অন্য পত্রিকা থেকে

রাজনীতির বেড়াজালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

নিউজ ডেস্ক: দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজনীতিবিদদের দ্বারা অনেক আগে থেকেই নিয়ন্ত্রিত। রাজনৈতিক নেতাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছায় পরিচালিত হয় প্রশাসন৷ ফলে পুলিশ-ব়্যাব কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বা নেবে না, তাও ঠিক করেন সরকার পক্ষের রাজনীতিকরা।

বাংলাদেশে স্বাধীনতা পরবর্তী সব সময়ই সরকারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। তারা সব সময়ই বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়েছে, মূলত সরকারকে খুশি করতে। এত কিছুর পরও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানদের কখনও রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে শোনা যায়নি৷ নিরবে কাজ করলেও মুখ খুলে কিছু বলেননি তারা৷ তবে এখন শুধু কাজ নয়, রাজনীতিবিদদের মতো বক্তব্যও দিচ্ছেন তারা। সরকার কতদিন ক্ষমতায় থাকবে, বিরোধী দল থাকবে কিনা – তাও বলছেন পুলিশ-ব়্যাব প্রধানরা।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নুরুল হুদা ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী আইনে বলা আছে, কে কতটুকু কথা বলতে পারবেন। আইনের বাইরে যাওয়ার কারো কোনো সুযোগ নেই৷ যদি কেউ বলেন, তাহলে তিনি তা নিজ দায়িত্বে বলবেন।’

তিনি বলেন, ‘তাই এখনকার ব়্যাব ও পুলিশ প্রধান যা বলছেন, তা তারা নিজ দায়িত্বেই বলছেন৷ তবে তারা যে সীমা অতিক্রম করে ফেলছেন, তা বোঝাই যাচ্ছে। তাদের উচিত রাজনৈতিক বিষয়ে কোনো বক্তব্য না দেয়া। তারা জনগণের ইচ্ছ-অনিচ্ছার প্রতিফলন ঘটাবেন। কিন্তু এখন যা ঘটছে তা দুঃখজনক।’

তিনি বলেন, ‘আমি যখন পুলিশ প্রধান ছিলাম তখন রাজনৈতিক সংস্কৃতি কিন্তু এরচেয়ে খুব একটা ভালো ছিল না৷ তারপরও আমি বা আমার আগে-পরে যারা ছিলেন, তারা কিন্তু রাজনীতি নিয়ে কথা বলতেন না।’

বুধবার কুমিল্লায় ‘নাশকতা প্রতিরোধ ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন’ বিষয়ক মত বিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ব়্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘খুন করে ক্ষমতায় যাবেন? শেইম, শেইম। আপনারা নিরীহ ও শান্তিপ্রিয় মানুষ খুন করে ক্ষমতায় যেতে চান? আমরা সহিংসতা সৃষ্টিকারীদের সমাজ থেকে বিদায় করবো। তাদের বিরুদ্ধে একাত্তরের পর আরেকবার একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ করতে হবে। সেই যুদ্ধে আপনারা সাধারণ জনগণ আমাদের পাশে থাকবেন। চৌদ্দগ্রামে যারা যাত্রীবাহী বাসে পেট্রোল বোমা মেরে সাতজনকে হত্যা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিশোধ নেওয়া হবে। তারা (হামলাকারী) পাকিস্তানের দোসর।’

একই অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘একটি লাশ পড়লে এর পরিবর্তে দুটি লাশ ফেলে দেয়ার ক্ষমতা পুলিশের আছে৷’ অবশ্য তারপরও অবশ্য মহাসড়ক পাহারা দিতে তিনি স্থানীয় জনগণকে অনুরোধ জানান।

এর একদিন আগে মঙ্গলবার পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক ঢাকার গাবতলীতে শ্রমিকদের সঙ্গে এক আলোচনা সভায় বলেন, ‘সন্ত্রাসীর কাছে সরকার হার মানবে না৷ সরকার যদি এদের কাছে আত্মসমর্পণ করে, তাহলে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে। আর তারপর আওয়ামী লীগও একই কাজ করবে।’

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘পুলিশ বা ব়্যাব প্রধান যে ভাষায় কথা বলছেন, সেটা প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মচারীর ভাষা নয়। তারা আওয়ামী লীগ নেতাদের মতো করে কথা বলছেন৷ এটা একেবারেই ঠিক নয়। রাজনীতি আর প্রশাসন এক হয়ে গেলে দেশের সামনে ভয়াবহ খারাপ উদাহরণ হয়ে যাবে। কিছুদিন পরে দেখা যাবে সচিবরাও রাজনীতির ভাষায় কথা বলছেন। তাতে আমলাতন্ত্র বলে কিছু থাকবে না৷ সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পর রুদ্ধ হয়ে যাবে।’

তাই তিনি পুলিশ ও ব়্যাব প্রধানদের রাজনীতির ভাষা ছেড়ে সাধারণ মানুষের পক্ষে কথা বলার অনুরোধ করেন।

হাফিজ উদ্দিন বলেন, ‘কয়েকদিন আগে ব়্যাব মহাপরিচালক রংপুরে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ২০১৯ সাল পর্যন্ত সরকার ক্ষমতায় থাকবে। এটা কি তার বলার কথা? কে কতদিন ক্ষমতায় থাকবে সেটা রাজনীতিবিদরাই ঠিক করবেন৷ তিনি কেন এটা করছেন?’

হাফিজ উদ্দিন বলেন, ‘রাজনীতিবিদরা এখন যে আচরণ করছেন, তা হয়ত এক সময় বদলে ফেলবেন৷ কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাঠামো একবার ধ্বংস হয়ে গেলে সেটা কিন্তু আর ঠিক করা যাবে না৷ ফলে সরকারের ঊর্ধতনদের উচিত পুলিশ ও ব়্যাব প্রধানকে সতর্ক করা৷ না হলে সামনে আরো খারাপ সময় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।’

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close