ফিচার

আজ বৃটেনে সাধারণ নির্বাচন

আজ বৃটেনের সাধারণ নির্বাচন। কিন্তু বাঙালি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস বরায় চলছে ভিন্ন হিসাব-নিকাশ। আগামী কালের পার্লামেন্ট নির্বাচনের চেয়ে আগামী মাসের মেয়র নির্বাচনের উত্তাপ সেখানে বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এক দিকে দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি বুদ্ধিদীপ্ত বাঙালি প্রার্থী রাবিনা খান এবং অপর দিকে লুৎফুর রহমানের কাছে গত নির্বাচনে ৭ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত লেবার পার্টির প্রার্থী জন বিগস।

গত নির্বাচনে ৩৭ হাজার ভোটে নির্বাহী মেয়র হিসেবে দ্বিতীয় বারের মতো নির্বাচিত লুৎফুর রহমানকে আদালতের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়েছে। ৩৭ হাজার ভোটার এবং এলাকার সাধারণ জনগণ জানে, তিনি ঘুষ দিয়ে এবং প্রতারণার মাধ্যমে নির্বাচিত হননি। বাংলা মিডিয়ার সাথে জড়িত সবাই জানেন, তারা তাঁকে অর্থের বিনিময়ে সমর্থন দেননি, দিয়েছেন নৈতিক কারণে।

আলেমরা জানেন, তারা যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়ে কোন অনৈতিক কাজ করেননি। তাই রায় নিয়ে জনমনে এবং সুধীজনের মধ্যে অনেক জিজ্ঞাসা রয়েছে, রয়েছে অনেক ক্ষোভ। মেয়র প্রার্থী হিসেবে রাবিনা খানের মনোনয়নের মাধ্যমে মানুষের সে ক্ষোভ প্রশমনের একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা লক্ষ্য করেছি, বিক্ষুব্ধ মানুষ রাবিনা খানকে নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছেন।

সাধারণ নির্বাচন নিয়ে লন্ডনের নিউহাম এবং টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকায় তেমন হৈ চৈ না হবার আরো কারণ রয়েছে। এ দুটি বরার চারটি আসন-ই লেবার পার্টির নিশ্চিত আসন। মধ্যখানে জর্জ গ্যালওয়ে এসে টাওয়ার হ্যালেটসে একটা সাময়িক ধাক্কা দেন। সে ধাক্কায় এখানে কমপক্ষে একজন বাঙালি এমপি’র আসন নিশ্চিত হয়ে গেছে। নিউহাম এবং টাওয়ার হ্যামলেটসের চারটি আসনের কোনটিতে লেবার পার্টির বিরুদ্ধে সম্ভাবনাময় কোন প্রার্থী নেই।

তাই চারটি আসন-ই লেবার পার্টি পাবে তা প্রায় নিশ্চিত। শক্তিশালী প্রতিপক্ষ না থাকলে কোন খেলাই তেমন জমে না। নিউহাম এবং টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকার নির্বাচনী খেলা তাই তেমন জম-জমাট হিসেবে দেখা যাচ্ছে না।

তবে আদালতের রায়ে সদ্য ক্ষমতাচ্যুত মেয়র লুৎফুর রহমান নিজের পক্ষ থেকে টাওয়ার হ্যামলেটসে কোন একজন প্রার্থী দিলে এলাকার নির্বাচনী-চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যেতো। লুৎফুর রহমান বা তাঁর গ্রুপ এমপি প্রার্থী হিসেবে কাউকে মনোনয়ন দেয়নি, কারো প্রতি সমর্থনও দেয়নি। কেন দেয়নি তা এখনো আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। হতে পারে, বেথনালগ্রিন ও বো এলাকা থেকে নির্বাচিত এমপি রুশনারা আলীর বিজয়ের পথে তারা কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে চাননি। রুশনারা আলী বৃটিশ পার্লামেন্টে প্রথম বাঙালি প্রতিনিধি। তাঁর সাথে বাঙালি কমিউনিটির অনেক আবেগ-উচ্ছ্বাস জড়িত রয়েছে।

সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে এবার কোন্ দল ক্ষমতায় আসবে কেউ বলতে পারে না। ইউকিপ’র অনেক তর্জন-গর্জন শোনা যাচ্ছে। তারা পার্লামেন্টে কয়েকটা আসন হয়তো পাবে। তাদের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু সরকার গঠনে কোন ভূমিকা রাখতে পারবে বলে ধারণা করা যায় না।

কারো কারো মতে, টোরি-লেবারের মধ্যে কোন দলই একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা পাবে না। কেউ বলছেন, টোরি পার্টির দলীয় এমপি’র সংখ্যা কিছুটা হলেও বাড়বে। আবার একদল ভাবছেন, এবার টোরি-লিবডেম জোট না হয়ে হবে লেবার-লিবডেম জোট। মানুষ টোরি-লিবডেম জোটের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ইমিগ্রেশন এবং ব্যয়-সংকোচন নীতির সমালোচনা মুখর। তাদের এ সমালোচনা ভোটের বাক্সকে কতটুকু প্রভাবিত করবে তা বলা যাচ্ছে না। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, লেবার পার্টি নিজেকে মানুষের চোখে অধিকতর যোগ্য হিসেবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা দেখেছি, যথাযোগ্য ও বিশ্বস্ত বিকল্প শক্তি না থাকলে শুধু সমালোচনা সাধারণতঃ ভোটের বাক্সকে প্রভাবিত করতে পারে না। তবে লেবার-লিবডেম জোট সরকার গঠিত হলে প্রথম বাঙালি এমপি রুশনারা আলীর মন্ত্রীত্ব লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। একজন বাঙালির এ রকম সম্ভাবনার পথে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেননি, এ জন্যে লুৎফুর রহমান অবশ্যই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

কেন রাবিনা খানকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হলো সে প্রশ্ন টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকায় নেই বললেই চলে। গত তিন টার্মে কাউন্সিলর হিসেবে রাবিনা খান যোগ্যতা ও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে প্রমাণ করেছেন, লুৎফুর রহমানের পর তিনিই এ পদের জন্যে সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি। মেয়র হিসেবে লুৎফুর রহমানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান হচ্ছে হাউজিং সেক্টর। আর হাউজিং সেক্টরের দায়িত্বশীল ছিলেন রাবিনা খান। টাওয়ার হ্যামলেটসবাসী যুগ যুগ ধরে হাউজিং সমস্যায় জর্জরিত। নির্বাচিত হওয়ার পর লুৎফুর রহমানের প্রতিশ্রুতি ছিল বছরে নতুন এক হাজার ঘর নির্মাণ করবেন। তিনি সে প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন। ১৬৮ মিলিয়ন পাউন্ড বাজেট নির্ধারণ করে কাউন্সিলের বর্তমান ঘরগুলোর সংস্কার করছেন। ইংল্যান্ডের যে কোনও কাউন্সিলের তুলনায় বেশি সংখ্যক সোস্যাল হাউজ নির্মাণের পুরস্কার হিসেবে সরকারের তরফ থেকে সর্বোচ্চ ‘হাউজিং বোনাস’ পেয়েছে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল, এর পরিমান প্রায় ৫০ মিলিয়ন পাউন্ড। সবার জানা, এ সাফল্যের সিংহভাগ রাবিনা খানের প্রাপ্য। সাবেক মেয়র লুৎফুর রহমান টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকার অন্যান্য ক্ষেত্রে উন্নয়নের যে ধারা সৃষ্টি করেছেন তা অব্যাহত রাখার জন্যে এমন একজন মেয়র দরকার যিনি এ সকল উন্নয়ন কর্মের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন।

লেবার পার্টি থেকে মনোনীত মেয়র প্রার্থী জন বিগসকে টাওয়ার হ্যামলেটসবাসী চিনে। টাওয়ার হ্যামলেটসের বাঙালি ভোটাররা পিটার শোরকে বার বার ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। উনা কিংকে ভোট দিয়েছে। রুশনারা আলীকে ভোট দিয়েছে। কিন্তু জন বিগসকে দেয়নি? এর প্রধান কারণ, টাওয়ার হ্যামলেটসের জনগণ যখন বর্ণবাদের বিরুদ্ধে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে তখন জন বিগস কখনো তাদের পাশে দাঁড়াননি। টাওয়ার হ্যামলেটসে লেবার পার্টি ক্ষমতায় আসে ১৯৯৪ সালে। এর আগে বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে এলাকার অধিকাংশ মানুষ বর্ণবাদের বিরুদ্ধে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে সংগ্রাম করেছে। আশ্রয়হীন ও গৃহহীন বাংলাদেশী জনগণ তাদের বেঁচে থাকার সংগ্রামে এ দেশের অনেক মানুষকে পাশে পেয়েছে। তখন কোথাও জন বিগসকে দেখা যায়নি। অথচ তখন তিনি রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন।

লেখক, রাজনীতিবিদ, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক কর্মী রাবিনা খান দেশ-বিদেশে অনেক সম্মাননা পেয়েছেন। বহুমুখি প্রতিভার অধিকারী এ সম্ভাবনাময় তরুণী টাওয়ার হ্যামলেটসের সকল মত ও পথের জনগণের সেবা করাকে তাঁর জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আমরা তাঁর সাফল্য কামনা করি।

লেখক: ফরিদ আহমদ রেজা, কলামিষ্ট, প্রবাসী সাংবাদিক।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close