Featuredফিচার

জন্মদিনের মর্ম ব্যথা

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম হাবিবী: জন্ম মৃত্যু একটি মুদ্রার এ পিট ও পিট মাত্র। জন্মগ্রহণ করে আমরা মৃত্যুকেও গ্রহণ করেছিলাম সেই প্রথম দিন। প্রথম শ্বাসই মৃত্যুর শুরু। একজন গ্রাহককে মুদ্রাটির উভয় সাইডই গ্রহণ করতে হয়। কোন কোন দেশের মুদ্রায় এমন কিছু দৃশ্য বা ছবি থাকে যা অনেকেই গ্রহণ করতে চায় না কিন্তু নিতে বাধ্য হয়। মৃত্যুও সে রকম। আপনাকে মেনে নিতে হবেই, এখানে কোন অজুহাত দেখানো যায় না। মৃত্যু জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জীবনের চেয়ে মৃত্যুর মূল্য বেশী। জীবন তো যে কোন ভাবে কাটানো সম্ভব কিন্তু মৃত্যু যে কোন ভাবে হওয়াটা কাপুরুষতা ।

কুরআনের ব্যখ্যায় মৃত্যু জীবনের আগে সৃষ্টি হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়। মৃত্যু সত্য। সে কখনো প্রতারণা করে না। মৃত্যু আসে দ্রুত এবং বিনা নোটিশে।ইচ্ছে করলে আপনি কারো জন্য দরজা বন্ধ রাখতে পারেন কিন্তু মৃত্যুর দরজা কখনো কেউ বন্ধ করতে পারে নি। জন্ম মানেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেয়া। তাই ভূমিষ্ঠের সময় শিশুরা কাঁদে। আমরা কখনও নবজাতকের হাসি দেখি না। কারণ,তারা মাছুম-বেগুনা। তারা জীবনকে দেখে, মৃত্যুকে বুঝে।

আমরা যে দিকেই যাচ্ছি না কেন, সোজা হিসেবে প্রতি নিয়ত কবরের দিকেই ধেয়ে চলছি। আমার একটি গান এ রকম: ” সদাই তোরে ডাকেরে কবর, হাবিবী আছে কি খবর”।

জীবন বরফের মত গলতেই আছে। মানুষ বা সৃষ্টি জগত একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আসে । সময় শেষে চলে যেতে হয়। কুরআনের ভাষায়: “ইজা জা আজলুহুম লা ইয়াসতাখেরুনা ছাতাও ওলা ইয়াসতাকদেমুন”। আবার পৃথিবীকে একটি বাস বা ট্রেনের মতও বলা যেতে পারে, ধরে নেয়া যেতে পারে, মানুষ তার যাত্রী। বাস যেমন স্টেশনে এসে থেমে যায়, যাত্রী যায় নেমে, তেমনি এই পৃথিবীটা সৃষ্টি জগতের জন্য বাস স্বরুপ । সময় শেষে স্টেশনে এসে থেমে যেতে হবে। বাসের যেমন স্টেশন আছে জীবনেরও স্টেশন আছে। এর নাম কবর। বাসের টিকেটে যেমন দিন, তারিখ এবং এরিয়া উল্লেখ থাকে, জীবন নামক বাসও সে রকম।এর নাম আয়ু। ইউরোপের টিকেটে ‘জোন’ উল্লেখ থাকে তার বাইরে এক চুলও আপনি এগুতে পারবেন না । অনুরূপ জীবনেরও জোন আছে তার নাম মৃত্যু। তারপর অনন্তকাল আপনাকে একা একা চলতে হবে।পাড়ি দিতে হবে কবর, হাশর, পুলসিরাত, মিজান সহ অসংখ্য অজানা রাস্তা। এ পথে যেতেই হবে, এখানে আর কোন অপশন নেই । আমার লেখা একটি গানে আছে “বায়ুর বেগে ছুটছে রে ট্রেন থামবে গিয়ে স্টেশনে, তেমনি তোমার আয়ু ফুরায়, আছে কি তা তোমার মনে”।

নতুন বছর আসা মানেই তো জীবন থেকে কিছু সময়কে বিদায় করা। বিদায় মানেই তো বেদনা। জীবনটা বিয়োগ অংকের মত। যেমন আপনার 100 টি টাকা আছে, সেখান থেকে আপনি 50 টাকা হারিয়ে ফেলেছেন, হারানোটা আপনার জন্য কষ্টের। তেমনি একজন মানুষ 100 বছরের জন্যও যদি দুনিয়াতে আসে, সে যদি খেলায় হেলায় 50 বছর নষ্ট করে সেটা তার জন্য ক্ষতিকর। কারণ, জীবন তো সময়ের সমাহার মাত্র । সেকেন্ড, মিনিট এবংঘন্টা তো মাস এবংবছরের বংশধর। সেকেন্ড মিনিট নিয়েই তো ঘন্টা হয়,ঘন্টা হয় দিন। এভাবে সপ্তাহ, মাস, এবং বছর। কয়েকটি বছরের সম্মিলিত নামই তো জীবন। সে অর্থে কয়েক হাজার বা কয়েক কোটি সেকেন্ড বা শ্বাস প্রশ্বাসের নামই জীবন। সে জন্য বুদ্ধিমানের কাছে সেকেন্ডের দাম জীবনের দামের সমান।

তা হলে বুঝা গেল জন্মদিন পালন করা মানে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেয়া। সে হিসেবে জন্মদিন উপলক্ষ্যে আমাদের যেখানে কাঁদা উচিত সেখানে আমরা হাসি। কেকের উপর মোমবাতি জ্বালিয়ে আবার তা ফুৎকারে নিভিয়ে দেবার হাকিকত যদি মানুষ জানত তা হলে জীবন মৃত্যুর মারিফত কি তা বুঝতে পারত।

‘দুনিয়া’ আদনা শব্দ থেকে উদ্ভূত। আদনা মানে যে তুচ্ছ তা তো আমাদের জানা কথা।

একজন উর্দু কবি দুনিয়াকে বলছেন “মুসাফির খানা”। গেয়েছেন :এহি দুনিয়া মুসাফির হে/ওয়াহী আখের ঠিকানা, কোয়ি আগে রাওনা হে, কোয়ি পিছে রাওয়ানা।

মরনে ওয়ালা মর যায়ে গে/ রহনে ওয়ালা কৌই নেহি, রোনে ওয়ালা সব হে মগর, ছাত ) যানে ওয়ালা কৌই নেহি ।

আরবীতে একটি বয়েত আছে: “ইন্নামাদ্দুনিয়া ফানাউন/ লাইসা লিদ্দুনিয়া সুবুতুন / ইন্নামাল হায়াতাত দুনিয়া কা বায়তে আনকাবুতে”। অর্থ : নিশ্চয়ই পৃথিবী ধ্বংস শীলা । দুনিয়ার অস্তিত্ব নেই। দুনিয়ার জীবন মাকড়সার বাসার মত ।

আরেকটি আরবি বয়েত যেমন : “মাওতে কাসিন কুল্লে নাসিন শারেবুন/ কবরে বাইতিন কুল্লে মাইতিন দাখেলুন l পার্থিব জীবন মায়াবী ভোগ ছাড়া আর কিছুই নয়। ঘুম মৃত্যুর জমজ ভাই। আমরা ঘুমের নামে মরণের স্বাদ গ্রহণ করি। ঘুমের দোয়া আল্লাহুম্মা বিইসমিকা আমুতু ওয়া আহয়্যা।

এর অর্থ হচ্ছে, হে আল্লাহ! আমি তোমার নামে মৃত্যু বরণ করব এবং জীবিত হব ।

কুরআন, হাদিস, বাইবেল ও গীতার আলোকে লেখাটি আরও দীর্ঘ করা যায়। আশা করি তা অন্য কোন প্রবন্ধে উল্লেখ করার চেষ্টা করব ।

আসুন আমরা আমাদের জীবন তথা সময়ের মূল্য দিতে শিখি। হায়াতকে হায়াতদাতার কাজে ব্যয় করি। কিয়ামতের মাঠে সময় সম্পর্কে আমরা জিজ্ঞাসিত হব, তার জন্য প্রস্তুত থাকি। আমরা যা বলি, লিখি, গাই, করি, ভাবি সব কিছুই যেন তার জন্য হয় যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন।

এখন প্রশ্ন হলো আমি এ রকম একটি প্রবন্ধ লেখার যোগ্যতা রাখি কিনা।সোজা উত্তর হলো, রাখি।

কারণ, আমি আমার জীবনকে সুন্দর সৃষ্টির জন্য ব্যয় করার চেষ্টা করি, বই পুস্তক রচনা করে সমাজে বিনা মূল্যে বিতরণ করি, এতিম ছেলেমেয়ের খবরাখবর রাখি, বিনা পয়সায় লন্ডনে বয়স্ক এবং ছেলেমেয়েদেরকে আরবী ও বাংলাভাষা শিখাই, দেশে বিদেশে চ্যারিটিবল কাজ করি। এবং আজ থেকে 20 বছর আগে আমি আমার মায়ের পাশে নিজের জন্য কবর কিনে রেখেছি ।

এ প্রবন্ধের মাধ্যমে আমি আপনাকে সংসার বিরাগী হতে বলছি না । ইসলাম দুনিয়া এবং আখিরাতের মাঝামাঝি অবস্থান করে । আমি মৃত্যু বিষয়ক চিন্তার পাশাপাশি প্রচুর জীবনের কথা বলেছি। গান লিখেছি, গেয়েছি, নাটক লিখেছি, অভিনয় করেছি, 18 টির মত বই লিখেছি, বাংলাদেশ এবং ইংল্যান্ড থেকে উচ্চতর ডিগ্রী নিয়েছি এখন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধীনে পিএইচডি করার সুযোগ আল্লাহ পাক আমাকে দিয়েছেন।

লেখক: বাংলা ও আরবী শিক্ষক, গবেষক।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close