আইন আদালত

নারী অধিকার ও তার ক্ষমতায়ন

নারী অধিকার মানবাধিকার থেকে ভিন্ন কিছু নয়। মানবাধিকারের সব বিষয়গুলোই নারী অধিকারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অধিকন্তু নারীদের জন্য আছে আরো কিছু অধিকার যা একান্তভাবে নারীকে তার নিজস্ব মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে বাঁচতে শেখায়।নারী অধিকার এমন একটি বিষয় যা সব বয়সের নারীর জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। তবে, এ অধিকারের মধ্যে কিছু অধিকার সর্বজনীন ও কিছু অধিকার বিশেষায়িত। বিশেষায়িত অধিকারগুলো আইন, আঞ্চলিক সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠান, জাতি ও রাষ্ট্রভেদে ভিন্ন হতে পারে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ অধিকারগুলো সামাজিক কর্মকাণ্ড ও রীতি দ্বারা সিদ্ধ হতে পারে। তবে, যেভাবেই দেখিনা কেনো, নারীর এ অধিকারগুলো নারীকে তার আপন সত্তায় উদ্ভাসিত করে।মানবাধিকারের যে শাখাটি নিয়ে সারাবিশ্বেই তোলপাড় তা হলো নারী অধিকার। নারী অধিকার নিয়ে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আইন রয়েছে, রয়েছে আন্তর্জাতিক আইন ও সনদ। জাতীয় গণ্ডির ভিতরে প্রায় প্রত্যেক দেশেরই নিজস্ব আইন আছে। সেই আইন কখনো সংবিধান দ্বারা সীকৃত আবার কোথাও বিশেষ আইন দ্বারা সীকৃত।

আমাদের সংবিধানের ২৭ ধারায় বলা আছে, সব নাগরিক সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। আইনের আশ্রয় লাভের ক্ষেত্রে সব নাগরিকেরই সমান সুযোগ ও অধিকার থাকবে। সেখানে রাষ্ট্র নারী পুরুষের ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য রাখবে না।

এমনকি প্রত্যেকটি রাষ্ট্রের সার্বভৌম সীমার মধ্যে রয়েছে কিছু পারিবারিক আইন। রাষ্ট্রের নাগরিকদের ধর্মভেদে এ আইনগুলো কার্যকর। এক্ষেত্রেও রাষ্ট্রকে যতটা সম্ভব বৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে। আমাদের দেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুযায়ী  নারীদের বিবাহবিচ্ছেদেরও অধিকার আছে। যদিও অন্যান্য কিছু আইনে এর ব্যতিক্রম আছে। তবে, সব পারিবারিক আইনেও নারীর অধিকার সীকৃত হয়েছে। ইতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাবে নারী তার প্রাপ্য অধিকারটুকুও পায় না।

আমাদের  সংবিধানে থাকলেও নারীর প্রতি বৈষম্য বিরাজ করছে সমাজের সবক্ষেত্রেই। পরিবার থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র এমনকি রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও বিরাজ করছে এ বৈষম্য। বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডে নারীর সমান অংশীদারী থাকলেও তাদের নিজেদের উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমরা দেখি বৈষম্য। সব ধরনের অবহেলা ও বঞ্চনাই যেনো নারীর নিয়তি।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে নারী অধিকার রক্ষায় গৃহিত হয়েছে নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও)। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এ সনদ স্বাক্ষরও করে। এটি একটি আন্তর্জাতক দলিল ও প্রতিশ্রুতি। কিন্তু আমাদের দেশে এর বাস্তবায়ন এখনো সুদূর পরাহত। যদিও আইন ও বিধির কমতি নেই। কমতি কেবল বাস্তবায়নে।

সিডও অনুযায়ী প্রতিটি রাষ্ট্র তার রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে নারী বান্ধব উন্নয়ন নীতি ও আইন প্রণয়ন করার জন্য বদ্ধ পরিকর। আইনানুযায়ীই রাষ্ট্রের সকল কর্মকান্ডে নারীর ক্ষমতায়ন এখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইন ও সংবিধানের মাধ্যমে প্রয়োজন সেই অধিকারকে রক্ষা করা।

এছাড়া নারী নির্যাতন ও নারীর প্রতি বৈষম্য প্রতিরোধে পৃথক আইন থাকাও জরুরি।  আমাদের সেরকম আইন আছে প্রচুর। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০, এসিড সন্ত্রাস দমন আইন ২০০২ ও যৌতুক নিষিদ্ধকরণ আইন ১ঌ৮০, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ ইত্যাদি আইন আমাদের আছে। এছড়াও নারী নীতিসহ আরো বেশ কিছু নীতি ও আইন আছে যেখানে পরোক্ষভাবে নারী অধিকার ও স্বার্থকে রক্ষা করার অঙ্গিকার ব্যক্ত করা হয়েছে।

দেশে প্রথমবার নারী নীতি প্রণয়ন করা হয়  ১৯৯৭ সালে, তারপর ২০০৪ ও ২০০৮ সালে তা সংশোধন করা হয়। সর্বশেষ ২০১১ সালে পুনরায় নারী নীতি প্রণয়ন করা হয়। নারী নীতির আলোকেই প্রয়োজন হলে প্রণয়ন করা হয় নারী বিষয়ক আইন। তাছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নারীর অংশগ্রহণ বিষয়ক নীতিও গ্রহণ করা এ আইনের ভিত্তিতেই।

আমাদের দেশে ব্যাপকহারে নারী সংশ্লিষ্ট আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। কিণ্তু তৃণমূল পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়ন বাড়েনি। সংবিধানে নারীর জন্য পৃথক কোনো বিধান নেই। সেই বিধানের কোনো প্রয়োজনও নেই। মূল বিষয় হলো ব্যক্তি পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়ন। সেখানো পিছিয়ে আছে নারীরা। অনেক দেশেই সংবিধানের ভিত্তিতে নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে চায়। সে লক্ষে তারা সংবিধানকে সংশোধন করেছে। কিন্তু তারপরও নারী অধিকার রক্ষা হয়নি। বঞ্চনা আর অধিকারহীনতাই নারীর বাস্তবতা। উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোতে নারীর এ বাস্তবতা আরো প্রকট।

তাই নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন আইনের প্রয়োগ ও ইতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার। রাষ্ট্রকে পালন করতে হবে অগ্রণী ভূমিকা। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়, সম্ভব নয় নারী তথা জনগণের ক্ষমতায়ন।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

আরও দেখুন...

Close
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close