অন্য পত্রিকা থেকে

প্রতিটি দিনই হোক প্যারেন্টস ডে

প্রফেসর ডা. সামনুন এফ তাহা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার নবজাতক কাব্যগ্রন্থের প্রবীণ নামের কবিতা শেষ করেছেন এভাবে ওগো প্রবীণ, চলো এবার সকল কাজের শেষে/নবীন হাসি মুখে নিয়ে চরম খেলার বেশে। কবিতায় তিনি বলেছেন, আশি বছর বয়সী এক পিপুলগাছের কথা, আশ্বিনের রোদ্দুরে যে বিপুল নাচে, পাতায় পাতায় চলে আবোলতাবোল দোলাদুলি। প্রাণশক্তি তো এখানেই। বয়সের কিছু সংখ্যা কি আর প্রাণচাঞ্চল্যকে থামিয়ে দিতে পারে?

প্রবীণ মানে কি তথাকথিত স্টেরিওটাইপ, ‘বুড়োটা আর কী বুঝে’? নাকি প্রবীণ সত্তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ ভার। জীবনযাত্রার দীর্ঘ পথচলায় অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ প্রবীণরাই তো নবীনদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারেন। দেখাতে পারেন পথ। প্রবীণ সমাজের অভিজ্ঞতাকে আমরা কীভাবে কাজে লাগাব সেটিই হচ্ছে কথা। দীর্ঘদিন ধরেই প্রবীণ নাগরিক বা সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য আলাদা সুযোগ-সুবিধা রাখার দাবি করা হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে।

যে মানুষগুলো সারাটা জীবন কাজ করেছেন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য, বর্তমানের সকল প্রাপ্তি যাদের কল্যাণে, তাদের প্রতি আমাদের করণীয় অনেক। আশার কথা, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ষাট বছর ও তার বেশি বয়সীদের সিনিয়র সিটিজেন অর্থাৎ জ্যেষ্ঠ নাগরিক ঘোষণা করা হয়েছে।

গত ২৭শে নভেম্বর বৃহস্পতিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ এ ঘোষণা দিয়েছেন। এ ঘোষণার ফলে দেশের ১ কোটি ৩০ লাখ সিনিয়র নাগরিক সব ধরণের পরিবহনে কম ভাড়ায় যাতায়াত, হাসপাতালে সাশ্রয়ী মূল্যে আলাদা চিকিৎসাসেবা, আলাদা বাসস্থান সুবিধাসহ বিভিন্ন সরকারি সুবিধা পাবেন।

প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ‘সমাজ ও রাষ্ট্রে বয়স্ক ব্যক্তিদের অবদান অপরিসীম। জীবনের শেষ প্রান্তে উপনীত হয়ে তারা যাতে মর্যাদা, স্বস্থি ও নিরাপদে জীবন যাপন করতে পারেন, তার সব ব্যবস্থা আমাদের করতে হবে। হাসপাতাল, ব্যাংক, অফিস-আদালতসহ নাগরিক সেবার সর্বক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।’ এ বিষয়গুলো কেবল ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বাস্তবায়নের জন্য চাই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। সিনিয়র সিটিজেনদের ব্যাপারে ঘোষণা দিতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট চমৎকার একটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, ‘প্রবীণ জনগোষ্ঠী আমাদের গুরুজন এবং পথপ্রদর্শক। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, দেশে মৃত্যুহার কমে যাওয়ায় প্রবীণদের সংখ্যা বাড়ছে। ১৯৯০ সালে প্রবীণদের সংখ্যা ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ২০০১ সালে তা বেড়ে ৬ দশমিক ৯৮ শতাংশে দাঁড়ায়। আগামী ২০৫০ সালে প্রবীণদের সংখ্যা বেড়ে মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ হবে। প্রবীণদের সিনিয়র সিটিজেনের স্বীকৃতি দিতে ২০১৩ সালের ১৭ই নভেম্বর জাতীয় প্রবীণ নীতিমালার খসড়া অনুমোদন করে সরকার। জাতীয় অধ্যাপক ডা. এম আর খানকে সভাপতি করে একটি কোর কমিটিও গঠন করা হয়।

নীতিমালায় বেশ কয়েকটি বিষয় অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম-সরকারি আবাসনের ক্ষেত্রে প্রবীণদের স্বচ্ছন্দে থাকার জন্য আলাদা কক্ষও তৈরি করা হবে। পর্যায়ক্রমে বেসরকারি আবাসনের ক্ষেত্রে নতুন করে তৈরা করা আবাসিক ভবনে প্রবীণদের জন্য আলাদা কক্ষ রাখার ব্যবস্থা নেয়া হবে। পাইলট প্রকল্প হিসেবে দেশের বিভাগীয় পর্যায়ের ১২টি শিশু-পরিবারকে আবাসন ও কর্মসংস্থানের জন্য বেছে নেয়া হয়েছে। পাইলট প্রকল্পের পর পর্যায়ক্রমে দেশের ৮৫টি শিশু-পরিবার এবং বিভিন্ন স্থানে যৌথ বিনিয়োগে ওল্ড হোম বা শান্তিনিবাস নির্মাণ করা হবে।

প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানসহ তাদের যতœ নেয়া ছিল আমাদের প্রচলিত মূল্যবোধের ঐতিহ্যগত অংশ। কিন্তু বর্তমানে আর্থ-সামাজিক নানা কারণে যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে যাচ্ছে। প্রবীণদের প্রতি সহানুভূতি কমছে, বাড়ছে অবহেলা; তারা শিকার হচ্ছেন নানাবিধ বঞ্চনার। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে প্রবীণরা নিজ পরিবারেই ক্ষমতা ও সম্মান হারাচ্ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে একাকিত্বে জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন এই বিষয়ে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে।

আশার কথা হচেছ সরকার বড় বড় হাসপাতালে আথ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, হৃদরোগসহ বয়স্কদের বিভিন্ন রোগ নিরাময়ের জন্য জেরিয়েট্রিক মেডিসিন বিভাগ খোলার ঘোষণা দিয়েছেন। প্রাথমিক ভাবে বাংলাদেশের ৯০টি হাসপাতালে এই বিভাগ স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রাথমিক ভাবে প্রতিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে এক লাখ করে টাকা দেয়া হবে। ওই টাকায় তারা প্রবীণদের জন্য আলাদা কর্নার, বেড ও স্বল্পমূল্যে ওষুধের ব্যবস্থা করবেন।

অ্যাকশন প্ল্যানে সরকারি-বেসরকারি ভবনে প্রবীণদের ব্যবহার উপযোগী আলাদা কক্ষ রাখতে বলা হয়েছে।সব ধরনের পরিবহনে প্রবীণদের জন্য আসন সংরক্ষণ ছাড়াও স্বল্পমূল্যে ভ্রমণের ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান। প্রবীণদের কাছ থেকে বিমানের ভাড়াও যেন কম রাখা হয় সেই প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস’র মতে – দেশে মৃত্যুহার কমে যাওয়ায় প্রবীণদের সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে দেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ ভাগ, অর্থাৎ ১ কোটি ৩০ লাখ নাগরিক প্রবীণ। ২০২৫ সাল নাগাদ এ সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ এবং ২০৫০ সালে প্রায় ৪ কোটি। ২০৫০ সাল নাগাদ এ দেশের প্রায় ২০ ভাগ নাগরিক হবেন প্রবীণ। এ হিসাবে আগামীতে দেশের আর্থ-সামাজিক ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বার্ধক্যই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আমাদের সকলের মনে রাখতে হবে ‘প্রবীণ জনগোষ্ঠী আমাদের গুরুজন এবং পথ প্রদর্শক। তাদের যথাযথ মর্যাদা, খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, বসবাসের সুবিধাসহ সামাজিক সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সকলকে আন্তরিক হতে হবে। ‘আমাদের ঐতিহ্যগত পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় করতে হবে। পাশাপাশি শৈশব থেকেই শিশুদের গুরুজনদের সম্মান করার সুমহান শিক্ষা দিতে হবে।

এটাই আমাদের চিরকালীন ঐতিহ্য বলেও উল্লেখ করেন তিনি। যারা এ সমাজ গড়ছেন, তাদের শেষ জীবন স্বস্তিময় করতে সন্তানদেরই দায়িত্ব নিতে হবে। ‘পরিবারই প্রবীণ নাগরিকের সবচেয়ে স্বস্থিময় ও নিরাপদ স্থান। এ কারণে পরিবারে যাতে প্রবীণ ব্যক্তিরা স্বাচ্ছন্দ্য ও মর্যাদার সাথে অন্য সদস্যদের সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করতে পারেন, তার দায়িত্ব সন্তানদের নিতে হবে। পশ্চিমা দেশগুলোর মতো নির্ধারিত দিনে ‘ফাদারস ডে’ বা ‘মাদারস ডে’ উদযাপন না করে বাংলাদেশে প্রতিটি দিন প্রতিটি পরিবারে উদযাপিত হোক ‘প্যারেন্টস ডে’।

লেখক: প্রবীণরোগ বিষেশজ্ঞ. এমবিবিএস (ঢাকা), এমআরসিপি (ইউকে), ডিপ্লোমা ইন জেরিয়াট্রিক মেডিসিন (লন্ডন)

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close