ফিচার

মহানবী (সাঃ) কে নিয়ে আপত্তিকর কার্টুন এবং বাক স্বাধীনতা

আকবর হোসেন: আজকাল বাক স্বাধীনতা নিয়ে খুব বেশি মাতামাতি হচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপ আমেরিকায় এক রকম ঝড় বইছে। কোন রকমের বাধা-বিপত্তি ও সীমাবদ্ধতা ছাড়াই তারা লাগামহীনভাবে বাক স্বাধীনতার চর্চা করতে চায়। ইসলামের নবীকে নিয়ে তারা যা’ খুশি তা-ই করতে চায়। এতে মুসলমানরা আপত্তি তুললে, বিক্ষুব্ধ হলেই অমনি সবাই সমস্বরে আওয়াজ তুলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছে বলে।

মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) কে নিয়ে প্যারিসের চার্লি এবডোতে কার্টুন ছাপানোর সূত্র ধরে বর্তমানে এই বাক স্বাধীনতার ব্যাপক আলোচনা। ডেনিশ কার্টুনের পর প্যারিস কার্টুন। কিন্তু দুনিয়ার মুসলিম জনগোষ্ঠির কাছে নবীজিকে কোনভাবে অমর্যাদা করা কিংবা সম্মানহানিকর কোনকিছুই গ্রহণযোগ্য নয়। মুসলিম অমুসলিম সহ সারা বিশ্বের অগণিত মানুষ প্যারিস হত্যাকান্ডের নিন্দা জানিয়েছে। এই হত্যাকান্ডের কোন জাষ্টিফিকেশন নেই।

তবে কারো ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রপ করে পরিকল্পিতভাবে কোন ধর্মের অনুসারীদের উস্কে দেবারও কোন যুক্তিসঙ্গত অধিকার নেই। যারা অকারণে বাক স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে ইসলামের নবী, বিশ্ব মানবতার মুক্তি দিশারী আমাদের প্রিয় নবী রাহমাতুল্লিল আলামীন রাসুলে করীম (সাঃ) কে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রপ করছে, কার্টুন এঁকে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভ‚তিতে আঘাত হানছে তাদের এজেন্ডা আর যা-ই হোক তা’ মুসলিম বিরোধিতায় যে পূর্ণ তাতে কোন সন্দেহ নেই।

আমরা সবাই জানি ইহুদীদের বিরুদ্ধে কিছু বললে তা এন্টি সেমিটিজম, বর্ণের কারণে কাউকে বৈষম্য করলে তা বর্ণবাদী আচরণ কিন্তু ইসলাম মুসলিম নবী নিয়ে ব্যঙ্গ, ঠাট্টা-মস্কারা করলে তখন আসে ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশনের দোহাই। এই ডাবল ষ্ট্যান্ডার্ড আমাদের সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করছে। ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত দিলেও চুপ করে থাকার কথা বলা হচ্ছে। হ্যাঁ শান্তিপ্রিয় মুসলিম জনগোষ্ঠি চুপ করেই আছে। প্রতিবাদ করছে নিয়মতান্ত্রিকভাবে। কিন্তু যারা ধ্বংসাত্মক কাজ করছে তারা গোটা মুসলিম জনগোষ্ঠিকে প্রতিনিধিত্ব করে না। এখনতো রীতিমতো সন্দেহ সৃষ্টির কারণ তৈরি হয়েছে যে, প্যারিস হত্যাকান্ড যারা ঘটিয়েছে তারা আসলে মুসলমান কিনা! এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার কোন পাবলিক ইনকুয়েরি হয়েছে কিনা আমরা জানিনা।

উল্লেখ্য, লন্ডনে ৭/৭ বোম্বিংএরও কোন পাবলিক ইনকুয়েরি হয়নি যেমন হয়নি ৯/১১ এর। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) আমাদেরকে ক্ষমা ও মহানুভবতা শিক্ষা দিয়েছেন। যে বুড়ি রাস্তায় কাঁটা দিতো সে বুড়ি একদিন কাঁটা না দেয়ায় তিনি তাকে দেখতে গেলেন।এতো আক্রমণাত্মক হবার শিক্ষা এখানে নেই। এমনকি মক্কা বিজয়ের সময়েও তিনি ক্ষমার মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। অথচ এখন ইসলামের নামে কেউ কেউ শুধুই হত্যাকান্ডে মেতে উঠেছে। জঙ্গি কায়দায় নির্বিচারে হত্যাকান্ড চালিয়ে জিহাদ করছে!

কথা হচ্ছে শুধু ইসলামই নয়, কোন ধর্ম নিয়ে, তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে, ধর্মীয় মহাপুরুষদের নিয়ে যেনো ব্যঙ্গ বিদ্রপ কিংবা হাসি-তামাসা করা না হয়। মানুষের বাক স্বাধীনতা অবশ্যই থাকতে হবে। অন্যায় অসত্যের বিরুদ্ধে কথা বলার, প্রত্যেকের যার যার চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রয়োজন রয়েছে। আপত্তিতো উঠে তখন যখন কোন ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে অথবা ধর্মীয় বিষয়াদি নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রপ করা হয়। নবীরাসূলদের নিয়ে কাটুন বানিয়ে উস্কাকি দেয়া হয়।

আর এর বিরুদ্ধে বললেই তখন আসে বাক স্বাধীনতার শ্লোগান। মনে রাখতে হবে সব সময় সব কথা সব জায়গায় বলা যায়না। স্বাধীনতা থাকলেও অনেক কাজ করা যায় না। কারো চেতনা, বিশ্বাসে আঘাত দেয়ার নাম বাকস্বাধীনতা নয়। এরও একটি সীমারেখা থাকা উচিত। এই কথারই প্রতিধ্বনি তুলেছেন পোপ ফ্রান্সিস। তিনি বলেছেন, কোন ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে কেউ হাসি তামাসা করতে পারে না।

ফ্রিডম অব স্পীচ যদিও মৌলিক মানবাধিকার কিন্তু প্রত্যেকটি ধর্মেরই ্একটি মর্যাদা রয়েছে। এটা আমাদের মানতে হবে। এই বাউন্ডারীর বাইরে গেলে মানুষের মনে উত্তেজনা ছড়াবে এবং হিংসা-বিদ্বেষে ভরে যাবে এবং উস্কানীর কারণে বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসীদের মাঝে বিরাজমান শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বিনষ্টে ইন্ধন যোগাবে। একবার কার্টুন ছাপিয়েই ক্ষান্ত হয়নি আবারো ছেপেছে ইংরেজীসহ বিভিন্ন ভাষা। একটি অস্বস্থিকর পরিবেশের মধ্যে তারা মুসলিম কমিউনিটিকে ফেলে রাখতে চায়। মুসলিম নামধারী কেউ অপরাধ করলে তার ধর্মের নাম প্রকাশ পায় কিন্ত অন্য ধর্মের কেউ করলে ¯্রফে অপরাধী বলে প্রচার পায়।

এতে স্পষ্টই বোঝা যায় তারা উস্কানি দিয়ে বড় কোন অঘটন ঘটিয়ে ফায়দা লুটতে চায়। এর পেছনে ষড়যন্ত্র আছে! যে নবী গোটা বিশ্বের মানুষের জন্য মুক্তিদূত হয়ে আসলেন, যিনি দুনিয়ার মানুষকে শান্তির পথ দেখালেন, যাকে রাহমাতুল্লিল আলামীন করে আল্লাহতাআলা দুনিয়ায় পাঠালেন, যিনি সর্বশেষ নবী এবং আল্লাহর সেরা সৃষ্টি তাঁকে নিয়েই কিনা একদল বিকৃত মস্তিস্কের জ্ঞানপাপী ব্যঙ্গ-বিদ্রপ করছে! এতে করে তারা মনে করছে নবীজিকে অসম্মান করা হলো কিন্তু আল্লাহতাআলা তাঁর নবীকে যে সম্মানিত স্থানে রেখেছেন দুনিয়া ও আখেরাতে তার মর্যাদাহানি কেউই করতে পারবেনা। তখনও পারেনি এখনও পারবে না।

আজ দুনিয়ার নানা প্রান্তে নবীর নামে দরুদ পাঠ হচ্ছে, আজান হচ্ছে, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নাম ইথারে ইথারে ভেসে মানুষের কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হচ্ছে। প্রতিদিনই মানুষ শাহাদাহ দিচ্ছে। একথা কে না জানে যে অনেক অমুসলিম দার্শনিক, লেখক, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবি নবীজির ভ‚য়শী প্রশংসা করেছেন। তাঁকে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মানুষের স্থানে সমাসীন করা হয়েছে। ক‘জনের নাম নেবো? জর্জ বার্নাড শ’ তো বর্তমান ঝঞ্জাবিক্ষুব্ধ পৃথিবীতে নবীর নেতৃত্বের কথাই বলেছেন।

এর বিপরীতে দু’চারটি কার্টূন এঁকে, ব্যঙ্গ-বিদ্রপ করে তারা নিজেদেরই ক্ষতি করছে। রাসুল কিংবা রাসুলের উম্মতের কোন ক্ষতি হবেনা বলেই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। এ সকল ঘটনায় মানুষ নবীর কাছ থেকে দুরে যাবে না বরং নবীর প্রতি মানুষের মহব্বত, তাঁর জীবনাদর্শ অনুসরণ করা, জানা ও মানার প্রতি মানুষ দলে দলে শামিল হবে। যখনই এ রকম নবীবিদ্বেষী কিছু একটা ঘটে তখনই মনে করতে হবে যে, আমাদের নবীর বেশি করে তারাই প্রচার করে দিলো এবং তাঁকে জানার আরো একটি সুযোগ আসলো। এজন্য সকলকে ধৈর্য্য ধারণ করতে হবে এবং যারা বিপথগামী তাদের হেদায়েতের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করা উচিত। কোন ধরণের উস্কানীতে বিভ্রান্ত না হয়ে নবী যে শান্তি, মহানুভবতা ও মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছিলেন তাঁর সেই বৈপ্লবিক বাণী বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে এগিয়ে আসলেই নবীর প্রতি ঈমানের দাবীর যথার্থতা প্রমাণিত হবে।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close