ফিচার

রিমান্ড রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের হাতিয়ার ও অসভ্যতার প্রতীক রিমান্ডের নামে নাগরিকদের রাষ্ট্রীয় নির্যাতন বন্ধ করতে হবে

এর আগেও এ বিষয়ে অনেক লেখালেখি করেছি, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এরপরও আজ পুনরায় এ সম্পর্কে না লিখে বসে থাকতে পারলাম না। দুইদিন থেকেই মনটা ভালো নেই। গেল রোববার সকালে ঘুম থেকে উঠেই পত্রিকার পাতা ও টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখতেই দেখি দেশের প্রবীণ সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদের ৮০ দিনের রিমান্ড চেয়েছে পুলিশ। পুলিশের দায়ের করা ৮টি মামলায় দশ দিন করে এই রিমান্ড চাওয়া হয়।

সোমবার আদালত শুনানি শেষে ৪দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। পত্রপত্রিকা থেকে যতদূর জানতে পেরেছি তাতে, তার বিরুদ্ধে গাড়ি পোড়ানোসহ নাশকতার অভিযোগ আনা হয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে দিকে বিএনপির হরতাল-অবরোধ চলাকালে পল্টন ও মতিঝিল থানায় ওই মামলাগুলো দায়ের করা হয়েছিল।এর আগে গ্রেফতারের পরপরই ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে তিনদিনের রিমান্ড শেষে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে টেলিভিশন টকশোতে উপস্থিতির কারণে মোটামোটিভাবে আমরা সবাই শওকত মাহমুদ সম্পর্কে কমবেশি জানি। আমরা যদি কোনো দল বা গোষ্ঠীর আদর্শে অন্ধ বিশ্বাসী ও আনুগত্যশীল না হয়ে থাকি, তবে একথা দৃঢ়ভাবেই বলতে পারি-দেশের একজন জেষ্ঠ্য নাগরিক ও সাংবাদিক হিসেবেই প্রায় সব মহলেই শওকত মাহমুদের একটা পরিচিতি রয়েছে।

কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হলো- হঠাৎ করেই কীভাবে তিনি রাষ্ট্র-সমাজের জন্যে এতটা ক্ষতিকর ও ভয়ঙ্ঙ্কর হয়ে গেলেন। যে কারণে পুলিশ তার ৯০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করলো। আমার জানামতে, সিরিজ কিলার কিংবা চোর-ডাকাতদেরও এক নাগারে এতোদিনের রিমান্ড চাওয়া হয় না। দেশের সাধারণ নাগরিকরা এ বিষয়ে কী ধারণা পোষণ করছেন তা জানি না, তবে শওকত মাহমুদ নিজে গাড়ি পোড়ানোসহ নাশকতার কাজে জড়িত ছিলেন এটা অন্তত: আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় শওকত মাহমুদের মত নীতি আদর্শের সাথে আমাদের অমিল থাকাটা স্বাভাবিক।

তাই বলে তার প্রতি এ ধরনের রাষ্ট্রীয় অবিচার দেখে আমাদের চুপ থাকাটা মোটেও সমীচীন নয়! ফলে বিবেকের তাড়না থেকেই আমার আজকের এই লেখা। আমরা যারা দলবাজি করি না তাদের কাছে বিষয়টি খুবই পরিষ্কার- শওকত মাহমুদ যতটা না অপরাধ করেছেন তার চেয়ে বেশি অপরাধ হলো একটি দলের প্রধানের উপদেষ্টা হওয়া। এছাড়া যতদূর জেনেছি তাতে, সাম্প্রতিককালে প্রেসক্লাবের নেতৃত্ব নিয়েও দু’পক্ষের মধ্যে যে সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে সেটাও এর পেছনে খানিকটা কাজ করছে।

এ প্রসঙ্গে আজ স্মরণে পড়ে গেল সেই পুরানো দিনের একটি প্রবাদের কথা। ছোটকাল থেকেই গ্রামবাংলায় একটি প্রবাদ শুনে এসেছিলাম- ‘কাকের মাংস নাকি কাকে খায় না’। কিন্তু বর্তমানে সাংবাদিকদের মধ্যে যে ধরনের বিভেদ তৈরি হয়েছে তাতে যেন সেই প্রবাদকেও হার মানাচ্ছে। সর্বশেষ জাতীয় প্রেসক্লাব দখল নিয়ে যা ঘটেছে তা গোটা জাতিকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। আর সাংবাদিকদের এই দলবাজির কারণে দেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতিও ক্রমেই নাজুক হচ্ছে।

থাক এসব বিষয়, আজকের প্রসঙ্গে ফিরে আসি- আমাদের দেশে আজকাল মামলা মানেই রিমান্ড। রিমান্ডে নিয়ে বলিউড স্টাইলে আসামীদের পিটিয়ে তথ্য উদ্ধার, কোন বাস্তবিক তদন্তের বালাই নেই। এখানেআর সাম্প্রতিকালে রিমান্ডে নির্যাতনের হার, এমন কি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটছে।

আমরা কী লক্ষ্য করছি- মামলা হলেই পুলিশ আসামী গ্রেফতারের পরপরই দিনের পর দিন রিমান্ডের আবেদন করছে, আমাদের বিজ্ঞ আইনজীবীরা তাদের আবেদনের পক্ষে ওকালতি করছেন। আর আমাদের নিম্ন আদালতের বিজ্ঞ বিচারক সাহেবরা উদার হস্তে এসব আবেদন মঞ্জুর করে চলেছেন। এ ফলে শওকত মাহমুদ, প্রবীর সিকদার, মাহমুদুর রহমান, মাহমুদুর রহমান নান্না, আব্দুস সালাম, কনক সারওয়ারের ক্ষেত্রেও এ রীতি কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।

কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হলো- বিজ্ঞ বিচারকরা কী জানেন না, এই আসামীদের পুলিশ হেফাজতে নিয়ে তাদের সাথে কী আচরণ করা হচ্ছে? আমার তো মনে হয়- এসব কিছু কারো অজানা থাকার কথা নয়। তবে কেন এইসব ধারাবাহিক রিমান্ড মঞ্জুর করা হচ্ছে? জানি, এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নাই। সবসবকিছুই উপর মহলের ইশারায় চলে।

প্রসঙ্গত, গেল বছরের ২০ নভেম্বর দৈনিক মানবজমিনে ‘রিমান্ডে অনিতাকে রোমহর্ষক নির্যাতন’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি খবরই প্রমাণ করে আমাদের দেশে রিমান্ড নাগরিকদের জন্য কতটা ভয়ঙ্কর। প্রতিবেদনে বলা হয়- একটি শিশু অপরহরণের ঘটনায় রিমান্ডে স্বীকারোক্তি আদায়ে ‘সেবিকা অনিতার গোপনাঙ্গে লাঠি দিয়ে খোঁচায় এসআই আঁখি।

আর মুখে পাইপ লাগিয়ে মদ ঢেলে দেন ওসি মনিরুল। এরপর মাটিতে ফেলে গলায় বুট দিয়ে চেপে ধরেন। এমন রোমহর্ষক ঘটনা ঘটে সিলেটের কোতোয়ালি থানায়। ঘটনাটি ফাঁস হয়ে গেলে এ নিয়ে তখন দেশব্যাপী হইচই পড়ে যায়। পরে ওসি মনিরুল ও সাব-ইন্সপেক্টর আঁখিকে কর্মস্থল থেকে শুধু প্রত্যাহার করা হয়। এছাড়া খুলনার একটি থানা হাজতে আসামীকে উপরে টাঙ্গিয়ে পেটানোর কথা তো আমাদের সবারই জানা।

বাংলা একাডেমীর অভিধান অনুযায়ী, রিমান্ড শব্দটির অর্থ আরও সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আদালত থেকে পুলিশের হেফাজতে পাঠানো। আর সংবিধান, ফৌজদারি কার্যবিধি, পুলিশ প্রবিধানসহ সব আইনেই পুলিশ হেফাজতে থাকা ব্যক্তিকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা অপরাধ। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, রিমান্ড মানেই নির্যাতন।

প্রসঙ্গত, উল্লেখ করা যেতে পারে- খিলগাঁও থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হেলালউদ্দীন জিজ্ঞাসাবাদের নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল কাদেরের পায়ে চাপাতি দিয়ে কোপ দিয়েছিলেন। পরে মিথ্যা অভিযোগে কাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এভাবে শুধু কাদের নন, রিমান্ডের নামে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অনেকেই। রিমান্ডে নিয়ে মারপিট করে, ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের ঘটনা অহরহ ঘটছে।

সাম্প্রতিককালে আমাদের দেশে নাগরিকদের ৫৪ ধারায় গ্রেফতার এবং পুলিশী রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাবাদের নামে নির্যাতনের প্রবণতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।এটাকে অনেকে রাষ্ট্রীয় নির্যাতন হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী, দেশীয়-আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে নাগরিকদের উপর এ ধরনের রাষ্ট্রীয় নির্যাতন বন্ধের দাবি করে আসছেন।

কিন্তু এরপরও থেমে নেই রিমান্ড। সাম্প্রতিক সময়ে নাগরিক ঐক্যের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্নাকে নাটকীয়ভাবে গ্রেফতার, তাকে দু’দফা ২০ দিন রিমান্ডে নেয়া, অবশেষে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও অতপর সংবাদ সম্মেলনে মান্নাকে রিমান্ডে নির্যাতনের অভিযোগ করেন তার পরিবারের সদস্যরা।

এছাড়া বিএনপির যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে কয়েক দফায় ২৯দিন রিমান্ডে নেয় পুলিশ। এসব রিমান্ডে পুলিশ কোন প্রক্রিয়ায় আসামীদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন তা আমার জানা নেই। তবে সুস্থ ব্যক্তিকে রিমান্ডে নেয়ার পর তাকে অসুস্থ অবস্থায় আদালতে হাজির করতে দেখা গেছে। আবার অনেককে অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে ভর্তি করাও হয়েছে।

এভাবে শুধু মান্না কিংবা রিজভী নয়, প্রতিনিয়ত শত শত নাগরিককে রিমান্ডে নিয়ে পুলিশ নির্যাতন করছে বলে তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে বরাবরই অভিযোগ করে আসছেন। এরপরও নিম্ন আদালত পুলিশের আবেদনে রিমান্ড মঞ্জুর করে যাচ্ছেন। বিরোধী মতের লোকদের অভিযোগ, নাগরিকদের দমনে রিমান্ডের যথেচ্ছ ব্যবহার করছে সরকার। কোনো ধরনের অভিযোগ বা সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া কিংবা মামলা থাকলেও তদন্ত ও অনুসন্ধানের আগেই দিনের পর দিন রিমান্ডে রেখে নির্যাতন চালানো হচ্ছে বিরোধী মতের লোকদের ওপর।

মারধর ছাড়াও পুলিশের নির্যাতন কৌশলের মধ্যে রয়েছে ‘ওয়াটার পলিশ’ (নাকে-মুখে গামছা দিয়ে পানি ঢালা), বাদুর ঝোলানো (উল্টো করে ঝোলানো), ‘ওয়াটার থেরাপি’ (পানিতে নাক চুবানো), বৈদ্যুতিক শক দেওয়া, পশ্চাদ্দেশে মরিচ দেওয়া, গুলি করে হত্যার (এনকাউন্টার বা ক্রসফায়ার) হুমকি ইত্যাদি।

আইনজীবীদের বক্তব্য হলো, উচ্চআদালতের নির্দেশনা হচ্ছে, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে দায়ের করা মামলায় নিম্নআদালত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কোনো ব্যক্তিকে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করতে পারবে।’ অথচ বর্তমানে কোনো কোনো ব্যক্তিকে একনাগাড়ে এক মাসেরও বেশি সময়ের জন্য রিমান্ড মঞ্জুর করছে নিম্নআদালত। এটা উচ্চআদালতের নির্দেশনার স্পষ্ট লঙ্ঘন ও অবজ্ঞা প্রদর্শন।

প্রসঙ্গত সন্দেহজনক গ্রেফতার সংক্রান্ত ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা এবং রিমান্ড সংক্রান্ত ১৬৭ ধারার অপব্যবহারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাষ্ট্র (ব্লাষ্ট) সহ আরো কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন হাইকোর্টে রিট দায়ের করে। ২০০৩ সালের ২৭ এপ্রিল হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ এক রায়ে ছয় মাসের মধ্যে এ দুটি বিষয়ে প্রচলিত আইন সংশোধনের নির্দেশ দেয়। আইন সংশোধনের পূর্বে হাইকোর্টের কয়েক দফা নির্দেশনা মেনে চলার জন্য সরকারকে আদেশে বলা হয়।

হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে এবং নির্দেশনার উপর স্থগিতাদেশ চেয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করা হয়। কিন্তু আপিল বিভাগ নির্দেশনাগুলো স্থগিতাদেশের আবেদন নাকচ করে দেয়। সুতরাং হাইকোর্টের ওই নির্দেশনা মান্য করা সকলের জন্যই বাধ্যতামূলক। কিন্তু সরকার, পুলিশ এমনকি খোদ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতও ওই নির্দেশনাগুলো মানছে না।

এদিকে ৫ বছর আগে (২০১০ সালের ১১ আগস্ট) অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এমকে রহমান আপিল বিভাগকে আশ্বাস দিয়েছিলেন হাইকোর্টের নির্দেশনা মান্য হচ্ছে কিনা ১৭ আগস্টের মধ্যে তিনি আদালতকে জানাবেন। কিন্তু ৫ বছরেও তিনি তা জানাননি।

আপিল বিভাগেও মামলাটি আর শুনানিতে আসেনি। যদিও এর চেয়ে অনেক কম জনগুরুত্বপূর্ণ মামলা খুবই অল্প সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে। কিন্তু জনস্বার্থমূলক এই মামলাটি পড়ে রয়েছে বছরের পর বছর। আইনে কী আছে: ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৩ ধারায় রয়েছে, কোনো পুলিশ কর্মকর্তা সাক্ষ্য আইনে বর্ণিত ২৪ ধারা অনুযায়ী কোনো প্রকার প্রলোভন, হুমকি বা প্রতিশ্রুতি দেবেন না বা দেওয়াবেন না। এই অধ্যায় অনুসারে কোনো ব্যক্তি স্বাধীনভাবে বিবৃতি দিতে চাইলে কোনো কর্মকর্তা তাঁকে হুঁশিয়ারি বা অন্য কোনোভাবে বারণ করবেন না।

অতীতে আমাদের দেশে এধরনের ঘটনা কদাচিত ঘটলেও কয়েক বছর থেকে এ ধরনের রিমান্ড ও হেফাজতে নির্যাতনের প্রবণতা বেড়েছে। আমরা লক্ষ্য করছি- কেউ রিমান্ডের জন্য আবেদন জানালেই ম্যাজিষ্ট্রেটগণ প্রায়ই রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ফলে রিমান্ডের যথেচ্ছ অপব্যবহার হচ্ছে, এবিউজ হচ্ছে।ফলে সুস্পষ্টভাবে কেস স্টাডি না করে রিমান্ড দেয়া একটা প্রাকটিস হয়ে গেছে। মামুলী মামলার ক্ষেত্রেও দেখা যায় রিমান্ড চাওয়া হচ্ছে । এটা সম্পূর্ণ অবৈধ – কোন অবস্থাতেই রিমান্ড আমাদের ফৌজদারী কার্যবিধি এলাও করে না, সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদেও একই কথা বলা হয়েছে।

কিন্তু আইনের তোয়াক্কা না করেই পুলিশ রিমান্ড চাইছে এবং ম্যাজিস্ট্রেটগণ রিমান্ড মঞ্জুর করছেন। সুস্থ মানুষকে রিমান্ডে নিয়ে চরম নির্যাতনের মাধ্যমে পুলিশ মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। কারও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ বিকলাঙ্গ করে দেয়া হচ্ছে। চোর-ডাকাত আর পেশাদার কিলারের মতো আমাদের রাজনীতিবিদদের ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে, অজ্ঞান ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করার পরও রাষ্ট্রপক্ষের আদালতে দাঁড়িয়ে বলছেন, শরীরে কোনো নির্যাতনের চিহ্ন দেখা যায়নি। রিমান্ডে মঞ্জুর করা যেতে।

এর চেয়ে বড় লজ্জা, মানবাধিকারের দৈন্যতার পরিস্থিতি আর কী হতে পারে! আর এসব নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে পুলিশকে দায়মুক্তির সংস্কৃতি থেকে। তারপরও আমাদের মিডিয়াগুলো নাগরিকের উপর এই নির্যাতন ও জুলুম নীরবে অবলোকন করছে। মিডিয়াগুলো রিমান্ডের সংবাদ প্রচার করছে, অথচ খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছে রিমান্ডে পুলিশ কী ধরনের আচরণ কিংবা নির্যাতন করছে। আইন সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে না, কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনায়। একটি জাতির ধ্বংসের জন্য এই অবিচার ও দৈন্যতাই যথেষ্ট।

সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, মানবাধিকার বেপারিরা রিমান্ডের এই নির্যাতনের ঘটনাগুলো দেখেও না দেখার ভান করছেন। বর্তমান এই পরিস্থিতিতে তারা নীরব। তাই আজ দাউদ হায়দারের সেই বিখ্যাত উক্তিটিই যেন আমার কাছে সত্য বলেই মনে হয়।তবে কি ‘জন্মই আমাদের আজন্ম পাপ?’

দাশনিক থমাস হবসের বিখ্যাত ‘Natural state’ থিওরি অনুযায়ী একমাত্র জানমালের নিরাপত্তার জন্যই মানুষ সেই প্রকৃত রাজ্য থেকে বেরিয়ে এসে সিভিল রাষ্ট্র গঠন করেছিল। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই সিভিল সোসাইটিতে-যে সিভিল রাষ্ট্র মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেয়ার কথা, সেই রাষ্ট্রই আজ নির্যাতকের ভুমিকায়। ফলে মানুষ আজ যাবে কোথায়?

যেখানে মানবাধিকারের নিশ্চয়তা নেই, সেটা কখনো সিভিল সোসাইটি হতে পারে না। এই রাষ্ট্রীয় নির্যাতন অসভ্য ও বর্বরতার প্রতীক। এই সভ্যতার যুগে এই ধরনের কোনো নির্যাতনের হাতিয়ার সুষ্পষ্টভাবে মানুষের জন্মগত, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ ও রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী।

আমরা এমন একটি পরিবেশ চাই- যেখানে নাগরিকরা সব ধরনের নির্যাতন-অবিচার মুক্ত থাকবে এবং তাদের অধিকারসমূহ সুনিশ্চিতভাবে ভোগ করতে পারবে। কেউ অপককেউ অপরাধ করলে আইনী প্রক্রিয়ায় বিচারের মাধ্যমে শাস্তি ভোগ করবে। তাই এ ধরনের রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমাদের সবাই সোচ্চার হতে হবে। জোরালো প্রতিবাদে ‘রিমান্ড’ নামে এই অপসংস্কৃতি বন্ধে রাষ্ট্রকে বাধ্য করতে হবে। সেই সাথে বন্ধ করতে হবে পুলিশের দায়মুক্তির সংস্কৃতি।

অন্যথা, গোটা জাতিকে এর মাশুল দিতে হবে। সবশেষে, রিমান্ডের নামে সাংবাদিক শওকত মাহমুদসহ নাগরিকদের উপর রাষ্ট্রীয় নির্যাতন বন্ধ এবং সব কারাবন্দি সাংবাদিকদের অবিলম্বে মুক্তি দাবি করছি।

লেখক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান, গবেষক ও কলাম লেখক। ই-মেইল: sarderanis@gmail.com

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close