স্বদেশ জুড়ে

বাংলাদেশের কিশোরী বধূদের পাশে বৃটিশ অভিনেত্রী জোয়ান

শীর্ষবিন্দু আন্তর্জাতিক নিউজ: সমপ্রতি বাংলাদেশের দিনাজপুর ঘুরে গেছেন এমি অ্যাওয়ার্ডজয়ী নাটক ‘ডাউনটাউন অ্যাবে’র অভিনেত্রী জোয়ান ফ্রোগাট। বৃটিশ দাতব্য সংস্থা প্ল্যান ইউকে’র ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডার ফ্রোগাট বাংলাদেশে এসেছিলেন সংস্থাটির বাল্যবিয়ে রোধ সম্পর্কিত কার্যক্রম দেখতে। বিবাহিত কিশোরীদের সঙ্গে তিনি একান্তে সময় কাটিয়েছেন। বন্ধুসুলভ প্রাণবন্ত আলাপচারিতায় মেতেছেন তাদের সঙ্গে।

নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, আমি ভালবেসে বিয়ে করতে পেরেছি, কিন্তু সব মেয়ে এতটা ভাগ্যবতী নয়। বিশ্বের প্রায় দেড় কোটি নারী প্রতি বছর বাল্যবিয়ের শিকার হয়। বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ নারীর বিয়ে হয় বয়স ১৮ বছর হওয়ার আগেই। আর বাংলাদেশে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে কাজ করছে প্ল্যান ইউকে। ফ্রোগাট বলেন, যখন সম্পূর্ণ অচেনা কারও সঙ্গে একটি মেয়ের বিয়ে দেয়া হয়। তখন তাকে পড়ালেখা ছেড়ে দিতে হয়।

বাংলাদেশে বিয়ের পর ওই মেয়েকে তার স্বামীর বাসায় চলে যেতে হয় এবং শ্বশুরবাড়ির সব দেখাশোনা করতে হয় তার। জন্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে তারা খুব বেশি সচেতন নয়, ফলে দ্রুতই ওই মেয়ে গর্ভবতী হয়ে পড়ে। অনেক মেয়ের বেলায় এসব এটা স্রেফ দাসত্ব। তাদের কিছুই বলার থাকে না। তিনি বলেন, সম্ভাব্য বাল্যবিয়ের কথা শুনলেই সংস্থাটির তরুণ সদস্যরা বিভিন্ন গ্রামে ছুটে যায় ও কাজে নেমে পড়ে। মেয়ের পরিবারের কাছে গিয়ে তাদের ওই বিয়ে থেকে সরে আসতে রাজি করানো ও তাদের কাছে মেয়েটির শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে তারা।

এ ছাড়া বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বাল্যবিয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করে তারা। এ কর্মীদের বয়স ১১ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। ফ্রোগাটের ভাষায়, এটি অনেকটা সবাইকে শেখানোর মতো। কন্যাশিশুটির বাবা-ভাইকেও বোঝানো হয় অনেক কিছু। এ রকম একজন কর্মী রাধার (১৮) সঙ্গেও কথা বলেছেন তিনি। রাধা প্রায় ৮ বার নিজের বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। একই সঙ্গে প্রায় ১২ কন্যাশিশুকে বাল্যবিয়ের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। রাধা সামাজিক কর্মী হতে চায়। তার দুই বোনের খুব কম বয়সে বিয়ে হয়েছিল। এদের একজনকে তার স্বামী অনেক মারপিট করায় চলে এসেছিল পিত্রালয়ে। এ থেকেই মূলত অন্য মেয়েদেরও বাল্যবিয়ের হাত থেকে বাঁচাতে কাজ করে রাধা। ফ্রোগাট বলেন, আমি রাধাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি কি কখনও বিয়ে করতে চাও? করলে সেটা কি ভালবাসার বিয়ে হবে?

সে আমাকে বলেছিল, এমন একজনকে সে বিয়ে করতে চায়, যাকে তার পরিবার মেনে নেবে এবং তাকেও তার সম্ভাব্য স্বামীর পরিবার মেনে নেবে। প্রায় ৮টি বিয়ের প্রস্তাব যেহেতু প্রত্যাখ্যান করেছে সে। তাই যে কোন বিয়েতে তার সম্মতি যে তার পরিবার মেনে নেবে তা নিশ্চিত। তিনি বলেন, তিনি ১৬ বছর বয়সী রহিমার সঙ্গে দেখা করেছেন, যার ২০১২ সালে বিয়ে হয়েছে। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। তার এখন এক বছর বয়সী এক শিশুও রয়েছে। অথচ আমি দুই বছর আগে বিয়ে করেছি, যখন আমার বয়স ছিল ৩২ বছর।

অর্থাৎ তার বয়সের প্রায় দ্বিগুণ। আমি চেয়েছিলাম, তাই আমি নিজের ভালবাসার মানুষকে বিয়ে করতে পেরেছিলাম। কিন্তু তার সে সুযোগই ছিল না। তার গল্পটা আমাকে রীতিমতো স্তব্ধ করে দেয়। আমি অনেক দিন তার কথা ভেবেছি। আমি বাসায় এসে আমার স্বামীকে দেখি, যাকে আমি অনেক ভালবাসি। আমি ভেবে অবাক হই, রহিমা এখন কি করছে? তিনি এমন আরও দুই বিবাহিত কিশোরীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা সবে নিজের পরিবারের কাছে থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা শেষ করেছে।

তিনি বলেন, আমি সে দুই কিশোরীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তাদের স্বামীর প্রতি তাদের ভালবাসা জন্মাবে কিনা। ভালবাসার কথা শুনেই লজ্জায় তারা হেসে দিলো! এ থেকেই বোঝা যায় এখনও কতটা অপরিণত ও অসচেতন তারা! কিন্তু তিনি আরও দুই সচেতন কিশোরীর সঙ্গেও দেখা করেছেন, যারা নিজেদের নিয়ে অত্যন্ত সচেতন। তাদের সচেতনতার পেছনে কাজ করেছে প্ল্যান ইউকে। তাদের চিন্তাভাবনার সঙ্গে যুক্তরাজ্যের এক কিশোরী মেয়ের চিন্তাভাবনার মধ্যে পার্থক্য খুঁজে পাননি ফ্রোগাট।

তার মতে, প্ল্যান ইউকে হয়তো প্রতিটি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করতে পারছে না। কিন্তু তারা চেষ্টা করছে সমাজকে সচেতন করতে। হয়তো এর মধ্য দিয়েই একদিন বাল্যবিয়ের অভিশাপ নির্মূল হবে। প্ল্যান ইউকের সঙ্গে ফ্রোগাটের সম্পৃক্ততা বহুদিনের। সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে তিনি নিজেকে নিয়োগ করেছেন আর্তমানবতার সেবায়। তাঞ্জানিয়ার এক শিশুর ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছিলেন ফ্রোগাট। প্ল্যান ইউকের মাধ্যমে প্রায় ১১ বছর ধরে ওই খরচ বহন করছেন তিনি। বৃটিশ টিভি চ্যানেল আইটিভি’র জনপ্রিয় নাটক ডাউনটাউনে দারুণ অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন তিনি।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close