অন্য পত্রিকা থেকে

বয়স লুকিয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে কিশোরীরা

জেসমিন পাপড়ি: বেতন কতো ধারণা নেই। কী ধরনের কাজ করতে হবে জানেও না। অথচ হাতে ভিসা পাসপোর্ট নিয়ে জর্ডানের উদ্দেশ্যে প্লেনে চড়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রুমা আক্তার। গত শুক্রবার শারজাহ আসার পথে প্লেনে আমার সহযাত্রী ছিলো রুমা। মিষ্টি চেহারা। ছিপছিপে গড়ন। বয়স জানতে চাইলে ফিসফিসিয়ে বলল, আসল বয়স ১৫। দালালের সাহায্যে পাসপোর্টে ২৫ করে নেওয়া হয়েছে।

রুমার গন্তব্য জর্ডান। তার মতো অনেকেই এভাবে বয়স লুকিয়ে বেশি আয়ের আশায় পাড়ি জমাচ্ছে বিদেশে। অথচ সরকার বিদেশগামী নারীদের জন্য বয়স নির্ধারণ করেছে ২৫ থেকে ৪৫ বছর। সেই নিয়ম রক্ষা করতে তাই অনিয়মের আশ্রয়।

কিন্তু কতো সেই আয়- সঠিক ধারণা নেই রুমাসহ অনেকেরই। প্লেনে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে তেমনটিই জানা গেলো। শারজাহ বিমানবন্দরে নেমে বাংলাদেশি অপ্রাপ্তবয়স্কদের সংখ্যা আরো চোখে পড়ল। সবারই গন্তব্য জর্ডান, লেবানন বা কাতার। অনেকেরই আবার দুবাই।

দুবাই, কুয়েত, জর্ডান, লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নারী কর্মীদের কঠোর পরিশ্রম করানোসহ যৌন হয়রানি করা হয় বলে অভিযোগ আছে। এসব বন্ধে সরকার একদিকে যেমন স্বচ্ছ চুক্তির মাধ্যমে নারী শ্রমিক পাঠাচ্ছে, তেমনি তাদের বয়সসীমাও নির্ধারণ করে দিয়েছে।

রুমা জানায়, পরিবারের বড় সন্তান সে। স্কুলে গিয়েছিল কিছু দিন। তবে পড়ালেখা বেশিদূর এগোয়নি। দু’বছর ধরে তার বাবা তাকে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা করছিল। অবশেষে দালালের সহায়তায় সেই সুযোগ হয়ে গেল।

বিদেশে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশের নারীদের বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ থেকে ৪৫ বছর। তবে সেই নিয়মের তোয়াক্কা না করে, এমনকি কিশোরীরাও বয়স লুকিয়ে বিদেশে যাচ্ছে। বয়স কিভাবে বাড়ানো হলো- এমন প্রশ্নে রুমা জানায়, আমাদের কিছুই করতে হয়নি, দালালই সব ব্যবস্থা করেছে।

দালালের নাম বলতে অস্বীকৃতি জানায় রুমা। তবে মোট ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে দালাল তাকে বিদেশ আসতে সহায়তা করেছে বলে জানায় সে। অথচ একজন নারীকর্মীর বিদেশে আসতে কোনো অর্থই খরচ হওয়ার কথা নয়। কারণ, যাতায়াতসহ সব খরচ বহন করে তার নিয়োগকর্তা।

নিজেকে একটু বয়স্ক প্রমাণের জন্য বোরকা পরে রুমা। সঙ্গে বড়সড় একটি স্কার্ফ। এসবই করা হয়েছে দালালের পরামর্শে।

গৃহকর্মী হিসেবে বিদেশে যেতে কোনো প্রশিক্ষণ নিয়েছে কিনা জানতে চাইলে, রুমা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে। তবে ট্রেনিং সেন্টারের নাম জানতে চাইলে বলতে পারেনি। এমনকি কতো বেতন সেটাও জানে না এই কিশোরী। তার হাতে পাসপোর্টের সঙ্গে থাকা ইলেকট্রনিক ভিসার কপিতে দেখা যায়, দুই বছরের জন্য মাসে ১৭৫ ডলার বেতনে মালিক তাকে নিয়োগ দিতে রাজি হয়েছে। সেই বেতন পেয়ে দেশে কিভাবে পাঠাতে হবে সেটাও জানা নেই তার।

রুমার পাশেই পাওয়া গেল আরেক যাত্রীকে। নাম আমেনা। তারও গন্তব্য জর্ডান। বয়স ২৫ পেরিয়েছে। কিন্তু কোথায় ট্রেনিং নিয়েছেন বলতে পারলেন না, এমনকি বেতনটাও না। কী ধরনের কাজ করতে যাচ্ছেন জানতে চাইলে বললেন, ঘরদোর পরিষ্কার ছাড়া কী আর করাবে বাড়িতে!

এভাবেই অজ্ঞতাকে সঙ্গী করে রুমা, আমেনারা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। প্রতারিত হচ্ছে দেশে বিদেশে সবখানে।

রুমার কাগজটি হাতে নিয়ে ভাবতে থাকি, কিভাবে এই অল্প বয়সী মেয়েটি দেশের ইমিগ্রেশন পার হয়ে প্লেনে উঠেছে। অথচ আমার লিগ্যাল ভিসা থাকা সত্ত্বেও এক ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা আটকে দিয়েছিলেন ‘একলা মেয়ে মানুষ’ মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছি বলে।

ভাবনাগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে পৌঁছে গিয়েছিলাম শারজাহ বিমানবন্দরে। সেখানে অল্প বয়স্ক বাংলাদেশি মেয়েদের বিদেশ যাওয়ার হার চোখে পড়ার মতো। ট্রানজিট লাইন ক্রস করে জর্ডান, ওমান বা লেবানন যেতে বাংলাদেশি মেয়েদের লাইনে গিয়ে দেখা গেল, পাঁচ জনে এক জন করে কিশোরী দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু কারোরই পাসপোর্টে বয়স কম নয়। এদের সবারই গল্প এক। কোনো না কোনো দালালের হাত ধরে বয়স বাড়িয়ে অনেক আয়ের আশায় বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে তারা।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close