গ্যালারী থেকে

পাকিস্তানকে হারিয়ে গৌরবের জয়ে ফুরোল অপেক্ষা: সাবাস বাংলাদেশ

গ্যালারী থেকে ডেস্ক: অবশেষে…

এই একটা শব্দই বোধ হয় যথেষ্ট। অবশেষে…

অবশেষে নর্দাম্পটন নিয়ে স্মৃতির জাবর কাটার দিন ফুরোল। ক্রিকেট রহস্য করতে ভালোবাসে। পাকিস্তানও কি বাংলাদেশের ক্রিকেটে অমীমাংসিত এক রহস্য হয়েই ছিল না গত ১৬টি বছর! বাংলাদেশ সবকিছু পারে, শুধু পাকিস্তানকে হারাতে পারে না।

একটা সময় ছিল, যখন একটি জয়ের জন্য বছরের পর বছর চাতকের মতো অপেক্ষায় থাকত বাংলাদেশ। সেসব দিন পেছনে ফেলে বড় দলকে হারানো বাংলাদেশ নিয়ম বানিয়ে ফেলেছে অনেক দিনই। অথচ কীভাবে কীভাবে যেন পাকিস্তানই ফসকে যেত বারবার। একদিন না একদিন এই রহস্যের জট খুলতই। অবশেষে তা খুলল।

নর্দাম্পটনে বাংলাদেশের জয়ের লগ্ন এসেছিল ছায়া ঘনিয়ে আসা বিকেলে। মিরপুরে ফ্লাডলাইটের আলোয় উদ্ভাসিত রাতে। ১৬ বছর আগে-পরের দুই জয়ে আশ্চর্য একটা মিল কিন্তু তার পরও থাকল। নর্দাম্পটনেও বাংলাদেশের জয় এসেছিল টিভি আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে। মিরপুরেও তা-ই। এর চেয়েও বিস্ময়কর মিল আউট হওয়া দুই ব্যাটসম্যানে। পাকিস্তান ক্রিকেটের দুই যুগের দুই সেরা অফ স্পিনার। নর্দাম্পটনে সাকলায়েন মুশতাক। মিরপুরে তাঁরই শিষ্য সাঈদ আজমল।

বোলিং অ্যাকশন শোধরানোর পর সাঈদ আজমলের প্রত্যাবর্তন ম্যাচ। আগের আজমল ফেরেননি। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে খরুচে বোলিং আর কোনো দিনই ফিরবেন কি না, সেই প্রশ্নও তুলে দিয়েছে। তবে ম্যাচের অর্ধেকটা পেরোনোর পর বাংলাদেশের জয় নিয়ে বলতে গেলে কোনো প্রশ্নই জাগেনি। ম্যাচের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ২৮ বল বাকি থাকতে। আসলে তা আরও অনেক আগেই শেষ। হয়তো বাংলাদেশের ইনিংস শেষেই।

এক ম্যাচে তিন-তিনটি ব্যাটিং মাইলফলক ছুঁয়েই আসলে জয়টাকে ছোঁয়া শুধুই সময়ের ব্যাপার করে তুলেছিলেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। আরও নির্দিষ্ট করে বললে তামিম ইকবাল ও মুশফিকুর রহিম। বাংলাদেশের ইনিংস শেষে রেকর্ড বইয়ের তিনটি পাতা নতুন করে লেখা হয়ে গেছে-

. ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান।

. যেকোনো উইকেটে সর্বোচ্চ জুটি।

. এক ইনিংসে এই প্রথম দুই সেঞ্চুরি।

দুই ইনিংসের বিরতির সময় প্রেসবক্সে ঘুরতে এলেন হাবিবুল বাশার। রেকর্ড-টেকর্ড খুব একটা মনে রাখেন না। বাংলাদেশ যে গত বছর এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৩২৬ রানকে টপকে সর্বোচ্চ রানের নতুন রেকর্ড করে ফেলেছে, এটা জানলেন সাংবাদিকদের কাছ থেকেই। তাঁর নাম জড়িয়ে থাকা আরেকটি রেকর্ডও যে অতীত হয়ে গেছে, এটাও তাঁর জানা নেই। ২০০৬ সালে কেনিয়ার বিপক্ষে রাজিন সালেহর সঙ্গে হাবিবুলের ১৭৫ রানই এত দিন ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জুটির রেকর্ড হয়ে ছিল। এর চেয়ে ৩ রান বেশি যোগ করে যেটিকে পেছনে ফেলে দিয়েছেন তামিম ইকবাল ও মুশফিকুর রহিম।

১৩২ রানের ইনিংসটির মতোই আলোচিত তামিমের উদ্যাপন। পাঁচ বছর আগে লর্ডসে সেঞ্চুরির পর তামিমের উদ্যাপন এখনো ইংলিশ সাংবাদিকদের আলোচনায় ফিরে ফিরে আসে। ২০১২ এশিয়া কাপে টানা চারটি ফিফটির পর একে একে চার আঙুল দেখানোটাও একই সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রিকেটের অমর ও আলোচিত ছবি হয়ে আছে। কাল সেঞ্চুরির পর ব্যাট ফেলে-গ্লাভস খুলে দুহাতের আঙুল দিয়ে যা দেখালেন, সেটির অনুবাদে সবাই খুব দ্রুত একমত হয়ে গেল। তাঁকে নিয়ে এত সমালোচনা, নিষ্ঠুর এবং একই সঙ্গে অন্যায় সব কৌতুকের জবাব ওই উদ্যাপন-অনেক বকবক হয়েছে, এবার চুপ করুন!

উদ্যাপনে যেমন, কাল তামিমের ব্যাটেও তেমনি মাঝে হারিয়ে যাওয়া সেই ঔদ্ধত্য। পুল আর হুকেই যেটি সবচেয়ে বেশি প্রকাশিত। তবে কী খেলেননি কাল! দুর্দান্ত সব ড্রাইভ, ব্যাটের আলতো ছোঁয়ায় চোখজুড়ানো লেট কাট, কখনো বা প্যাডল সুইপও।

সাফল্যই হোক বা ব্যর্থতা-তামিমকে নিয়ে আলোচনাটা একটু বেশিই হয়। বাংলাদেশের পক্ষে ওয়ানডেতে তৃতীয় দ্রুততম সেঞ্চুরি করে ম্যাচসেরার পুরস্কার পাওয়ার পরও মুশফিকুর রহিম যেমন একটু আড়ালেই পড়ে থাকলেন। তামিমের ১৩৫ বলে ১৩২। মুশফিকের ১০৬ রান যেখানে মাত্র ৭৭ বলে। এই পরিসংখ্যান সাদ নাসিম ও জুনাইদ খানের বিনিদ্র রাতের কারণ হওয়ার কথা।

পাকিস্তান ক্রিকেটে এত সব ওলট-পালট, শুধু একটা জিনিসই কখনো বদলায়নি। পাকিস্তানের ফিল্ডিং সব সময়ই বিশ্ব ক্রিকেটে রসিকতার বিষয় হয়ে থেকেছে। গত বিশ্বকাপে পাকিস্তানের শেষ ম্যাচটির কথা মনে করে দেখুন, বাকি সব ছাপিয়ে ওয়াহাব রিয়াজের বলে রাহাত আলীর ফেলে দেওয়া শেন ওয়াটসনের ক্যাচটিই কি চোখে ভাসে না? পেছন ফিরে তাকালে এই ম্যাচের ক্যাচিংও পাকিস্তানের জন্য অনন্ত আক্ষেপের কারণ হয়ে দেখা দেবে।

বাংলাদেশের দুই সেঞ্চুরিয়ানই এই আনুকূল্যধন্য। দুজনেরই ‘নতুন জীবন’ ফিফটি ছোঁয়ার আগে। অভিষিক্ত সাদ নাসিম নিজের বলেই ক্যাচ ফেলার পর তামিম করেছেন আরও ৮৫ রান। জুনাইদের কল্যাণে বেঁচে যাওয়ার পর মুশফিক আরও ৭১।

প্রথম ২০ ওভারে বাংলাদেশের স্কোর ছিল মাত্র ৬৭। শেষ ৩০ ওভারে অবিশ্বাস্য ২৬২। স্কোরবোর্ডে ৩২৯ রান উঠে যাওয়ার পরও অবশ্য উঁকি দিচ্ছিল গত এশিয়া কাপের স্মৃতি। সেবার ৩২৬ করেও তো হারতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। কিন্তু পাকিস্তানের এই দলে আহমেদ শেহজাদ কোথায়, যিনি বলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সেঞ্চুরি করবেন? অথবা শহীদ আফ্রিদি? ২৫ বলে ৫৯ করে শেষ ১০ ওভারে দশের বেশি আস্কিং রেটকে যিনি ছেলেখেলা বানিয়ে ফেলবেন!

পাকিস্তান ইনিংসে সর্বোচ্চ স্কোর আজহার আলীর। এই ম্যাচের আগে যাঁর স্ট্রাইক রেট ৬৪.৮৪, সেই আজহারের জন্য ৭৩ বলে ৭২ রান তো রীতিমতো ঝোড়ো ইনিংস! বিশ্বকাপের পর পাকিস্তানের নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে তাঁকে অধিনায়ক করে। যাঁর অধিনায়কত্ব অভিষেকেই পাকিস্তান-বাংলাদেশ দ্বৈরথে নতুন যুগের সূচনা।

অবশেষে…

 

বাংলাদেশ: ৫০ ওভারে ৩২৯/৬

পাকিস্তান: ৪৫.২ ওভারে ২৫০

ফল: বাংলাদেশ ৭৯ রানে জয়ী

বাংলাদেশের তিন কীর্তি

. সর্বোচ্চ দলীয় স্কোর

. সর্বোচ্চ দলীয় জুটি

. এক ম্যাচে দুই সেঞ্চুরি

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close