ফিচার

জাতীয় সঙ্কট: নারী-শিশুর নিরাপত্তায় জরুরী অবস্থা চাই

মহাজোট সরকারের গেল সাড়ে ছয় বছরে দেশের অনেক উন্নয়ন হয়েছে। উনুন্নত দেশ থেকে আমরা হয়েছি নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। সত্যিই এটি আমাদের জাতির জন্য একটি আত্মস্লাগার সংবাদ। ফলে এ নিয়ে সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও দলীয় লোকদের চলছে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা। টার্গেটের ছয় বছর আগেই এধরনের একটি অস্বাভাবিক উন্নতিতে আমাদের রাষ্ট্রের হর্তাকর্তারা খুশিতে আত্মহারা ।

যদিও স্বল্পোন্নত দেশের গন্ডি থেকে বের হবার স্বপ্ন পূরণের পথ পারি এখনো অনেক দূরে। জানিনা, এই উন্নতিতে আমাদের রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকদের জীবনে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, তবে বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য দাতাগোষ্ঠী ও সংস্থার ঋণপ্রাপ্তি যে সহজ হয়েছে, ফলে আগামী দিনে রাষ্ট্রের নাগরিকদের যে ঋনের বোঝা বৃদ্ধিতে এটি বেশ ইতিবাচক ভুমিকা রাখবে এতে অন্তত: কারো কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়।

যাক দৃশ্যত দেশের উন্নতি যাই হোক না কেন, মহাজোট সরকারের গেল সাড়ে ছয় বছরে দেশের অনেক উন্নতির পাশাপাশি রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতা যে অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে সেটা কিন্তু কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই। ধর্ষণ, হত্যা-খুন, গুম, অপরহরণ ও বিচারবহির্ভুত হত্যাসহ নানা অপরাধ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে।

পাল্টে গেছে যে অপরাধের ধরণ, যোগ হয়েছে নাগরিকদেরে উপর নির্যাতনের নতুন নতুন কৌশল। শুধু তাই নয়, এসব অপরাধে যোগ হয়েছে অসভ্য ও বর্বর যোগের যতসব নির্মম কৌশল। ফলে আজ বাংলাদেশ নামক ভু-খন্ডের নাগরিকরা ব্যক্তিগত ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই গেল কয়েক মাস থেকে নারী-শিশুদের নিরাপত্তাহীনতা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে ।

ঘরে-বাইরে, কর্মক্ষেত্রে সর্বত্রই নারী-শিশুরা বর্বর নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নির্যাতনে অনেকে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছে, আবার অনেকে পঙ্গুত্ববরণ করে কোনো মতে বেঁচে থাকছে। এক্ষেত্রে তিন-চার বছরের শিশু থেকে ৬০ বছরের নারীরাও রেহাই পাচ্ছে না। গেল কিছুদিনের বেশ কয়েকটি লোমহর্ষক ঘটনা আইয়্যামে জালিয়াত তথা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। এসব ঘটনা আমাদের গোটা জাতিকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

এক. এইতো ক’দিন আগে সিলেটের শহরতলি কুমারগাঁও এলাকায় চোর সন্দেহে শিশু সামিউল আলম রাজনকে খুটির সাথে বেঁধে বর্বরোচিত কায়দায় কয়েকজনে মিলে পিটিয়ে হত্যা করার পর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করে পাষণ্ডরা । এরপর সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ি ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামে সরকারি রাস্তায় খেজুরের কাঁটা দিয়ে তৈরি বেড়া ভেঙে ফেলায় দুই শিশুকে দড়ি ও শিকল দিয়ে বেঁধে রেখে নির্যাতন করা হয়। লোমহর্ষক এসব নির্মম নির্যাতনের রেশ কাটতে না কাটতেই সোমবার খুলনা নগরীতে নির্মমভাবে শিশু রাকিবকে হত্যা করা হয়েছে। কর্মস্থল ছেড়ে অন্য স্থানে কাজ করায় ১২ বছর বয়সী রাকিবের মলদ্বারে কমপ্রেসার মেশিন বসিয়ে পেটে বাতাস ঢুকিয়ে নির্মম পৈশাচিকতায় তাকে হত্যা করা হয়েছে। অন্যান্য ঘটনার মতো এ ঘটনার পর নিন্দা-প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। তাতে কী, এসব অপরাধ কী হ্রাস পাবে?

দুই. আজ সমাজে নারী ও শিশু অধিকার এতটা উদ্বেগজনক পর্যায়ে গেছে যে, মায়ের গর্ভেও শিশুরা নিরাপদ নয়। আমরা দেখেছি গত ২৩ জুলাই বিকালে মাগুরা শহরের দোয়ারপাড়ায় বাড়িতে ঢুকে অন্তঃসত্ত্বা মা নাজমা খাতুনের (৩০) পেটে গুলি করে ছাত্রলীগ-যুবলীগ সন্ত্রাসীরা। পেটে বাচ্চার দোহাই দিয়েও হামলাকারীদের হাত থেকে রেহাই পাননি তিনি। এখন ঢাকার একটি হাসপাতালে মা ও সদ্যজাত মেয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে।

তিন. ৩০ এপ্রিল নড়াইলের সেনা সদস্য স্বামী ও তার পরিবারের লোকজন কর্তৃক গৃহবধুকে গাছে বেধে নির্যাতন। পরে এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্টের রুল জারি। ১৯ জুলাই সন্ধ্যায় সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর পশ্চিমপাড়া গ্রামে মিস্টির বক্স নিয়ে অতিথি সেজে ঘরে ঢুকে লন্ডন প্রবাসীর স্ত্রীসুজিনা বেগমকে হত্যা করে দুর্বৃক্তরা। প্রতিনিয়ত এরকম আরো অনেক হত্যা-নির্যাতনের ঘটছে আমাদের চারপাশে। কিন্তু এসবের যেন কোনো প্রতিকার নেই।

চার. . প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া না দেয়া বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ছাত্রলীগ নেতাকর্তৃক ছাত্রীকে মারধর। ঘরে-বাইরে সর্বত্রই একই অবস্থা। এমন কী স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীকে যৌনহয়রানি করা হচ্ছে। সারা দেশে বেড়েই চলছে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা। বাড়ছে খুন, ধর্ষণের ঘটনাও। দুর্বৃত্তদের পাশবিকতা থেকে বাদ যাচ্ছে না শিশুরাও। গত কয়েক মাসে খোদ রাজধানীতেই একাধিক গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে। কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরতে মাইক্রোবাসে তুলে, বন্ধুর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে, এমনকি স্বামীকে অতিরিক্ত মদ্যপান করিয়ে মাতাল করে স্ত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

সর্বশেষ মঙ্গলবার রাজধানীর ভাটারা থানার নয়ানগরে নিজের ঘরে ধর্ষিত হয়েছে চতুর্থ শ্রেণীতে অধ্যয়নরত এক গারো শিশু। এর গত জুন মাসে ভাটার থানা এলাকা যমুনা ফিউচার পার্কে পোশাকের দোকানে কর্মরত এক গারো তরুণীকে চলন্ত মাইক্রোবাসে ধর্ষণের ঘটেছিল। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী গত ছয় মাসে সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় অন্তত ১০ হাজার মামলা হয়েছে। এ থেকে বুঝা যায় আমাদের নারী-শিশুরা কতটা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন।

সমাজ বিজ্ঞানীরা মতে, দেশে এক ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু হয়েছে। এতে ধর্ষক-নির্যাতকরা শাস্তি থেকে বেঁচে যাচ্ছে। এসব দেখে অন্যরা অপরাধ কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত হচ্ছে। এছাড়া সমাজে মূল্যবোধের অভাব এত প্রকট হচ্ছে যে মানুষ তার মানবিকতাবোধ হারিয়ে ফেলছে। এ কারণে তরুণী ও মহিলার পাশাপাশি শিশুরাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে।

অপরদিকে সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকদের ভাষ্যমতে, আইনের যথাযথ প্রয়োগ, দ্রুত বিচার সম্পন্ন ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমেই কেবল ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মতো অপরাধ রোধ করা সম্ভব। কিন্তু সেটা কি আমাদের এই কুলষিত সমাজে আশা করতে পারি? আজ নারী ও শিশুদের জীবন ও ইজ্জত এতটাই হুমকির মুখে যে কোথাও তাদের নিরাপত্তা নেই। যতদূর জানি তাতে, আইয়্যামে জাহেলিয়াত কিংবা মধ্য যুগেও নারী-শিশুরা এমন নিরাপত্তাহীনতায় বসবাস করেনি। আমরা আজ আমাদের মা-বোন ও সন্তানদের নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। রাষ্ট্র যেন নিরাপত্তা দিতে পারছে না।

এসব অপরাধ দমন করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাই রাষ্ট্র যদি স্বাভাবিকভাবে আমাদের নারী-শিশুদের জীবন দিতে ব্যর্থ হয়, তবে প্রয়োজনে দেশে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করা হোক।কেননা, বর্তমানে স্বাভাবিক অবস্থা নেই। প্রতিদিনই নারী-শিশু নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ফলে নারী-শিশুর নিরাপত্তাহীনতা জাতীয় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। সরকার কোনোভাবেই নিশ্চিত করতে পারছে না। ফলে সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতা বলেই নাগরিক নিরাপত্তার স্বার্থে জরুরী অবস্থা জারি করে পরিস্থিতির উন্নতি করা প্রয়োজন।

সবশেষে আমাদের রাষ্ট্র্রের কর্ণধারদের প্রতি আহবান রাখবো- আসুন আমরা সবাই সময় থাকতে ঘুম থেকে জাগ্রত হই, এসব বিষয়ে সচেতন হই, একগুয়েমি-দলবাজির উর্ধ্বে উঠে সত্যিকার অর্থে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করি।

অপরাধী অপরাধীই- হোক সে ক্ষমতাসীন দলের কোনো সদস্য, হোক সে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কোনো সদস্য কিংবা সাধারণ কোন অপরাধী। সেই সাথে দেশবাসীর প্রতি আহবান- আসুন, সময় থাকতে আমরা সবাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই এবং আমাদের দেশ-জাতি ও সমাজকে অধঃপতনের হাত থেকে রক্ষা করি। আমাদের মা-বোন ও সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ ভুমি গড়ে তুলি।

লেখক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান, গবেষক ও কলাম লেখক । ই-মেইল:sarderanis@gmail.com

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close