অন্য পত্রিকা থেকে

সব ক্ষমতা শিমুল বিশ্বাসের

নিউজ ডেস্ক: বিএনপির শীর্ষ থেকে তৃণমূল, সর্বত্র এই নাম এখন আলোচনায়। বিশেষ করে গত ২৪ জানুয়ারি আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু হলে মা খালেদা জিয়াকে দেখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফিরে আসার পর বিভিন্ন মুখরোচক আলোচনা-সমালোচনা এখন তাকেই কেন্দ্র করে। ওই দিন খালেদার কার্যালয়ে প্রবেশে বাধা দেওয়ার পেছনে একমাত্র কারণটি ছিলেন তিনি নিজেই।

দৃশ্যত খালেদার ইনজেকশন ঘুমকে কারণ হিসেবে বলা হলেও মূলত এর পেছনের কারণটি ভিন্ন। গত কয়েকদিন খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের অন্তত ১২ নেতাকর্মী এবং প্রভাবশালী গোয়েন্দাবাহিনীর নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ বিষয়গুলো ওঠে এসেছে। খবর বাংলা ট্রিবিউন।

জানা গেছে, শিমুল বিশ্বাসের ওপর নেতাকর্মীদের সন্দেহের চোখ চলতি মাসে অন্তত তিনবার তিনটি ঘটনার মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হয়েছে। একটি হচ্ছে ৩ জানুয়ারি খালেদার নয়া পল্টনযাত্রা ফাঁস, দ্বিতীয়টি হচ্ছে খালেদার সঙ্গে অমিত শাহের কথোপকথনের বিষয়টির ঘোষণা এবং সর্বশেষ খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে প্রবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাধা প্রদান। এই তিন কারণে শিমুল বিশ্বাসের ওপর সাধারণ থেকে শীর্ষ নেতারা সন্দিহান। তবে কার্যালয়ের আরও দুই কর্মকর্তার দিকে অভিযোগ ডানা মেলছে বলেও নিশ্চিত করেছে একাধিক রাজনৈতিক সূত্র।

জানা গেছে, গত ৩ জানুয়ারি অসুস্থ নেতা রুহুল কবির রিজভীকে দেখতে রাতেই খালেদা জিয়া নয়া পল্টনের কার্যালয়ে যাওয়ার সময় আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর বাধা দেওয়ার পর শিমুল বিশ্বাসের ওপর সন্দেহের তীর প্রথম আসে। এরপর থেকে অাজ পর্যন্ত খালেদা জিয়া তার গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবস্থান করছেন।

ওই ৩ জানুয়ারি রাতে খালেদা জিয়া নয়া পল্টনে যাবেন এবং ৫ জানুয়ারির পূর্বঘোষিত গণহত্যা দিবসের কর্মসূচি সমাবেশে বক্তব্য রাখবেন, এ বিষয়টি গুলশান কার্যালয়ের মাত্র দুজন কর্মকর্তা জানতেন। এর প্রথম ব্যক্তিটি হচ্ছেন শিমুল বিশ্বাস।

বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ম্যাডাম যাবেন, নয়া পল্টনে রওয়ানা হবেন, এ কথা তো কেউই জানতো না। তাহলে মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে পুলিশ আসল কীভাবে? উল্লেখ্য, ওই রাতে খালেদা জিয়া কার্যালয় থেকে বের হতে গেলে রাত সাড়ে ১১টার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গেটে তালা লাগিয়ে দেয় এবং নারী পুলিশরা অবস্থান নেয়। মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধানে পুরো কার্যালয় এলাকায় গোয়েন্দাসংস্থাসহ কয়েকশ’ পুলিশ অবস্থান নেয় এবং ট্রাক দিয়ে ৮৬ নম্বর রোডের উভয় পাশের সড়কটি বন্ধ করে দেয়।

নেতাকর্মীদের দাবি, খালেদা জিয়া গুলশান থেকে নয়া পল্টন যাবেন, এ কথাটি সিনিয়র নেতারাও জানতেন না। পরিকল্পনা ছিল, ওই রাতে গিয়ে নয়া পল্টনেই থাকবেন খালেদা জিয়া। এ কারণে ডিসেম্বরের শেষ দিকে নয়া পল্টনের দোতলার কার্যালয়টি ধোয়ামোছা করা হয়েছিল। তাদের প্রশ্ন, তাহলে কে ফাঁস করেছে খালেদা জিয়ার নয়া পল্টনে যাওয়ার পরিকল্পনাটি? এই সন্দেহের তীরও শিমুল বিশ্বাসের দিকে বলে দাবি নেতাকর্মীদের।

আলাপকালে আরও জানা গেছে, শিমুল বিশ্বাসের ওপর নেতাকর্মীদের সন্দেহ অনেক আগে থেকে বিরাজ করছে। তাকে একটি বড় বাহিনীর লোক এবং পাশ্ববর্তী একটি দেশের এজেন্ট হিসেবেও সন্দেহ করেন অনেকে। এ কারণে, দৃশ্যত খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারীর বেতনভুক্ত কর্মকর্তা হলেও কার্যত বিএনপিতে তিনি একটি আতংকের নাম। সরকারি দল আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতার সঙ্গেও দহরম মহরম সম্পর্ক। এ কারণে আওয়ামী লীগের এই ধারাবাহিক সরকারের সময়ে আদতে তার কিছুই হয়নি। অব্যাহত আছে তার পরিবহণ ব্যবসাও। সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে অদৃশ্য শক্তিশালী হিসেবে তার দাপট বিএনপিতে অনেক বেশি। এমনকি বাংলাদেশসহ একটি প্রভাবশালী দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক খুব ভাল থাকায় তার কোনও ক্ষতিও হবে না কখনও।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গত ২৪ জানুয়ারি আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর পর শনিবার রাতে শোকার্ত খালেদা জিয়াকে সান্ত্বনা দিতে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু তিনি কার্যালয়ে পৌঁছানোর মাত্র মিনিট তিনেক আগে কার্যালয়ের নিচে এসে সাংবাদিকদের জানান, খালেদাকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে পারবেন না। কারণ, প্রধানমন্ত্রী আসবেন, এ সংবাদটিও তাকে জানানো যায়নি।

যদিও ওই রাতে খালেদা জিয়ার প্রেসসচিব মারুফ কামাল খান জানান, প্রধানমন্ত্রী আসায় খালেদা তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। পরদিন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে যথাযথ সম্মান না দেওয়াটা সঠিক হয়নি। এমনকি সিনিয়র নেতারা জানতেন না যে, কার্যালয়ের গেটে তালা রয়েছে। এ বক্তব্যের পরই মূলত শিমুল বিশ্বাসের ওপর নেতাকর্মীদের সন্দেহ আরও মজবুত হয়।

তবে সোমবার বিকালে ঢাকা মহানগর আহ্বায়ক মির্জা আব্বাসের একটি বক্তব্যের পর থেকে সন্দেহ অারও মজবুত হয়। তিনি একটি নিউজ পোর্টালকে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীকে উপযুক্ত অভ্যর্থনা না দেওয়া এবং তাকে কার্যালয়ে না নিয়ে যাওয়া পুরোটাই কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের অর্বাচীনতা।

তিনি বলেন, কার্যালয়ে ওই সময় বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতারাই উপস্থিত ছিলেন। তাহলে কেন কর্মকর্তারা তাদের সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করেননি। একইসঙ্গে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) আসার পর কী করা উচিত সে সম্পর্কে নির্দেশনা নেওয়া। তা না করে সংশ্লিষ্টরা অর্বাচীনতার পরিচয় দিয়েছে। একইসঙ্গে তাদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড অপরাধ হিসেবেও মন্তব্য করেন মির্জা আব্বাস।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত শনিবার রাতে গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতা উপস্থিত ছিলেন। এদের মধ্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আর এ গণি, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান, শামা ওবায়েদসহ সিনিয়র কয়েকজন নেতা ছিলেন।

নেতাকর্মীদের দাবি, শিমুল বিশ্বাস অনেকটা উদ্দেশ নিয়েই প্রধানমন্ত্রীকে কার্যালয়ের ভেতরে নিয়ে যাননি। এমনকি সিনিয়র নেতাদের কাছেও বিষয়টি লুকিয়েছেন। তাদের দাবি, কার্যালয়ের ভেতরে প্রধানমন্ত্রীকে নেওয়া যেত এবং খালেদা জিয়াকে দেখানো যেত যে, তিনি ঘুমিয়েছেন। কারণ, প্রধানমন্ত্রীও একজন নারী।

বিষয়টি নিয়ে এ প্রতিবেদকের কথা হয় বাড্ডা এলাকার একজন ছাত্রদল নেতার সঙ্গে। তিনিও বলেন, টেলিভিশনে খবর দেখে ছুটে এসেছিলাম, দুই নেত্রীর দেখা হবে, সৌজন্যবোধ রক্ষা হবে, স্বস্তি আসবে।

কিন্তু ঠিক কোন ষড়যন্ত্রের কারণে ম্যাডামকে ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল, তা অজানাই রয়ে গেল।

কারণ হিসেবে ওই নেতার যুক্তি, ছেলের মৃত্যুতে অবশ্যই মায়ের মন ভেঙে যায়, কিন্তু ইনজেকশন দিয়ে ঘুমাতে দেওয়া হবে কেন? সাধারণত, খালেদা জিয়ার শরীর এমনিতেই দুর্বল। সেক্ষেত্রে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে তার শরীরের ক্ষতি ডেকে আনা হল না তো?

ঠিক তেমনি, খালেদা জিয়ার সঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির সভাপতি অমিত শাহের আলাপের বিষয়টিও প্রকাশ্যে জানানোর কিছু নেই। কথা হয়ে থাকলে দুই পার্টি প্রধানের ক্ষেত্রে হতেই পারে। কিন্তু এটিকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে জানানোর তো কিছু নেই। যৌক্তিকতাও নেই।

সূত্রের দাবি, অমিত শাহের সঙ্গে আলাপের বিষয়টিও শিমুল বিশ্বাসের পরামর্শে মারুফ কামাল করেছেন। ম্যাডামকে কিছু একটা বুঝিয়ে লোকমুখে ছোট করা হয়েছে বিএনপিকে। বিজেপি প্রধানের সঙ্গে আলাপের বিষয়টিও বিএনপি নেতারা জানতেন না এবং এটিও গোপন করা হয়েছিল। পরে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে খালেদা জিয়াকে। এমনকি গত সপ্তাহে সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলার আগেই মারুফ কামাল খান মাইক নিয়ে জানান, ম্যাডামের সংবাদ সম্মেলন এখানেই শেষ।

জানা গেছে, শিমুল বিশ্বাস আইনে পড়াশোনা করেছেন। জোট সরকারের সময়ে তিনি বিআইডব্লিউসির প্রধান ছিলেন। একইসঙ্গে তিনি অনেকগুলো পরিবহনের মালিক।

তার এক অনুরাগীর লেখা থেকে জানা গেছে, শিমুল বিশ্বাসের পূর্ব পুরুষেরা প্রায় দুশ’ বছর অাগে পাবনায় বাস করতেন। বিশ্বাস পরিবার পেশায় অভিজাত ভূ-স্বামী, জোতদার, সামন্ত শ্রেণিভুক্ত। কালে কালে তাদের জমির পরিমাণ এতো বেশি বেড়ে যায় যে, পাবনা শহরের পশ্চিম ও দক্ষিণ প্রান্তে পদ্মার তীর ধরে ১৭ মাইল দূরে পাকশীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পর্যন্ত জমি বিস্তৃত ছিল। এমনকি কুষ্টিয়া জেলা পর্যন্ত তাদের জমির মালিকানা বিস্তৃত ছিল। বিশ্বাস পরিবারের জমির পরিমাণ ছিল বেশ কয়েক হাজার বিঘা। শিমুল বিশ্বাসের এক নিকট আত্মীয় কমরেড মোশারফ হোসেন বিশ্বাস ছিলেন একজন নামকরা বাম রাজনীতিক। তিনি ছিলেন পাবনা জেলা পার্টির সবচেয়ে মাপের তাত্ত্বিক নেতা। পাবনা জেলায় বিশ্বাস পরিবারের ব্যাপ্তী বিশাল। কালে কালে কেউ কেউ মুসলীম লীগ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছেন।

তিনি লিখেছেন, শিমুল বিশ্বাস স্কুল জীবন থেকেই বাম ধারার বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরে এই রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে আশির দশকে পরিবহণ শ্রমিক সংগঠনে যোগ দেন। তখন থেকেই তিনি বিবদমান শ্রমিক সংগঠনগুলোকে একত্রিত করতে আত্মনিয়োগ করেন। শিমুল বিশ্বাস ২০০০ সালে বিএনপিতে যোগ দেন।

উল্লেখ্য, গত বছর অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের বড় ছেলে তানভীর রহমান বিশ্বাস ওরফে মিথুন বিশ্বাসের সঙ্গে পাবনা পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট তসলিম হাসান সুমনের মেয়ে তাহজিদ হাসান তরণীর বিয়ে হয়েছে।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close