অন্য পত্রিকা থেকে

নিরাপত্তা ইস্যু: দেড় বছরে ২১১ গার্মেন্ট বন্ধ

এমএম মাসুদ: পোশাক শিল্পের দৈন্যদশা কাটছে না কিছুতেই। একের পর এক দুর্ঘটনা, বেতন-বোনাসের দাবিতে শ্রমিক আন্দোলনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে অস্থিরতা লেগেই আছে এ খাতে। ফলে ধারাবাহিকভাবে কমছে দেশের পোশাক রপ্তানি। গত কয়েক মাসের পোশাক রপ্তানি চিত্রে এর প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। আর এতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন এ খাতের সঙ্গে জড়িত উদ্যোক্তারা। এ কারণে রানা প্লজা দুর্ঘটনার পর এ পর্যন্ত নিরাপত্তার অজুহাতে ছোট-মাঝারি মিলিয়ে প্রায় ৪৫০টি পোশাক কারখানার মালিক নিজেদের কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন বলে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে।

এর মধ্যে শুধু বিজিএমইএ সদস্যভুক্ত ২১১টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সদস্য নয় এমন অনেক কারখানার মালিক কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে এ সময়ে প্রায় ৩ লাখ শ্রমিক বেকার হয়েছেন। কারখানা বন্ধের কারণ হিসেবে তারা গত জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সহিংসতা, মজুরি বৃদ্ধির জন্য উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং কারখানার পরিবেশ নিয়ে ক্রেতাদের কঠোর মনোভাবকে চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিজিএমইএ দেয়া তথ্যে দেখা যায়, সংগঠটির সদস্যভুক্ত বন্ধ হওয়া ২১১টি কারাখানার মধ্যে তালিকার প্রথমটি হলো জাবিদ ফ্যাশন। এটি ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় অবস্থিত। কারখানাটি সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করতো। বিজিএমইএ বন্ধ হওয়া তালিকার সর্বশেষ কারখানাটি হলো-জারোমস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। এটি গাজীপুরের টঙ্গীতে অবস্থিত। এ কারখানাটি বন্ধ হয়েছে অর্ডার না থাকায়। এ ছাড়া বন্ধ হয়েছে যমুনা ফ্যাশন

ওয়্যার লি. ও ফেয়ার নিটিং লি.। তোবা গ্রুপের পাঁচটি গার্মেন্ট বন্ধের পর গত ১লা সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরের পূরবী সুপার মার্কেটের ইমাকুলেট প্রাইভেট লিমিটেড গার্মেন্ট বন্ধ করে দেন এ কারখানার মালিক। কারখানা শ্রমিকরা জানান, তারা কারখানা বন্ধের আগের দিন পর্যন্ত কাজ করেছেন। এর আগে মিরপুর ১২ নম্বরে আরও একটি কারখানা বন্ধ হয়ে যায়।

বিজিএমইএ সূত্রে জানা যায়, বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে ৪০ শতাংশ শেয়ার্ড বিল্ডিং কারখানা। এ বিষয়ে বিজিএমইএ সহসভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম মানবজমিনকে বলেন, হরতাল অবরোধ ও রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে অনেক বিদেশী ক্রেতা এ দেশ থেকে ভিয়েতনামে চলে যান। এখন অর্ডার কম।

এ ছাড়া শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির কারণে কারখানা মালিক অনেকেই বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। তা ছাড়া কমপ্লায়েন্ট ইস্যুতে ক্রেতারা এখন কঠোর হওয়ায় বহু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং কিছু বন্ধের পথে রয়েছে। তিনি বলেন, কারণ বড় কারখানাগুলো এ প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে টিকে গেলেও ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো তা পারবে না। আর এ পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য এবং উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারকে কারখানাগুলোতে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও গ্যাস সুবিধা দিতে হবে।

খরচ কমাতে কারখানা মালিকদের অনেকেই এখন শ্রমিক ছাঁটাই করছেন। অনেক কারখানা বন্ধ করা হয়েছে যার খবর বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ জানে না। তবে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো বেশির ভাগই ছোট ও মাঝারি ধরনের। আগে বড় কারখানাগুলো বেশি করে পোশাকের অর্ডার নিয়ে তা অন্য কারখানায় সাব-কন্ট্রাক্টের ভিত্তিতে করিয়ে নিতো। কিন্তু রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর এখন বড় ক্রেতারা কারখানাগুলোর পরিবেশ ও মান যাচাই করে তবেই অর্ডার দেন। আর এ ক্রেতারা শেয়ার্ড বিল্ডিংয়ে অর্ডার নেয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে ছোট কারখানাগুলো কাজ না পেয়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

শ্রমিক নেতারা জানান, আমাদের দেশের পোশাক কারখানাগুলোর যে পরিমাণ যন্ত্রপাতি রয়েছে তা দিয়ে ৫০ বিলিয়ন ডলারের পোশাকের অর্ডার নেয়া সম্ভব। আর এ অবস্থায় যদি বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ বলে তাদের অর্ডার কম, সে কথা গ্রহণযোগ্য নয়। তবে বড় কারখানাগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ছোট কারখানাগুলো টিকতে না পেরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শ্রম আইন অনুযায়ী কোন কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে শ্রমিকদের চার মাসের বেতন ও গ্র্যাচুইটি দিতে হয়। কিন্তু শ্রমিকদের বঞ্চিত করার জন্য মালিকরা লোকসানের বাহানা দিয়ে কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছেন।

শ্রমিক নেত্রী মোশরেফা মিশু বলেন, কারখানা যদি লে-অফে যায় তবে বিদ্যমান শ্রম আইন মেনে কারখানা কর্তৃপক্ষকে শ্রমিকদের চাকরির প্রাপ্য সব সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।

এদিকে নিরাপত্তা ইস্যুতে উত্তর আমেরিকা ভিত্তিক পোশাক ক্রেতাদের জোট অ্যালায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স সেফটি (অ্যালায়েন্স) ও ইউরোপের আরেকটি জোট অ্যাকর্ড অন ফায়ার অ্যান্ড বিল্ডিং সেফটি ইন বাংলাদেশ (অ্যাকর্ড) কারখানা পরিদর্শনের পর ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার কারণে ২১টি কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত অ্যাকর্ড পরিদর্শন করেছে ১০৩০টির বেশি কারখানা। তারা বন্ধ করেছে ১৮টি। আর অ্যালায়েন্স পরিদর্শন করেছে ৬০১টি কারখানা। বন্ধ করে ৩টি। বর্তমানে বিজিএমইএ সদস্যভুক্ত ৫৭৫১টি কারখানার মধ্যে ৩৫০০ কারখানা চালু আছে।

অনেকেই বলছেন, অ্যাকর্ড-এর সামপ্রতিক দৌড়ঝাঁপ দেখে মনে হবে, পর্যবেক্ষণের নামে বিশেষ কোন পক্ষের স্বার্থ হাসিল করার মিশন নিয়েই যেন সব কার্যক্রম চালাছে। যে সব কারখানা অ্যাকর্ড বন্ধ করেছে, সেগুলোর শ্রমিকরা এখন পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে কোনও ক্ষতিপূরণও পায়নি।

বিজিএমইএর সূত্র জানায়, গত ৬ মাসে ৪১৯টি কারখানায় নিজস্বভাবে জরিপ চালায় বিজিএমইএ। এতে দেখা গেছে, নিজস্ব ভবন না থাকার কারণে বিদেশী ক্রেতারা ১১০ মিলিয়ন ডলারের (৫৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা) কার্যাদেশ বাতিল করে। অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স কারখানা মালিকদের শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য ব্যয়বহুল সব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলছে। মালিকরা তা পূরণের চেষ্টাও করছেন। কিন্তু এ অবস্থায় ক্রেতারা যদি অর্ডার ফিরিয়ে নেন তবে কিভাবে কারখানা চালু রাখা সম্ভব তা ভেবে দেখার বিষয় বলে মনে করে সংগঠনটি।

অন্যদিকে মালিকদের নানারকম পরামর্শ দিলেও বিদেশী ক্রেতারা পোশাকের মূল্য না বাড়িয়ে উল্টো কমানোর কথা বলছেন। তারা দক্ষিণ আফ্রিকা, ইথিওপিয়ার মতো দেশ থেকে পোশাক কেনার কথা ভাবছেন। বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ জানায়, মূলত যেসব পোশাক কারখানার নিজস্ব ভবন নেই, শেয়ার্ড ভবনে নিজেদের কারখানা চালাচ্ছে তাদের কাছ থেকেই বিদেশী ক্রেতারা অর্ডার ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এরই মধ্যে অর্ডার না পেয়ে অনেক ছোট ও মাঝারি কারখানা মালিক কারখানা বন্ধের জন্য বিজিএমইএ’র কাছে করণীয় জানতে চেয়েছেন বলে জানা গেছে।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close