অন্য পত্রিকা থেকে

জিম্মি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক

মান্নান মারুফ: হাতে গোনা কয়েকজন ব্যাংকারের হাতে জিম্মি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো। ঘুরে ফিরেই এসব ব্যাংকারই এক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক(এমডি) অথবা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা(সিইও) হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন। প্রায় শত শত কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে ব্যাংক এমডি নিয়োগে।সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকসহ ব্যাংকিং খাত নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের কর্তারাও এর কোন সুরাহা করতে পারছেন না। কারণ জনশ্রতি আছে এসব ব্যাংকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে সরকারি মন্ত্রী, এমপি, বড় বড় ব্যবসায়ীসহ একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তির। সংশ্লিষ্টরা সিন্ডিকেট করেই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী নিয়োগ পাইয়ে দেন।বিভিন্ন লবিং করে যারা ব্যাংকের শীর্ষ পদে থাকছেন তাদের অনেকেই চুক্তিভিত্তিক। এদের সরকারি চাকরির বয়স নেই। চাকরির বয়স শেষ হলেও তারা বহাল তবিয়তেই রয়েছেন। আরা যারা  ব্যাংকের নিয়মিত হিসাবে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক রয়েছেন তাদেরকে এমডি কিংবা সিইও হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয় না।  কারণ তাদের অর্থ বা রাজনৈতিক প্রাধান্য নেই। বিষয়টি নিয়ে গোটা ব্যাংকিং খাতে তোলপাড় শুরু হয়েছে।

এ বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ম. মাহফুজুর রহমান বাংলানিউজকে বলেন, ব্যাকের চেয়ারম্যান বা এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের তেমন ভুমিকা নেই। এ পদগুলোতে ঐসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদই নিয়োগ দিয়ে থাকে। তবে ঐ সব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ যাদের নাম নির্বাচন করে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নাম পাঠায় তাদের অনিয়ম বা দুর্নীতি আছে কিনা তা তদন্ত করে দেখে। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের বিরুদ্ধে কোন অনিয়ম বা দুর্নীতি অভিযোগ না পেলেই  নিয়োগের অনুমতি দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু এমডি বা চেয়ারম্যানদের নিয়োগের বিষয়টি ঠিক আছে কিনা তা তদন্ত করে দেখে, বলেন মাহফুজুর রহমান।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, বেশ কয়েক বছর ধরেই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত এবং নন ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঘুরে ফিরে প্রায় কয়েকজন ব্যক্তিই ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা(সিইও) হিসাবে নিয়োগ পাচ্ছেন। নিয়োগ প্রাপ্তরা হলেন, সোনালী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ কুমার দত্ত। তিনি এ ব্যাংকে যোগদানের আগে বাংলাদেশ রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে চাকরি করছিলেন।

কিন্তু যখন সোনালী ব্যাংকের সিইও’র পদ শূন্য হল তখন তিনি ওই ব্যাংক ছেড়ে সোনালী ব্যাংকে যোগদান করেন। এখানে তিনি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং পেশী শক্তিকেও কাজে লাগিয়েছেন। অথচ সোনালী ব্যাংকের সিইও নিয়োগ প্রার্থীদের মধ্যে সোনালী ব্যাংকেই অনেক যোগ্য প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু প্রদীপ কুমার দত্ত অনেক লবিং করে যোগ্য লোকদের পাশ কাটিয়ে অন্য ব্যাংকের এমডি’র পদ ছেড়ে সোনালী ব্যাংকে যোগদান করেন।

এসএম আমিনুর রহমান। তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জনতা ব্যাংকের সিইও বা এমডি হিসাবে দায়িত্ব পালন করছিলন। তার সরকারি চাকরির বয়স শেষ হওয়ার পরেই তিনি দু’দফায় চুক্তিভিত্তিক হিসাবে ওই ব্যাংকের এমডি’র দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ দ্বিতীয় দফায় তার দায়িত্ব শেষ হওয়ায় তিনি আবার ওই ব্যাংকের সিইও হওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে দেন-দরবার করছেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এসএম আমিনুর রহমানের নিয়োগের ফাইল ফেরত দেওয়ার পরেই তিনি ওই ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল বারকাত কে দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। প্রায় তিন বছর ধরে অগ্রণী ব্যাংকের সিইও বা এমডি’র পদে ছিলেন সৈয়দ আব্দুল হামিদ। গত মঙ্গলবার তার চাকরির মেয়াদ শেষ হয়েছে। তিনিও দীর্ঘদিন ধরে চুক্তিভিত্তিক হিসেবে এ ব্যাংকে চাকরি করছেন। এখন মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও তিনি ওই একই ব্যাংকে এমডি হিসাবে নিয়োগের জন্য চেষ্টা করছেন।

বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ  ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক(বিডিবিএল), রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক(রাকাব), বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক(বিকেবি), হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনসহ সরকারি বাণিজ্যিক, বিশেষায়িত ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে লোক নিয়োগের বিষয়ে ঘুরে ফিরে কয়েকজন চুক্তিভিত্তিক ব্যক্তিরাই থাকছেন। আর তাদেরকে ইন্ধন দিচ্ছেন মন্ত্রী, এমপি, রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং কিছু সরকারি আমলারা।

কারণ চুক্তিভিত্তিক এসব লোক কোন ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমডি নিয়োগের পর তাদের স্বার্থ দেখবেন বলে অর্থ, পেশিশক্তি বা রাজনৈতিকভাবে লবিং করে এদের এমডি কিংবা সিইও হিসাবে নিয়োগ দিতে সহায়তা করেন। এমডি নিয়োগে প্রায় শত কোটি টাকাও খরচ করেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, যেসব ব্যত্তিরা দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকের এমডি কিংবা সিইও হিসাবে ছিলেন কেবলই তারাই টাকা ঢালতে পারেন। আর তাদের সঙ্গে আছে রাজনৈতিক ব্যবসায়ী, মন্ত্রী, এমপি কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংত তথা অর্থমন্ত্রণালয়ের লোক। এ কারণেই এমডিরাই বার বার নতুন করে এমডি কিংবা সিইও হন।

এখানে ডিএমডি বা অন্য কোন যোগ্য ব্যক্তিরা পিছিয়ে পড়েন। কারণ তাদের যেমন অর্থের জোর নেই, তেমনি নেই রাজনৈতিক প্রভাব। ফলে ঘূরে ফিরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে প্রায় একই ব্যক্তিরাই এমডি হচ্ছে। আর এতে ব্যাংকিং খাতে বিশৃঙ্খরার সৃষ্টি হচ্ছে। ক্ষোভ, হতাশা আর অনাগ্রে অভিজ্ঞ ব্যাংকারা কর্মবিমুখ হচ্ছেন।

কেন ঘুরে ফিরে একই ব্যক্তিরা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের নিয়োগ পাচ্ছে এ বিষয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব গোকুল চন্দ্র দাস বাংলানিউজকে বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারব না। বিষয়টি নিয়ে সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ড. আসলাম আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি কিছু বলতে পারব না। বিষয়টি আরো উপরের।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close