Featuredঅন্য পত্রিকা থেকে

ইউরোজোনের সর্বোত্তম ব্যবহার

কোইচি হামাদআন্তর্জাতিক নিউজ ডেস্ক: কোইচি হামাদইউরোজোনের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ ভালো নয়, প্রবৃদ্ধি এক জায়গায় থমকে গেছে। মুদ্রার অবমূল্যায়নের সম্ভাবনাও ব্যাপক। অর্থনীতিবিদ মার্টিন ফিল্ডস্টেইন শুরু থেকেই এই উদ্যোগের ব্যাপারে সন্দিহান ছিলেন, তিনি এখন এটাকে ‘ব্যর্থতা’ হিসেবে অভিহিত করতে শুরু করেছেন। ফিল্ডস্টেইন কি সঠিক? ইউরোজোন কি ‘অপটিম্যাল কারেন্সি এরিয়া’ হতে পারবে? এর প্রবক্তারা যা ভেবেছিলেন।

এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে বিনিময় হারের বিভিন্ন ব্যবস্থার খরচ (কস্ট) ও প্রাপ্তি (বেনিফিট) সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) আজ থেকে ৭০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এর লক্ষ্য ছিল ‘সমন্বয়যোগ্য পেগ’ ব্যবস্থার ব্যবস্থাপনা করা। এটি ছিল একটি সংকর ব্যবস্থা, যেখানে বিনিময় হার নির্ধারণ করা হতো মূলত মার্কিন ডলারের সঙ্গে সমন্বয় করে। কোনো দেশ আবার চাইলে রপ্তানি বাজারে তাদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে সময় সময় তা সমন্বয় করতে পারে।

প্রথম কয়েক দশকে এই ব্যবস্থা ‘পেগের’ ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল ছিল। কারণ, মার্কিন ডলার তখন সরাসরি সোনায় রূপান্তর করা যেত। এতে বৈশ্বিক মুদ্রাব্যবস্থায় যে স্থিতিশীলতা আসে, তা উল্লেখযোগ্য। ১৯৩০-এর দশকে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে মুদ্রার অবমূল্যায়ন হয়েছিল, অর্থনীতিবিদেরা সেটা ভালো চোখে দেখেননি।

কিন্তু এই নির্ধারিত বিনিময় হার ব্যবস্থার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যালান্স অব পেমেন্ট-ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। সে কারণে ১৯৭১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এককভাবে ডলারের সোনায় রূপান্তরের বিধান রহিত করেন। ফলে প্রধান প্রধান মুদ্রার বিনিময় হার একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিতভাবে নির্ধারিত হওয়ার সুযোগ হয়।

এ ব্যবস্থার কারণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা লাভ সম্ভব হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, এর ফলে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ অর্থনীতিতে ব্যাপক হারে অর্থ সরবরাহের সুযোগ পায়, মন্দা মোকাবিলারও সুযোগ তারা পায়। কিন্তু এর সঙ্গে একটি মারাত্মক ঝুঁকিও যুক্ত ছিল, ১৯৮০-এর দশকে বাণিজ্য-ঘাটতির মধ্য দিয়ে তা আলোয় চলে আসে।

১৯৮০ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত মার্কিন ডলারের মান জাপান, পশ্চিম জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মুদ্রার তুলনায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। যুক্তরাষ্ট্রের চলতি হিসাবের ঘাটতি জিডিপির ৩ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছায় আর দেশটির প্রধান চারটি প্রতিষ্ঠানের হাতে বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত জমা হওয়ায় তাদের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারায় চালিত হয়। এই ভারসাম্যহীনতা দূর করতে পাঁচটি দেশ প্লাজা চুক্তি সই করে, এতে তারা মুদ্রা বাজারে হস্তক্ষেপ করে ডলারের মূল্য হ্রাসের সিদ্ধান্ত নেয়।

এই পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোর জন্ম হয়, এর লক্ষ্য ছিল ইউরোপীয় অর্থনীতি চাঙা করতে স্থানীয় বাজার সম্প্রসারণ করা, লেনদেন খরচ কমানো এবং তথ্যের সরবরাহ জারি রাখা। ১৯৯১ সালে মুদ্রানীতির স্বাধীনতাহরণ ইউরোপের অর্থনীতির জন্য একটি সময়োচিত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু আজ মনে হয়, এটা আসলে ভুলই ছিল।

বস্তুত, ১৯৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা থেকে ইউরোজোনের প্রবক্তাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। জাতীয় মুদ্রা কর্তৃপক্ষের হাত-পা বেঁধে দেওয়া কোনো কাজের কথা নয়। সেটা হতো না, যদি ইউরোজোন রবার্ট মান্ডেলের অপটিমাল কারেন্সি এরিয়ার ধারণার ভিত্তিতে কাজ করত। অর্থাৎ, যদি বিনিময় হার সমন্বয়ের জায়গায় শ্রম ও পুঁজির সমন্বয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো। তার পরও জার্মানির একত্রীকরণ থেকে আমরা বুঝতে পারি, এরূপ মিলনের সফলতার জন্য রাজনৈতিক মিলন খুবই জরুরি।

ইউরোজোনের কার্যক্রম উপর্যুক্ত কোনো মানদণ্ডের সঙ্গেই যায় না। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে, ইউরোজোনের দেশগুলো ভিন্ন ভিন্ন মারাত্মক কিছু ধাক্কা খেয়েছে। দেশগুলোর মুদ্রানীতি স্বাধীন না হওয়ায় এ ব্যাপারে তারা যথাযথ পদক্ষেপও নিতে পারেনি। ফলে তারা বারবার অর্থনৈতিক সংকটে পর্যুদস্ত হচ্ছে।

মুদ্রানীতি কীভাবে সংস্কারমূলক হয়, তা বোঝার জন্য জাপানের দিকে তাকাতে হবে। তারা কীভাবে কয়েক দশকের স্থিরাবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছে, সেটা নজির হিসেবে নিতে হবে। মুদ্রানীতির সম্প্রসারণই ছিল শিনজো আবের অর্থনৈতিক কৌশলের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নীতির একটি। ইয়েনের ত্বরিত মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে অনেক বছর আগেই তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো। সমস্যা হচ্ছে, ব্যাংক অব জাপানের গভর্নর হারুহিকো কুরোদার পূর্বসূরিরা এমনভাবে কাজ করেছেন, যাতে মনে হয় নির্ধারিত বিনিময় হারের বাইরে যাওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

এই যে ইউরোজোনের দেশগুলো কোনো সাহসী মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে পারল না, সেটা তাদের কোনো পছন্দের ব্যাপার ছিল না। জাপানে এর উল্টোটা ঘটেছে। অন্যান্য মুদ্রার সাপেক্ষে ইউরোর মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু প্রতিটি দেশের মুদ্রানীতি ভিন্ন হওয়ায় তা এ কাজের পথে একটি বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

নিশ্চিতভাবেই গোটা ইউরোপের অর্থনৈতিক অঙ্গীভবন হওয়ার ফলে যে রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়া গেছে, তা বেশ দৃশ্যমান। ইউরোজোন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এ প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। এই একীভূত করার ফলে জার্মানি ও ফ্রান্সের মধ্যে যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়েছে, ইউরোপীয় সম্প্রদায়ের ধারণার প্রবক্তা রবার্ট স্কুম্যান যার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু এ লক্ষ্য অর্জনে এত বৃহত্তর পরিসরে মুদ্রা ঐক্য দরকার ছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে।

যা-ই হোক, ইউরোজোন আছে, আর এ মুহূর্তে হঠাৎ করে এটা বিলুপ্ত করাও খুব কঠিন হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আজকের লক্ষ্য হওয়া উচিত, একটি অপটিম্যাল কারেন্সি এরিয়া গড়ে তোলা। নতুনদের এটা জানা উচিত, আজকের যে ইউরোজোন রয়েছে, তা ইউরোপের অপটিম্যাল কারেন্সি এরিয়ার চেয়েও বড়। এর কিছু সদস্যরাষ্ট্রের স্বাধীন মুদ্রানীতি গ্রহণ করা উচিত, অবশ্যই গ্রিস এবং সম্ভবত ইতালি ও স্পেনের। তা না হলে তারা শুধু সংকটের মধ্যে ঘুরপাক খাবে, জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো এই অপটিম্যাল কারেন্সি এরিয়াভুক্ত দেশগুলো যার ফল ভোগ করবে।

বিভিন্ন দেশ ইউরোজোনের সদস্য হতে আগ্রহী হয়ে উঠলে তার পরবর্তী পদক্ষেপ হবে রাজনৈতিক সংহতি অর্জনের পথে এগিয়ে যাওয়া। ফলাফল হবে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর ইউরোজোনের সৃষ্টি; যার প্রাপ্তি হবে খরচের চেয়ে ঢের বেশি।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
কোইচি হামাদা: জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের বিশেষ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close