অন্য পত্রিকা থেকে

সক্রিয় তিন সিন্ডিকেট

নুর মোহাম্মদ: ১লা জানুয়ারি ঢাকঢোল পিটিয়ে সারা দেশে স্কুলে স্কুলে বই উৎসব উৎযাপন করে সরকার। অথচ এর এক দিন পরই কালোবাজারে উচ্চমূল্যে বিত্রিু হচ্ছে বিনামূল্যের পাঠ্যবই। রাজধানী বাংলাবাজার, নীলক্ষেত, মোহাম্মদপুরসহ কয়েকটি এলাকার লাইব্রেরি ঘুরে বই বিক্রির প্রমাণও পাওয়া গেছে।

আর এর পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে তিন সিন্ডিকেট। একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি), উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও স্কুলের কিছু অসাধু শিক্ষক মিলে চলছে বিনামূল্যের পাঠ্যবই বিক্রির ব্যবসা। তবে এনসিটিবির বিতরণ নিয়ন্ত্রক মোসতাক আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, কালোবাজারে বই বিক্রি রোধে গোয়েন্দা সংস্থাসহ আমাদের একটি ভিজিটিং টিম তৎপর রয়েছে। যারাই এই অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকবে তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কালোবাজারে প্রতিটি বই ১৫০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিশেষ করে চড়া দামে বই কিনছেন ইংলিশ ভার্সন, কিন্ডারগার্টেন ও বাংলা স্কুলে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের কিছু অভিভাবক। এই শ্রেণীর প্রতিষ্ঠান সরকার থেকে বিনামূল্যে বই পায় না। অথচ সরকারি কারিকুলামে তারা পাঠদান করে। শিক্ষার্থীরাও পেয়ে যায় সরকারি টাকায় ছাপা বই। এর পুরোটাই যায় কালোবাজার থেকে। ওই সব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিরা কালোবাজার থেকে বই কিনেন।

কিন্ডারগার্টেনসহ কিছু প্রতিষ্ঠান ভর্তি মওসুমে সিলেবাসের পুরো বই ফ্রি দেয়া হয় এ রকম বিজ্ঞাপনও দিয়ে থাকে। যদিও বিনামূল্যের বই তারা চড়া মূল্যে বিতরণ করে শিক্ষার্থীর কাছে। রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল ঘেষা লাইব্রেরিতে এখন মিলছে সরকারি বই। বৃহস্পতিবার সরজমিন রাজধানী আইডিয়াল স্কুলের পাশে ফেনী লাইব্রেরিতে এসব বই বিত্রিু হতে দেখা গেছে।

 

র্যাব বলছে, ত্রেুতা সেজে মোহাম্মদপুরে ইসলামিয়া লাইব্রেরীতে বই চাইলে দোকানের বিক্রেতা প্রতিটি বই ১২০ টাকা ধরে দাম চান। এর আগে তিনি নানা ধরনের প্রশ্ন করেন আমাদের। আমরা কি আসলে ক্রেতা নাকি গোয়েন্দা সংস্থার লোক তা নিশ্চিত হয়েই তিনি বই বিক্রি করতে রাজি হন এবং দাম চান।

 

মন্ত্রণালয় বলছে, প্রতিবছর বাফার স্টক বা আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ৫ শতাংশ বই অতিরিক্ত ছাপা হয়েছে। এবার ৩২ কোটি ৬৩ লাখ ৪৭,৬৭৪ কপি চাপাচ্ছে সরকার। সে অনুয়ায়ী এবার প্রায় ১ কোটি ৬৩ লাখ বেশি চাপানো হচ্ছে। আর এসব বই প্রয়োজন অনুয়ায়ী জেলা ও উপজেলায় স্টকে রাখা হয়। কিছু প্রতিষ্ঠানে চাহিদার চেয়ে বেশি বই প্রয়োজন হয় তখন বাফার স্টক থেকে দেয়া হয়। এছাড়া নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিশেষকালীন চাহিদা মেটানো হয় সেখান থেকে। এই বাফার স্টক থেকে বেশি বই কালো বাজারে যায় বলে সূত্র জানিয়েছে।

 

এনসিটিবি সূত্র বলছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুর নূর জাহান রোডে কয়েকটি লাইব্রেরিতে বিনামূল্যের পাঠ্যবই বিত্রিু করছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে সেখানে অভিযোন চালানো হয়। র‌্যাব-২ এর একটি টিম নিয়ে মঙ্গলবার এই অভিযান পরিচালনা করেন এনসিটিবি গবেষণা কর্মকর্তা আনিসুর রহমান। দলটি সেখানে থেকে সাড়ে ৫ হাজার সরকারি বইসহ ইসলামিয়া লাইব্রেরির ম্যানেজার নজরুল ইসলামসহ ১০ জনকে আটক করে। এ সময় পাঠ্যপুস্তক ছাড়াও লাইব্রেরি থেকে বিক্রি নিষিদ্ধ এরকম আরও ২,৭৭১টি গাইড ও নোট বই জব্দ করে।

এদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে বলে জানান র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান। তিনি জানান, বিনা মূল্যের এসব বই খোলাবাজারে বিত্রিু নিষিদ্ধ। তারপরও এসব বই কিভাবে সেখানে গেল- তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি জানান, সরকারের শুভ উদ্যোগকে ম্লান করতেই কালোবাজারি চক্রটি এসব বই খোলাবাজারে বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছিল। উদ্ধার করা বইয়ের মধ্যে কিছু লাইব্রেরিতে রাখা হলেও বেশির ভাগই ওই গুদামে লুকিয়ে রাখা ছিল।

র‌্যাব-২ এর অপারেশন অফিসার মারুফ হাসান লাইব্রেরির ম্যানেজারের বরাত দিয়ে জানান, বাংলাবাজার এলাকার বিভিন্ন দোকান ও ছাপাখানা থেকে এসব বই কেনা হয়। পরে তারা উচ্চমূল্যে বিক্রির জন্য তা দোকানে ও গুদামে রাখেন। র্যাবের কর্মকর্তা জানান, বাংলাবাজারে বিনামূল্যে বিতরণের বই কালোবাজারে ছাড়ার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। শিক্ষা ও প্রাথমিক মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, এনসিটিবি, প্রেস এবং লাইব্রেরিয়ান এই তিনটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব বই কালোবাজারি হয়।

প্রেস মালিকরা টেন্ডারের প্রাপ্ত বই চেয়ে বেশি বই চাপিয়ে এগুলো খোলাবাজারের বিত্রিু করে। কত প্লেট বই চাপানো হয়, এর খতিয়ান এনসিটিবি জমা দেয়া কথা থাকলেও বেশিভাগ প্রেস মালিকরা তা দেন না। আর তাদের এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডের জোগান দেন এনসিটিবির বিতরণ শাখার কিছু অসাধু কর্মকর্তা। এই বইগুলো চাহিদা দেয়া লাইব্রেরিতে পৌঁছে দেন প্রেস মালিকরাই।

 

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close