ফিচার

প্রাসঙ্গিক ভাবনা: আবদুল গাফফার চৌধুরীর ধৃষ্টতা প্রসঙ্গে

ড. মো: নূরুল আমিন: এই সপ্তাহে পলাতক দেশপ্রেমিক আমার এককালের সহকর্মী, সাংবাদিক, কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরী প্রসঙ্গে কিছু কঠোর কথা বলতে হচ্ছে বলে আমি দুঃখিত। ইতঃপূর্বে তার সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে আমি বলেছিলাম যে একজন লেখক হিসেবে শুরু থেকে সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য প্রতিপন্ন করার ব্যাপারে তার জুড়ি নেই। তার বাচনভঙ্গি, রচনাশৈলী এবং উপস্থাপনা পদ্ধতিতে সাধারণ মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারেন। তার কথায় যুক্তি যেমন থাকে তেমনি সাক্ষীও থাকে প্রচুর।

তবে তার স্বভাব হচ্ছে, তিনি জীবিতদের নয়, মৃতদেরই সাক্ষী মানায় বেশি বিশ্বাসী। কেননা এসব সাক্ষীদের ডেকে এনে তার বর্ণিত ঘটনা প্রমাণ করা কঠিন। তার ধর্ম ও নৈতিক নিষ্ঠা কখনো ছিল না। আবার নিজেকে তিনি কখনো ধর্মহীন বা ধর্মচ্যুত বলেও মনে করেন না। অবশ্য মিথ্যার আবরণে সত্যকে সন্দেহযুক্ত করে তোলার প্রতি তার অদম্য প্রবণতা সব সময়ই লক্ষণীয় ছিল। সম্প্রতি তিনি চরম মূর্খতা ও ধৃষ্টতার পরিচয় দিয়ে পরম করুণাময় আল্লাহর ৯৯ গুণ বাচক নাম, রাসূল (স.) ও হিজাবসহ ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে মন্তব্য করে সারা দুনিয়ার প্রায় পৌনে দু’শ কোটি মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছেন।

দেশের প্রোথিতযশা ইসলামী বিশেষজ্ঞ ও আলেমরা এর তীব্র প্রতিবাদ করেছেন এবং এর জবাব দিয়েছেন। আমার মনে হয় তার অজ্ঞতা ও মিথ্যাচার প্রমাণের জন্য বড় কোনও দলিলের প্রয়োজন নেই। আমাদের দেশের মুসলিম পরিবারের অনেক শিশুও জানে যে, ইসলামপূর্ব জাহেলী যুগে মূর্তিপূজকরা পবিত্র কাবা শরীফে ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করেছিল। তাদের স্বতন্ত্র নাম ছিল এবং এই মূর্তিগুলোর মধ্যে যাদেরকে তারা বড়, মেঝো ও ছোট নেতা হিসাবে পূজা করতো তাদের নাম ছিল যথাক্রমে লা’ত, মানত ও উজ্জা। আল্লাহ তায়ালার গুণবাচক ৯৯ নামের মধ্যে এর কোনটিই নেই।

তিনি আল্লাহর গুণবাচক নামকে কাফেরদের দেবদেবীর নাম আখ্যায়িত করে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছেন এবং এর মাধ্যমে দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ইসলামবিদ্বেষী শক্তিকে সহযোগিতা করতে চাচ্ছেন বলে মনে হয়। একই সাথে জনাব গাফফার ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে মুসলমানদের উপর মূর্তি পূজাও চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা করছেন।

জনাব আবদুল গাফফার আরো কিছু ফালতু কথা বলেছেন। ইসলামবিদ্বেষী অপশক্তির Paid agent হিসেবে ইসলামী আন্দোলনের অগ্রযাত্রায় তিনি যে মর্মজ্বালা ভোগ করছেন তা আমরা বুঝি। তিনি এবং তার দোসরদের ওহাবী মতবাদের তীব্র সমালোচনায় মুখর হতে দেখা যায়। একজন সাংবাদিক এবং কলামিস্ট হিসাবে সাধারণ মানুষ তার জ্ঞানের গভীরতা পরিমাপ করতে অনেক সময় ব্যর্থ হয়। বৃটিশ আমলে ইসলামের পুনর্জাগরণ ও সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন মুহম্মদ বিন আবদুল ওয়াহাব (আবদুল ওহাবের পুত্র মুহম্মদ) তার আন্দোলনকে ওহাবী আন্দোলন যারা বলেন তারা ভুল করেন। তিনি কুরআন সুন্নাহর পরিপন্থী কোনও মতবাদ প্রচার করেননি।

তিনি ইসলামের অনুসারীদের শিরকসহ সকল প্রকার অপসংস্কৃতি থেকে মুক্ত করে নির্ভেজাল ইসলামের দিকে মানুষকে আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং ইসলামের পুনরুজ্জীবনের অনুকূলে কাজ করেছিলেন। তৎকালীন বৃটিশ সরকার এতে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে যান এবং মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির মাধ্যমে এই আন্দোলনকে ধ্বংস করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তারা এর নাম দেন ওহাবিজম বা ওহাবী মতবাদ। একশ্রেণীর মুসলমানও বৃটিশদের এই বড়ি গিলে ফেলেন। অনেকে (যার মধ্যে কিছু আলেমও ছিলেন) কোন কিছু না জেনে এই আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের পেছনে লেগে যান এবং বহু জায়গায় তারা সংঘর্ষ ও মারামারিতেও লিপ্ত হন। যারা মারামারিতে লিপ্ত হয়েছেন তারা কখনো এই বিষয়টির গভীরে গিয়ে সত্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করেননি। “লম্বা কুর্তা গোল টুপি, তাকে বলে ওহাবী” এই স্লোগান দিয়ে নিরীহ মুসলমানদের উপর হামলা করতেও আমরা দেখেছি।

অবশ্য ইসলামী আন্দোলনের প্রসার ও ইসলামী শিক্ষাদীক্ষা বিস্তারের সাথে সাথে এই বিষয়টি আস্তে আস্তে প্রশমিত হয়ে গেছে। এখন আবার গাফফার চৌধুরীর মত ব্যক্তিরা এই ফিতনাকে সামনে নিয়ে আসছেন এবং অল্প শিক্ষিত বা অশিক্ষিত মুসলমানদের বিভ্রান্ত করে সমাজকে অস্থিতিশীল করে তোলার চেষ্টা করছেন। আসল সত্য হচ্ছে ওহাবী মতবাদ বলে মুসলিম দুনিয়ায় কোনও কিছু নেই। যাদের ওহাবী বলা হয় তারা আহলে হাদিস বা হাম্বেলী মাযহাবভুক্ত মুসলমান।

যারা হজ্ব, ওমরাহ ও অন্য কোনও কাজে সৌদি আরব সফর করেছেন তারা নিশ্চয়ই দেখেছেন যে, ওই দেশটি শিরক-কবরপূজা প্রভৃতিসহ অনেক কুসংস্কার থেকে মুক্ত। মুহাম্মদ বিন আবদুল ওহাবের আন্দোলনের এটি একটি অনন্য কৃতিত্ব। যখন দেখা যায় যে, গাফফার চৌধুরীর মত জ্ঞান পাপীরা এই কৃতিত্বকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করছেন তখন অত্যন্ত দুঃখ হয়। এরা মুসলিম নাম নিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন।

জনাব গাফফার চৌধুরী ১৯৫২ সালে অনুষ্ঠিত পাঞ্জাবের কাদিয়ানী দাঙ্গায় জামায়াতকে জড়িয়ে আরেকটি মিথ্যাচার করেছেন। এই মিথ্যাচারের জবাব আমি এর আগে এই স্তম্ভে একাধিক বার দিয়েছি। কিন্তু তার মিথ্যাচার থামেনি। তিনি বার বারই বলে বেড়াচ্ছেন যে, জামায়াতই হচ্ছে কাদিয়ানী দাঙ্গার অনুঘটক এবং এই অপরাধে পাঞ্জাবের তৎকালীন সামরিক আদালত তাকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছিলেন। তার এই তথ্যটি ইতিহাস বিকৃতির সামিল এবং অজ্ঞতারও পরিচায়ক। এই দাঙ্গায় জামায়াতের কোনও ভূমিকা ছিল না। এই দাঙ্গার পূর্বে কাদিয়ানী ফিতনা আইনগতভাবে মোকাবিলা করার জন্য একটি সর্বদলীয় কমিটি হয়েছিল।

ঐ কমিটিতে জামায়াতের একজন প্রতিনিধিও ছিলেন। তৎকালীন আহরার নেতা নবাবজাদা নসরুল্লাহ খান এই কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন। তার নেতৃত্বে কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে Direct Action বা প্রত্যক্ষ সংগ্রাম ঘোষণা করেন। জামায়াত প্রতিনিধি প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেন এবং মাওলানা মওদূদী (র.)-এর নির্দেশে কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন। কাদিয়ানী দাঙ্গা ছিল Direct Action বা প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ফসল। জামায়াত এই দাঙ্গাসহ সকল প্রকার দাঙ্গা ও হানাহানির বিরোধিতা করেছে এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি অবলম্বন করেছে।

জনাব গাফফার চৌধুরীর আরেকটি মিথ্যাচারের কথা আমি আগেই বলেছি এবং তা হচ্ছে দাঙ্গার কারণে মাওলানা মওদূদীর ফাঁসির আদেশ। প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে পাঞ্জাবের সামরিক আদালত “কাদিয়ানী সমস্যা” নামক একটি পুস্তিকা রচনার কারণেই মাওলানা মওদূদীকে ফাঁসির দণ্ড দিয়েছিলেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যে বই রচনার জন্য তাকে ফাঁসির দণ্ড দেয়া হয়েছিল সেই বইটি সরকার বাজেয়াপ্ত করেননি। সেটি মূল ও তরজমা আকারে এখনো বাজারে চালু আছে। বিশ্বের বহু ভাষায় তা পাওয়া যায়। সামরিক আদালতের দণ্ডের বিরুদ্ধে রুজু করা মামলায় উচ্চ আদালতের রায়ে মাওলানা মওদূদীর ফাঁসির দণ্ড মওকুফ হয় এবং তিনি বেকসুর খালাস পান।

জনাব গাফফার বলেছেন যে, কাদিয়ানী দাঙ্গায় ৫০ হাজার লোক মারা গেছেন। এটিও একটি মিথ্যাচার। সম্ভবত শাপলা চত্বরের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের তথ্য তিনি কাদিয়ানী দাঙ্গার উপর চাপিয়ে দিতে চাচ্ছেন। কাদিয়ানী দাঙ্গার উপর তদন্ত করে রিপোর্ট দেয়ার জন্য তৎকালীন সরকার জাস্টিস মনিরের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করেছিলেন। তার বিশাল তদন্ত রিপোর্টটি মুনির রিপোর্ট নামে বহুল পরিচিত এবং তা বাজারে এবং ইন্টারনেটে পাওয়া যায়।

এই রিপোর্ট অনুযায়ী দাঙ্গায় নিহতের সংখ্য ১১ জন। জনাব গাফফার ৫০ হাজার কোথায় পেলেন তা বোধগম্য নয়। কেননা তিনি তার লেখায় কোনও তথ্যসূত্র উল্লেখ করেননি। দ্বিতীয়ত : মনির রিপোর্টে দাঙ্গার জন্য কোথাও জামায়াতকে দায়ী করা হয়নি। রিপোর্টের প্রতিটি পাতা আমি পড়েছি এবং জনাব গাফফারকে পড়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। না জেনে মিথ্যা তথ্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চরম মূর্খতারই সামিল।

গাফফার চৌধুরী ও তার দোসররা মানুষকে গোমরাহ করার জন্য মওদূদীবাদ আখ্যায়িত করে ইসলামী আন্দোলনে নিবেদিত সংগঠন জামায়াতে ইসলামীকে লোক চক্ষে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছেন। আমার দীর্ঘ সাংবাদিক জীবনে ইসলামও সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে জড়িত সংগঠনগুলোকে আমি অধ্যয়ন করার চেষ্টা করেছি এবং জামায়াতের সাহিত্যও আমি অধ্যয়ন করেছি। মওদূদীবাদ বলে কোনও মতবাদ আমি দেখেনি। বাস্তাবে এর কোনও অস্তিত্ব নেই।

জামায়াতের সাথে যারা সংশ্লিষ্ট তারা বেশির ভাগই আহলে সুন্নাহর অনুসারী হানাফী মাযহাবভুক্ত মুসলমান। তাদের মধ্যে কিছুসংখ্যক আহলে হাদিসের অনুসারীও আমি দেখেছি। তবে মওদূদী ফিকাহ বলতে আমি কিছু দেখিনি। এটা মনগড়া, মিথ্যাচার। জামায়াতের একটা গঠনতন্ত্র আছে যে কেউ তা পড়লেই বুঝতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close