মুসা ‘‘আলাইহিস সালামের অবিচলতা দেখে বিস্মিত, বিমোহিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। নিঃসন্দেহে এটা ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জের বিষয়, অসম লড়াই। কারণ ফিরআউন তৎক্ষণাত তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ডান হাত ও বাম পা কর্তন করে তাদেরকে চিরতরে পঙ্গু করার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু কী অদ্ভুত ব্যাপার যে, যারা এক মুহূর্ত আগে স্রষ্টার বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসেছিল তারাই এখন মুসা ‘আলাইহিস সালামের ঈমানী শক্তির বদৌলতে নকল স্রষ্টার বিরুদ্ধে, কাট্টা কাফেরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন!

মমতা এপর্যন্ত বাংলা, হিন্দি, তামিল, তেলেগু, মালায়লাম ও কানাড়ি শিল্পে প্রায় অর্ধশতাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন। সর্বশেষ অভিনীত ছবি ছিল ২০০২ সালে। বলিউডে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং আবেদনময়ী নায়িকা হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। সেই মমতার পক্ষে এমন একটা প্লাটফর্ম ছেড়ে ইসলাম গ্রহণ করার মতো দুঃসাহস দেখানো নিঃসন্দেহে নারীজাতির দীপ্তপদচারণার নজির হয়ে থাকবে।
অনেক সময় পথভ্রষ্ট করার চক্রান্ত পথহারা পথিকের সুপথ পাওয়ার মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। এর নজির আমরা জানতে পারি ইসলামের ইতিহাসে, মক্কার কুরায়শদের কুচক্রান্তের ঘটনায়। রাসূসুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় হজ করতে আসা লোকদেরকে দীনের দাওয়াত প্রদান করবেন এই আশঙ্কায় মক্কার অলিতে গলিতে আগে থেকেই লোক বসিয়ে দেওয়া হয় তাঁর নামে কুৎসা রটনা করতে। নেতাদের আদেশ মোতাবেক এই চেলা-চামুন্ডারা রাস্তার মোড়ে মোড়ে নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর আনীত দীনের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করতে থাকে। এতে হিতে বিপরীত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তর থেকে আগত লোকেরা এই নতুন ধর্মের প্রবর্তক নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠে এবং এভাবেই অসংখ্য মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। মক্কার কুরাইশরা কুৎসা রটনা না করলে তারা নবী সম্পর্কে জানতেনই না এবং ইসলাম গ্রহণেরও সুযোগ মিলত না।
ঠিক কুরাইশদের দেখানো পথেই হাঁটছে আজকের ইসলামবিদ্বেষীচক্র। ওরা বিভিন্নভাবে নারী সমাজকে ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষীপ্ত করতে গিয়ে অনেক বিধর্মী নারীকে ইসলাম সম্পর্কে জানতে, ইসলামকে মানতে অনুপ্রাণিত করছে। এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০০০ সালের তুলনায় ২০১১ সালে নারীদের মধ্যে ইসলাম গ্রহণের প্রবণতা ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রবণতা এমন সব রাষ্ট্রে বেশিমাত্রায় পরিলক্ষিত হচ্ছে, যেখানে ইসলামের বিরুদ্ধে, পর্দার বিরুদ্ধে অলঙ্ঘনীয় সংবিধান চালু করে রেখেছে! ইনশাআল্লাহ, শত্রুরা না চাইলেও এভাবেই অব্যাহত থাকবে ইসলামের অগ্রযাত্রা, বিজয় নিশান। ভারতের মতো ইসলামবিদ্বেষী রাষ্ট্রগুলোতেও ফিরআউনের জাদুকরদের মতো গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে গিয়ে মমতা কুলকার্নির মতো নারীরা ইসলামের পতাকাতলে আশ্রিত হবেন। তাই নারীরা শুধু অবলার দুর্বলতায় অভিযুক্তই নয়; সাহসের উপমা হিসেবেও সমান দক্ষ। সালাম, মমতা তোমাকে!

স্যুপের হাঁড়িতে কন্যাসন্তান : নারীসত্তায় এ কোন কলঙ্ক?
পৃথিবীর দুটি বিষয়ের প্রতি মানুষ সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট। নারী ও প্রকৃতিগত রিপু। এই দুটি বিষয়ের সঙ্গে মানবপ্রকৃতির অন্তরঙ্গতার বিষয়টি কারো অজানা নয়। নারী তো মানবসমাজের অর্ধাংশ, পৃথিবীর মানবসভ্যতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে পুরুষের নিত্যসঙ্গী। আর আল্লাহপ্রদত্ত জৈবিক প্রয়োজনও মানুষের অস্তিত্বের জন্যই অপরিহার্য। তবে জৈবিকশক্তি নিছক ভোগের জন্য নয়। বরং তা এক বিরাট আমানত। একজন পুরুষ ওই কৃষকের মতো, যে ভূমিতে বীজ রোপণ করে ফসল ফলানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং নারী ওই উর্বর ভূমির মতো, যে ফসল ফলায়। আল্লাহর কুদরতে একটি সুন্দর ধারার মাধ্যমে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে এবং এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে জীবনের বহু ধারা; বিয়ের মাধ্যমে বৈধ জৈবিক বন্ধন-ব্যবস্থা না থাকলে যে ধারাগুলো ছিন্ন হয়ে যাবে এবং মানবসভ্যতাও অচল হয়ে পড়বে। সেই পবিত্র ও সুশৃঙ্খল ধারা অক্ষুণ্ন রাখতে জৈবিকশক্তির নিয়ন্ত্রণ ও যথাযথ ব্যবহার অপরিহার্য।

ইমাম গাযালী রহিমাহুল্লাহ বলেন, জৈবিকশক্তি কেবল এজন্য নয় যে, সাময়িক কিছু আনন্দ লাভ করল এবং এর ফলশ্রুতিতে বাচ্চার আগমন ঘটল। বরং এর আরেকটি বিরাট হেকমত রয়েছে। সেটা হচ্ছে, মানবজাতির জন্য পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ আকর্ষণীয় বস্তু হচ্ছে নারী-পুরুষের বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ এবং এটার পূর্ণতা পায় যৌনাচার দ্বারা।

আশরাফুল জওয়াব গ্রন্থে উল্লেখ হয়েছে, পৃথিবীতে জৈবিক সুখের চেয়ে আকর্ষণীয় কোনো নেয়ামত নেই। কিন্তু এই নেয়ামত যেমনই আকর্ষণীয় তেমনিই ক্ষণস্থায়ী। মানুষ এই আকর্ষণীয় নেয়ামতটি দীর্ঘস্থায়ী করতে যতই কসরত করুক না কেন সে তাতে সক্ষম নয়। চূড়ান্ত মুহূর্তে তাকে পরাজিত হতেই হয়। সুতরাং মানুষ যেন এ থেকে শিক্ষা নেয় এবং এমন এক স্থান ও সঙ্গীর সন্ধান করে এবং সে অনুযায়ী আমল করে যেখানে এই সুখের ইতি নেই। বলাবাহুল্য, সেই স্থানটি হচ্ছে জান্নাত। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, জৈবিকশক্তি আনন্দ লাভের উপলক্ষ্য নয় মাত্র, বরং তা জান্নাতের দিকে আকর্ষণ করার একটি বিরাট মাধ্যমও বটে। এদিকে মানুষকে যদি জৈবিকশক্তি প্রদান না করা হতো তবে জান্নাতের মর্ম ও সেখানকার অপরিসীম নেয়ামতের কোনো আকর্ষণ সৃষ্টি হত না তাদের। একজন যৌনাক্ষম (ইন্নিন ও শিশু) কি বোঝে এর মর্ম? কিংবা একজন পাগল কি বোঝে রাজক্ষমতার মাহাত্ম্য? তাই মানুষের মধ্যে যদি এই শক্তি সঞ্চারিত না করা হতো তবে দুনিয়া যেমন তার কাছে আকর্ষণহীন হয়ে পড়ত তেমনিভাবে জান্নাতের দিকেও আকর্ষণ করা দুঃসাধ্য হতো।

তাই মানুষকে জান্নাতমুখী করতে এবং জান্নাতে প্রবেশের একমাত্র উপায় ঈমান ও আমলে মজবুত করে তোলার পেছনে যৌনশক্তি নামের এই নেয়ামতের বিরাট ভূমিকা রয়েছে।

মোটকথা, মানুষের জীবনে দুটি দিক রয়েছে। ইহকালীন ও পরকালীন। পরকালের জীবন এমন এক জীবন, যার সুখ-ঐশ্বর্য অনুধাবন করতে গিয়ে মানবমণ্ডলির জ্ঞান ভোঁতা ও হতভম্ব হয়ে যাবে। কিন্তু সেগুলো সম্বন্ধে একেবারেই প্রাথমিক ধারণা দেয়ার জন্য দুনিয়ায় কিঞ্চিত সুখ ও নেয়ামতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেই বিস্ময়-বিমুগ্ধকর নেয়ামতের অধিকারী হওয়ার জন্য যেমন এই শক্তিকে বৈধ পথে ব্যবহার করার গুরুত্ব অপরিসীম ঠিক তদ্রুপ ব্যর্থ হলে এর ক্ষতিও অপূরণীয়। এ কারণেই আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেছেন, যে ব্যক্তি বিবাহ করে জৈবিকশক্তির যথাযথ ব্যবহার করে না তার হজ পূর্ণতা পায় না। বিখ্যাত মুফাসসির ইকরামা ও মুজাহিদ রহিমাহুমাল্লাহ বলেন,
في معنى قوله تعالى وخلق الإنسان ضعيفا أنه لا يصبر عن النساء
‘মানুষকে দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে’ আয়াতের অর্থ হলো, তারা নারী ছাড়া সবর করতে পারে না।’

ফাইয়াজ ইবনে নুজাই রহিমাহুল্লাহ বলেন,
إذا قام ذكر الرجل ذهب ثلثا عقله وبعضهم يقول ذهب ثلث دينه
‘যখন পুরুষের চাহিদা জেগে ওঠে তখন তার জ্ঞানের এক তৃতীয়াংশ লোপ পায়। আর কেউ কেউ বলেন, তার দীনের এক তৃতীয়াংশ লোপ পায়।’
নাওয়াদিরুত তাফসীরে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে-
ومن شر غاسق إذا وقب قال قيام الذكر ومن شر غاسق إذا وقب
আয়াতের অর্থ হচ্ছে, পুরুষের চাহিদার তীব্রতার অনিষ্ট।’
ইমাম গাযালী রহিমাহুল্লাহ বলেন, বস্তুত এটা হচ্ছে এমন এক শক্তি, যখন তা দুর্বল মানুষের মধ্যে প্রকাশ পায় তখন তার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে যায়। দীন ও আকল তখন সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে না। একারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
وَمَا رَأَيْتُ مِنْ نَاقِصَاتِ عَقْلٍ وَدِينٍ أَغْلَبَ لِذِى لُبٍّ مِنْكُنَّ
‘জ্ঞানে দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও জ্ঞানীদেরকে ধরাশায়ী করার ব্যাপারে নারীদের মতো পারঙ্গম আর কাউকে দেখিনি।’

নারীর প্রতি পুরুষের এই তীব্র টান সৃষ্টি হয় কামনার সহজাত প্রবৃত্তি থেকে এবং চোখ এই কামনাকে চরমভাবে উস্কে দেয়। একারণে চোখের অনিষ্ট থেকে রক্ষা পেতে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বয়ং প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে এ ব্যাপারে শিক্ষা দিয়েছেন। শুতাইর ইবন শাকাল ইবন হুমাইদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، عَلِّمْنِي دُعَاءً أَنْتَفِعُ بِهِ، قَالَ: «قُلِ اللَّهُمَّ عَافِنِي مِنْ شَرِّ سَمْعِي وَبَصَرِي، وَلِسَانِي وَقَلْبِي، وَمِنْ شَرِّ مَنِيِّي»
‘আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে একটি দু‘আ শিক্ষা দিন যাতে আমি উপকৃত হতে পারি। তিনি বললেন, তুমি (নিম্নের দু‘আটি) পড়বে,
‘হে আল্লাহ, আমাকে আপনি হেফাযত করুন নিজের কান ও চোখ এবং জিহ্বা ও মনের অকল্যাণ থেকে আর আমার বীর্যের (লজ্জাস্থানের) অনিষ্ট থেকে।’ [সুনান নাসাঈ : ৫৪৫৬, শায়খ আলবানী সহীহ বলেছেন।]

উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয়, জৈবিক চাহিদা মানবজীবনের অপরিহার্য একটি অংশ এবং বিভিন্ন হেকমত ও প্রজ্ঞার আলোকেই বান্দাকে এ বস্তু দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মানুষ সৃষ্টির সেই সূচনা থেকেই নারীর প্রতি আকর্ষণ ও কামাচারারে  সীমালঙ্ঘন করে আসছে। ইতিহাস খুঁজলে দেখা যায়, এই দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই মূলত বড় বড় ঘটনা-দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। নারীর ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করতে গিয়ে সর্বপ্রথম ধরাপৃষ্ঠে রক্তপাতের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। যার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এমন :

আদম ‘আলাইহিস সালাম ও হাওয়া ‘আলাইহাস সালাম পৃথিবীতে আসেন এবং তাঁদের মাধ্যমে সন্তান প্রজনন ও বংশ বিস্তার শুরু হয়। প্রতি গর্ভ থেকে একটি পুত্র ও একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করত। তখন ভাইবোন ছাড়া পৃথিবীতে অন্য কোনো মানুষ ছিল না। তাই আল্লাহ তা‘আলা আদম ‘আলাইহিস সালামের শরীয়তে বিশেষভাবে এ নির্দেশ জারি করেন, একই গর্ভ থেকে যে জমজ পুত্র ও কন্যা জন্ম গ্রহণ করবে তারা পরস্পরে সহোদর ভাই-বোন হিসাবে গণ্য হবে এবং কেবল তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হবে। কিন্তু পরবর্তী গর্ভ থেকে জন্ম গ্রহণকারী কন্যা সহোদর বোন হিসাবে গণ্য হবে না। তাদের পরস্পর বিবাহ বন্ধন বৈধ হবে।

কিন্তু কাবিল এই বিধানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার চেষ্টা করল। ঐতিহাসিকগণ এর একাধিক কারণ উল্লেখ করেছেন। আমরা ঐতিহাসিক সূত্র বিশ্লেষণ না করে শুধু কয়েকটি কারণ তুলে ধরার প্রয়াস পাবো।

ইমাম তাবারী রহিমাহুল্লাহ তারিখে তাবারীতে উল্লেখ করেন, আদম ও হাওয়া ‘আলাইহুমাস সালাম জান্নাতে মিলিত হয়েছিলেন। ওই মিলনে যে জমজ সন্তানের জন্ম হয় তারা হলেন কাবিল ও ইকলিমা। এরপর তারা দুনিয়ায় পদার্পণ করলে হাবিল ও তার জমজ বোন লিওজার জন্ম হয়। আদম ‘আলাইহিস সালাম ছেলেদেরকে বিধান অনুযায়ী বিয়ে করার আদেশ করলে কাবিল তা প্রত্যাখান করে। তাবারী রহিমাহুল্লাহ লিখেন,
وكره تكرما عن أخت هابيل ورغب بأخته عن هابيل وقال نحن ولادة الجنة وهما من ولادة الارض وأنا أحق بأختى ويقول بعض أهل العلم من أهل الكتاب الاول بل كانت أخت قين من أحسن الناس فضن بها عن أخيه وأرادها لنفسه والله أعلم
‘কিন্তু কাবিল তা প্রত্যাখান করে এবং বলে আমরা জান্নাতের সন্তান আর তারা দুনিয়ার সন্তান। সুতরাং আমি ইকলিমার বেশি হকদার। আর পূর্ববর্তী কিতাবধারীদের কতক আহলে ইলম বলেন, বরং মূল ঘটনা হচ্ছে ‘কীন’ (কাবিলের আরেক নাম) এর সহজাত সহোদর বোন ছিল পরমা সুন্দরী। তাই সে তাকে নিজের জন্য চাইল।’ [তাফসীরু তাবারী : ১০/২০৬]

যাহোক, ইতিহাসের সারকথা হচ্ছে, হাবিলের সহজাত সহোদরা বোন লিওজা ছিল কুশ্রী। বিবাহের সময় হলে নিয়মানুসারে হাবিলের সহজাত কুশ্রী বোনটি কাবিলের ভাগে পড়ল। এতে কাবিল অসন্তুষ্ট হলো এবং শরীয়তে আদমের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারল না। কাজেই কাবিল হাবিলের শত্রু হয়ে গেল। সে জিদ ধরল, আমার সহোদরা বোনকেই আমার সঙ্গে বিবাহ দিতে হবে। আদম ‘আলাইহিস সালাম স্বীয় শরীয়তের বিধানের পরিপ্রেক্ষিতে কাবিলের আবদার প্রত্যাখান করলেন। এরপর তিনি হাবিল ও কাবিলের মতভেদ দূর করার উদ্দেশ্যে বললেন, তোমরা উভয়ই আল্লাহর জন্য নিজ নিজ কুরবানী পেশ কর। যার কুরবানী কবুল হবে, তার সঙ্গে লিওজাকে বিয়ে দেওয়া হবে। আদম ‘আলাইহিস সালামের নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল, যে সত্যের পথে আছে কেবল তার কুরবানীই গৃহীত হবে। তৎকালীন কুরবানী গৃহীত হওয়ার নিদর্শন অনুযায়ী হাবিলের কুরবানী কবুল হলো এবং কাবিলের কুরবানী হলো প্রত্যাখ্যাত। ফলে কাবিল আত্মসংবরণ করতে পারল না এবং স্বীয় ভ্রাতা হাবিলকে হত্যা করল।

এভাবে পৃথিবীতে নারীকে কেন্দ্র করেই সূচিত হলো মানুষ হত্যাকাণ্ডের মতো ভয়াবহ অপরাধ। যে অপরাধকে আল্লাহ তা‘আলা গোটা পৃথিবী ধ্বংস করার মতো মারাত্মক অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ مِنۡ أَجۡلِ ذَٰلِكَ كَتَبۡنَا عَلَىٰ بَنِيٓ إِسۡرَٰٓءِيلَ أَنَّهُۥ مَن قَتَلَ نَفۡسَۢا بِغَيۡرِ نَفۡسٍ أَوۡ فَسَادٖ فِي ٱلۡأَرۡضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ ٱلنَّاسَ جَمِيعٗا وَمَنۡ أَحۡيَاهَا فَكَأَنَّمَآ أَحۡيَا ٱلنَّاسَ جَمِيعٗاۚ وَلَقَدۡ جَآءَتۡهُمۡ رُسُلُنَا بِٱلۡبَيِّنَٰتِ ثُمَّ إِنَّ كَثِيرٗا مِّنۡهُم بَعۡدَ ذَٰلِكَ فِي ٱلۡأَرۡضِ لَمُسۡرِفُونَ ٣٢ ﴾ [المائ‍دة: ٣٢]
‘এ কারণেই, আমি বনী ইসরাঈলের ওপর এই হুকুম দিলাম যে,  যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করা কিংবা যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করা ছাড়া যে কাউকে হত্যা করল, সে যেন সব মানুষকে হত্যা করল। আর যে তাকে বাঁচাল, সে যেন সব মানুষকে বাঁচাল। আর অবশ্যই তাদের কাছে আমার রাসূলগণ সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ নিয়ে এসেছে। তা সত্ত্বেও এরপর জমিনে তাদের অনেকে অবশ্যই সীমালঙ্ঘনকারী।’ {সূরা মায়েদা, আয়াত : ৩২}

নারীকে কেন্দ্র করে কাবিল যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছিল সেটার ধারাবাহিকতায় কেয়ামত পর্যন্ত যত খুন-খারাবী সংঘটিত হবে হাদীসের ভাষ্যানুযায়ী তার একটা অংশ তার আমলনামায় যুক্ত হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
« لَيْسَ مِنْ نَفْسٍ تُقْتَلُ ظُلْمًا إِلاَّ كَانَ عَلَى ابْنِ آدَمَ الأَوَّلِ كِفْلٌ مِنْهَا »
‘পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে যত হত্যাকাণ্ড ঘটবে তার একটা হিস্যা আদমপুত্র কাবিলের আমলনামায় যুক্ত হবে। কেননা সেই সর্বপ্রথম হত্যাকাণ্ডের প্রচলন ঘটিয়েছে।’ [বুখারী : ৭৩২১]

নারীকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের দাগ আজও বিদ্যমান। রক্তের সেই চিহ্ন আজও প্রবহমান। বিখ্যাত মুফাসসির ইবনুল আরাবী রহিমাহুল্লাহ স্বীয় তাফসীরগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন-
وَعَلَى الْغُرَابِ جَبَلِهَا دَمُ هَابِيلَ فِي الْحَجَرِ جَارٍ لَمْ تُغَيِّرْهُ اللَّيَالِي  وَلَا أَثَّرَتْ فِيهِ الْأَيَّامُ ،وَلَا ابْتَلَعَتْهُ الْأَرْضُ
‘হত্যাকাণ্ডের ওই স্থানে পাথরের ওপর হাবিলের রক্ত এখনও প্রবাহমান। দিনরাতের দীর্ঘপরিক্রমায় তাতে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসেনি। মাটিও সেই রক্ত চুষে নেয়ার সক্ষমতা রাখেনি।’ [তাফসীর আহকামুল কুরআন : ৮/৪৯]

সত্যি! নারীর ইতিহাস বর্ণিল, নারীজীবনকেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহ বিচিত্র! যুগের আবর্তনে নিঃশেষ হয় না এদের স্মৃতি!
আর জৈবিকতার উন্মাদনা আরো বেশি রক্তাভ। কখনও কখনও ঘটেছে এমন অনেক ঘটনা যা একই সঙ্গে চমকপ্রদ ও শিক্ষণীয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ একজন পারস্য সম্রাটের ইতিহাস স্মরণ করা যেতে পারে। ওই সম্রাট তার বার্ধক্যে একজন সুন্দরী রমণীকে বধূ করে ঘরে আনলে সৎমার প্রতি নজর পড়ে সম্রাটের ঔরষজাত বড় ছেলের। বিষয়টি সম্রাট পিতা টের পান এবং এ কারণে সন্তানের হাতে প্রাণ হারানোর আশঙ্কাও করেন তিনি। ফলে সম্রাট পিতাও সন্তানের প্রাণবধের পরিকল্পনা আঁটেন এবং সন্তানের হাতে প্রাণ হারালে পাল্টা প্রতিশোধের অগ্রিম ব্যবস্থা করে যান।

শঙ্কা বাস্তবে পরিণত হয়। সুন্দরী সৎমাকে নিজের করে নেওয়ার বাসনায় প্রচণ্ড কামুক শাহজাদা সত্যই সম্রাট পিতার প্রাণবধ করেন। এরপর বিজয়ের হাসিতে সৎমার ঘরে প্রবেশ করেন। ঘরে প্রবেশ করে ঘরের আলমারিতে সারিবদ্ধ একটি বোতলের ওপর দৃষ্টি আটকে যায় তার। বোতলের গায়ে ফার্সিতে স্পষ্ট করে লেখা﴿قوة باه﴾  ‘যৌনশক্তিবর্ধক হালুয়া’। শক্তিবর্ধক বোতলটা যেন শাহজাদার উপরি উপহার হিসেবে হাজির হলো! কামনার ঘৃতে আরেকটু আগুন পড়ল তার। শিহরিত পদবিক্ষেপে সেদিকে এগিয়ে গেলেন এবং পিতার ‘উত্তরাধিকার’ গ্রহণ করার আগে ‘হালুয়া’টা সেবন করা দরকার বলে মনে করলেন। এরপর আগপিছ না ভেবে ‘হালুয়া’টা গলধঃকরণ করলেন। হালুয়া সেবনের অল্প সময়ের মধ্যে তার চেহারা বিকৃত হতে লাগল, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঢিলে হয়ে আসতে লাগল এবং শাহজাদা শেষ পর্যন্ত পিতার যৌনশক্তিবর্ধক হালুয়া নামের বিষ খেয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হলেন।
আসলে পিতাই এই প্রক্রিয়া করে রেখেছিলেন। তিনি জানতেন, শাহজাদা অত্যন্ত যৌনকাতর এবং একারণেই হয়ত সন্তানের হাতে তার প্রাণ হারানো হতে পারে। সুতরাং সেরকম কিছু হলে তাকেও তার সঙ্গে রওয়ানা হতে হবে। তাই তিনি এমন একটা কৌশল গ্রহণ করলেন, যা দেখে শাহজাদার বিবেক-বুদ্ধি লোপ পাবে এবং নিজেই নিজের মৃত্যুর ফাঁদ রচনা করেন।

ইতিহাসের এই উথাল-পাতাল ধারাবাহিকতা অনুযায়ীই চলছে নারী আর জৈবিক শক্তিকে কেন্দ্র করে জীবন দেওয়া-নেওয়ার মহড়া। এই মহড়া দিনে দিনে আরও তীব্র ও অতি ভয়ানক হয়ে উঠছে, যা আধুনিক সভ্যতার গায়ে সাধারণ নয়; মহা তিলকের চিহ্ন হয়ে উঠছে। নারী ও জৈবিকতা নিয়ে মানুষ কত নিষ্ঠুর হতে পারে তার ভয়ঙ্কর দৃষ্টান্ত চীন। এরা যৌন শক্তি বাড়াতে শেষ পর্যন্ত খাওয়া শুরু করেছে মানবভ্রুণ ও মৃত বাচ্চা দিয়ে তৈরি স্যুপ! চরম ঘৃণিত এই কাজের খবর পুরো বিশ্বকে হতবিহবল করে দেয়। কিছুদিন আগে ২০১৩ সালের ২৫ জুলাই দক্ষিণ কোরিয়ার ‘সিউল টাইমস’ এর কাছে একটি ইমেইল আসে যাতে ছিল বেশ কিছু ছবি। এ ভয়াবহ, বীভৎস ও আতঙ্ক সৃষ্টিকারী ছবিগুলোতে দেখা যায় মৃতশিশু ও নির্দিষ্ট সময়ের আগেই গর্ভপাত ঘটানো অপূর্ণাঙ্গ ভ্রুণ বা ফিটাসের স্যুপতৈরি করা হচ্ছে মানুষের খাওয়ার জন্য!

আরো প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে থাকে। চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ ক্যানটন বা গুয়াংডন এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। জানা যায় সেখানকার পুরুষরা তাদের শারীরিক সুস্থতা ও যৌনশক্তি বৃদ্ধির জন্য ভেষজ শিশু স্যুপ (herbal baby soup) খেয়ে থাকে! এরকম অবস্থায় জানা গেল আরেক ঘটনা। চীনের এক দম্পতির ইতোমধ্যেই একটি কন্যাসন্তান ছিল। মহিলাটি সন্তান-সম্ভবা ছিলেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে জানতে পারলেন, তার দ্বিতীয় সন্তানটিও মেয়ে হতে যাচ্ছে। ততদিনে তার গর্ভস্থ সন্তানের বয়স ৫ মাস। তিনি ও তার স্বামী গর্ভপাত করানোর সিদ্ধান্ত নেন। স্বাভাবিকভাবে কোনো শিশু যদি ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই মারা যায় তবে তাতে ২০০০ ইউয়ান খরচ হয়, সেখানে গর্ভপাত করাতে খরচ হয় মাত্র কয়েকশো ইউয়ান। তবে যারা মৃত শিশু বিক্রি করতে চান না, তারা ইচ্ছা করলে প্লাসেন্টা বা জীবিত অবস্থায় বিক্রি করতে পারেন।

একজন স্থানীয় সাংবাদিকের মতে, এই সমস্যার উৎপত্তি মূলত হয়েছে চীনাদের মাত্রাতিরিক্ত স্বাস্থ্যসচেতনতার কারণে। এছাড়া অনেকের মতে, চীন সরকার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ‘এক সন্তান নীতি’ চালু করেছিল। আর এ হতভাগ্য শিশুগুলো এ নীতিরই নির্মম শিকার। এছাড়া চীনের অধিকাংশ পরিবার মেয়ে সন্তান নয়, ছেলে সন্তান আশা করে। গরীব পরিবারগুলো তাদের মেয়ে শিশুদের বিক্রি করে দেয় অর্থের আশায়। চরম ঘৃণিত ‘বেবি স্যুপ’ এর উদ্ভব এই মানসিকতা থেকেই। তাইওয়ানে মৃত শিশুরা ৭০ মার্কিন ডলারে বিক্রি হয় গ্রিল করা ‘রুচিকর’ (?) খাবার হিসেবে!
হং কং থেকে প্রকাশিত NEXT সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনে শিশুদের মৃতদেহ কিংবা ভ্রুণ স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য রক্ষার নতুন উপকরণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এছাড়া প্লাসেন্টা বা অ-মরাকে সুস্বাদু খাবার হিসেবে খাওয়া হয়। এমনকি গুয়াংডনে হাসপাতালগুলোর মাধ্যমেই অনেক সময় এসব অঙ্গ কেনাবেচা হয় এবং এগুলোর চাহিদাও আকাশচুম্বী। ম্যাগাজিনের অনুসন্ধানী প্রতিনিধিরা এগিয়ে যেতে থাকেন। নরমাংস ভক্ষণের নতুন এই রীতি তাদেরকে নিয়ে যায় চীনের আরেক প্রদেশ লিয়াওনিং-এ।
ম্যাগাজিনটির মতে, লিয়াওনিং এর একজন তাইওয়ানিজ ব্যবসায়ী একটি ভোজসভা আয়োজন করেন। তার একজন গৃহপরিচারিকা ছিল যাকে সবাই মিস লিউ নামেই চিনতো। মিস লিউ ছিলেন লিয়াওনিং এর স্থানীয় অধিবাসী। ভোজের দিন অসাবধানতাবশত তার মানব শিশু ভক্ষণের বিষয়টি প্রকাশ পেয়ে যায়।
ভোজ অনুষ্ঠানে উপস্থিত তাইওয়ানিজ মহিলারা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন। মিস লিউ পরে এও বলেন, অনেক মানুষই মানবশিশু খেতে আগ্রহী, তবে চাহিদা অনেক বেশি। যাদের ক্ষমতা অনেক বেশি তারাই কেবল সবচেয়ে ‘ভালো জিনিস’ পায়। সাধারণভাবে ছেলে শিশু ভ্রুণকে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট বলে ধরা হয়। প্রতিবেদকের অনুরোধে মিস লিউ কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে প্রতিবেদককে সেই জায়গায় নিয়ে যান যেখানে মানবভ্রুণ রান্না করা হয়। তিনি দেখলেন, একজন মহিলা একটি ছুরি দিয়ে ছেলে শিশু ভ্রুণ কেটে কুচি কুচি করছেন তারপর তা দিয়ে স্যুপ তৈরি করছেন। আর আশেপাশের মানুষকে এই বলে আশ্বস্ত করছেন যে, ভয় পাওয়ার কিছু নেই, এটি ’প্রাণীর মাংস’। অনেক চীনার কাছে মানবভ্রুণ ভক্ষণ করা নাকি এক ধরনের শিল্প!

২২ মার্চ, ২০০৩। গুয়াংজি প্রদেশের বিংইয়ন পুলিশ একটি ট্রাক থেকে ২৮টি মেয়ে শিশু উদ্ধার করে, যাদেরকে পাচার করা হচ্ছিলো আনহুই প্রদেশে। শিশুগুলোর মাঝে সবচেয়ে বড় বাচ্চাটির বয়স ছিল মাত্র তিন মাস। তিন-চারটি শিশুকে একটি একটি করে ব্যাগে ঢোকানো হয়। উদ্ধারের সময় শিশুগুলো প্রায় মরণাপন্ন অবস্থায় ছিল।

৯ অক্টোবর, ২০০৪ এর সকালবেলা। সুজহৌ এলাকার জিউকুয়ান শহরের এক ব্যক্তি আবর্জনা পরিষ্কারের সময় বেশ কিছু ছিন্নবিচ্ছিন্ন শিশুর দেহ আবিষ্কার করেন। দুটি মাথা, ছয়টি পা, চারটি হাত, দুটি মাথা পাওয়া গেল। তদন্তে জানা গেল, শিশুগুলো মাত্রই ভূমিষ্ঠ হয়েছিল, এদের বয়স হয়েছিল ১ সপ্তাহ। রান্নার পরে খাওয়া শেষে হাত-পাগুলো উচ্ছিষ্ট হিসেবে ফেলে দেওয়া হয় ডাস্টবিনে!
যদিও মানবভ্রুণ খাওয়া নিষিদ্ধ করে চীনে কঠোর আইন চালু আছে, কিন্তু একইসঙ্গে চীনের ‘এক সন্তান’ নীতি অনেক দম্পতিকে অকালে গর্ভপাত ঘটাতে বাধ্য করে, যেগুলোর সুযোগ নিচ্ছে একদল জঘন্য মানুষ। এছাড়া মাও সেতুং এর ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ কিছু ক্ষেত্রে চরমপন্থীরূপ ধারণ করে, যার ফলে চীনের অনেকের মাঝেই নৈতিকতা ও মানুষের জীবনের প্রতি সম্মান দেখানোর প্রবণতা কমে গেছে।
গ্লোবাল রিপোর্টারস ভিয়েনার তাই জরুরি আহ্বান, নরমাংস ভক্ষণকে ‘না’ বলুন এবং নিষ্পাপ শিশুদের জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসুন। এই তথ্যটি প্রকাশ করে হয়তো সেই সব নিষ্পাপ শিশুদের বাঁচাতে পারবেন যারা হয়তো নির্মম ও জঘন্য হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে যাচ্ছে। [তথ্যসূত্র : হ্যালো টুডে ২৬ নভেম্বর, ১৩ ইং]

পাঠক! এবার আপনার নিজস্ব বিবেক দিয়ে বিচার করুন, আমরা কোন্ সভ্যতার যুগে বাস করছি? এখানে জৈবিক ও পাশবিক শক্তি এত অদম্য হয়ে উঠছে যে, নিজ সন্তান, মৃত বাচ্চা এবং ভ্রুণ খাওয়াও অতি লোভনীয় ব্যাপারে পরিণত হয়েছে! এরচেয়ে পারস্য সম্রাট ও শাহজাদার ঘটনা তুচ্ছ ও স্বাভাবিক নয় কি?

বস্তুতঃ আল্লাহর এক বিধান লঙ্ঘন করায় সৃষ্টি হচ্ছে মানবিক বিপর্যয়। এক আদেশ লঙ্ঘন ডেকে আনছে হাজারও বিশৃঙ্খলা। মানুষের সহজাত প্রকৃতির মূল্যায়ন করে ইসলাম দম্পতিদেরকে অধিক সন্তান নেয়ার প্রতি উৎসাহিত করেছে। কিন্তু চীনারা সেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করে এক সন্তান রীতি চালু করল। আল্লাহ তা‘আলার সৃষ্টিগত ব্যবস্থায় হাত দিয়ে যা হয় চীনাদের বেলায়ও তাই হতে লাগল। পাইকারিহারে মানব তথা ভ্রুণ হত্যা চালু হলো। কারণ এক সন্তানের বেশি নেয়া যাবে না। আবার দম্পতিরা মেয়ে সন্তান নিতেও রাজি নয়।

তাই পেটে সন্তান আসার পর আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে কন্যাসন্তান সম্পর্কে নিশ্চিত হলে তাদেরকে মেরে ফেলো এবং পারলে ভ্রুণখোরদের কাছে চড়া মূল্যে বিক্রি করে উপরি কিছু মাল কামাও! জাহেলি যুগের পিতারা তো কন্যাসন্তানকে দাফন করত, আধুনিক জাহেলিয়াত দেখি তাদেরকে ভক্ষণ করা শুরু করেছে!

এভাবেই চলছে পাপের পিঠে পাপ। এক পাপের পরিণতি ভোগ করতে না পেরে আরেক পাপের জন্মদান! আজ জৈবিক প্রবৃদ্ধির কারণে মানুষ মানুষ খাচ্ছে, ভ্রুণ খাচ্ছে! কল্পনা করা যায়? জৈবিক তাড়না বৃদ্ধি কেবল মানুষের পরকাল, নৈতিকতাই ধ্বংস ডেকে আনে না, জাগতিক সুখ-শান্তি ও শারীরিক ধ্বংসও ডেকে আনে। কাযী ইয়াজ রহিমাহুল্লাহ বলেন,
وغلبة الشهوة مسبب لمضارالدنيا و الآخرة ، جالب لأدواء الجسد وخثار النفس ، وامتلاء الدماغ ، وقلته دليل على القناعة ، و ملك النفس، وقمع الشهوة مسبب للصحة ، و صفاء الخاطر، و حدة الذهن
‘প্রবৃত্তির প্রাবল্য দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতের ধ্বংস ও ক্ষতির কারণ। শারীরিক নানা রোগ-ব্যাধি সৃষ্টি ও মানসিক বৈকল্যের সূত্র। পক্ষান্তরে এর পরিমিত প্রভাব ও স্বাভাবিকতা মানবিক সুস্থতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের পরিচয়। আর কুপ্রবৃত্তি দমন ও চূর্ণ করা শারীরিক সুস্থতা, অন্তরের পরিচ্ছন্নতা ও মেধার তীক্ষ্নতার লক্ষণ।’ [তথ্যসূত্র : আশ-শিফা বিতা‘রিফী হুকুকিল মুস্তাফা]

দুনিয়া-আখেরাতের কল্যাণ ভাবনার উপেক্ষা, শারীরিক ও মানবিক সুস্থতার প্রতি অবজ্ঞা আর আল্লাহর বিধান পালনের অনীহায় ধ্বংসের আগুনে জ্বলছে নারী। যে ধোঁকাবাজ পুরুষ নারীর আগমন বরদাশত করতে পারে না, যন্ত্রের সাহায্যে তার নারীত্ব চিহ্নিত করে শুধু হত্যাই করে না, স্যুপ বানিয়ে খেয়ে ফেলে, আধুনিক সভ্যতার যে পুরুষরা জাহেলি সভ্যতাকে পেছনে ফেলে নারীত্বের অবমাননার সকল ধাপ অতিক্রম করেছে সেই পুরুষের ‘নারী অধিকারের’ স্লোগানে বিভ্রান্ত হয়! এসব লম্পট, নারী-ইজ্জতহরণকারীরা নারীর সম্মানজনক ও নিয়ন্ত্রিত-নিরাপদ চলাফেরার দাবি জানালে তাদেরকে মৌলবাদী বলে খিস্তিখেউর করে! ওরাই আবার হয় দেশের হর্তাকর্তা। সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার ঝাঁঝালো কণ্ঠস্বর মিনা ফারাহ একটি জাতীয় দৈনিকে ৫ ডিসেম্বর ১৩’ এর উপসম্পাদকীয়তে লিখেছিলেন, মন্ত্রীসভায় এমন কিছু লোক আছে যাদের দেখে বমি করতে ইচ্ছা হয়… জানি না লেখিকার বমোনিচ্ছার কারণ কী। তবে বিবেকবান লোকেরা অবশ্যই ওইসব মন্ত্রীদের দেখলে কিংবা নাম শুনলে বমনেচ্ছা জাগে, যারা নিজেরা নারীদের ইজ্জত হরণ করে উলামায়ে কেরামকে বিদ্রূপ করে, কথায় কথায় তাদেরকে তেঁতুল হুজুর বলে খিস্তিখেউর করে।
[চলবে…]

—–
– আবু বকর সিরাজী

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close