অন্য পত্রিকা থেকে

দশক ঘুরতেই দ্বিগুণ ইলিশ

শরিফুল হাসান: আকাশছোঁয়া দাম, বাজারেও সব সময় মিলছে না—এক দশক আগেও এমন ছিল ইলিশ মাছের অবস্থা। মেঘনা বা যমুনা তো দূরের কথা, খোদ পদ্মা নদীতেও ইলিশ নেই বলে হাহাকার উঠেছিল। কিন্তু গবেষকদের নির্দেশনা আর পরিকল্পিত একাধিক উদ্যোগ বাঙালির পাতে আবার ফিরিয়ে এনেছে ইলিশকে। মাত্র এক দশকে দেশে ইলিশের উৎপাদন বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ১০ বছর আগেও দেশের মাত্র ২১টি উপজেলার নদীতে ইলিশ পাওয়া যেত। এখন ইলিশ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের ১২৫টি উপজেলার নদীতে। বিশ্বের মোট ইলিশের ৬০ ভাগই উৎপাদিত হচ্ছে বাংলাদেশে। বাকি ইলিশ উৎপাদিত হয় প্রধানত ভারত ও মিয়ানমারে। আর দেশের নদীতে ধরা পড়া মোট মাছের ১১ শতাংশই ইলিশ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মা-ইলিশের সুরক্ষা ও ডিম পাড়ার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারায় এ সফলতা এসেছে। পাশাপাশি আছে সরকারের জাটকা নিধন বন্ধ অভিযান। এ দুই কর্মসূচির সফলতাই ইলিশের সংখ্যা বাড়তে বড় ভূমিকা রেখেছে। মা-ইলিশ রক্ষায় ২০১১ সালে যেখানে এক হাজার ৪৪০টি অভিযান চালানো হয়েছিল, সেখানে ২০১৪ সালে চালানো হয় চার হাজার ৩৫৭টি অভিযান।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০২-০৩ অর্থবছরে দেশে দুই লাখ মেট্রিক টনের কম ইলিশ উৎপাদিত হতো। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদিত হয়েছে তিন লাখ ৮৫ মেট্রিক টন।
একই সূত্রের তথ্য হলো, দেশের প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ সরাসরি ইলিশ আহরণে নিয়োজিত। আর ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত আছেন ইলিশ পরিবহন, বিক্রয়, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ইত্যাদি কাজে।

চাঁদপুরের মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক মো. আনিছুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, জাটকা রক্ষা, ভরা প্রজনন মৌসুমে ১১ দিন ইলিশ আহরণ বন্ধ এবং ইলিশের পাঁচটি অঞ্চলকে অভয়াশ্রম ঘোষণা—এই তিনটি কাজের মধ্য দিয়েই বর্তমানের ব্যাপক সফলতা মিলেছে। পাশাপাশি জেলেদের সরকারি সহায়তা একটি বড় ভূমিকা রেখেছে। আরেকটি বিষয় হলো, কয়েক বছর ধরে এসব কর্মসূচি চলায় এখন জেলেসহ সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বেড়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০০০-২০০১ সালে দুই লাখ ২৯ হাজার ৭১৪ টন ইলিশ উৎপাদিত হয়েছে। কিন্তু পরের অর্থবছরে উৎপাদন ৯ হাজার ১২১ টন কমে গেছে। ২০০২-০৩ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন আরও কমে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩২ টনে নেমে আসে। এরপর জাটকা রক্ষা কর্মসূচিতে জোর দেয় সরকার। এতে উৎপাদন কিছুটা বাড়তে থাকে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৯২১ মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদিত হয়। এরপর মা-ইলিশ রক্ষার কর্মসূচি আরও জোরদার করলে ইলিশের উৎপাদন তিন লাখ টন ছাড়িয়ে যায়। সর্বশেষ গত অর্থবছরে (২০১৩-১৪) তিন লাখ ৮৫ হাজার টন ইলিশ উৎপাদিত হয়েছে দেশে।

উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে ইলিশ রপ্তানিও বেড়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে যেখানে তিন হাজার ৬৮০ মেট্রিক টন ইলিশ রপ্তানি হয়েছে, সেখানে ২০১০-১১ অর্থবছরে আট হাজার ৫৩৮ মেট্রিক টন ইলিশ রপ্তানি হয়। টাকার অঙ্কে এতে আয় হয় সাড়ে তিন শ কোটি টাকা। তবে ২০১২ সালের ৩১ জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত ইলিশ রপ্তানি বন্ধ আছে। এর ফলে দেশের বাজারে প্রায় সব সময় ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে।

জাটকা রক্ষা কার্যক্রম: ২০০২-০৩ অর্থবছরে যখন ইলিশের উৎপাদন একেবারেই কমে যায়, তখন সীমিত পরিসরে এই কর্মসূচি নেওয়া হয়। বর্তমানে দেশের ২২টি জেলার ১০২টি উপজেলায় জাটকা নিধন প্রতিরোধ কার্যক্রম চলছে। গত অর্থবছরে চার হাজার ৩৮১টি জাটকাবিরোধী অভিযান চালানো হয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জাটকা নিধন বন্ধ কর্মসূচি হাতে নেওয়ায় জেলেরা সংকটে পড়েন। ফলে সরকার জাটকা আহরণকারী মৎস্যজীবীদের খাদ্যসহায়তা দেওয়া শুরু করে। শুরুতে একটি জেলে পরিবারকে প্রতি মাসে ১০ কেজি করে চাল দেওয়া হলেও এখন ৪০ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে। ২০০৪-০৫ অর্থবছরে যেখানে মাত্র এক হাজার টন খাদ্যসহায়তা দেওয়া হয়েছিল। গত অর্থবছরে সেখানে ৩৫ হাজার ৮৫৬ মেট্রিক টন খাদ্য দেওয়া হয় জেলেদের। দেশের ১৬টি জেলার দুই লাখ ২৪ হাজার ১০২টি পরিবার এ সহায়তা পেয়েছে বলে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ উপলক্ষে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়।

মৎস্য অধিদপ্তরের অধীন জাটকা সংরক্ষণ, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও গবেষণা প্রকল্পের পরিচালক জাহিদ হাবিব প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে শীত মৌসুমে ইলিশ পাওয়া যেত না। এখন শীতেও প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ছে। আর পাঁচটি এলাকাকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে ইলিশের উৎপাদন আরও বাড়বে।’

মাইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রম: বিশেষজ্ঞরা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বর্ষা মৌসুমের হেরফের হওয়ায় ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন মৌসুমেও হেরফের হচ্ছিল। এ কারণে সরকার ১৯৮৫ সালের মৎস্য সংরক্ষণ ও সুরক্ষা আইনের কিছু ধারা ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে সংশোধন করে। সংশোধিত আইন অনুযায়ী, ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম আশ্বিন মাসের প্রথম উদিত চাঁদের তিন দিন আগে ও সাত দিন পরে—মোট ১১ দিন উপকূলীয় এলাকাসহ সারা দেশে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, বিপণন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং জেলা ও উপজেলা প্রশাসন প্রতিবছর সমিন্বতভাবে মা-ইলিশ রক্ষায় কাজ করে।

ইলিশের অভয়াশ্রম চিহ্নিত: জাটকা নিরাপদে বেড়ে যেন ইলিশ হতে পারে, সে জন্য দেশের পাঁচটি এলাকাকে ইলিশের অভয়াশ্রম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো চাঁদপুরের ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুরের চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত মেঘনা নদীর অববাহিকার ১০০ কিলোমিটার, ভোলার মদনপুর চরইলিশা থেকে চরপিয়াল পর্যন্ত মেঘনার শাহবাজপুর শাখা নদীর ৯০ কিলোমিটার, ভোলার ভেদুরিয়া থেকে পটুয়াখালীর চররুস্তম পর্যন্ত তেঁতুলিয়া নদীর ১০০ কিলোমিটার এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়ার আন্ধারমানিক নদীর ৪০ কিলোমিটার ও পদ্মা নদীর নিম্নাংশে শরীয়তপুর অঞ্চলে ২০ কিলোমিটার এলাকা ইলিশ অভয়াশ্রমের আওতায় রয়েছে। এর মধ্যে চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, ভোলা ও শরীয়তপুরে মার্চ-এপ্রিল এবং পটুয়াখালী জেলায় নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ইলিশ গবেষক দেওয়ান আলী আহসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের দেশের কত মাছই তো হারিয়ে গেছে। ইলিশের ক্ষেত্রেও এমনটি হতে পারত। কিন্তু আমরা সময়োপযোগী সব পদক্ষেপ নিয়ে ইলিশকে কেবল রক্ষা করেছি তা-ই নয়, উৎপাদনও দ্বিগুণ হয়েছে। এভাবে চললে সামনে উৎপাদন আরও বাড়বে।’

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close