অন্য পত্রিকা থেকে

কেন্দ্রে কেন্দ্রে সাংবাদিকদের বিরূপ অভিজ্ঞতা

নিউজ ডেস্ক: ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সংবাদ সংগ্রহ ও ছবি তুলতে গিয়ে সরকারি দলের ক্যাডারদের হামলার শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরা। ঢাকা ও চট্টগ্রামে পৃথক পৃথক ঘটনায় সাতজন সাংবাদিক আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহত সাংবাদিক ও স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার সকাল থেকে ভোট কেন্দ্রে অবৈধভাবে সিল মারাসহ নানা অনিয়মের সংবাদ সংগ্রহ করার সময় তারা সরকার দলীয় ক্যাডারদের হামলার শিকার হন।

আহতদের মধ্যে রয়েছেন- দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার ওবায়েদ অংশুমান, একই পত্রিকার সিনিয়র ফটো সাংবাদিক শামীন নূর, যমুনা টেলিভিশনের ক্যামেরাপারসন আখলাক সাফা, একাত্তর টেলিভিশনের সিনিয়র রিপোর্টার আজাদ তালুকদার, ক্যামেরাপারসন জহিরুল ইসলাম ও প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সুজয় মহাজন।

যুগান্তর সাংবাদিকের ওপর হামলা

সরকার সমর্থিত প্রার্থীর ক্যাডাররা হামলা করে যুগান্তরের সাংবাদিক ওবায়েদ অংশুমানকে আহত করে তার ভিডিও ক্যামেরা ও মোবাইল ছিনিয়ে নিয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৫নং ওয়ার্ডে আহমেদাবাদ স্কুলের সামনে এ ঘটনা ঘটে।

ওবায়েদ জানান, সবুজবাগ আহমেদাবাদ স্কুল রোডে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর প্রার্থী আশরাফুন্নেছা ফরিদের লোকজন প্রতিপক্ষ প্রার্থীর পোলিং এজেন্টসহ ভোটারদের কেন্দ্র থেকে তাড়িয়ে দেয়। এক পর্যায়ে ফরিদের কয়েকজন ক্যাডার বিপক্ষ প্রার্থীদের লোকজনকে প্রকাশ্যে দা দিয়ে কুপিয়ে আহত করে। এসব ছবি তোলার সময় ফরিদের ক্যাডাররা তাকে বাধা দেয়। এরপর কমলাপুর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে বেলা সোয়া ১২টার দিকে ফরিদের লোকজন প্রিজাইডিং অফিসার মো শরীফকে মারধর করে তিনশ’ ব্যালট ছিনিয়ে নিয়ে প্রকাশ্যে সিল মারা শুরু করে। ঘটনাটি ওবায়েদ উপস্থিত থেকে ভিডিও করেন। এসময় উপস্থিত পুলিশের কয়েকজন সদস্য বাধা দিতে গিয়ে আহত হয়।

ওবায়েদ জানায়, এসব ঘটনার ভিডিও করার পর কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যাবার সময় ফরিদের সশস্ত্র ক্যাডাররা তার ওপর হামলা চালায়। তারা মারধর করে ভিডিও ক্যামেরা এবং দুটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। এক পর্যায়ে ওবায়েদের সার্ট ছিড়ে যায়। ক্যাডাররা তার মোটর সাইকেল ভাংচুর করে আগুন দেয়ার চেষ্টা চালায়। এসময় ওবায়েদ তাদের কাছে মাফ চাইলে তাকে ছেড়ে দেয় ক্যাডাররা। ওবায়েদ অংশুমান বলেন, ভোট ছিনতাইয়ের যে দৃশ্য ধারণ করেছি, তাতে প্রিজাইডিং অফিসার তাকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্য পুলিশের কাছে দাবি জানাতে দেখা গেছে।

প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকের ডায়েরি ও টাকা ছিনিয়ে নিল সরকার সমর্থকেরা

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পুরান ঢাকার নারিন্দায় দায়িত্ব পালন করার সময় প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মোশতাক আহমেদের ডায়েরি (ভোট কেন্দ্রের অনিয়মের তথ্য ছিল) ও টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে সরকার সমর্থক মেয়র ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীর কয়েকজন কর্মী-সমর্থক। আজ মঙ্গলবার দুপুরে ভোটকেন্দ্র দখলের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি এ ঘটনার শিকার হন। এ সময় ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রতিবেদককে দ্রুত ওই কেন্দ্রের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

দুপুর ১২টার একটু আগে নারিন্দার দক্ষিণ মৈশণ্ডি স্কুলের সামনে এ ঘটনা ঘটে। সকাল থেকে এই কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওয়ামী লীগ-সমর্থিত মেয়র প্রার্থী সাঈদ খোকন ও স্থানীয় ৪১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিল প্রার্থী সারোয়ার হাসানের কর্মী-সমর্থকেরা। তারা সবাই ওই দুই প্রার্থীর ব্যাজ পড়ে কেন্দ্র ও কেন্দ্রের আশপাশে অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে তারা কেন্দ্রের বাইরে থেকেইলোকজনকে ভেতরে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কোনো ভোটার কেন্দ্রে যেতে চাইলে বাইরে থেকে বলা হচ্ছিল, দুইটার আগে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, ভেতরে ‘গেঞ্জাম’ হচ্ছে। এ সময় ভেতরে কারচুপি করে ওই দুই প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেওয়ার খবর আসছিল।

এই ঘটনা দেখার সময় টি-শার্ট পরা এক যুবক, যার নেতৃত্বে ভোটারদের বাধা দেওয়া হচ্ছিল, সে হঠাৎ করেই প্রথম আলোর প্রতিবেদককে জাপটে ধরে এবং পাশের গলির ভেতর নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখাতে থাকে। এ সময় তার সঙ্গী ছিল আরও দুই-তিন যুবক। তারা সবাই শাসিয়ে বলতে থাকেন, ‘কার অনুমতিতে এখানে এসেছিস?’ এ পর্যায়ে প্রথম আলোর প্রতিবেদকের সঙ্গে থাকা নির্বাচন কমিশনের কার্ড, প্রথম আলোর পরিচয়পত্র, মানিব্যাগ, ডায়েরিসহ সব কাগজপত্র ছিনিয়ে নেয় যুবকেরা। তারা গলির ভেতর আটকে রেখে প্রথম আলোর প্রতিবেদক বার বার মারধরের হুমকি দিচ্ছিলেন।

যমুনা টিভির ক্যামেরাম্যানের ওপর হামলা

সকালে মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাসের সামনে যমুনা টিভির ক্যামেরাপারসন আখলাক সাফা’র উপর হামলা চালায়। এতে তিনি আহত হন।

যুগান্তরের ফটো সাংবাদিক আহত

সকাল সাড়ে আটটায় সেগুনবাগিচা স্কুল কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের হামলার শিকার হন দৈনিক যুগান্তরের সিনিয়র ফটো সাংবাদিক শামীম নূর। হামলার পর ক্যাডাররা তাকে কিছু সময় অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে সংবাদ পেয়ে অন্যান্য ফটো সাংবাদিকরা গিয়ে তাকে উদ্ধার করে।

চট্টগ্রামে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, ক্যামেরা ভাঙচুর

জাল ভোট ও সংঘর্ষের ছবি ধারণ করতে গিয়ে প্রার্থীর সমর্থকদের হামলায় চট্টগ্রামে তিনজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। এঁরা হচ্ছেন বেসরকারি টেলিভিশন একাত্তরের স্টাফ রিপোর্টার আজাদ তালুকদার, ক্যামেরাপারসন জহিরুল ইসলাম ও আরটিভির ক্যামেরাপারসন পারভেজুর রহমান। হামলায় দুটি ক্যামেরাও ভেঙে দেওয়া হয়েছে।

একাত্তরের স্টাফ রিপোর্টার আজাদ তালুকদার বলেন, সকাল ১০টার দিকে দক্ষিণ হালিশহর কেজি অ্যান্ড হাইস্কুল কেন্দ্রের বাইরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ চলছিল। ঘটনাটি ক্যামেরায় ধারণ করার সময় সংঘর্ষকারীদের কয়েকজন ক্যামেরাপারসন জহিরুলের ওপর হামলা চালায়। তারা লাঠি দিয়ে দিয়ে জহিরুলের মাথা ফাটিয়ে দেয় এবং ক্যামেরাটি কেড়ে নিয়ে ভাঙচুর করে। তিনি বলেন, ‘তাঁকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে আমাকেও তাঁরা মারধর করেছে। আক্রমণকারীদের সবার গলায় হাতি প্রতীকের কার্ড ঝুলছিল। পুলিশ ও র্যাব চুপচাপ ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে ছিল।’

আহত তিন সাংবাদিক চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। জহিরুলের মাথায় বেশ কয়েকটি সেলাই দেওয়া হয়েছে।

আগ্রাবাদ ব্যাপারীপাড়ার তালিবিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে জালভোটের ছবি তুলতে গিয়ে হামলায় আহত হয়েছেন আরটিভির ক্যামেরাপারসন পারভেজুর রহমান। আরটিভির স্টাফ রিপোর্টার কাজী মনজুরুল ইসলাম জানান, বেলা ১১টার দিকে কেন্দ্রের মহিলা বুথে ঢুকে বেশ কয়েকজন পুরুষ ভোট দিচ্ছিলেন। তাঁদের গলায় ছিল হাতি প্রতীকের কার্ড। এই ঘটনার ছবি ধারণ করতে গেলে তারা পারভেজের ওপর হামলা চালায় ও ক্যামেরা ভেঙে ফেলে।

বাংলামেইলের প্রতিবেদকদের কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রে গণমাধ্যম কর্মীদের প্রবেশে বাধা দিচ্ছে পুলিশ। অনেক কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে। কোথাও কোথাও সরকারি দলের নেতাকর্মীরাও সাংবাদিকদের বাধা দিচ্ছে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নির্বাচন কমিশন থেকে অনুমতিপ্রাপ্ত গণমাধ্যম কর্মীরা।

মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর শাজাহানপুর মড়েল সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মির্জা আব্বাস মহিলা স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে বাংলামেইলের এ দু’জন প্রতিবেদক ভোট কেন্দ্রে প্রবেশ করেন। এ সময় সেখানে কর্মরত শাহজাহান পুর থানার উপ-পরিদর্শক মো. সাইফুল বাংলামেইলসহ উপস্থতি পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, ‘কোনো সাংবাদিক ভোট কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবে না। কোনো ছবিও তুলতে পারবে না। ওসি স্যারের নির্দেশ আছে।’

এসময় সাংবাদিকরা বলেন আমাদের তো নির্বাচন কমিশন থেকে অনুমতিপত্র রয়েছে। জবাবে মো. সাইফুল বলেন, ‘আপনাদেরকে যে অনুমতি দিয়েছে তাকে বলবেন পুলিশ ছবি তুলতে দিচ্ছে না। তিনি যদি আমাদেরকে বলেন তখন ছবি তুলতে দেয়া হবে।’

পরে অপর পুলিশ সদস্য ওসিয়ার এই দুই সাংবাদিককে কেন্দ্র এলাকা থেকে বের করে দেন। পরে কেন্দ্র এলাকায় আর কোনো গণমাধ্যম কর্মীদের প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।

কেন আপনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন?

পুরান ঢাকার আমলীগোলা এএমসি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র। মঙ্গলবার সকাল সোয়া ১০টার দিকে হঠাৎ কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার নুরুল আলমের কক্ষে প্রবেশ করেন লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামান ও ভারপ্রাপ্ত কর্তকর্তা (তদন্ত) পরিতোষ।

তারা কক্ষে প্রবেশ করেই বৃদ্ধ প্রিসাইডিং অফিসার নুরুল আলমকে ধমক দেন। ‘কেন একটি বেসরকারি টেলিভিশনে সাক্ষাতকার দিলেন? কেন আপনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন? কে আপনাকে এ অধিকার দিয়েছে? সবাইকে বের করে দেন।’

ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তার ধমকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় প্রিসাইডিং অফিসার নুরুল আলমের চোখে জল এনে দেয়। প্রিসাইডিং অফিসারের কক্ষে উপস্থিত দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমের দুই প্রতিবেদক বিষয়টি প্রত্যক্ষ করেন। এর আগে পুলিশের ওই দুই কর্মকর্তা তাদের পরিচয় নিশ্চিত করেন।

প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকরা জানান, সকাল ১০টার দিকে প্রিসাইডিং অফিসার মো. নুরুল ইসলাম একটি বেসরকারি টেলিভিশনে সাক্ষাতকার দেন। যা সরাসরি ওই টেলিভিশনের প্রচারিত হয়।

ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তার ধমকের পর নুরুল আলম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ঠিক আছে ভাই। সবাইকে বের করে দিচ্ছি।’

তিনি দোতলায় গিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপনারা চলে যান।’ তিনি আর সাংবাদিকদের সামনে আসেননি।

এ বিষয়ে লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্তকর্তা জামান দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘ডিএমপির মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলেন। আমাদের কাজ আমরা করেছি। কেন্দ্রে সাংবাদিক প্রবেশ নিষেধ।’

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close