অন্য পত্রিকা থেকে

যে কারণে বাতিল হয়ে যায় প্রধানমন্ত্রীর লন্ডন ও রোম সফর

সৈয়দ শাহ সেলিম আহমেদ: অক্সফোর্ড ইউনিয়নের বার্ষিক বক্তৃতায় আমন্ত্রিত অতিথিদের সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একজন আমন্ত্রিত বক্তা ছিলেন। সব কিছুই চূড়ান্ত ছিলো।প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকেও অক্সফোর্ড ইউনিয়নকেও জানানো হয়েছিলো প্রধানমন্ত্রী প্লেনারি সেশনে বক্তৃতা দিবেন। সেভাবেই সব কিছু সাজানো হচ্ছিলো। কিন্তু কেন জানি অক্সফোর্ড ইউনিয়ন এবং প্রধানমন্ত্রীর দফতর এই সফর নিয়ে বেশ গোপনীয়তা  রক্ষা করে চলছিলেন।
অক্সফোর্ড ইউনিয়নের সাথে কাজ করেছেন, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে লন্ডনবাসী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানালেন,  অক্সফোর্ড ইউনিয়ন থেকে এ বছর সুনির্দিষ্টভাবে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে জানানো হয়েছিলো, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন পূর্ববর্তী অবস্থা থেকে পরবর্তী সকল প্রেক্ষাপট সবিস্তারে জানার জন্যে ইউনিয়ন শেখ হাসিনাকে আহবান জানিয়েছিলেন। তাদের বক্তব্য ছিলো, সারা বিশ্বের নেতৃবৃন্দের কাছে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে অনেক প্রশ্ন এবং বিতর্ক রয়েছে। সেজন্যে এই আন্তর্জাতিক বক্তৃতার মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সুনির্দিষ্ট প্রসঙ্গের বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর সম্মেলনে তুলে ধরবেন বলে আগে ভাগেই নির্ধারিত হয়েছিলো।
কিন্তু অক্সফোর্ডে শেখ হাসিনার বক্তৃতার আগেই প্রধানমন্ত্রীর সব চাইতে প্রভাবশালী উপদেষ্টা এবং সাবেক দক্ষ আমলা এইচ টি ইমাম ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রসঙ্গে গণ-মাধ্যমে যে খোলামেলা বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে, তাতে বিশ্ব গণ-মাধ্যম তৎক্ষণাৎ লুফে নেয়। কূটনৈতিক চ্যানেলে এইচ টি ইমামের বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপ চলে আসে ব্রিটেন সহ প্রভাবশালী সকল ডিপ্লোম্যাটদের কাছে। অক্সফোর্ড ইউনিয়ন কর্তৃপক্ষ ইমামের এই বক্তব্য শ্রবণ করে নড়ে চড়ে বসেন। ইউনিয়ন রিসার্চ টিম মনে করে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে যে বিষয়ের  সুস্পষ্ট বক্তব্য তারা জানতে চেয়েছিলেন, এইচ টি ইমাম সেই বক্তব্য পরিষ্কারভাবেই জানিয়ে দিয়েছেন। ইউনিয়ন তাদের সকল প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেছেন- এমন অবস্থায় কর্তৃপক্ষ জরুরী মিটিং এ বসেন এর পর আদৌ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ আছে কিনা?
বিদ্যমান প্রটোকল ব্যবস্থায় ইউনিয়ন কর্তৃপক্ষ যোগাযোগ করেন ব্রিটিশ ফরেন অফিসের সাথে। ফরেন অফিসের দক্ষ আমলাদের মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ হাই কমিশন সহ ঢাকা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়ে দেয়া হয় অক্সফোর্ড ইউনিয়নে প্রধানমন্ত্রীর নির্ধারিত বক্তৃতার বিষয় বাতিল করা হয়েছে। সেগুণ বাগিচাস্থ ফরেন অফিস নড়ে চড়ে বসেন। দৌড় ঝাপ চলে ব্রিটিশ হাই কমিশন দূতাবাসের সাথে। ইতোমধ্যে এইচ টি ইমামকে জানিয়ে দেয়া হয় প্রেস কনফারেন্স করে ব্যাখ্যা দিতে যাতে লবিং অব্যাহত রাখা যায়। কিন্তু অক্সফোর্ড ইউনিয়ন তাদের সিদ্ধান্তে অটল। রিসার্চ পলিসি মেকিং মিটিং যে সিদ্ধান্ত পাস হয়েছে, তা আর পূণর্বহালের সুযোগ নেই। কূটনৈতিক চ্যানেলে জানিয়ে দেয়া হয় এ বৎসর আর কিছু করার নেই। আগামী সেশনে বিবেচনা করা হবে।

যে কারণে অক্সফোর্ডে বক্তৃতা দেয়া বাতিল হয়ে যায়, সেই একই নেপথ্যের কারণ রোম সম্মেলনেও উত্থাপিত হয়।প্রধানমন্ত্রীর সফর চূড়ান্তকারী টিম তাই বাধ্য হয়ে রোম সম্মেলনও বাতিলের পরামর্শ দেন। কেননা, রোম সম্মেলন আয়োজক দেশের ঊর্ধ্বতন মহল থেকে নেগেটিভ সিগন্যাল চলে আসে ব্রাসেলস দূতাবাসে। তাই তড়ি ঘড়ি করে বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে আগ বাড়িয়ে অক্সফোর্ড সফর বাতিলের সাথে রোম সম্মেলন বাতিল প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে ইস্যু করা হয়। ইমাম ঝড়ে বিশ্বের দুই শক্তিধর দেশে এতো বড় বড় সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশকে তুলে ধরার সুযোগ বাতিল হয়ে গিয়েই ক্ষান্ত হয়নি।

কারণ পরিস্থিতি এখানেই থামেনি। বিশ্ব কূটনৈতিক অঙ্গনে এ নিয়ে চলছে ব্যাপক খেলা। সরকার দুটানায় পড়ে যায় ৫ তারিখের নির্বাচন নিয়ে এতো কষ্টে ও জাতি সংঘ স্থায়ী প্রতিনিধির মাধ্যমে দেন দরবার করে যে পজিটিভ একটা আবহ তৈরি করা সম্ভব হয়েছিলো, ঝানু আমলা ইমামের এক ফুঁৎকারে সব অর্জন ধূলিসাৎ হয়ে যায়। নতুন করে বিশ্ব অঙ্গনে বাংলাদেশের নির্বাচন আলোচনার টেবিলে চলে আসে। এরই মধ্যে নির্ধারিত রাজনীতির খেলার ছকে ভারতীয় গোয়েন্দাদের ঢাকা সফর সফলভাবে সমাপ্তি হলেও মোদী সরকার বুঝে যায় ৫ তারিখের নির্বাচনের মাধ্যমে যে সংসদ গঠিত হয়েছে, তাকে আর কোনভাবে টিকিয়ে রাখা যাবেনা।
যুদ্ধাপরাধ মামলা  এবং টিকফা ইস্যুতে শেখ হাসিনা কোন কোন ক্ষেত্রে আমেরিকার অনুরোধ উপেক্ষা করলেও জঙ্গি এবং যুদ্ধাপরাধ মামলায় মধ্য প্রাচ্যের অনুরোধ রক্ষা করায় ভারত আমেরিকার অনুকূলে হয়ে সুনজরে দেখেনি। ইমাম ঝড়ে দিল্লীও নাখোশ- যার ফলে নেপালে সার্কের সম্মেলনেও দুই প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক বৈঠকের সময়সূচী এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিগত সময়ে সরকারের বিরামহীন প্রচারণা ও ভারতীয়দের উজাড় ভাবে দিয়েও বর্তমান বিশ্ব কূটনৈতিক চাপে সরকার এক টাল মাটাল ও অস্থির অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।
আর তা সামাল দিতে দিল্লীর দক্ষিণ ব্লকের সুপারিশে লতিফ সিদ্দিকীকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোথাকার পানি কোথায় গিয়ে শেষ হয় সেটাই এখন দেখার বিষয়। কেননা ইতোমধ্যে দক্ষ নাবিকের ন্যায় সব দিক বেশ ভালোভাবেই সামাল দিয়ে এসেছেন শেখ হাসিনা। এবার খোদ ঘরের ভিতরের খুঁটি নড় বড়ে হয়ে গেছে, শেখ হাসিনা কিভাবে সামলাবেন- সেটাই আসল বিষয়।

salim932@googlemail.com

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

আরও দেখুন...

Close
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close