ফিচার

ড. জাফর ইকবাল ও একটি গাধার কাহিনী

হাতি-ঘোড়া গেল তল, গাধা বলে কত জল। সিলেট আমার, সিলেট তোমার, সিলেট গলার মালারে, বাবা শাহজালালের দেশ, সিলেট ভূমিরে। সিলেট নিয়ে কেউ অন্যায় বা অশোভন কথা বললে আমি বা কোন সিলেট বাসী তা মেনে নিবে না।

সম্প্রতি ডা. জাফর ইকবালকে সিলেট বিদ্বেষী বলে চিহ্নিত করতে কেউ কেউ আদাজল খেয়ে লেগেছেন। ড. জাফর ইকবাল যদি সত্যি সিলেট বিদ্বেষী হয়ে থাকেন তবে আমি তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমি যদ্দুর জানি তাঁর পিতা সরকারী চাকুরীর সুবাদে দীর্ঘদিন সিলেটে বসবাস করেছেন এবং তার বাসস্থান ছিল আমার মিরাবাজারের বাসার খুবই সন্নিকটে, প্রায় ২০০ গজের মধ্যে।

আমি শুনেছি ড. জাফর ইকবালের স্বনামধন্য প্রয়াত বড় ভাই প্রখ্যাত দেশবরণ্য সাহিত্যিক জনাব হুমায়ুন আহমেদ মিরাবাজারে কিশোরী মোহন পাঠশালায় পড়াশুনা করেন। আমরা অতি সংক্ষেপে বলতে গেলে আমরা দেখেছি হুমায়ুন আহমেদ তার জনপ্রিয় নাটকগুলোতে হাছন রাজা ও বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের গান ব্যবহার করে নিজেকে ধন্য মনে করতেন। এই রকম একজন ব্যাক্তির ছোট ভাই ড. জাফর ইকবাল হঠাৎ করে কিভাবে সিলেট বিদ্বেষী হয়ে গেলেন, তা পরিস্কার নয়।

ড. জাফর ইকবাল কোন লেখাতে সিলেট বিরোধী কোন বক্তব্য আমার নজরে আসেনি। দীর্ঘদিন ধরে যিনি শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় রূপে গড়ে তুলতে নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। সিলেটের ছাত্রদের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যাপারে তিনি যদি কোটা পদ্ধতির বিরোধী হয়ে থাকেন, শিক্ষার গুণগত মান ও ছাত্রদের মেধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে যদি তার এই বক্তব্য হয়ে থাকে তবে সেটি তার একজন শিক্ষক হিসেবে ব্যাক্তিগত চিন্তাধারা বা মতামত হতে পারে। তিনি এটা নিয়ে কোন আন্দোলন সংগ্রাম করতে গেলে আমরা অবশ্যই তার পদক্ষেপের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেব এবং রুখে দাড়াব।

মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের ভর্তি ও চাকুরীর কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধে অনেকেরই সরব অবস্থান রয়েছে। তাই বলে তারা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী হয়ে উঠেছেন বলে দাবি করা আমার বিবেচনায় সঠিক হবে না। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি তাদের এই দাবি সমর্থন করি না বা মেনে নিতে পারি না।

যদিও আমার কোন সন্তান মুক্তিযোদ্ধা কোঠায় ভর্তি হয়নি বা চাকুরী লাভ করেনি। একজন স্বনামধন্য শিক্ষক যিনি মুক্তিযোদ্ধের পক্ষে তার বলিষ্ঠ লেখনীর মাধ্যমে রাজাকার আলবদর ও মুক্তিযোদ্ধের বিরোধীতাকারী পাকিস্তানী দালালদের সহযোগী মীর জাফরদের বিরুদ্ধে নিজের জীবনকে বিপন্ন করে স্বাধীনতার চেতনাকে সমুন্নত রাখার জন্য রাত দিন কাজ করে যাচ্ছেন এবং বর্তমান প্রজন্মের তরুন তরুণীদের এক বিরাট অংশ তার প্রকাশিত বই, প্রবন্ধ ও লেখনীর দ্বারা গভীরভাবে উৎসাহিত হয়ে মুক্তিযোদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে পারছেন। ড. জাফর ইকবালকে চাবুক মারার কথা শুনলে মনে হয় গাধাদেরও পেছনে ফেলে কেউ কেউ এগিয়ে যেতে চাচ্ছেন।

বিশেষ করে, আমাদের দেশে কিছু আইন প্রণেতা বা যারা সংসদ সদস্য নামে পরিচিত তার যখন একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সম্বন্ধে এই ধরনের উক্তি করেন তখনই বুঝা যায় যে, তাদের স্বার্থে ছাপানো শিক্ষার ফিরিস্তি ভুয়া ছাড়া আর কিছু নয়। ইংরেজীতে একটি কথা আছে, “Empty Vessels Count much” যার বাংলা অর্থ হলো- “খালি কলসী বাজে বেশী”। এদের অনেকের আবার জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে সৃষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্রে ২টি আলাদা আলাদা জন্ম তারিখ রয়েছে।

কারো যদি এ ব্যাপারে সন্দেহ হয়, তবে তাকে এ ব্যাপারে যেকোন সময় যে কোন স্থানে প্রমাণ দেখানো যাবে। এই সমস্ত পাকিস্তানি দালালদের উত্তরসূরীর পরিবারের একটি লোক ও মুক্তিযোদ্ধ করে নাই। আওয়ামীলীগের নাম ব্যবহার করে শতকোটি টাকা ঋণ নিয়ে একাধিক গাড়ি দৌড়াচ্ছে। জায়গায় জায়গায় আলিসান বাড়ি বানাচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে- বেনামে ব্যাংক ম্যানেজারদের হাত করে ভূয়া কাগজপত্র প্রস্তূত করে আরো কত শত টাকা ঋণ নিয়েছে তার বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া উচিত। এদের অনেকেরই নিজ এলাকায় দেখা যায় জামায়াতের লোকজন বিপুল ভোটে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।

এছাড়াও কোন এলাকায় যদি ছাত্রলীগের সাবেক কোন নেতা তার জনপ্রিয়তা ও জনসেবা দিয়ে আওয়ামিলীগ এম.পি এর ষড়যন্ত্রকে নস্যাত করে জামায়াত শিবিরকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন, তখন এই সমস্ত জামায়াত শিবিরের পৃষ্ঠ পোষক আঁতাতকারী এমপিরা এদের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ ও সংগঠনকে শক্তিশালী করার কাজে বাধা সৃষ্টি করেন। দলের অভ্যন্তরে টাউট বাটপারদের দিয়ে বাধা সৃষ্টি করে তর্কে দূর্বল ও এমপি নির্ভর করে তুলতে তাদের কালো টাকা ও পেশি শক্তির ব্যবহার করতে কখনও পিছপা হয়না। এদের কার্যকলাপে পরিস্কার ভাবে ধারনা হয় যে, এরা জাল জালিয়াতি দুর্নীতি ছাড়া কিছুই বুঝেনা।

সমাজের সম্মানিত ও শ্রদ্ধেয় ব্যাক্তিদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করাই এদের একমাত্র ধর্ম। এরা বিভিন্ন সময় তাদের সুযোগ ও সুবিধা মত বিভিন্ন রূপে নিজেদেরকে প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ করে না। এবং এদের কাছে অর্থই সবকিছু। প্রয়োজনে এরা অর্থের জন্য নিজের আত্মীয় স্বজনের বিশ্বাসকে পুজি করে অসদুপায় অবলম্বনের মাধ্যমে তাদের ন্যাজ্য পাওনা না দিয়ে এদের টাকা সম্পত্তি আত্মসাৎ করার নিরন্তন প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়।

বাংলাদেশ আওয়ামিলীগের সভানেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে সবিনয় অনুরোধ জানাব, সময় থাকতে এদের লাগাম শক্ত হাতে ঠেনে ধরুন। নতোবা এ মুষ্টিমেয় দূনির্তীগ্রস্ত সুবিধাবাদীদের কারণে আমাদের সরকারের জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে অর্জিত সাফল্য হোচট খাবে। দল, জাতি ও সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে।

কিছু কিছু গর্ধব প্রায়ই অন্যের ঘারে বন্দুক রেখে শিকার করতে আনন্দ পায়। সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা জনাব সজীব ওয়াজেদ জয় এর একটি উক্তির ব্যাপারে ড. জাফর ইকবালের বক্তব্য আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ আমরা সবাই জানি ধর্ম যার যার দেশ সবার। জনাব সজিব ওয়াজেদ জয় যথার্থ আমাদের দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তার মতামত ব্যাক্ত করেছেন এবং আমি মনে করি তার এই বক্তব্য যথার্থই হয়েছে।

ড. জাফর ইকবাল ধর্ম সম্পর্কে ভিন্ন মত থাকতেই পারে। তিনি তার মতামত ব্যাক্ত করেছেন। এটাকে পুঁজি করে নেতারা সিলেটবাসীর ব্যানারে কোন ব্যাক্তির মূর্খতা ও জ্ঞানের অভাব থাকতে পারবেনা। সজিব ওয়াজেদ জয় এর বিরুদ্ধে ড. জাফর ইকবালের উক্তিতে আমরা আওয়ামী পরিবার বা কোন দেশের সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ মূখর হওয়ার কোন লক্ষণ দেখি নাই।

তার পরও আমি বলব, আমরা লক্ষ্য করলাম কেন্দ্রীয় আওয়ামিলীগ এবং এর কোন কেন্দ্রীয় যথা এর কোন সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে কোন প্রতিবাদ বা প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। বিশেষ করে সিলেট জেলা আওয়ামিলীগের অন্যান্য অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন এর পক্ষ থেকে কোন ধরনের মিছিল সমাবেশ বা বিবৃতি প্রদান করেনি। আমি স্বাধীনতার পক্ষের সকল শক্তিকে আহবান জানাবো

আসুন আমরা সবাই মিলে এদেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালি করি এবং একটি সত্যিকার অর্থে দূর্নীতি মুক্ত সমাজ বিনির্মানে যার যার অবস্থান থেকে ঝাপিয়ে পরি।

পবিত্র কোরআর শরিফে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরা লোকমানে বলেছেন- পৃথিবীতে কন্ঠস্বর সমূহের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ বা শুনতে বাজে আওয়াজ হলো গাধার।” তাই মানুষরূপী গাধাদের কাজে কথায় কান না দিয়ে এদের এই মারাত্মক অভদ্রতা ও ঘৃন্য উক্তির সবাইকে তীব্র নিন্দা জানাতে হবে।

আমরা জানি চাবুক সাধারণত গরু রাখালদের হাতেই থাকে। বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কয়েকজন বুদ্ধিজিবীদের মধ্যে একজন ড. জাফর ইকবালকে কোন সাংসদ কর্তৃক প্রকাশ্যে চাবুক মারার ঘোষনা এই প্রথম শোনা গেল। পাকিস্তান আমলে সম্ভবত এম.এ হক নামে একজন ম্যাজিস্ট্রেট জিন্দাবাজার তার বাসার সম্মুখে একজন শিক্ষককে অপমান করেছিল।

এ নিয়ে সিলেটের ছাত্র সমাজ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে আন্দোলনে নেমেছিল। আন্দোলন থামাতে সিলেটের মতো শান্ত জায়গায় পুলিশকে মিছিলে গুলি করতে হয়েছিল। সেই সিলেটের একজন শিক্ষককে কোর্ট পয়েন্টে ধরে চাবুক মারার কথা বলার সাহস যারা দেখায় এবং তাদের এই অমার্জনীয় ইতরামির প্রতিবাদ আমাদের অবশ্যই করতে হবে। সাথে সাথে ড. জাফর ইকবাল সাহেবকে আহবান জানাবো আপনি সিলেটে থেকে সিলেটের মানুষদের মনে আঘাত দিবেন না।

আপনি সিলেট বিদ্ধেষী কোন চক্রান্তের সাথে জড়িত হয়ে থাকেন, তার পরিণাম শুভ হবে না। আমাদের সকলের সব সময় মনে রাখা উচিত সিলেটের মানুষ ধর্ম ভীরু। তাই সবকিছুতে ধর্মকে টেনে না আনাই সমাজের জন্য ভালো। ধর্মকে ব্যবহার করে যারা নেতা হতে চায় আবার ধর্মকে কটুক্তি করে যারা ধর্ম বিরোধী সাজতে চায়, তাদের উভয় ধরনের লোকই মানবতার শত্রু। এদেরকে প্রতিহিত করে সমাজকে, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। সত্যিকারের গণতন্ত্র ও দূর্নীতি মুক্ত নেতৃত্বই কেবল আমাদেরকে এই অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌছাতে পারে।

লেখক: শোয়েব চৌধুরী, বীর মুক্তিযুদ্ধা ও আওয়ামীলীগ নেতা

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close