অন্য পত্রিকা থেকে

বিমান চালায় চোরাকারবারিরা

নিউজ ডেস্ক: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস চালাচ্ছে সোনা চোরাকারবারিরা। ফ্লাইট শিডিউল নির্ধারণ থেকে শুরু করে উড়োজাহাজ লিজ, ক্রয়, নিয়োগ, বদলি- সবই হচ্ছে চোরাকারবারি চক্রের নির্দেশমতে। বিমান উড়বে কি উড়বে না, সবকিছুই নির্ভর করে এই চক্রের সিদ্ধান্তের ওপর।

জাতীয় পতাকাবাহী একমাত্র রাষ্ট্রীয় আকাশ পরিবহন সংস্থা বিমানের কেউ না হয়েও বহিরাগত ঠিকাদার মাহমুদুল হক পলাশের সিদ্ধান্তে চলছে বিমান। সোনা চোরাচালানের অন্যতম হোতা এই পলাশের নেতৃত্বে বিমানের শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ঝাড়ুদার পর্যন্ত একবিন্দুতে মিলে গড়ে তোলা হয়েছে সোনা চোরাকারবারি চক্র।

সোনা চোরাচালানে জড়িতদের জিজ্ঞাসাবাদ ও গোয়েন্দাদের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে বিমান সম্পর্কে এমন উদ্বেগজনক তথ্য। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সোনা চোরাচালানে বিমানকর্মীরা এমনভাবে জড়িয়েছেন, তাতে যাত্রী পরিবহন নয়, চোরাচালানের সোনা বহনই যেন বিমানের এখন অন্যতম কাজ। চোরাকারবারিদের ভাড়াটে কর্মী হিসেবে কাজ করছেন সোনা বহনকারী কেবিন ক্রুসহ বিমানের অন্য কর্মীরা। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, বিমানের গুরুত্বপূর্ণ পদ ও আকাশে উড়ে চলা উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রক যারা রয়েছেন, তাদের অধিকাংশই সোনা চোরাচালানে সরাসরি জড়িত। এ ছাড়া নিুপদস্থ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরও নাম রয়েছে চোরাকারবারি চক্রের সদস্য হিসেবে। এমন অন্তত অর্ধশত ব্যক্তি রয়েছেন এখন গোয়েন্দা নজরদারিতে।

এর আগে ১২৪ কেজি সোনা আটক ঘটনার তদন্তে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের এক প্রতিবেদনে বিমানের ১০ কর্মী জড়িত থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এই ১০ কর্মীর মধ্যে তিনজন ইতিমধ্যে বরখাস্ত হয়েছেন। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক মইনুল খান বলেন, বিমান একটি রাষ্ট্রীয় আকাশ পরিবহন সংস্থা। বিমানের উড়োজাহাজে ভিভিআইপি, ভিআইপিরা ভ্রমণ করেন। অসাধু চক্রের খপ্পরে পড়ে বিমানকর্মীরা এমন কিছু করে বসতে পারেন যে, ভিভিআইপিদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।

এদিকে সোনা চোরাচালানে জড়িত বিমানের এক উপ-মহাব্যবস্থাপকসহ (ডিজিএম) পাঁচজনকে গ্রেফতারের পর বিমানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বিমানের এক শীর্ষ কর্মকর্তার ধর্মপুত্র বিমানের ঠিকাদার মাহমুদুল হক পলাশ গ্রেফতারের পর আতঙ্কের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।

বিমানের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, বিমানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা গ্রেফতারের বিষয়টি চিন্তা করা যেতে পারে, কিন্তু প্রভাবশালী পলাশের গ্রেফতার হওয়াটা অবিশ্বাস্য। কারণ বিমানের কিছু না হয়েও যে ব্যক্তিটি গোটা বিমান পরিচালনা করছেন, তিনি গ্রেফতার হন কীভাবে! ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম গতকাল বলেছেন, পলাশ ভীষণ প্রভাবশালী। তিনি বিমান চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) জামালউদ্দিন আহমেদের ধর্মপুত্র।

বিমানসূত্র জানায়, বিমানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কাবো কেলেঙ্কারির অন্যতম হোতা এই পলাশ। কাবো কেলেঙ্কারির পর পলাশ সম্পর্ক গড়ে তোলেন গ্রেফতারকৃত এমদাদ হোসেন, তোজাম্মেল ও ফারহা মানি একচেঞ্জের মালিক হারুন রশীদের সঙ্গে। এ সময় পলাশ বিমানে কর্মরত তার স্ত্রী বিমানবালা নূরজাহানকে কাজে লাগান। সর্বশেষ যে ফ্লাইটে সোনা ধরা পড়ে তার শিডিউল ঠিক করার দায়িত্ব পালন করেন তোজাম্মেল ও এমদাদ। গ্রেফতারের পর তারা প্রাথমিকভাবে এসব স্বীকারও করেন।

সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বিমানের সব ফ্লাইট নিয়ন্ত্রণ করছে চোরাকারবারি চক্র। নিজেদের ভাড়াটে পাইলট, ক্রু দিয়ে চালানো হচ্ছে এ ধরনের ফ্লাইট। তারাই এয়ারক্রাফট ভর্তি করে নিয়ে আসে সোনার চালান। সোনার চালান সহজে পার করতে বিমানবন্দরে কর্মরত সব সংস্থার অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কিনে ফেলা হচ্ছে। এর পরও মুনাফা হচ্ছে শত কোটি টাকা। ভাগ যাচ্ছে বিমানের সংশ্লিষ্ট শাখার অসাধু কর্মকর্তাদের কাছে। টাকার লোভে বিমান ও এয়ারপোর্টের প্রায় সব শাখার অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বাইরে অসাধু ব্যবসায়ী একবিন্দুতে মিলে একটি চক্র গড়ে তুলেছেন। তারা কয়েক বছর ধরে নির্বিঘ্নে চোরাই পণ্যের ব্যবসা করে যাচ্ছেন।

জানা গেছে, বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দামি হলো জেদ্দা ও দুবাইগামী ফ্লাইট। সপ্তাহে জেদ্দা আর দুবাই মিলে মোট ১১টি ফ্লাইট চলাচল করে। প্রতিটি ফ্লাইট গড়ে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকায় বিক্রি হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাস্টমস বিভাগের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, যদি একটি ফ্লাইট কিনতে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা ব্যয় হয় তবে প্রতি ফ্লাইটে কী পরিমাণ চোরাচালান হচ্ছে তা অনুমান করাও কঠিন। শুধু ফ্লাইট কেনা নয়, ঘাটে ঘাটে টাকা খরচ করছেন চোরাকারবারিরা।

এ কারণে চোরচালান বন্ধ করা যাচ্ছে না।বিমানের কেউ নন, তবুও : বিমানের সবাই পলাশকে চেনেন চেয়ারম্যানের লোক হিসেবে। রটনা আছে, পলাশ হচ্ছেন চেয়ারম্যানের অতি বিশ্বস্ত টোল কালেক্টর। সে সুবাদেই বিমানে তার দাপট একচ্ছত্র। কেনাকাটা, পদোন্নতি, নিয়োগ-বদলি, শাস্তি- সব ক্ষেত্রেই তিনি নিয়ামক। তার আশীর্বাদ ছাড়া এসব আশা করা দুরূহ। বিমানসূত্র জানায়, দেড় শ নতুন কেবিন ক্রু নিয়োগ দেওয়া হয় বিমানে। চোরাচালানের সোনা বহন করার জন্য পলাশ কেবিন ক্রু নিয়োগ দেন। পলাশের তালিকা থেকে ৩৪ জন কেবিন ক্রুকে নিয়োগ দেওয়া হয়। আর প্রতি জনের কাছ থেকে অন্তত ২০ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নেন পলাশ।

বিমান কাস্টমার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা জানান, পলাশের স্ত্রী বিমানবালা নূরজাহান। তারও আচার-আচরণ ভয়ঙ্কর। নূরজাহানের ভয়ে অন্য বিমানবালারা সারাক্ষণ থাকেন তটস্থ। চেয়ারম্যানের নাম ভাঙিয়ে নূরজাহান ডিউটি রোস্টার পরিবর্তন, প্রতিপক্ষকে নাস্তানুবাদ করাসহ বিভিন্ন রকম অপকর্ম করেন। কিছু দিন আগে লন্ডন ফ্লাইটে পলাশকে নিয়ে ঘটে এক অপ্রীতিকর ঘটনা। ওই ফ্লাইটে এমদাদও ছিলেন। পলাশকে নিজের আসন থেকে টেনে কেবিন ক্রুদের জন্য সংরক্ষিত বিশ্রামাগারে (গালি) নিয়ে ঘুমানোর সুযোগ করে দেন এমদাদ।

এ কারণে ওই ফ্লাইটের অন্য ক্রুরা ঠিকমতো বিশ্রাম না নিতে পেরে প্রচণ্ড ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে বিমানের একজন জিএম বলেন, পলাশের সঙ্গে চেয়ারম্যানের পারিবারিক সম্পর্ক অনেক আগে থেকেই। সেই কাবো এয়ারলাইনসের যুগ থেকে। কাবো লিজ নেওয়ার আগে চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকেই এই পলাশকে নিয়োগ দেওয়া হয় সেখানে।

এ সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কাবোর চুক্তি শেষ হওয়ার পর পলাশ বিমানে একজন তদবিরবাজ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। পদোন্নতি, নিয়োগ, বদলি, শাস্তি, সাপ্লাই, কেনাকাটায় পলাশ একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। সর্বশেষ কেবিন ক্রু নিয়োগেও তার তালিকাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close