Featuredফিচার

কেউ হারেননি, হাসিনা-খালেদার নমনীয়তায়: রাজনীতিতে শান্তির সুবাতাস

ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান: টানা ৯২ দিন গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ থাকার পর রোববার ২০ দলীয় জোট নেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া আদালত থেকে জামিন নিয়ে নিজ বাসায় ফিরেছেন। এ নিয়ে দেশের রাজনীতিতে হার-জিতের নানা হিসাব-নিকেশ চলছে।

মহাজোট সরকার পক্ষের লোজকন ও তাদের আস্থাভাজন বুদ্ধিজীবীরা বলছেন, শেখ হাসিনার কৌশলের কাছে খালেদা জিয়া পরাজিত হয়ে ঘরে ফিরে গেছেন। অনেকে আবার খালেদা জিয়ার ঘরে ফেরাকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেও দেখছেন। আবার অনেকের মতে, শেখ হাসিনা-খালেদা জিয়া কেউ হারেননি আবার কেউ বিজয়ীও হননি।

বরং খালেদা জিয়া বাসায় ফেরার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ তিন মাসের রাজনৈতিক সংকটের একটা সাময়িক সুরাহা হয়েছে। রাজনীতিতে সমঝোতার একটা পথ তৈরি হয়েছে। এখন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঠিক রাখার দায়িত্ব বর্তায়েছে সরকারের উপর। কেননা, এতোদিন সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা বলে এসেছিলেন- হরতাল-অবরোধ ও সহিংসতার পথ পরিহার না করা পর্যন্ত বিএনপির সাথে কোনো ধরনের সংলাপ হবে না।এখনতো ২০ দলীয় জোট সেই পথ প্রশ্বস্ত করেছে, তাই সংলাপের মাধ্যমে রাজনীতিতে সমঝোতার জন্য বড় ধরনের একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। অন্যথা সরকারের ভুল পথে পা বাড়ানো হবে এমনটিই মনে করছেন অনেকে ।

এদিকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে জাতীয় রাজনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করে। প্রায় তিন মাস ধরে বিরোধী জোটের যে রাজনৈতিক আন্দোলন চলছিল, ইতোমধ্যেই সেই আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়েছে।২৪ মার্চ, ২০১৫ থেকে বিএনপি-জামায়াত জোটের আন্দোলন কর্মসূচি তিন সিটিতে হরতাল আপাতত স্থগিত করা হয়।এছাড়া পুরো আন্দোলনও স্থগিত করার ইঙ্গিত মিলেছে জোটের পক্ষ থেকে।এরই অংশ হিসেবে খালেদা জিয়া

রোববার নিজ কার্যালয় থেকে ঘরে ফিরে গেছেন।এটাকে সরকারপক্ষের লোকজনের বাঁকা চোখে দেখার কিছুই নেই। বলতে গেলে এক্ষেত্রে খালেদা জিয়া দেশ-জাতি ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বার্থের কথা বিবেচনায় এক ধরনের ছাড় দিয়েছেন।

অন্যদিকে সরকারও কিছুটা নমনীয়তার উদাহরণ স্থাপন করেছে। যেমনটি বলা যায়- দীর্ঘদিন পর বিএনপির কার্যালয়ের তালা খুলে দেয়া,নির্বিঘ্নে খালেদা জিয়াকে আদালতে যাওয়া-আসার সুযোগ দেয়া, যথাযথ প্রক্রিয়ায় আদালত থেকে জামিন লাভ ইত্যাদি। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে সরকারও কিছুটা আগের অবস্থান পরিবর্তন করে শক্তি প্রয়োগের রাজনীতি থেকে সরে এসে গণতন্ত্রের পথে পা বাড়িয়েছে। এটা আমাদের রাজনীতির জন্য খুবই শুভ লক্ষ্ণ বলা যেতে পারে। আর এই ধারা অব্যাহত থাকলে আশা করা যায়- অচিরেই আমাদের দেশে আবারও পুরোপুরি শান্তি ফিরে আসবে।

গত দুই দিনের পরিস্থিতিই আমাদের সে ধরনের ইঙ্গিতই দেয়। কেননা, বিরোধী জোট ও সরকার পক্ষের সামান্য নমনীয়তায় লক্ষ্য করা গেছে দেশের সর্বত্রই এক ধরনের শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। মানুষের মধ্যে অন্যরকম এক সস্তির নি:শ্বাস, শান্তির আভা বইছে। কেননা, ক’দিন আগেও যেখানে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, মানুষের জানমাল হুমকির মুখে ছিল। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিল গোটা দেশ। সেই উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা কিছুটা হলেও কেটেছে । এখন গোটা দেশবাসী আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর

স্বপ্ন দেখছে। গত তিন মাসের বিশাল ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার স্বপ্ন দেখছেন তারা। প্রত্যাশা করছেন, দেশে আবারও গণতান্ত্রিক রাজনীতির সংস্কৃতি ফিরে আসবে। ফলে জনগণের এই প্রত্যাশাকে উভয়পক্ষের মূল্যায়ন করতে হবে। অন্যথা এর খেসারত আমাদের সবাইকে ভোগ করতে হবে। তবে সরকার ও তাদের পক্ষের লোকজন যদি বিরোধী জোটের এই নমনীয়তাকে ভিন্নভাবে দেখে তাদেরকে আবারো আন্দোলনের দিকে ক্ষেপিয়ে তুলে তবে সেটা হবে তাদের বড় ধরনের ভুল। ইতোমধ্যে সরকারপক্ষের লোকজনকে বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া এবং বিরোধীজোটকে হেয় করে নানা কথা বলতে শোনা যাচ্ছে। যেমনটি বলা যায়- রোববার রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে ‘অবরোধ-

হরতালে মানুষ পুড়িয়ে মারার অভিযোগে খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে রাজপথে অবস্থান’ শীর্ষক গণপদযাত্রা কর্মসূচির উদ্বোধন শেষে সংগঠনের আহ্বায়ক ও নৌমন্ত্রী শাজাহান খান খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, একটা শ্লোক আছে, ‘সেই তো নথ খসালি, কেন লোক হাসালি’।

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান আরো বলেছেন, খালেদা জিয়া বলেছিলেন, বিজয় অর্জন না করে ঘরে ফিরবেন না। এখন পরাজিত হয়ে লেজ গুটিয়ে বাসায় গেছেন। দেশে অবরোধ উনি গাড়ি নিয়ে আদালতে গেলেন। নিজের ডাকা অবরোধ নিজে ভেঙ্গেছেন। এখন হরতাল-অবরোধ দিয়ে মানুষ খুন করেন

একই অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, আমরা বিপদমুক্ত নই। জঙ্গিবাদী,আগুন সন্ত্রাস ও বেগম খালেদা জিয়াকে আলাদা আলাদা দেখার সুযোগ নেই। সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘোষণা করা হলেও খালেদা জিয়া আগুনে পোড়া কর্মসূচি বন্ধ করেনি। তারা সিটি নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করুন আর না করুন, আগুন সন্ত্রাসী খালেদা জিয়াকে বিচারের কাঠগড়ায় দাড় করানো হবে।

এছাড়া সংসদের বাইরে-ভেতরেও বেগম খালেদা জিয়া ও ২০ দলীয় জোটকে লক্ষ্য করে মন্ত্রী-এমপিরা উস্কানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন। এধরনের বক্তব্য শান্তির পথে বাঁধা। ফলে এগুলো পরিহার করা উচিত। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির আরো উন্নতি ঘটাতে হলে মন্ত্রী-এমপি ও নেতানেত্রীদের এধরনের অকথন ও উস্কানিমূলক বক্তব্য ছেড়ে গণতান্ত্রিক আচরণ করতে হবে।

দেশে পুরোপুরি শান্তি ফিরিয়ে আনতে সরকার কতটা আন্তরিক তা বুঝা যাবে সরকারের কর্মকাণ্ডেই। সামনে ৩ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। উভয়পক্ষই এ ব্যাপারে বেশ তৎপর হয়ে উঠেছে। উভয়পক্ষেই এই নির্বাচন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ীই অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আগ্রহী।

কিন্তু এই নির্বাচন কতটা শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু হবে এ বিষয়ে অবশ্য সংশয় বিরাজ করছে জনমনে। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করার বিষয়ে আশ্বস্ত করলেও বিরোধীরা এ বিষয়ে নানা অভিযোগ করে আসছেন। তাদের মতে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, যুগ্ম-মহাসচিবসহ উঁচুস্তরের বহু নেতা জেলে আটক আছেন। যুগ্ম-মহাসচিব সালাউদ্দিন আহমদ নিখোঁজ। হাজার হাজার নেতাকর্মি জেলে বন্দি এমন এক পরিস্থিতি তাদের জন্য অনুকূল নয়। তারা লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির জন্য আহবান জানিয়েছেন। এখন দেখার বিষয় নির্বাচন কমিশন ও সরকার কতটা সাড়া দেয় বিএনপির এই আহবানে।

এই নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে অনুষ্ঠিত হয় এর উপরও নির্ভর করছে দেশের আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে নির্বাচন হলে রাজণৈতিক পরিস্থিতির আরো উন্নতি হবে এমনটিই আশা করা যায়। অন্যথা, যে কোনো সময় পরিস্থিতি আরো সংঘাতময় হয়ে উঠতে পারে। আমরা জানি এ নির্বাচনে সরকার পরিবর্তিত হবে না।

তবে ভোটাররা যেন নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন এমনটিই প্রত্যাশা সবার। সুষ্ঠু-সুন্দর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা জয়লাভ করলে এতে কারো অবাক হওয়ারও কোনো কারণ নেই। এক্ষেত্রে সবার প্রত্যাশা নিকট অতীতে ৬টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন যেভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছে সেভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রামের নির্বাচনগুলো হোক। সবশেষে বলবো- বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বাসায় ফেরা নিয়ে রাজনীতিতে হার-জিতের হিসাব নয়, উভয়পক্ষের সামান্য নমনীয়তায় দেশে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছে এটাই জনগণের কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়। আগামী দিনেও এই শান্তি বজায় থাকুক এমনটিই প্রত্যাশা দেশবাসীর। এজন্য সরকার ও বিরোধী জোট দেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বজায় রাখতে আরো দায়িত্বশীল ভুমিকা রাখবেন বলেই আমরা আশা করি।

লেখক: শিক্ষা ও সমাজ বিষয়ক গবেষক। ই-মেইল: sarderanis@gmail.com

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close