রাজনীতি

নির্বাচনকালীন সরকারের প্রক্রিয়া কী হবে?

শীর্ষবিন্দু নিউজ ডেস্ক: ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারি চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ সরকারকে সাত দফা প্রস্তাব দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি এ প্রস্তাবনা পেশ করেন। একই সঙ্গে এ প্রস্তাব না মানলে সর্বাত্মক আন্দোলনের ঘোষণা দেন তিনি। তার প্রস্তাবে আওয়ামী লীগ সাড়া না দিলে শুরু হয় আন্দোলন।

পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বার বার অবস্থান পরিবর্তন করছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। কখনও বলছেন তত্ত্বাবধায়ক হতে হবে এমন নয়, যে কোন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাব। আবার কখনও বলছেন নির্বাচনের বিষয়ে আমাদের আগের অবস্থান পরিবর্তন হয়নি। কখনওবা বলছেন তত্ত্ববাধায়ক সরকার ফিরিয়ে এনে মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে হবে।

২০১৩ সালের ৮ ডিসেম্বর ‘সকলের অংশগ্রহণমূলক, অহিংস এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন’ অনুষ্ঠানের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে গ্রহণযোগ্য এক আপস-ফর্মুুলায় পৌঁছানোর তাগিদ দিয়েছিল জাতিসংঘ। এরপর গত ২০১৫ সালের ১৪ আগস্ট নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ফর্মুলা দিয়েছে হাইকোর্ট।

বিবিসি সংলাপে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, সম্প্রতি হাইকোর্ট নির্বাচনকালীন সরকারের যে রূপরেখা দিয়েছেন সেটি অসাংবিধানিক। তিনি বলেন, সংবিধানে যা লেখা আছে, সেটা না বদলিয়ে কেউ যদি বলেন এটার বিপরীত কিছু করতে হবে, সেটা শুধু অগ্রহণযোগ্যই নয়, অসাংবিধানিকও। হাইকোর্ট যে রূপরেখা দিয়েছেন সেটিকে সরকার বিবেচনা করতে পারে কিনা- এমন প্রশ্নে আইনমন্ত্রী বলেন, আমার মনে হয় না হাইকোর্ট এ ধরণের প্রস্তাব দিতে পারে। হাইকোর্টের রায় যদি ডাইরেকটিভ (নির্দেশনামূলক) হয় তাহলে সেটি অসাংবিধানিক। যদি অবজারভেশন (পর্যবেক্ষণ) হয় তাহলে সেটা সেই আলোকেই দেখা হবে।

হাইকোর্ট ফর্মুলা সম্পর্কে বিএনপি বলছে, উচ্চ আদালত যে দুটি ফর্মুলা দিয়েছে তার বাস্তবভিত্তিক কোনো সম্ভাবনা নেই এবং এটা প্রয়োগযোগ্যও নয়। এ ফর্মুলার মাধ্যমে, নির্বাচন নিয়ে যে সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে উত্তরণের পাকানো পথ খুলবে বলে বিএনপি মনে করে না। তবে গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অবৈধ ছিল তা এ দুটি ফর্মুলায় স্বীকৃতি পেয়েছে।

২৫ জুলাই রাতে বাহ্মণবাড়িয়া জেলার জাতীয়তাবাদী আইনজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বেগম জিয়া বলেন, তত্ত্ববাবধায়ক সরকার হতে হবে এমন নয়, যে কোন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আমরা নির্বাচনে যাব।

১ আগস্ট রাতে রাজশাহী জেলার জাতীয়তাবাদী আইনজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে খালেদা জিয়া বলেন, নির্বাচনের বিষয়ে বিএনপি আগের অবস্থান বদলায়নি। শেখ হাসিনার অধীনে আমরা কখনও নির্বাচনে যাব না। আর ৫ জানুযারি নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। এর আগে রোজার মাসে এক ইফতার পার্টিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে মধ্যবর্তী নির্বাচন দাবি করেন।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বক্তব্য স্পষ্ট নয় বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, উনি (খালেদা) কি বলতে চাইছেন তা কারও কাছেই স্পষ্ট নয়। খালেদাকে ও বিএনপিকেই বক্তব্য স্পষ্ট করতে হবে তারা কি বলতে চাইছেন।

১৫ সালের ২৮ জুলাই বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এমপি বলেছেন, খালেদা জিয়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে না এসে ভুল করেছেন। এখন তিনি (খালেদা) আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার চান না। তিনি কেবল ‘নিরপেক্ষ নির্বাচন’ চান। তবে, খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে আসতে হলে জঙ্গীবাদ ও মৌলবাদ ত্যাগ করে গণতন্ত্রের পথে আসতে হবে।

২৭ জুন ২০১৫ জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, ২০১৯ সালে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে না। “২০১৯ সালে একটি নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচনে গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে গণতান্ত্রিক শক্তির নির্বাচন হবে। এতে গণতন্ত্রের অচল মাল সচল হওয়ার কোনো সুযোগ নাই। আগুন সন্ত্রাসী খালেদা জিয়ার সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ থাকবে না।”

আর খালেদা জিয়ার এ কথার জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম একদিকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, সংবিধান অনুসারে ২০১৯ সালের মধ্যেই নির্বাচন হবে। এ পরিস্থিতিতে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশে আবারও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে বলে অভিজ্ঞমহল মনে করছেন।

সংবিধান অনুসারে দলীয় সরকারের বাইরে অন্যকোন সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সুযোগ নেই। তারপরও এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী এক অনুষ্ঠানে বলেন, সংবিধান অনুসারে ২০১৯ সালে দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। অপর এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, বিএনপি ভুল বুঝতে পেরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু থেকে সরে এসেছে। আর ১ জুলাই এক অনুষ্ঠানে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বিএনপির মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেন, ২০১৯ সালে শেখ হাসিনার অধীনেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে।

এদিকে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে সঠিক গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে। এর আগে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচন নয়, নতুন নির্বাচন চায় বিএনপি।

উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের মুখে তৎকালীন বিএনপি সরকার সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী এনে তত্ত্ববাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করে। কিন্তু ২০০৬ সালে রাজনৈতিক সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে জরুরি অবস্থা জারির পর গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর ক্ষমতায় থাকার কারণে এই পদ্ধতির দুর্বলতা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন ওঠে। বিভিন্ন মহল থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিলেরও দাবি ওঠে। ২০১১ সালের ১০ মে সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল বিষয়ক সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে। এরপর জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বিল পাসের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করা হয়। এই সংশোধনীতেই দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচনের ব্যবস্থা রাখা হয়। তাই বর্তমান সংবিধান অনুসারে ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারির পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত বর্তমান সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি।

সূত্রমতে, বিএনপি কৌশলগত কারণে মাঝেমধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি ফিরিয়ে এনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি করলেও দলীয় হাইকমান্ড ধরে নিয়েছে বর্তমান সরকার তাদের এ সুযোগ করে দেবে না। তাই রোববার দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মধ্যবর্তী নির্বাচন নয়, নতুন নির্বাচন চায় বিএনপি। এ দলটি এটাও ধরে নিয়েছে যে, সংবিধান পরিবর্তন করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি আর বর্তমান সরকার ফিরিয়ে আনবে না। তবে যে কোনভাবে যাতে একটি গ্রহণযোগ্য সরকারের অধীনে নির্বাচন করা যায় সে জন্য তারা সরকারকে চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছে।

প্রসঙ্গত, দীর্ঘদিন আন্দোলন করেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় না হওয়ায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। কিন্তু নির্বাচন বর্জন করে রাজনৈতিকভাবে বেকায়দায় পড়ায় বছরখানেক পর আবারও আন্দোলন শুরু করে দলটি। চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি টানা ৯২ দিন নেতিবাচক আন্দোলন করতে গিয়ে বিএনপিরই রাজনৈতিক ইমেজ ক্ষুণ্ণ হয়েছে। দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে পাঁচবার রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা এ দলটি। সে আন্দোলনের রেশ টানতে গিয়ে এখনও বিএনপি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। না পারছে দল গুছিয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করতে এবং না পারছে আবার আন্দোলনের দিকে গিয়ে সরকারকে চাপে রাখতে। তবে পরবর্তী নির্বাচনের ব্যাপারে মাঝেমধ্যে গরম গরম কথা বলে দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে চাচ্ছেন খালেদা জিয়া। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিএনপির অন্য নেতারাও বক্তব্য রেখে চলেছেন।

শত নাগরিক কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন তো কোন নির্বাচন ছিল না। তাই যে কোনভাবেই হোক নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হতেই হবে। তা না হলে রাজনৈতিক পরিবেশ নষ্ট হতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াসহ দলের নেতারা যা বলছেন তা দলীয় অবস্থান থেকেই বলছেন। তাদের কথায় যুক্তি আছে কিনা তা বিবেচ্য বিষয়। আর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যা বলা হচ্ছে তা হচ্ছে সংবিধান অনুসারে ২০১৯ সালেই নির্বাচন হবে। পরবর্তী নির্বাচন সংবিধান অনুসারেই হবে। তবে নির্বাচনের প্রক্রিয়া কী হবে এ নিয়ে পরস্পরের মধ্যে আলোচনা হতে পারে।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close