ফিচার

জনতার বিবেকের কাঠগড়ায় গণমাধ্যম

আমরা জানি, একবিংশ শতাব্দীর এই যুগে মানবজীবনে গণমাধ্যমের ভুমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এই গণমাধ্যমকে বাদ দিয়ে কোনো কিছু চিন্তা করার সুযোগ নেই।

এছাড়াও জাতির ক্রান্তিকালে্ও গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভুমিকা অত্যন্ত জরুরি। কারণ গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন খুব দ্রুত ও সহজে আপামর জনসাধারণের কাজে পৌঁছে যায়। এতে সাধারণ মানুষও খুব প্রভাবিত হয়।

ফলে আজকাল সময় ও বাস্তবতার প্রেক্ষিতে দেশ-জাতি গঠনে গণমাধ্যমের ভুমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু আজ আমাদের দেশের গণমাধ্যম ও সাংবাদিকরা কী সে ধরনের ভুমিকা রাখতে পারছে?

না, এই গণমাধ্যমের দুর্বলতার কারণেই দেশ-জাতি আজ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে সেটা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের চলমান ভুমিকায় দেশের জনগণ ক্ষুব্ধও বটে।

তাদের ভাষ্যমতে, দেশের গণমাধ্যম দায়িত্বশীল ভুমিকা পালন না করায় সমাজের সর্বত্র বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। কেন এমনটি হচ্ছে। তা আমাদের খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।

এক. মিডিয়া ট্রায়াল: আমরা গেল কয়েক বছর থেকে দেখতে পাচ্ছি- স্পর্শকাতর বিভিন্ন ঘটনায় সন্দেহভাজনদের আটকের পরপরই গণমাধ্যমের সামনে হাজির করানোর পর সরকারি বাহিনী যে তথ্য সরবরাহ করে তাই হুবহু তুলে ধরছে গণমাধ্যম। এক্ষেত্রে ওইসব ব্যক্তিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ থাকছে না। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গণমাধ্যম অভিযুক্ত ব্যক্তিকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যাতে বিচারের আগেই অভিযুক্তরা জনমনে দোষী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যান।এতে যেমনটি অভিযুক্ত ব্যক্তি সামাজিকভাবে হেয় হচ্ছেন তেমনি বিচারের আগেই তার

এক ধরনের বিচার হয়ে যাচ্ছে। ফলে সরকার ইচ্ছা করলেই মিডিয়া ট্রায়ালে যে কাউকে অপরাধী বলে সামাজিকভাবে হেয় করছে। এক্ষেত্রে বিরোধীদের দমনে এই কৌশল যথেচ্ছাভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনা মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হলেও কারও কিছু করার থাকছে না। হাইকোর্টেরও নির্দেশনা রয়েছে গ্রেপ্তার বা সন্দেহভাজন হিসেবে আটকের পর কোনো ব্যক্তিকে যেন গণমাধ্যমের সামনে হাজির না করা হয়।

কিন্তু তা মানা হচ্ছে না। এক্ষেত্রে সম্প্রতি জঙ্গি সংগঠনকে অর্থায়নের অভিযোগে আটক তিনজন আইনজীবীর কথা উল্লেখ করা যায়। মিডিয়ায় এমন ফলাও করে তাদের ছবি ছাপা হয়েছে তাতে বিচারের আগেই অপরাধী হিসেবে জনমনে ধারণা তৈরি হচ্ছে। অথচ গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের ভাষ্যমতে, গণমাধ্যমের কাজ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা নয়, কিংবা কোনো বিশেষ বাহিনীকে বাহবা দেয়া নয়।

অথচ মিডিয়াগুলো অনেক ক্ষেত্রে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মিডিয়া উইং হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অবশ্য মিডিয়াকর্মীরা বলছেন, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সন্দেহভাজনদের যেভাবে উপস্থাপন করে সেটা কতটা সত্য, সে বিষয়ে পরবর্তীতে অনুসন্ধান করা যায় না। এক্ষেত্রে ওই গণমাধ্যমকর্মীর হয়রানির সমূহ সম্ভাবনা থাকে। এ বিষয়ে

একজন গণমাধ্যমকর্মী সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমরা সবাই ভুল করছি। এ বিষয়ে গণমাধ্যমের আরও সচেতন হওয়া দরকার।’

এ প্রসঙ্গে আমাদের বক্তব্য হল, সাংবাদিকতা একটা দায়িত্বশীল ও স্বাধীন পেশা। সাংবাদিকদের বিবেকই তাঁদের রক্ষাকবচ। সাংবাদিকেরা বিবেকের নির্দেশেই পরিচালিত হয়। এর সঙ্গে রয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কিছু নিয়ম, নীতি ও নৈতিকতা।

কিন্তু আমাদের দেশের পক্ষপাত দোষেদুষ্ট আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর কল্পকাহিনী প্রচার করা গণমাধ্যমের জন্য কতটা দায়িত্ব কিংবা সাংবাদিকতার কোন নীতির মধ্যে পড়ে তা আমার জানা নেই। ফলে এসব বিষয়ে ভাববার সময়

দুই. আমাদের গণমাধ্যম আর সাংবাদিকরা কতটুকু স্বাধীন ! এ নিয়েও সাংবাদিক মহলে রয়েছে পক্ষে-বিপক্ষে নানা বিতর্ক। দেশের নীতিহীন রাজনীতির বেড়াজালে আবদ্ধ আমাদের সাংবাদিকরাও নিজেদের বিকিয়ে দিয়েছেন দলের কাছে।আর তারা সেভাবেই সংবাদ পরিবেশন করার চেষ্টা করছেন। এর ফলে জাতির যা হবার তাই হচ্ছে।

কেননা, দেশের রাজনৈতিক বিভাজনে সাংবাদিকরাও দ্বিধাবিভক্ত। দ্বিধাবিভাজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই ক্রমেই সেটা সহিংসতায়ও ছোটকাল থেকেই গ্রামবাংলায় একটি প্রবাদ শুনে এসেছিলাম সেটা হলো- ‘কাকের মাংস নাকি কাকে খায় না’। কিন্তু বর্তমানে সাংবাদিকদের মধ্যে যে ধরনের বিভেদ তৈরি হয়েছে তাতে যেন সেই প্রবাদকেও হার মানিয়ে যাচ্ছে।

সর্বশেষ জাতীয় প্রেসক্লাব দখল নিয়ে যা ঘটেছে তা গোটা জাতিকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। আর সাংবাদিকদের এই দলবাজির কারণে দেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি ক্রমেই নাজুক হচ্ছে। অথচ আমরা জানি, মানবাধিকার রক্ষায় গণমাধ্যম সর্বদা অনন্য ভুমিকা পালন করে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশের গণমাধ্যমগুলোর দায়িত্বশীলতার ক্রমেই নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে।

তিন. বর্তমানের সামাজিক গণমাধ্যমের বিকাশের ফলে মানুষের চিন্তা-ভাবনা ও কর্মকেৌশল দ্রুত পরিবর্তিত হতে দেখা যাচ্ছে। বিশেষত বিশ্বব্যাপি যুবজনশক্তির সামাজিক গণমাধ্যমে যুক্ত হওয়া এবং চিন্তা আদান-প্রদানের প্রবণতা প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধুমাত্র চিন্তা আদান-প্রদান নয়, চিন্তাকে কার্যে পরিণত করার উদ্যোগও পরিলক্ষিত হচ্ছে। অনেকেই মধ্যপ্রাচ্যে পরিবর্তনের হাওযা, লন্ডনের যুববিক্ষোভ, যুক্তরাষ্ট্রের ওকুপাই ওয়ালস্ট্রিট আন্দোলনগুলো গড়ে উঠতে স্যোসাল মিডিয়া বা সামাজিক গণমাধ্যম জোড়ালো ভূমিকা রেখেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে আরব বসন্তে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এবং বাংলাদেশে বিভিন্ন আন্দোলনেও সামাজিক গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে – এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। অর্থাৎ সামাজিক গণমাধ্যম ক্রমাগতভাবে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে।

ইন্টারনেট এর সাথে সম্পৃক্ত প্রায় সকল ছাত্র-তরুন-যুব জনগোষ্ঠীর নিকট জনপ্রিয় সামাজিক গণমাধ্যম ফেইজবুক। প্রতিদিন ফেইজবুকে নানারকম স্টাটাস, ছবি, ব্যঙ্গচিত্র, কর্মসূচি ইত্যাদি প্রকাশিত হচ্ছে। সহজেই আমরা জানতে পারছি,

আমাদের বন্ধুদের কে কি কাজ করছেন, কিসে তাদের আগ্রহ ইত্যাদি সব খবর। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বির্নিমাণে এসব খবরের গুরুত্ব অনেক বেশি। মত প্রকাশ ও প্রচার এবং মতামত গ্রহনের বিষয়টিকে সহজ করে দিয়েছে ফেইজবুক।

যারা একটু বিস্তারিত কথা জানাতে চান কিংবা বিস্তারিত মতামত গ্রহণ করতে চান, তারা প্রতিনিয়ত ব্লগে লেখালেখি সামাজিক গণমাধ্যমের সাথে তৈরী হয়েছে মানুষের একরকম আত্ত্বিক সম্পৃক্ততা। কেউ একে বিনোদন, কেউ অবসর কাটানো, কারো কারো নেশা, কারো কারো কাছে সামাজিক গণমাধ্যম জনমত গঠনের উপায় হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে।

যারা সমাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসাবে সামাজিক গণমাধ্যমকে দেখছেন, তারা কিন্তু পরিকল্পিতভাবেই এর ব্যবহার করছেন। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন করতে হলে এরকম একটা পরিকল্পনা অবশ্যই থাকা প্রয়োজন। এই পরিকল্পনা কেমন হতে পারে, এ বিষয়ে নানাজনের নানা মত থাকতে পারে।

এটি মূলধারা গণমাধ্যমের একটা সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি সামাজিক যোগাযোগের এই মাধ্যমটিকেও সরকার নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস নিয়ে আইসিটি এ্যাক্ট-এ মামলা, বিচার, গ্রেফতার নির্যাতনের ঘটনা সমাজে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

এক্ষেত্রে কিন্তু আমাদের গণমাধ্যমগুলোর বলিষ্ঠ কোনো ভুমিকা লক্ষ্য করা যায়নি। তাই বলবো একটি সুন্দর সমাজ কিন্তু কোনো গোষ্ঠী বা দল একা গঠন করতে পারে না। একটি সুন্দর সমাজ গঠন করতে হলে সবাই দায়িত্ব নিয়ে স্বপ্নকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার দায়িত্ব পালন করতে হয়। গণমাধ্যমে এই দায়িত্বশীলতা নিয়ে যদি আমরা যুক্ত হতে পারি, তাহলে সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় একদিন একটি সুন্দর সমাজ বিনির্মাণ করতে পারবো।

কেননা, সমাজের অসংগতি, অব্যবস্থাপনা নিরসন করে সুস্থ সমাজ-দেশ গঠন তথা জাতির চিন্তাধারা দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে জনমত গঠনে গণমাধ্যম সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণমাধ্যমকে চতুর্থ স্তম্ভ বলে মনে করা হয়। তাই নানা সময়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা কম হয় না। গণমাধ্যম কি শুধু সংবাদ পরিবেশন করবে নাকি জনমতও গঠন করবে এটা অনেকেই বুঝতে পারেন না।

ফলে দেশ ও রাজনীতির স্বার্থে গণমাধ্যমের ভূমিকা পালন নিয়ে বিতর্ক সবসময়ই থাকে। আমাদের দেশের মিডিয়ার পথচলা মুলত সেই ব্রিটিশ পিরিয়ডেই। তখন থেকেই আমাদের সংবাদপত্রগুলো পাশাপাশি দুটো ভূমিকা পালন করে এসেছে। একটি হল সংবাদ পরিবেশন, দ্বিতীয়টি হল জনমত গঠন। তার মানে, গণমাধ্যম একইসঙ্গে জনগণের মধ্যে চেতনা তৈরি করেছে এবং জনগণের ভাবনাগুলো তুলে ধরেছে।

ঐতিহাসিকভাবেই আমাদের মিডিয়া এসব ভূমিকা পালন করে এসেছে।কিন্তু আজ সাংবাদিক ও গণমাধ্যমে দলবাজির কারণে বর্তমানে গণমাধ্যমের এই দায়িত্বশীলতা যেন সেভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। যার ফলে গণমাধ্যম সমাজে নানা ধরনের অস্থিরতা বাড়ছে। তাই সবশেষে বলবো, মিডিয়ার সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিগণ দায়িত্বশীলতার সাথে ভুমিকা পালনে ব্যর্থ হলে জাতিকে এর জন্য যেমনি অনেক সাফার করতে হবে তেমনি গণমাধ্যম হয়ে পড়বে আরো বেশি নিয়ন্ত্রিত।

রাষ্ট্রের নাগরিকের অধিকারগুলোও হবে সংকোচিত, সেই সাথে রাষ্ট্র-সমাজে অনাচার-অবিচার আরও বাড়বে। তাই গণমাধ্যমই পারে জনমত গঠনের মাধ্যমে জাতিকে সুস্থ পথে পরিচালিত করতে, সুস্থ-সুন্দর একটি গণতান্ত্রিক গঠন করতে । অন্যথা জনতার বিবেকের কাঠগড়ায় এই গণমাধ্যমের ভুমিকা আরো বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

লেখক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান, গবেষক ও কলাম লেখক। ই-মেইল: sarderanis@gmail.com

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close