ফিচার

এমন মানুষ যদি এদেশে জন্মাতেন

‍‘শিলং যাচ্ছি… আইআইএম- এ ‘লিভেবল প্ল্যানেট আর্থ’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নিতে।’ শিলংয়ে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্টের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাওয়ার আগে একটি ট্যুইটে এমন কথা লিখেন, সেই ট্যুইটই জীবনে শেষ ট্যুইট।

ফেরা হলো না আর। ‘যাচ্ছি’ বলে গেলেন, আর ফিরলেন না! শিলংয়েই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ‘ভারতের মিসাইল ম্যান’ গেল সোমবার শিলংয়ে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্টের এক অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হন তিনি। শিলং হাসপাতালের চিকিৎসকরা বহু চেষ্টার পরও তাকে বাঁচাতে পারেননি।

আমাদের সবাইকে ছেড়ে এক অজানার পৃথিবী নামক এই গ্রহে ৭০০ কোটিরও বেশি মানুষ বসবাস করে। প্রতিদিনই তো হাজার হাজার মানুষ চলে যাচ্ছে সেই অজানার দেশে, কে কার খবর রাখে।

হয়তো স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনদের শোকের সাগরে ভাসিয়ে বিদায় নিচ্ছেন কিন্তু এই মানুষটির জন্য আজ কাঁদছি আমরা, কাঁদছে ভারতবাসি, কাঁদছে গোটা বিশ্ব। সত্যিই বিশ্ববাসী আজ অনুভব করছে আব্দুল কালামের শূন্যতা। কেন কাঁদছে বিশ্ববাসী এই মানুষটির জন্য সেটাই আজ আমাদের ভাবনার বিষয়।

ফলে তার জীবন

এক. আব্দুল কালামের ইন্তেকালে ৭ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে ভারত। আজ মঙ্গলবার একদিনের জাতীয় ছুটি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অবশ্য কাজ পাগল এই সজ্জন ব্যক্তিত্ব এক সময় বক্তৃতা করতে গিয়ে বলেছিলেন,

আমার ইন্তেকালের পর যেন রাষ্ট্রীয় শোক পালনের জন্য কোন ছুটি ঘোষণা করা না হয়, বরং তার বিপরীতে যেন একদিন

দুই. নিজে মুসলিম হয়েও ভারতের মত একটি কট্টর হিন্দুবাদ সাম্প্রদায়িক দেশে নিজের অসাম্প্রদায়িকতা চেতনা আর উচ্চ মানবতাবোধের মাধ্যমে শুধু ভারতবাসিকেই নয় গোটা বিশ্ববাসীকেই জয় করেন তিনি।

তিন. স্বপ্নের ফেরিওয়ালা- তিনি ছিলেন বিশ্ববাসীর নতুন স্বপ্ন জাগানোর মানুষ। ‘ঘুমিয়ে যে স্বপ্ন মানুষ দেখে তা স্বপ্ন নয়। স্বপ্ন সেটাই, যা তোমাকে ঘুমোতে দেবে না।’- এই হলেন ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ও খ্যাতিমান পরমাণু বিজ্ঞানী আবুল পাকির জয়নাল আবেদিন আবদুল কালাম।বিজ্ঞানী, লেখক, রাষ্ট্রপতি— অনেক বিশেষণেই পরিচিত আবদুল কালাম। তবে ভারতসহ বিশ্বের লাখ লাখ তরুণের কাছে তিনি আপাদমস্তক একজন স্বপ্নবাজ মানুষ, স্বপ্নের ফেরিওয়ালা।

যিনি স্বপ্ন দেখতে এবং স্বপ্ন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত লেগে থাকতেন। এক স্বপ্ন সফল হলে ঝাঁপিয়ে পরতেন নতুন স্বপ্ন নিয়ে। স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হয়েই সোমবার রাতে ৮৪ বছর বয়সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। ‘আমি সম্ভাবনা নিয়ে জন্মেছি। আমি জন্মেছি মঙ্গল আর বিশ্বাস নিয়ে। আমি এসেছি স্বপ্ন নিয়ে। মহৎ লক্ষ্য নিয়েই আমার জন্ম। হামাগুড়ির জীবন আমার জন্য নয়, কারণ আমি ডানা নিয়ে এসেছি। আমি উড়ব, উড়ব, আমি উড়বই’- পারস্যের কবি জালাল উদ্দিন রুমির এই কবিতায় আবদুল কালামেরসেটিকেই ব্রতী মেনে উড়েছেন, করেছেন মানবের কল্যাণ।

অবাক করার মত হলেও সত্য, স্বপ্নবাজ এই মানুষটি বিগত দুই দশকে বিশ্বের এক কোটি ৮০ লাখ তরুণের সঙ্গে মিশেছেন। তাদের মতের সঙ্গে নিজের মতের সংমিশ্রন ঘটিয়েছেন।

চার. ১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর দক্ষিণ ভারতের রাজ্য তামিলনাড়ুর অত্যন্ত দরিদ্র এক মৎস্যজীবী পরিবারে তাঁর জন্ম। কিন্তু যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাধা অতিক্রম করে আব্দুল কালাম ভারতে বিজ্ঞানচর্চার শীর্ষে ও সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আরোহণ করেছিলেন তা রূপকথাকেও হার মানায়। তিনি সব সীমাবদ্ধতাকে পদদলিত করে স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করেছেন।

পাঁচ. সহজ সরল অনাড়ম্বর জীবনযাপন- ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অবিবাহিত। আর খুব সহজ সরল অনাড়ম্বর জীবনযাপনের জন্যও আজীবন পরিচিত ছিলেন। রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অবসরের পর থেকে আবদুল কালাম সারা দেশজুড়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা-বিষয়ক ও প্রেরণামূলক বক্তৃতা দিয়ে বেড়াতেন, বহু জনপ্রিয় বইও লিখেছেন তিনি।

ছয়. ‘জীবনের লক্ষ্য অর্জনের পথে এগিয়ে যেতে যেতে বারবার সমস্যা আসবে, সংকট পথ আটকাবে। কিন্তু হৃদয়ে রাখতে হবে একটি সংকল্প- আমি সংকটজয়ী হব, সব সমস্যা পেছনে ফেলে ছিনিয়ে নেব সাফল্য।’- নিজের এই বিশ্বাসে অটল থেকেসফল পরমাণু বিজ্ঞানী হয়েছেন আবদুল কালাম।

সাত. তিনি বিশ্বাস করতেন, সব স্বপ্ন অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত মহৎ যত বই আছে, সব পড়ে জ্ঞান অর্জন চালিয়ে যেতে হবে। যেহৃদয় দিয়ে কাজ করে না, শূন্যতা ছাড়া সে জীবনে কিছুই অর্জন করতে পারে না।

আট. আপাদমস্তক রাজনীতিবিহীন আবদুল কালাম ছাত্ররাজনীতি নিয়ে ভাবতেন। এ বিষয়ে তার স্পষ্ট উচ্চারণ, ‘যেখানে হৃদয় হবে ন্যায়-পরায়ণ, চরিত্রে থাকবে সৌন্দর্য, সেই রাজনীতিই আমরা চাই।’ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নোংরা রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে ‘চাকরিপ্রার্থী’ না করে ‘চাকরিদাতা’ তৈরি করারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

* বাবার অভাবের সংসার। নুন আনতে পানতা ফুরায় অবস্থা। এজন্য কলেজে পড়ার সময় আবদুল কালাম বড় ভাইয়ের মুদি দোকানে বসে তেল, নুন, পিঁয়াজ, চাল, ডাল বিক্রি করতেন। কোনো কাজকেই তিনি জীবনে ছোট মনে করতেন না। আমিষে খরচ বেশি ভেবে নিরামিষ খেতেন। আজীবন তিনি নিরামিষ ভোজিই থেকে গেছেন।

*. দক্ষিণ ভারতের শ্রেষ্ঠ কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে ভর্তির সুযোগ পান আবদুল কালাম। কিন্তু বাঁধ সাধে অর্থ। বোন জোহরা পাশে দাঁড়িয়ে নিজের সোনার বালা ও চেন বন্ধক রেখে প্রায় এক হাজার রুপীর

* খাবারের জন্য আট বছর বয়সে সংবাদপত্র বিক্রি করতেন আবদুল কালাম। প্রতিদিন মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতেন পত্রিকা। তার থেকে প্রাপ্ত আয়ে নিজের অন্ন এবং সংসারে সহযোগিতা করতেন।ছোটকালে বোট চালিয়ে বাবাকে সহায়তা সর্বোপরি, তিনি সাধনা আর উচ্চ মানবাবিকতার দ্বারা বিশ্বকে জয় করেছেন। এতে যেমনটি তিনি নিজেকে গড়েছেন একজন আদর্শবান মানুষ হিসেবে তেমনি বিশ্ববাসীকে দিয়ে গেছেন অনেক কিছুই। ফলে আজ কাঁদছে ভারতবাসী, কাঁদছি আমরা এবংকাঁদছে বিশ্ববাসী। তাই আফসোস! সত্যিই আমাদের দেশে এমন মানুষ যদি জন্ম নিতেন!

লেখক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান, গবেষক ও কলাম লেখক। ই-মেইল: sarderanis@gmail.com

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close