অন্য পত্রিকা থেকে

যেমন আছে হাকালুকির মৎস্যজীবীরা

ইমাদ উদ দীন: হাকালুকি হাওরের তীরবর্তী গ্রাম। জনসংখ্যাবহুল এ গ্রামটির নাম সাদিপুর। আর্থিক দৈন্যদশার এ গ্রামটির অবস্থান কুলাউড়ার ভূকশিমইল ইউনিয়নে। গ্রামটি জেলেপল্লী হিসেবেই স্থানীয়দের কাছে পরিচিত। মাছ ধরা, মাছ চাষ আর মাছ বিক্রি করেই চলে তাদের জীবন-জীবিকা। বলতে গেলে পানির সঙ্গেই তাদের বসবাস।

গ্রামের অধিকাংশ মানুষের বসতঘর জরাজীর্ণ। সুপেয় পানি আর স্যানিটেশনের অবস্থা বেহাল দশায়। অভাব অনটনে স্কুলের ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর পরিসংখ্যান বাড়ছে দিন দিন। মৌলিক অধিকারের কোনটিরই বাস্তবায়ন নেই ওখানে। নেই দুবেলা দুমোটো ভাতের নিশ্চয়তা।

স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে জরাজীর্ণ খুপড়ি ঘরে স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে থাকা হতদরিদ্র এ মানুষ জীবনযুদ্ধে অসহায়। উন্নয়ন অগ্রগতি স্বাবলম্বী এগুলো সবই শুধু তাদের স্বপ্ন। মাঝেমধ্যে তাদের ভাগ্যোন্নয়নে এগিয়ে আসে এনজিও সংস্থা। তারা খুশি হন। নতুন করে জেগে ওঠার স্বপ্নও দেখেন।

কিন্তু কই কিছুদিন পর ভেস্তে যায় তাদের দেখানো সেই স্বপ্ন। এ হতদরিদ্র মানুষগুলোর নাম করে ভাগ্যের পরিবর্তন হয় এনজিও সংস্থারগুলোর। বারবার সহজ-সরল হতদরিদ্র এ মানুষগুলোকে নিয়ে এনজিওগুলো করে প্রতারণা। চালায় তাদের রমরমা লাভজনক ব্যবসা। কিছুদিন হলো ধরা পড়ে স্থানীয় এনজিও সংস্থা প্রচেষ্টার প্রতারণা। কিন্তু অসহায় এ মানুষগুলোর প্রতিবাদ আর আর্তনাদ সংশ্লিষ্ট বড় কর্তাদের কানে পৌঁছায় না। তাই বন্ধ হয় না তাদের ভাগ্য নিয়ে প্রতারণা। এমনটিই জানালেন ভুক্তভোগীরা।

গ্রামটি আয়তনে ছোট হলেও জনসংখ্যাবহুল। ছোট-বড় মিলে প্রায় ৫ হাজার মানুষের বসবাস সাদিপুর গ্রামে। প্রতিটি ঘরে (বয়সের পাশাপাশি দূরত্বে থাকা) শিশুর সংখ্যা কমপক্ষে ৪ থেকে ৫ জন। ওখানে ছোট পরিবার রাখতে পরিবার পরিকল্পনার কার্যক্রম চোখে পড়ে কম। ওখানকার বাসিন্দাদের জীবন-জীবিকা হাকালুকি হাওরকেই ঘিরে। বর্ষা মওসুমে বাড়ির আঙ্গিনার চারপাশ পানিতেই টইটুম্বর। কোন রকম জিয়ে থাকে তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই। তখন তাদের যোগাযোগের একমাত্র বন্ধু বাহন হলো নৌকা।

আর শুষ্ক মওসুমে চোখ যতদূর যায় ধু-ধু বালুচর। আগেকার দিনে বর্ষা মওসুম আর শুষ্ক মওসুমের যোগসূত্র তেমন চোখে না পড়লেও এখন এমন দৃশ্য আর আলোচনা সবার চোখেমুখে। কারণ একটাই। বদলে যাচ্ছে হাকালুকি। নানা কারণে হাকালুকি নেই আর হাকালুকির মতো। দিন দিন মানুষের অযাচিত অত্যাচারে ক্ষয়ে যাচ্ছে তার রূপ-যৌবন। আজ জৌলুস হারিয়ে অনেকটাই নির্বিকার চিরচেনা রূপ সৌন্দর্যের হাকালুকি।

নাব্য হ্রাসে বর্ষা মওসুমে যেমন অল্প পানিতে বন্যা, তেমনি শুকনো মওসুমে ধু-ধু মরুভূমি। দিন দিন অবহেলা আর অত্যাচারে এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে হাকালুকির প্রাকৃতিক সম্পদ। হাওরের এমন দৈন্যদশায় ভাগ্য বিড়ম্বনায় পড়েছেন হাওরকে অবলম্বন করে জীবিকা চালানো হাওরতীরের এ মানুষগুলো। বাপ-দাদাদের রেখে যাওয়া এ কর্ম তাদের শেকড়ের সংস্কৃতি। এটাকে আগলে রাখতে গিয়েই তাদের এমন দুর্দশা।

সাদিপুর গ্রামের কয়েছ আহমদ বটলাই (৩৮), আহমদ মিয়া (৪৮), গুলজার মিয়া (৫০), আমান্দি মিয়া (৬২), লীলু বিবি (৩৭), সহেনা বেগমসহ (৩২) ওখানকার বাসীন্ধারা জানালেন ৫টি উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত ২৩৮ বিলের ঐতিহ্যবাহী বিশাল হাওরটির এখন আর নেই তার সুদিন। তারা জানালেন হাওরে এখন আগের মতো মাছ নেই। নেই নানা রকমের জীববৈচিত্র্য, যেগুলো আহরণ করে চলতো তাদের জীবন-জীবিকা। আগের মতো বিলগুলোতেই ধরা যায় না মাছ।

জাল যার জলাশয় তার- এ নীতি না থাকায় তারা স্বাধীনভাবে আগের মতো ধরতে পারেন না মাছ। ইজারাদারদের বাধার কারণে মাছ ধরাতো দূরের কথা, জাল নিয়ে বিলের আশপাশেও যাওয়া যায় না। বর্ষা মওসুমে ৪ মাস হাওর এলাকায় পানি থাকায় কোন রকম মাছ ধরে তাদের সংসার চালান। আর বছরের বাকি ৮ মাসই তাদের চরম দুর্ভোগ। বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় অভাব-অনটনে উপস থাকতে হয় পরিবার পরিজন নিয়ে। সরজমিন সাদিপুর গেলে গ্রামবাসী জানান তাদের এমন নানা সমস্যা আর আর্থিক দৈন্যদশার কথা।

তারা জানান, মা মাছ ও পোনা মাছ ধরার নিধন করার কথা বলে অভিযান চালিয়ে মহাজনের কাছ থেকে ভাড়ায় নেয়া জাল প্রশাসনের লোকরা জব্দ করে পরে তা পুড়িয়ে দেন। মহাজনের এ জাল তাদেরই ভর্তুকি দিতে হয়। তারা বলেন, মা মাছ ও পোনা মাছের সময় যদি হাওর পাড়ের জেলে পরিবারগুলোকে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়া যেত তাহলে দুবেলা দু’মুঠো ভাতের নিশ্চয়তা পেতো হাওর পাড়ের মৎস্যজীবী পরিবার। আর রক্ষা পেতো দেশীয় প্রজাতির নানা জাতের মাছ। তারা জানালেন হাকালুকির বিলগুলো নামমাত্র স্থানীয় মৎস্যজীবী সমিতির নামে ইজারা দেয়া হলেও এর পেছনে থাকেন রাঘববোয়ালরা। যে পরিমাণ টাকায় একেকটা বিল ইজারা যায় তা মৎস্যজীবীরা পারেন না বলেই তাদের সম্পৃক্ত করেন।

এতে এ রাঘববোয়ালরা হাওরের মাছের যত্ন না করে সব লুটেপুটে খেতে চায়। হাওরের মাছ ও উদ্ভিদ বাঁচাতে তাদের কোন দরদ থাকে না। তাদের দাবি, সরকার যদি ইজারার নিয়মগুলো সহজ করে দিতো তাহলে তারা কোন অংশীদার না রেখেই পুরোটা তারাই থাকতো। আর যত্ন করে তাদের জীবন-জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হাকালুকির সম্পদ রক্ষা করতে পারতো।

হাওর বাঁচাও, কৃষক বাঁচাও, কৃষি বাঁচাও কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও বাংলাদেশ কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি, সাবেক ভূকশিমইল ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সিরাজ উদ্দিন আহমদ বাদশা জানান, প্রতি বছর সরকার হাওর থেকে যে পরিমাণ রাজস্ব পায় তার সিকিভাগও যদি হাকালুকির উন্নয়নের জন্য ব্যয় হতো তাহলে হাওরটির এমন দৈন্যদশা হতো না।

তিনি হাকালুকির নাব্য হ্রাসের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, সরকার যদি হাকালুকি সংস্কারের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে ধ্বংসের দোরগোড়ায় থাকা হাকালুকির ঐতিহ্য বিলীন হয়ে যাবে। আর এ হাওরটিকে উপলক্ষ করে জীবিকা নির্বাহকারী ৫ উপজেলার হাওর পাড়ের কয়েক লাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। ব্যাপক প্রভাব পড়বে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

আরও দেখুন...

Close
ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close