Featuredফিচার

সিটি নির্বাচনে দু’পক্ষের চ্যালেঞ্জ ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান: ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে জাতীয় রাজনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। প্রায় তিন মাস ধরে বিরোধী জোটের যে রাজনৈতিক আন্দোলন চলছিল, ইতোমধ্যেই সেই আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়েছে।২৪ মার্চ, ২০১৫ থেকে বিএনপি-জামায়াত জোটের আন্দোলন কর্মসূচি তিন সিটিতে হরতাল আপাতত স্থগিত করা হয়েছে।এছাড়া পুরো আন্দোলনও স্থগিত করার ইঙ্গিত মিলেছে জোটের পক্ষ থেকে।ফলে বলা যায়-সব দলই এখন নির্বাচনমুখী।

যদিও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন স্থানীয় সরকারের নির্বাচন, এ নির্বাচনের সাথে জাতীয় রাজনীতির কোনো সম্পর্ক থাকার কথা নয়, তবুও এই নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক তৎপরতার কোনো কমতি নেই। সংবিধানের রীতি অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচন রাজনীতিরবাইরে থাকার কথা।

কিন্তু তা হয়নি। পরিস্থিতির আলোকে বলা যায়- এ নির্বাচন এখন পুরোটাই রাজনীতিকরণ হয়ে গেছে। শুধু জাতীয় রাজনীতির প্রতীক নেই, আর সবই আছে এতে । কেননা, দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী নিজেই যেখানে প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন সেখানে আর রাজনীতিকরণের বাকী থাকে কোথায়?

এখানেই শেষ নয়, এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি বেশ তৎপর হয়ে উঠেছে। উভয়েই এই নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ

করেছে। এই চ্যালেঞ্জ আবার নাগরিক সেবা বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ নয়, জেতার

চ্যালেঞ্জ। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং এই নির্বাচনকে

চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করার জন্য নেতাকর্মিদের প্রতি আহবান

জানিয়েছেন।অন্যদিকে বিরোধী জোটের রাজণৈতিক গুরু হিসেবে পরিচিত

পেশাজীবী নেতা অধ্যাপক ইমাজ উদ্দীন আহমেদ বলেছেন, এই নির্বাচনে

জিততে না পারলে বিরোধীদের আরো বেশী দুর্ভোগ পোহাতে হবে।

এছাড়া বিরোধী জোটের অন্যান্য নেতাদের কথা-বার্তায়ও এই নির্বাচনকে

চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করার বিষয়টি ফুটে উঠেছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে রাজনীতিকরণ ও জাতীয় রাজনীতির সাথে

সম্পৃক্ত হবার কারণে আজ এই নির্বাচন বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পরিস্থিতির আলোকে মনে হচ্ছে এই নির্বাচন এখন উভয়পক্ষের জন্যই

প্রেস্টিজ ইস্যু। ফলে উভয়পক্ষই এ ব্যাপারে বেশ তৎপর হয়ে উঠেছে।

উভয়পক্ষেই এই নির্বাচন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ীই অনুষ্ঠানের ব্যাপারে

আগ্রহী। ফলে ধারণা করা যায়- এই নির্বাচন যথাসময়েই অনুষ্ঠিত হবে।

কিন্তু এই নির্বাচন কতটা শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু হবে এ বিষয়ে অবশ্য সংশয়

বিরাজ করছে জনমনে। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন

সম্পন্ন করার বিষয়ে আশ্বস্ত করলেও বিরোধীরা এ বিষয়ে নানা

অভিযোগ করে আসছেন। তাদের মতে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব,

যুগ্ম-মহাসচিবসহ উঁচুস্তরের বহু নেতা জেলে আটক আছেন। যুগ্ম-মহাসচিব

সালাউদ্দিন আহমদ নিখোঁজ। হাজার হাজার নেতাকর্মি জেলে বন্দি এমন এক

পরিস্থিতি তাদের জন্য অনুকূল নয়। তারা লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির

জন্য এবং সরকার পন্থী প্রার্থীদের ব্যাপারে নির্বাচন আচারণ বিধি

লঙ্ঘনের অভিযোগ করে আসছেন।বলা যায়, নির্বাচনের দিন যত এগুচ্ছে

পরিস্থিতি ততই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ফলে নির্বাচন কমিশন যতটা সহজে

বলছে, সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিস্থিতির আলোকে মনে হচ্ছে

এবার ততটা সহজ হবে না। যে কোনো সময় পরিস্থিতি সংঘাতময় হয়ে

উঠতে পারে।

 

তবে এটা অবশ্য নতুন কিছু নয়, এরশাদ আমল থেকেই স্থানীয় সরকার

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব-সংঘাত হয়ে আসছে। রাজনৈতিক

কূটকৌশলের সঙ্গে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন যুক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে

প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্থানীয় সরকার তার নিজস্ব গৌরবে প্রতিষ্ঠিত হতে

পারেনি। ফলে নাগরিক সেবা বৃদ্ধির প্রয়াসও সফল হয়নি।

এ নিয়ে বহু তর্ক বিতর্ক থাকলেও সবচেয়ে আশার দিক হলো- দীর্ঘদিন

পর ঢাকাবাসী তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি পেতে যাচ্ছেন। দুটি নগরীতে

নির্বাচন হলেও মূলত: নির্বাচন হবে ৩টি সিটি কর্পোরেশনের। যেহেতু ঢাকা

সিটি কর্পোরেশনকে উত্তর ও দক্ষিণে ভাগ করা হয়েছে, সেহেতু ঢাকাবাসীরা

দু’জন মেয়র এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলরদের পেতে যাচ্ছেন।

এই নির্বাচনে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলই কম-বেশি উৎসাহ প্রদর্শন

করেছে। অনেকেই ভেবেছিলেন দল হিসেবে বিএনপি এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ

করবে না।

 

কিন্তু সবার সেই ধারণা পাল্টে দিয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন

নির্বাচনে সাবেক মেয়র মনজুরুল আলমকে সমর্থন জ্ঞাপন করে বিএনপি

নীতিগতভাবে এই নির্বাচনে জড়িয়ে গেছে। তবে ঢাকার ক্ষেত্রে এখনো

জানা যায়নি বিএনপি কোন কোন প্রার্থীকে সমর্থন করবে। যাকেই

সমর্থন করুক না কেন, বিএনপি এখন নির্বাচনমুখী।

 

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ অনেক আগেই তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।

ঢাকা ও চট্টগ্রামে কোন কোন মেয়র প্রার্থীকে তারা সমর্থন দিচ্ছে

তা ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়ে গেছে। সুতরাং এদিক থেকে আওয়ামী লীগ সমর্থিত

প্রার্থীরা বেশ কিছুটা এগিয়ে আছে। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার অনেক

আগেই ঢাকা পরিণত হয়েছিল বিলবোর্ডের নগরীতে। এ নিয়ে সুধী সমাজের

পক্ষ থেকে এর বিরুদ্ধে সমালোচনা ও প্রতিবাদ হয়েছে। একপর্যায়ে দেখা

গেল, কিছু বিলবোর্ড নামিয়ে ফেলা হচ্ছে। এভাবে আগাম প্রচারণা একটি

সুষ্ঠু ও সার্থক নির্বাচনের জন্য কতটুকু সহায়ক তা অবশ্য প্রশ্নবিদ্ধ

বিষয।

 

আমরা সবাই জানি, এ নির্বাচনে সরকার পরিবর্তিত হবে না। তবে

ভোটাররা যদি নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন তাহলে

অবাক হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। সুষ্ঠু-সুন্দর নির্বাচনে আওয়ামী

সমর্থিত প্রার্থীরাও জয়লাভ করলে এতে কারো অবাক হওয়ারও কোনো

কারণ নেই। এক্ষেত্রে সবার প্রত্যাশা নিকট অতীতে ৬টি সিটি কর্পোরেশন

নির্বাচন যেভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছে সেভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রামের

নির্বাচনগুলো হোক।

আমরা আশা করবো- নির্বাচন কমিশন একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার

দিবেন। দেশের বর্তমান এই দ্বান্দ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নির্বাচন

কমিশন কতটা সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে তার

ওপরই নির্ভর করছে এই নির্বাচনটির সার্থকতা। বিএনপির দিক থেকে এই

নির্বাচনকে তাদের আন্দোলনেরই অংশ হিসেবেই মনে করছে। বাধা-বিপত্তি

ও নির্যাতনমূলক ব্যবস্থার কারণে তারা সাধারণ মানুষের কাছে নিজেদের

অবস্থান তুলে ধরতে পারছে না, এই নির্বাচনের মাধ্যমে সেটি সম্ভব হত

পারে।এরমাধ্যমে কিছুটা হলেও যাচাই হতে পারে- তাদের দাবি ও চলমান

আন্দোলনের পক্ষে কতটা জনসমর্থন রয়েছে। অন্যদিকে এই নির্বাচনের

মাধ্যমে বর্তমান সরকারও এক ধরনের জনমত যাচাই হতে পারে। জনগণ

সরকারের পদক্ষেপ ও কর্মকাণ্ডকে কতটা সমর্থন করে তা এখান থেকেই

সুস্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

 

সবশেষে বলবো, বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিয়ে অনেক সমালোচনা রয়েছে। এরপরও আশা করবো- তারা সেসব সমালোচনার ঊর্ধ্বে ওঠার জন্য সৎ প্রচেষ্টা চালাবেন এবং একটি সুষ্ঠু সুন্দর নির্বাচন উপহার দিবেন।অন্যথা এর মাসুল সবাইকে গুণতে হবে।

 

লেখক: শিক্ষা ও সমাজ বিষয়ক গবেষক।ই-মেইল: sarderanis@gmail.com

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

আরও দেখুন...

Close
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close