ফিচার

বিএনপি ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান

ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম: আগামী পহেলা সেপ্টেম্বর বিএনপির ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। “১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

৭৫ পরবর্তী ঘটনাবলীকে অন্ধকারাচ্ছন্ন রাখতে এক শ্রনীর বুদ্ধিজীবী ও আওয়মী লীগ এই সময়ের দাবীতে প্রতিষ্ঠিত দলটিকে নিয়ে নানা ধরনের অপপ্রচারে লিপ্ত এবং এই জন্য ঐ সময়কার ঘটনাবলীর কিছু বিষয় তুলে ধরা হলোঃ শেখ মুজিবকে হত্যার পর বাকশাল নেতা মোশতাক রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ নেন। গঠন করেন মন্ত্রীসভা।

শেখ মুজিবের মন্ত্রীসভার প্রায় সকলেই মোশতাকের মন্ত্রীসভার সভায় শপথ নেন। মোশতাক সারাদেশে সামরিক আইন জারি করেন। ঐ সময় সেনাপ্রধান ছিলেন শফিউল্লাহ। শহীদ জিয়া সেই সময় ছিলেন সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ। শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের পরে মোশতাকের মন্ত্রীসভার শপথ অনুষ্ঠানে যাননি জিয়াউর রহমান। বিজয়ীর বেশে গিয়েছিল তাহের-ইনু বাহিনী এবং তৎকালীন মুজিব বিরোধী নেতারা। শেখ মুজিব হত্যাকান্ডের পর আরো কমপক্ষে দশ দিন, অর্থাৎ ২৪শে আগস্ট পর্যন্ত জেনারেল শফিউল্লাহ ছিলেন সেনা প্রধান।

রাষ্ট্রদূত হিসাবে সরকারি চাকুরী কনফার্ম করার পর সেনাপ্রধানের পদ ছাড়েন শফিউল্লাহ। এরপর যথা নিয়মে ডেপুটি চীফ অব স্টাফ থেকে প্রমোশন পেয়ে ২৫শে আগস্ট সেনাপ্রধান হন জিয়াউর রহমান। সেনাপ্রধান হিসাবে দায়িত্ব নেয়ার পর রক্ষী বাহিনীর প্রভাবমুক্ত একটি শক্তিশালী পেশাদার ও সেনাবাহিনী গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন শহীদ জিয়া। জিয়াকে মেনে নিতে পারেননি ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফ। তিনি ভেতরে ভেতরে জিয়াউর রহমানকে সরানোর চক্রান্ত শুরু করেন।

চক্রান্তের অংশ হিসেবে খালেদ মোশারফ ১৯৭৫ সালের ২রা নভেম্বর সেনা প্রধান জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্টে বন্দী করেন। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফ ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মোশতাকের অনুমোদন নিয়ে মেজর জেনারেল হিসেবে নিজেই নিজের প্রমোশন নেন এবং এরপর প্রশাসন চলে খালেদ মোশারফের ইশারায়।

১৯৭৫ সালের ৫ই নভেম্বর রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন মোশতাক। তার আগে মোশতাক এবং খালেদ মোশারফ বিচারপতি সায়েমকে রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব দেন ৬ই নভেম্বর। বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধান বিচারপতি। শেখ মুজিব পাকিস্তানী পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশে ফেরত আসেন ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারী। এর দুই দিন পর ১২ই জানুয়ারী সায়েমকে প্রধান বিচারপতি হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়।

১৫ই আগস্ট থেকে মোশতাক-শফিউল্লাহর জারী করা সামরিক আইন বহাল থাকায় রাষ্ট্রপতি সায়েম একাধারে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের ও দায়িত্ব পালন করেন। উল্লেখ্য, ৭ই নভেম্বর সংঘটিত হয় সিপাহী-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লব। শহীদ জিয়াকে বের করে আনা হয় বন্দীদশা থেকে।

১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর জেলের মধ্যে সংঘটিত হয় ৪ নেতা হত্যাকান্ড।আবার ৬ই নভেম্বর পাল্টা ক্যু’তে নিহত হন খালেদ মোশারফ। ১৯৭৭ সালের ২০শে এপ্রিল পর্যন্ত রাষ্ট্রপ্রতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিচারপতি সায়েম। এ সময়কালে জিয়া ছিলেন সেনা প্রধান এবং উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক।

১৯৭৭ সালের ২০শে এপ্রিল প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগ করেন বিচারপ্রতি সায়েম। এরপর প্রেসিডেন্ট এবং উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দাযিত্ব নেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি গঠিত বাকশালের মাধ্যমে হত্যা করা গণতন্ত্রকে পুনর্জীবন দেন জিয়াউর রহমান। এমনকি বাকশালের মাধ্যমে বিলুপ্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকেও পুনর্জন্ম দেন বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা জিয়াউর রহমান। বাকশালী একদলীয় শাসন অবসান হওয়ার পর দেশে যে রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল তা পূরণ করতে বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পূনঃপ্রবর্তন এবং এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।সব রাজনৈতিক দলকে মুক্তভাবে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পাহারাদার হিসেবে নিজে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি।

জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আদর্শের এই দলের নেতৃত্বে তিনি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি রচনা করেন। সবাইকে নিয়ে তিনি একটি আত্মনির্ভরশীল সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে উদ্যোগী হন। তার এ কর্মপ্রচেষ্টা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বিএনপি বিগত ৩৭ বছরে বার বার জনগণের ভোটে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে এবং দেশ ও জনগণের সমৃদ্ধি ও কল্যাণে কাজ করে গেছে।

রাষ্ট্রীয় দায়িত্বভার গ্রহণ  ২১ এপ্রিল ১৯৭৭ প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান এবং সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে প্রেসিডেন্ট পদে মনোনীত করেন। জিয়াউর রহমান বঙ্গভবনে অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। ৩০ এপ্রিল ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান ১৯ দফা কর্মসূচি শুরু করেন।   ২ মে এক ঘোষণায় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ৩০ মে ’৭৭ গণভোট হয় তার ওপর ও তার নীতির ওপর এবং তার কর্মসূচির প্রতি ভোটারদের আস্থা আছে কি না সেজন্য।

গণভোটে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতি জনগণের আস্থা   ৩০ মে ’৭৭ অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং তার ১৯ দফা কর্মসূচি ও নীতির প্রতি দেশবাসী বিপুল আস্থা জ্ঞাপন করেন। ১২ হাজার ২৬৪টি কেন্দ্রের ভোটের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোট ভোটের সংখ্যা ১ কোটি ৯২ লাখ ৯ হাজার ৬০টি। এর মধ্যে ১ কোটি ৮৯ লাখ ৯৩ হাজার ৯২টি ‘হ্যাঁ’ সূচক ভোটের সংখ্যা। ‘না’ সূচক ভোটের সংখ্যা ২ লাখ ১৫ হাজার ৯৬৮টি।

সকল ক্ষমতার উত্স জনগণ তাদের আস্থার রায় জানিয়েছেন স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর সৈনিক এবং নবীন প্রত্যাশায় উদ্দীপ্ত বাংলাদেশের স্বর্ণালি অভিজ্ঞতার নায়ক মেজর জেনারেল জিয়াকে, জনগণ তাদের রায় দিয়েছেন স্বাধীনভাবে।

জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) গঠন   ১৯৭৮ সালের ২২ ফেবু্রয়ারি জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) সরকারি অনুমোদন পায়। রাজনৈতিক দলবিধি (পিপিআর) ১৯৭৮ মোতাবেক এ নয়া দলের অনুমোদনের কথা ঢাকা পৌরসভা চেয়ারম্যান আবুল হাসনাতকে চিঠির মাধ্যমে ২২ ফেবু্রয়ারি জানানো হয়। বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে আহ্বায়ক করে জাগদলের ১৬ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ২২ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করা হয়।

আহ্বায়ক কমিটির সদস্যরা ছিলেন— প্রফেসর সৈয়দ আলী আহসান, আবদুল মোমেন খান, শামসুল আলম চৌধুরী, ক্যাপ্টেন (অব.) নুরুল হক, এনায়েতউল্লাহ খান, মওদুদ আহমদ, জাকারিয়া চৌধুরী, ড. এম আর খান, সাইফুর রহমান, জামাল উদ্দিন আহমদ, আবুল হাসনাত, এম এ হক, ক্যাপ্টেন (অব.) সুজাত আলী, আলহাজ এম এ সরকার ও আবুল কাশেম। ২৭ মার্চ ১৯৭৮ জাগদল প্রথম তাদের ম্যানিফেস্টো ঘোষণা করে। পর্যায়ক্রমে সারাদেশে জাগদলের কমিটি গঠন করা হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ২৯ মার্চ এক ভাষণে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন।

তিনি বলেন, ‘ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’ ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের দ্বিবার্ষিক পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। ঘোষণার আগে তিনি বলেন, পরিকল্পনাটির সাফল্য প্রধানত নির্ভর করে কৃষি উন্নয়ন ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ওপর। আর এজন্য জাতিকে রাজনৈতিক লক্ষ্য স্থির করে দেশের সমস্যা সমাধানে আত্মনিয়োগ করতে হবে। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দলে যোগদান ৯ এপ্রিল ১৯৭৮ জিয়াউর রহমান প্রথম আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন, তিনি রাজনৈতিক দলে যোগদান করবেন এবং ডিসেম্বরের নির্বাচনে প্রার্থী হবেন।

১৯৭৮ সালের ২ মে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে চেয়ারম্যান করে ৬টি দলের সমন্বয়ে ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’ গঠন করা হয়। যে সব রাজনৈতিক দল ফ্রন্ট গঠন করে, সেগুলো হলো— জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ভাসানী), ইউনাইটেড পিপলস পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, বাংলাদেশ লেবার পার্টি ও বাংলাদেশ তফসিলি জাতীয় ফেডারেশন। জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের ৬টি অঙ্গ দলের এক বৈঠকে আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে জিয়াউর রহমানকে মনোনয়ন দেয়া হয়।

১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন   দেশে গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে আনার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনী অনুচ্ছেদ নং ১১৮ থেকে ১২৬ অনুযায়ী ১৯৭৮ সালের ৩ জুন প্রাপ্তবয়স্কদের প্রত্যক্ষ সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭৮ সালে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচন অতীব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষ্য বহন করছে। এতে বহুদলীয় রাজনীতির ভিত্তিতেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রায় সব রাজনৈতিক দলই এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।

রাষ্ট্রপতি পদের জন্য মোট ১০ জন প্রার্থী পূর্ণপ্রস্তুতি নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তার মধ্যে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। অন্যদিকে তার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন গণতান্ত্রিক ঐক্যজোটের মনোনীত প্রার্থী জেনারেল (অব.) এম এ জি ওসমানী। আওয়ামী লীগ, জাতীয় জনতা পার্টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (মোজাফ্ফর), পিপলস পার্টি, গণআজাদী লীগ ও নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সমন্বয়ে গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট গঠিত হয়েছিল।

অন্যদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং নির্দলীয় প্রার্থী ছিলেন। নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট প্রার্থী জিয়াউর রহমান ১ কোটিরও বেশি ভোটের ব্যবধানে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ঐক্যজোট প্রার্থী জেনারেল (অব.) এম এ জি ওসমানীকে পরাজিত করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এ নির্বাচনে মোট ৫৩ দশমিক ৫৪ ভাগ ভোটার ভোট প্রদান করেন। এর মধ্যে ৭৩ দশমিক ৬৩ ভাগ ভোট পান জিয়াউর রহমান। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এম এ জি ওসমানী পান ২১ দশমিক ৭০ ভাগ ভোট।

১৯৭৮ সালের ১২ জুন জিয়াউর রহমান বঙ্গভবনের দরবার হলে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। স্বাধীন বাংলাদেশে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রথম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এর আগের সব রাষ্ট্রপতি সময়ের প্রয়োজনে কিংবা জবরদস্তি করে রাষ্ট্রপতির পদে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এজন্যই জনগণের ভোটে প্রথম নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গণমানুষের হৃদয়ে নিজের স্থান করে নেন।

১৯৭৮ সালের ২৯ জুন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান উপদেষ্টা পরিষদ ভেঙে দিয়ে ২৮ সদস্যের একটি মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেন। বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব দেন। মন্ত্রিপরিষদের সিনিয়র মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন মশিউর রহমান যাদু মিয়া।

মন্ত্রিপরিষদের অন্য সদস্যরা হলেন— ড. মির্জা নুরুল হুদা, শাহ আজিজুর রহমান, কাজী আনোয়ারুল হক, অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুল হক, আজিজুল হক, এসএম শফিউল আজম, আবদুল মোমেন খান, মেজর জেনারেল (অব.) মাজেদুল হক, ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল হালিম চৌধুরী, বি এম আব্বাস, লে. কর্নেল (অব.) আবু সালেহ মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান, রসরাজ মণ্ডল, মোহাম্মদ সাইফুর রহমান, জামাল উদ্দিন আহমেদ, ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কাজী জাফর আহমদ, শামসুল হুদা চৌধুরী, ক্যাপ্টেন (অব.) নুরুল হক, এ জেড এম এনায়েতউল্লাহ খান, মওদুদ আহমদ, এস এ বারী এটি, ড. মিসেস আমিনা রহমান, মির্জা গোলাম হাফিজ, কে এম ওবায়দুর রহমান, আবদুল আলীম, হাবিবুল্লাহ খান ও আবদুর রহমান। প্রতিমন্ত্রী হন দু’জন ডা. ফসিউদ্দীন মাহতাব ও ডা. এম এ মতিন।

এই মন্ত্রিপরিষদেও প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারণা বাস্তবায়ন করেন। মন্ত্রিপরিষদে ২৮ জন মন্ত্রীর মধ্যে ১৮ জন ছিলেন জাগদলের, ৪ জন ন্যাপ ভাসানীর, ২ জন ইউপিপির ও ১ জন তফসিলি ফেডারেশনের। বিশেষত ৪ জন ছিলেন সাবেক সামরিক অফিসার, ৮ জন বেসামরিক অফিসার, ১ জন সাংবাদিক ও বাকিরা হলেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।

জাতীয় দায়িত্ব প্রাপ্তির অল্প সময়ের মধ্যেই সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান নিজের আন্তরিকতা, কর্ম ও চেষ্টা দিয়ে দেশবাসীর হৃদয়ে জায়গা করে নেন। সামাজিক বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে এক প্লাটফর্মে আনার উদ্যোগ নেন। দেশ পরিচালনায় তাদের পরামর্শকে প্রাধান্য দেয়া হয়। তাঁর এই ইতিবাচক উদ্যোগের বিরুদ্ধেও দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র অব্যাহত থাকে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিনি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পান। এই দায়িত্ব পেয়ে প্রথমেই তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেন।

গণমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন। জনগণের প্রতিনিধির হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা দিতে তিনি প্রেসিডেন্ট পদে গণভোট এবং সাধারণ নির্বাচন দেন। গণতান্ত্রিক উপায়ে জাতির ব্যাপক সমর্থন পেয়ে জিয়াউর রহমান গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনেন।   বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি প্রতিষ্ঠা   জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের শরিক দলগুলোর সমন্বয়ে ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।

জাতীয় সংসদ নির্বাচন এগিয়ে আসলে জিয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠন করেন। এ পরিস্থিতিতে ২৮ আগস্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তার এক জরুরি আদেশে জাগদল ও এর সব অঙ্গদলকে বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। এখানে উল্লেখ্য, বিএনপি গঠন করার আগে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) নামে আরেকটি দল তৎকালীন উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে সভাপতি করে গঠিত হয়েছিল। ২৮ আগস্ট ১৯৭৮ সালে নতুন দল গঠন করার লহ্ম্য জাগদলের বর্ধিত সভায় ওই দলটি বিলুপ্ত ঘোষণার মাধ্যমে দলের এবং এর অঙ্গ সংগঠনের সকল সদস্য জিয়াউর রহমান ঘোষিত নতুন দলে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিকাল ৫টায় রমনা রেস্তোরাঁয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠাতা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র পাঠের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের যাত্রা শুরু করেন। জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তিনি ঘোষণাপত্র পাঠ ছাড়াও প্রায় দুই ঘণ্টা সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

সংবাদ সম্মেলনে জিয়াউর রহমান ঘোষিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ঘোষণাপত্রে বলা হয় : বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ইস্পাতকঠিন গণঐক্য, জনগণভিত্তিক গণতন্ত্র ও রাজনীতি প্রতিষ্ঠা, ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত জনগণের অক্লান্ত প্রয়াসের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনৈতিক মুক্তি, আত্মনির্ভরশীলতা ও প্রগতি অর্জন এবং সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ, নয়া উপনিবেশবাদ ও আধিপত্যবাদের বিভীষিকা থেকে মুক্তি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ গঠিত হয়েছে। এই চারটি লক্ষ্যকে ‘জনগণের মৌলিক দাবি’ বলে ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে জাতীয় মিলন ও ঐক্যের দল হিসেবে উল্লেখ করে দলের ঘোষণাপত্রে বলা হয়, এই দলের বৈপ্লবিক উদারতা ও বিশালতা সব দেশপ্রেমিক মানুষকে এক অটল ঐক্যবাদী কাতারে শামিল করতে সক্ষম হবে। সক্ষম হবে জাতীয় পর্যায়ে স্থিতিশীলতা, সার্বিক উন্নতি ও প্রগতি আনয়ন করতে।

ঘোষণাপত্রে স্থিতিশীল গণতন্ত্রের রূপরেখায় প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকার নির্বাচিত ও সার্বভৌম পার্লামেন্টের প্রতি দলের আস্থা জ্ঞাপন করা হয়। এতে দেশের শতকরা ৯০ জন অধিবাসী মধ্যবিত্ত গ্রামের সার্বিক উন্নয়নের প্রতি সকল পর্যায়ে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। ভূমি ব্যবস্থা ও প্রশাসনকে ন্যায়বিচারভিত্তিক, আধুনিক ও সুবিন্যস্ত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।

গণমুখী কৃষিনীতি ও কার্যক্রম প্রণয়ন, সমবায়ের ভিত্তিতে জাতীয় উন্নয়ন, সৃজনশীল উত্পাদনমুখী ও গণতান্ত্রিক শ্রমনীতি প্রণয়ন, গণমুখী জীবননির্ভর কার্যক্রম প্রণয়ন, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতাকে সুনিশ্চিত করতে দেশরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার, মুক্তিযোদ্ধাদের সৃজনশীল, গঠনমূলক ও উত্পাদনমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, বাংলাভাষা ও সাহিত্যের সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও প্রসার, শাসনতন্ত্রের জীবননির্ভর ও বাস্তবমুখী রূপ সংরক্ষণ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি নিশ্চিতকরণ, সামাজিক ও বৈষম্য দূরীকরণ, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার সুদৃঢ় অঙ্গীকার করা হয় ঘোষণাপত্রে। জাগদলকে বিএনপির সাথে একীভূত করা হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়া এই দলের সমন্বয়ক ছিলেন এবং এই দলের প্রথম চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এর প্রথম মহাসচিব ছিলেন। জিয়ার এই দলে বাম, ডান, মধ্যপন্থি সকল প্রকার লোক ছিলেন। বিএনপির সবচেয়ে প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এর নিয়োগ পদ্ধতি। প্রায় ৪৫ শতাংশ সদস্য শুধুমাত্র রাজনীতিতে যে নতুন ছিলেন তাই নয়, তারা ছিলেন তরুণ। সংবাদ সম্মেলনে নতুন দলের আহ্বায়ক কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি প্রথমে ১৮ জন সদস্যের নাম এবং ১৯ সেপ্টেম্বর ওই ১৮ জনসহ ৭৬ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেন।

নিচে দলের প্রথম আহ্বায়ক কমিটির পূর্ণাঙ্গ তালিকা দেয়া হলো :   আহ্বায়ক : জিয়াউর রহমান। সদস্য : ১. বিচারপতি আবদুস সাত্তার ২. মশিউর রহমান যাদু মিয়া ৩. মোহাম্মদ উল্লাহ ৪. শাহ আজিজুর রহমান ৫. ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল হালিম চৌধুরী ৬. রসরাজ মন্ডল ৭. আবদুল মোনেম খান ৮. জামাল উদ্দিন আহমেদ ৯. ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ১০. মির্জা গোলাম হাফিজ ১১. ক্যাপ্টেন (অব.) নুরুল হক ১২. এম. সাইফুর রহমান ১৩. ওবায়দুর রহমান ১৪. মওদুদ আহমদ ১৫. শামসুল হুদা চৌধুরী

১৬. এ জেড এম এনায়েতউল্লাহ খান ১৭. এসএ বারী এটি ১৮. ড. আমিনা রহমান ১৯. আবদুর রহমান ২০. ডা. এম এ মতিন ২১. আবদুল আলিম ২২. ব্যারিস্টার আবুল হাসনাত ২৩. আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ২৪. নুর মোহাম্মদ খান ২৫. আবদুল করিম ২৬. শামসুল বারী ২৭. মুজিবুর রহমান ২৮. ডা. ফরিদুল হুদা ২৯. শেখ আলী আশরাফ ৩০. আবদুর রহমান বিশ্বাস ৩১. ব্যারিস্টার আবদুল হক

৩২. ইমরান আলী সরকার ৩৩. দেওয়ান সিরাজুল হক ৩৪. এমদাদুর রহমান ৩৫. এডভোকেট আফসার উদ্দিন ৩৬. কবীর চৌধুরী ৩৭. ড. এম আর খান ৩৮. ক্যাপ্টেন (অব.) সুজাত আলী ৩৯. তুষার কান্তি বারবি ৪০. সুনীল গুপ্ত ৪১. রেজাউল বারী ডিনা ৪২. আনিসুর রহমান ৪৩. আবুল কাশেম ৪৪. মনসুর আলী সরকার ৪৫. আবদুল হামিদ চৌধুরী ৪৬. মনসুর আলী ৪৭. শামসুল হক ৪৮. খন্দকার আবদুল হামিদ ৪৯. জুলমত আলী খান

৫০. এডভোকেট নাজমুল হুদা ৫১. মাহবুব আহমেদ ৫২. আবু সাঈদ খান ৫৩. মোহাম্মদ ইসমাইল ৫৪. সিরাজুল হক মন্টু ৫৫. শাহ বদরুল হক ৫৬. আবদুর রউফ ৫৭. মোরাদুজ্জামান ৫৮. জহিরুদ্দিন খান ৫৯. সুলতান আহমেদ চৌধুরী ৬০. শামসুল হুদা ৬১. সালেহ আহমেদ চৌধুরী ৬২. আফসার আহমেদ সিদ্দিকী ৬৩. তরিকুল ইসলাম ৬৪. আনোয়ারুল হক চৌধুরী ৬৫. মাইনুদ্দিন আহমেদ ৬৬. এমএ সাত্তার ৬৭. হাজী জালাল ৬৮. আহমদ আলী মন্ডল ৬৯. শাহেদ আলী ৭০. আবদুল ওয়াদুদ

৭১. শাহ আবদুল হালিম ৭২. ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমিরুদ্দিন সরকার ৭৩. আতাউদ্দিন খান ৭৪. আবদুর রাজ্জাক চৌধুরী ৭৫. আহমদ আলী।   মূলনীতি বিএনপির লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক উন্নয়ন, গণতন্ত্রায়ন, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য এবং জনগণের মধ্যে স্ব-নির্ভরতার উত্থান ঘটানো।

এগুলোর ভিত্তিতে জিয়াউর রহমান তার ১৯-দফা ঘোষণা করেন। বিএনপির রাজনীতির মূল ভিত্তি ছিল- ১. সর্বশক্তিমান আল্লাহ্র উপর বিশ্বাস, ২. জাতীয়তাবাদ, ৩. গণতন্ত্র, ৪. সমাজতন্ত্র (অর্থনৈতিক ও সমাজিক ন্যায়বিচারের অর্থে)। দলীয় স্লোগান “ শহীদ জিয়া অমর হউক। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।

উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য: জাতীয়তাবাদী দলের ঘোষণাপত্রে এ দলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হয়েছে। সংক্ষেপে এ দলের কয়েকটি মৌলিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বর্ণিত হলোঃ

(ক) বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ-ভিত্তিক ইস্পাতকঠিন গণঐক্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ও গণতন্ত্র সুরক্ষিত ও সুসংহত করা।

(খ) ঐক্যবদ্ধ এবং পুনরুজ্জীবিত জাতিকে অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতার মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ, নয়া-উপনিবেশবাদ, আধিপত্যবাদ ও বহিরাক্রমণ থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করা।

(গ) উৎপাদনের রাজনীতি, মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং জনগণের গণতন্ত্রের মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক মানবমুখী অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জাতীয় সমৃদ্ধি অর্জন।

(ঘ) জাতীয়তাবাদী ঐক্যের ভিত্তিতে গ্রামে-গঞ্জে জনগণকে সচেতন ও সুসংগঠিত করা এবং সার্বিক উন্নয়নমুখী পরিকল্পনা ও প্রকল্প রচনা ও বাস্-বায়নের ক্ষমতা ও দক্ষতা জনগণের হাতে পৌঁছে দেওয়া।

(ঙ) এমন এক সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করা যেখানে গণতন্ত্রের শিকড় সমাজের মৌলিক স্তরে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়।

(চ) এমন একটি সুস্পষ্ট ও স্থিতিশীল সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার নিশ্চিতি দেওয়া যার মাধ্যমে জনগণ নিজেরাই তাঁদের মানবিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতি আনতে পারবেন।

(ছ) বহুদলীয় রাজনীতির ভিত্তিতে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত একটি সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের মাধ্যমে স্থিতিশীল গণতন্ত্র কায়েম করা এবং সুষম জাতীয় উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি আনয়ন।

(জ) গণতান্ত্রিক জীবন ধারা ও গণতান্ত্রিক বিধি ব্যবস্থার রক্ষাকবচ হিসাবে গণনির্বাচিত জাতীয় সংসদের ভিত্তি দৃঢ়ভাবে স্থাপন করা এবং জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করা।

(ঝ) রাজনৈতিক গোপন সংগঠনের তৎপরতা এবং কোন সশস্ত্র ক্যাডার, দল বা এজন্সী গঠনে অস্বীকৃতি জানানো ও তার বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করা।

(ঞ) জাতীয় জীবনে মানবমুখী সামাজিক মূল্যবোধের পুনরুজ্জীবন এবং সৃজনশীল উৎপাদনমুখী জীবনবোধ ফিরিয়ে আনা।

(ট) বাস্তবধর্মী কার্যকরী উন্নয়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জাতীয় জীবনে ন্যায়বিচার-ভিত্তিক সুষম অর্থনীতির প্রতিষ্ঠা, যাতে করে সকল বাংলাদেশী নাগরিক অন্ন, বস্ত্র, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও শিক্ষার ন্যূনতম মানবিক চাহিদা পূরণের সুযোগ পায়।

(ঠ) সার্বিক পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচীকে অগ্রাধিকার দান করা ও সক্রিয় গণচেষ্টার মাধ্যমে গ্রাম বাংলার সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা।

(ড) নারী সমাজ ও যুব সম্প্রদায়সহ সকল জনসম্পদের সুষ্ঠু ও বাস্-বভিত্তিক সদ্ব্যবহার করা।

(ঢ) বাস্তবধর্মী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং সুসামঞ্জস্যপূর্ণ শ্রম ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক স্থাপন এবং সুষ্ঠু শ্রমনীতির মাধ্যমে শিল্পক্ষেত্রে সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করা।

(ণ) বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, বাংলাদেশের সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও বাংলাদেশের ক্রীড়া সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও প্রসার সাধন।

(ত) বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশী জনগণের ধর্ম ইসলাম এবং অন্যান্য ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগ দান করে বাংলাদেশের জনগণের যুগপ্রাচীন মানবিক মূল্যবোধ সংরক্ষণ করা, বিষে করে অনগ্রসর সম্প্রদায়ের জন্য শিক্ষা সম্প্রসারণ ও বৃহত্তর জাতীয় তাদের অধিকতর সুবিধা ও অংশগ্রহণের সুযোগের যথাযথ ব্যবস্থা করা।

(থ) পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে জোট নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে আন্-র্জাতিক বন্ধুত্ব, প্রীতি ও সমতা রক্ষা করা। সার্বভৌমত্ব ও সমতার ভিত্তিতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে, তৃতীয় বিশ্বের মিত্র রাষ্ট্রসমূহের সাথে এবং ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে প্রীতি ও সখ্যতার সম্পর্ক সুসংহত এবং সুদৃঢ় করা। সাংগঠনিক কাঠামো জাতীয়তাবাদী দল দেশের মৌলিক স্তর গ্রাম/ওয়ার্ড পর্যায় থেকে সংগঠিত হয়ে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারিত। দলের সাংগঠনিক কাঠামো নিম্নরূপঃ

(১) গ্রাম কাউন্সিল ও গ্রাম নির্বাহী কমিটি

(২) শহর/পৌরসভা ওয়ার্ড কাউন্সিল ও শহর/পৌরসভা ওয়ার্ড নির্বাহী কমিটি

(৩) ইউনিয়ন কাউন্সিল ও ইউনিয়ন নির্বাহী কমিটি

(৪) থানা কাউন্সিল ও থানা নির্বাহী কমিটি

(৫) শহর/পৌরসভা কাউন্সিল ও শহর পৌরসভা নির্বাহী কমিটি

(৬) জেলা কাউন্সিল ও জেলা নির্বাহী কমিটি

(৭) নগর/ওয়ার্ড কাউন্সিল ও নগর ওয়ার্ড নির্বাহী কমিটি

(৮) নগর থানা কাউন্সিল ও নগর থানা নির্বাহী কমিটি

(৯) নগর কাউন্সিল ও নগর নির্বাহী কমিটি

(১০) জাতীয় কাউন্সিল

(১১) জাতীয় নির্বাহী কমিটি

(১২) জাতীয় স্থায়ী কমিটি

(১৩) পার্লামেন্টারী বোর্ড

(১৪) পার্লামেন্টারী পার্টি

(১৫) বিদেশে দলের শাখা জাতীয় ঐক্য বিএনপি গঠনের শুরুতে দেশে বিভিন্ন ভাবে বিভক্ত ছিল।

এই বিভক্তির ভিত্তি ছিল রাজনৈতিক বিশ্বাস (বাম, ডান, মধ্যপন্থি), মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের ও বিপক্ষের শক্তি ইত্যাদি। এর ফলশ্রুতিতে ছাত্র-শিক্ষক, বুদ্ধজীবী, পেশাজীবি, সাংস্কৃতিক কর্মী, সামরিক বাহিনী এমনকি প্রশাসনও বিভক্ত ছিল। বিএনপি প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি ছিল এই সকল বিভেদ ভুলে সকলে মিলে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। জিয়ার সময়ই আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা, শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর প্রথম দেশে আসেন এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই সাথে জামায়াতে ইসলামীও এই সময় রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠে। তাদের বহু নেতা যারা মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের বাইরে ছিল তারা দেশে আসার অনুমতি লাভ করে।

উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তি শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারি সকল দল ও ব্যক্তির জন্য ক্ষমা ঘোষণা করেন। তবে, যাদের বিরুদ্ধে সরাসরি হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নি সংযোগ ও লুটপাট এই চারটি অভিযোগ থাকবে তারা এই ক্ষমার আওতায় পরে নাই। যদিও, এদের বিরুদ্ধে তেমন কোন ব্যাপক ও কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়ার উদাহরণ নেই। পররাষ্ট্রনীতি শুরু থেকেই বিএনপির লক্ষ্য ছিল জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। স্বাধীনতা পরবর্তি সরকারের ভারত-ঘেষা পররাষ্ট্রনীতির ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জার্তিক অঙ্গনে ভারত-সোভিয়েত অক্ষের দিকে চলে যায়, ফলে বাংলাদেশের অন্যান্য বিশ্বশক্তির সাথে সম্পর্ক তেমন ভাল ছিল না। বিএনপি তার পররাষ্ট্রনীতিতে নিরপেক্ষতা ধারণ করে।

১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচন ও বিএনপির সরকার গঠন   প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সর্বতোভাবে চেষ্টা করেছিলেন দেশে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সরকার প্রতিষ্ঠার। ১৯৭৮ সালের ৩০ নভেম্বর এক ঘোষণায় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ১৯৭৯ সালের ২৭ জানুয়ারি তারিখ নির্ধারণ করেন। এ নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নেয় এবং তাদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া ও শর্ত পূরণের জন্য নির্বাচন দু’দফায় পেছানো হয়।

১৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২০৭টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ৩৯টি আসন পেয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (মালেক) প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পায়।

এছাড়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (মিজান) ২টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ৮টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (মোজাফ্ফর) ১টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ ও ইসলামী ডেমোক্রেটিক দল ২০টি, গণফ্রন্ট ২টি, বাংলাদেশ জাতীয় লীগ ২টি, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক আন্দোলন ১টি, বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল (তোয়াহা) ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১৬টি আসন পায়।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট, স্বাধীন বাংলার রূপকার, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শুধু একটি নাম নয়, তিনি একটি ইতিহাসও বটে। সেদিন বিভক্ত বাঙালী জাতি তার ডাকে এক কাতারে শামিল হয়ে দেশ গড়ার কাজে অংশ নিয়েছিল। তার কাছে ছিলনা কোন ভেদাভেদ। সকলের মাঝে সাম্যের রাজনৈতিক চিন্তাধারা প্রতিষ্টার জনক শহীদ জিয়া। এ কারণে তিনি মরেও অমর হয়ে আছেন।শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নাম বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক ছিলেন।

দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ। একজন ঈমানদার মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম থাকা অপরিহার্য। দেশপ্রেম ও সততা শব্দ দুটি একে অন্যের পরিপূরক। যে দেশপ্রেমিক সে অবশ্যই সত্। আবার যে ব্যক্তি সত্ তার মধ্যে অবশ্যই দেশপ্রেম আছে। একজন প্রকৃত নেতার মধ্যে অনেক গুণাবলী থাকা আবশ্যক। তার মধ্যে দেশপ্রেম ও সততা অন্যতম। সততা ও দেশপ্রেমের কারণেই শহীদ জিয়া আমাদের প্রিয় নেতা ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। আমাদের বিশ্বাস, জিয়াউর রহমানের যে কট্টর সমালোচক, সেও জিয়াউর রহমানের সততা ও দেশপ্রেম নিয়ে কটূক্তি করতে পারবে না। সততা ও দেশপ্রেমের প্রশ্নে আপসহীন এই মহান নেতা দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় অবস্থান করে নিয়েছেন।

মুহাম্মদ মনসুর রহমান ও জাহানারা খাতুনের দ্বিতীয় পুত্র শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে ১৯ জানুয়ারী বগুড়া জেলার বাগাবাড়ী গ্রামে তাঁর পিতামহের বসত বাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শিশুকাল এবং শৈশবের প্রথম অধ্যায় কেটেছে এই বাগাবাড়ি গ্রামেই। মানুষের জীবনের সমচেয়ে গুরুত্বপূর্ন সময় হলো তার শিশুকাল বা ছেলেবেলা। কারন এই সময়টা হলো নিজেকে আবিস্কার করার এবং প্রকৃতির ভেতর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সময়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও এর ব্যতিক্রম নন।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ডাকনাম ছিল কমল। কমল অর্থ পদ্ম। পিতা মুহাম্মদ মনসুর রহমান এবং মাতা জাহানারা খাতুনের বড় আদরের সন্তান ছিলেন এই কমল। তাঁরা হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁদের এই সন্তান পদ্মের মতো বিকশিত হয়ে উঠবে আপন গুন, গরিমা ও প্রতিভায়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অসম্ভাবিতভাবে তাঁর পিতা মুহাম্মদ মনসুর রহমান এবং মাতা জাহানারা খাতুনের নিবিড় পরিচর্যায় বড় হয়ে উঠলেও তার সাথে তাঁর পিতামহ মৌলভী কামাল উদ্দিন মন্ডল এবং তাঁর মাতামহী রহিমা খাতুনের প্রত্যক্ষ প্রভাব শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের উপর লক্ষ্য করা যায়। আর তাঁর মাতামহ আবুল কাশেম আহম্মেদ এবং তাঁর পিতামহী মিসির উন্নিসা বেগম এবং তাঁর চাচা ডা: মমতাজুর রহমানের পরোক্ষ প্রভাবও তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে দেখা যায়।

ধার্মিক এবং ব্যাক্তিত্ববান পিতামহ মৌলভী কামাল উদ্দিনের সাহচার্যে কাটে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মধুর শিশুকাল। দ্বিতীয়ত তাঁর মাতামহী রহিমা খাতুনের প্রভাব ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। কারন তিনি বহু বিরল গুনের অধিকারিনী ছিলেন। তিনি ছিলেন তেহস্বিনী মহিলা, সংগীত চর্চা করতেন। শিক্ষা এবং সাহিত্যের প্রতি তাঁর ছিল বিশেষ আগ্রহ এবং অনুরাগ। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মাতা জাহানারা খাতুনের সংগীত গুরু ছিলেন শহীদ জিয়ার মাতামহী।

শহীদ জিয়া গভীর আগ্রহ নিয়ে সারাদিন পরিশ্রম করে ক্লান্ত হয়ে বাড়ী ফিরলেও খাওয়া দাওয়ার পর বিছনায় যেয়ে এই সংগীতের প্রতি অনুরক্ত হতে ভুলতেন না। সেই ছোট বেলা থেকে শুরু করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের এই অভ্যাস বিদ্যমান ছিল।   ছোটবেলায় শহীদ জিয়া খুব খেলাধুলা করতেন। ফুটবল, হকি ও ক্রিকেট ছিলো শহীদ জিয়ার প্রিয় খেলা। মাঝেমধ্যে গুলি, ডান্ডাও খেলতেন।

আবার কখনো কখনো বৃষ্টিতে ভিজতেন কাঁদা মেখে আনন্দ পেতেন। কখনো কখনো আকাশে ঘুড়ি উড়াতেন। খেলাধুলায় মেতে থাকলেও সন্ধ্যায় রাস্তায় বাতি জ্বলে ওঠার সাথে সাথে বাড়ী ফিরে যেতেন শহীদ জিয়া। এরপর লেখা পড়ায় মনোনিবেশ করতেন তিনি। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে যাওয়া শহীদ জিয়ার ছোট বেলা অভ্যাস ছিল। স্বল্পভাষী হলেও ছেলেবেলায় ও শহীদ জিয়া ছিলেন প্রানবন্ত।

চকলেট তাঁর খুব প্রিয় ছিল ছোট বেলায়। পছন্দ করতেন মিষ্টি ও মুরগির গোশত। বিশেষ করে মুরগির পাখনাকে শহীদ জিয়া শিশু কালে নাম দিয়েছিলেন লাঙল। আর প্রিয় খাবার ছিল ভাজা বাসী ভাত বগুড়ার আঞ্চলিক ভাষায় যাকে বলা হয় ‘কড়কড়া’।   শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বয়স যখন ৪ বৎসর তখন থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে স্কুলে যাতায়াত শুরু করেন। এই সালটি ছিল ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ। কারন শহীদ জিয়ার পিতামহ মৌলভী কামাল উদ্দিন মন্ডল স্কুলে অর্থাৎ যে স্কুলে শহীদ জিয়ার হাতে খঁড়ি সেই বাগাবাড়ি মাইনর স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। শহীদ জিয়ার হাতে খড়ি হয় তারই পিতামহের হাতে। বাগাবাড়িতে তিনি ছিলেন ছোট কমলের প্রথম শিক্ষা গুরু।

সেই সূত্রে জিয়াউর রহমানের সৌভাগ্য যে তিনি তার পিতামহের কাছ থেকে জীবনের বিভিন্ন বিষয় ও বস্তুনিষ্ট মূল্যায়ন করতে শিখেছিলেন। এরপর ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর পিতা মুহাম্মদ মনসুর রহমান তাঁর পরিবারকে কোলকাতায় নিয়ে যান। তখন শহীদ জিয়ার বয়স ৬ বছর। তাঁকে ভর্তি করা হয় পার্ক সার্কাসের আমীন আলী এভিনিউতে অবস্থিত শিশু বিদ্যাপীঠে।   এক বছর এই স্কুলে তিনি পড়াশুনা করার পর আবার নিজ গ্রাম বগুড়ার বাগবাড়িতে ফিরে যায় তার পরিবার।

বগুড়ার বাগবাড়ী গ্রামে পিতামহের বসত বাড়ীতে শহীদ জিয়ার আর একটি বছর কাটে। আবার বাগবাড়ি মাইনর স্কুলে এক বছররের জন্যে ভর্তি হন শহীদ জিয়া।   এরপর শহীদ জিয়ার পরিবার আবার কলকাতায় ফিরে আসেন। শুরু হয় নতুন উদ্দীপনায় আবার এক নতুন জীবন চলা। সালটি ছিল ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দ। শহীদ জিয়াকে তখন কলকাতায় কলেজ স্ট্রীটের হেয়ার স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করে দেওয়া হয়। সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত শহীদ জিয়া হেয়ার স্কুলেই লেখাপড়া করেন।

১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের পর শহীদ জিয়ার পিতা মো: মনসুর রহমানের সরকারী চাকরী সূত্রে পরিবার পরিজন নিয়ে পাকিস্তানের করাচীতে চলে আসেন। শহীদ জিয়াকে ১৯৪৮ এর ১ জুলাই ভর্তি করে দেয়া হয় করাচী একাডেমী স্কুলে সপ্তম শ্রেনীতে। বর্তমানে সেই স্কুলের নাম তাইয়ের আলী আলভী একাডেমী। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যোগদান করেন পাকিস্তান সামরিক একাডেমীতে একজন অফিসার ক্যাডেট হিসেবে। শুরু হয় তার জীবন সংগ্রামের নতুন অধ্যায়।

জীবনের শুরু থেকেই একটি নৈতিক একটি আদার্শিক কঠিন বাতাবরন চিন্তা ও দর্শনের উপর টিকে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে জীবন শুরু শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত— সেই জীবন দর্শন থেকে একটি মুহূর্তের জন্যও বিচ্যুত হননি তিনি।   ১৯৫২ সালে তিনি দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন করাচিতে ‘করাচি একাডেমি স্কুল’ (বর্তমানে, তাইয়েব আলী আলভী একাডেমী) থেকে।

ম্যাট্রিক পাসের পর তিনি ভর্তি হন করাচির ‘ডি জে কলেজে’। ১৯৫৩ সালে ‘পাকিস্তান সামরিক একাডেমি’তে একজন অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন।   ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে একজন কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে বীরত্ব দেখিয়ে জিয়াউর রহমান পাক সেনাবাহিনীতে প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন। এ সময়েই জিয়াউর রহমান বাঙালি সহকর্মীদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করেন।

এরপর তাকে পাকিস্তান সামরিক একাডেমীতে প্রশিক্ষকের দায়িত্ব দেয়া হয়। সেখানেও তিনি নবীন সেনা অফিসারদের সঙ্গে ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ বিষয়ে কথা বলেছেন। এদিকে, ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পূর্ব-পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতা প্রাপ্তির সুযোগ পায় পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। জাতীয় পরিষদের ১৬২ আসনের মধ্যে ১৬০টি ও প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। এই বিশাল বিজয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে পূর্ব-পাকিস্তান আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান রাষ্ট্রের ক্ষমতা গ্রহণের অপেক্ষায় ছিলেন।

অন্যদিকে, পাকিস্তান পিপলস্ পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এ নির্বাচনে অপেক্ষাকৃত কম আসনে জয় পেয়েও ক্ষমতা ভাগাভাগির নানা কৌশল আটতে থাকেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানও এ অপকৌশলে সহায়ক ভূমিকা রাখেন। দীর্ঘ বিলম্বের পর ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। কিন্তু, কোনো কারণ ছাড়াই হঠাত্ ১ মার্চ দুপুরে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন তিনি।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ফুঁসে ওঠে পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণ। ১ মার্চ থেকেই রাজপথে নেমে আসেন তারা। ২ মার্চ উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা। শাসকগোষ্ঠীর কারফিউ ভেঙে দিন-রাত চলে বিক্ষোভ। বিক্ষোভে নির্বিচারে গুলিতে নিহত হয় অন্তত তিনজন। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান এদিন এক বিবৃতিতে ৩ মার্চ থেকে ৬ মার্চ প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত গোটা প্রদেশে হরতালের ডাক দেন। ২ মার্চ থেকে ৫ মার্চ দেশজুড়ে সংঘর্ষ চলে। বহু মানুষ হতাহত হন।

৬ মার্চ দুপুর ১টা ৫ মিনিটে রেডিও পাকিস্তানের জাতীয় অনুষ্ঠানে ইয়াহিয়া খান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন এবং ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশন আহ্বান করেন। পরের দিন ঐতিহাসিক ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমান কী ভাষণ দেবেন তা শোনার জন্য সারাদেশ ও আন্তর্জাতিক মহল অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। ৭ মার্চ শেখ মুজিব বজ্রকণ্ঠে সাত দফা ঘোষণা করেন।

সামরিক আইন ও সেনা বাহিনী প্রত্যাহার, গণহত্যার তদন্ত এবং জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের প্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করা হইলে পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের প্রশ্ন বিবেচনা করা যাইতে পারে, তাহার পূর্বে নয়।’ সাবেক প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমানের লেখা ‘বাংলাদেশের তারিখ’ (প্রথম সংস্করণ) নামক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে—“বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘জয়-বাংলা, জয় পাকিস্তান’ বলে ৭ মার্চের ভাষণ শেষ করেন।”

৯ মার্চ মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পল্টনের এক জনসভায় শেখ মুজিবকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী অপেক্ষা বাংলার নায়ক হওয়া অনেক গৌরবের।’ (দৈনিক আজাদ, ১০ মার্চ ১৯৭১) ১০ মার্চ একইভাবে তিনি বলেন, ‘আলোচনায় কিছু হবে না। ওদের আসসালামু আলাইকুম জানিয়ে দাও।’ ১৩ মার্চ ভৈরবে এক জনসভায় ভাসানী বলেন, ‘পূর্ববাংলা এখন সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং আমরা এখন একটি পূর্ববাংলা সরকারের অপেক্ষায় আছি।’ ১৪ মার্চ জনতার বাঁধভাঙা আন্দোলনের একপর্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির প্রধান ওয়ালী খানের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশ করেন।

শাসনতান্ত্রিক সংকট প্রশ্নে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনার জন্য ১৫ মার্চ প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও প্রেসিডেন্ট জেনারেল আবু মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন। ১৬ মার্চ প্রথম শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান বৈঠকে বসেন। ১৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের দ্বিতীয় দফা সংলাপও সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়। ১৮ মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকের বিরতি ছিল। ১৯ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের মধ্যে তৃতীয় দফা বৈঠক হয়। বৈঠকের পর শেখ মুজিব সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি মঙ্গলের প্রত্যাশী, আবার চরম পরিণতির জন্যও প্রস্তুত।’

২০ মার্চ বৈঠকের পর আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে বলে জানান তিনি। ২১ মার্চ পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় আসেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পৃথকভাবে শেখ মুজিবুর রহমান ও ভুট্টোর সঙ্গে বৈঠক করেন। রাজনৈতিক সঙ্কট উত্তরণে ২২ মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টো শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর পূর্ব ঘোষিত ২৫ মার্চের জাতীয় পরিষদের সভা স্থগিত করা হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর ২৪ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সমঝোতার আভাস দেন। সংবাদ সম্মেলনে শেখ মুজিব বলেন, ‘ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে আমরা মতৈক্যে পৌঁছেছি।

আমি আশা করি, প্রেসিডেন্ট এখন তা ঘোষণা করবেন।’ ২৫ মার্চ দিনব্যাপী ঢাকা শহরে চলে প্রতিবাদ মিছিল, রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি এবং বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ চলে সংগ্রামী মানুষের সঙ্গে সেনাবাহিনীর জওয়ানদের। সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। এ দিন রাত ১১টার পর থেকে অপারেশন সার্চ লাইট শুরু করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। পাকবাহিনী রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা, ইপিআর সদর দফতর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পুরো ঢাকা মহানগরীতে হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং অগ্নিসংযোগ করে।

রাত ১টা ১০ মিনিটের দিকে একটি ট্যাংক, একটি সাঁজোয়া গাড়ি এবং কয়েকটি ট্রাক বোঝাই সৈন্য শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ির ওপর দিয়ে গুলি ছুড়তে ছুড়তে রাস্তা ধরে এগিয়ে আসে এবং তাকে সহ ৪ জন চাকর এবং একজন দেহরক্ষীকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের আগেই শেখ মুজিবুর রহমান গণহত্যার প্রতিবাদ এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবিতে ২৭ মার্চ সারাদেশে হরতাল আহ্বান করেন। পরের দিন শেখ মুজিবের গ্রেফতার ও হরতালের খবর প্রায় সব পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এদিকে রাত আনুমানিক ২টা ১৫ মিনিটের দিকে চট্টগ্রাম থেকে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন মেজর জিয়াউর রহমান।

এর আগে দিনে চট্টগ্রাম শহরে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করে। অস্ত্র বোঝাই জাহাজ সোয়াতের বিরুদ্ধে গড়ে তোলা হয় প্রবল প্রতিরোধ। অস্ত্র খালাস করে যাতে পশ্চিমা সৈন্যদের হাতে না পৌঁছতে পারে সে জন্য রাস্তায় রাস্তায় তৈরি করা হয় ব্যারিকেড। এই ব্যারিকেড সরিয়ে রাস্তা পরিষ্কারের কাজে লাগানো হয় বাঙালি সৈন্যদের। রাত ১০টা পর্যন্ত চলে এই ব্যারিকেড সরানোর কাজ। রাত ১১টায় চট্টগ্রামস্থ অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট’র কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল আবদুর রশীদ জানজুয়া আকস্মিকভাবে সেকেন্ড ইন কমান্ড মেজর জিয়াউর রহমানের কাছে নির্দেশ পাঠান এক কোম্পানি সৈন্য নিয়ে বন্দরে যাওয়ার জন্য। রাত প্রায় সাড়ে ১১টায় জানজুয়া নিজে এসে মেজর জিয়াকে নৌ-বাহিনীর একটি ট্রাকে তুলে ষোলশহর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বন্দরের দিকে রওনা করিয়ে দেন। সঙ্গে একজন নৌ বাহিনীর অফিসারকে (পশ্চিম পাকিস্তানি) গার্ড হিসেবে দেয়া হয়। রাস্তায় বিভিন্ন জায়গায় ব্যারিকেড সরিয়ে যেতে তাঁর দেরি হয়।

আগ্রাবাদে একটা বড় ব্যারিকেডের সামনে বাধা পেয়ে তাঁর ট্রাক থেমে যায়, তখনই পেছন থেকে একটি ডজ গাড়িতে ছুটে আসেন ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান। গাড়ি থেকে নেমেই তিনি দৌড়ে যান মেজর জিয়াউর রহমানের কাছে। হাত ধরে তাকে রাস্তার ধারে নিয়ে যান। জানান, ক্যাপ্টেন অলি আহমদের কাছ থেকে বার্তা নিয়ে এসেছেন। পশ্চিমারা গোলাগুলি শুরু করেছে। শহরে বহু লোক হতাহত হয়েছে। এতে চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন মেজর জিয়াউর রহমান। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দৃঢ়কণ্ঠে তিনি বলে ওঠেন— ‘উই রিভোল্ট।’ সঙ্গে সঙ্গে তিনি খালেকুজ্জামানকে ষোলশহরে ফিরে গিয়ে ব্যাটালিয়নকে তৈরি করার জন্য কর্নেল অলি আহমদকে নির্দেশ দিতে বলেন।

আর সেই সঙ্গে নির্দেশ পাঠান ব্যাটেলিয়নের সমস্ত পশ্চিমা অফিসারকে গ্রেফতারের। এই রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল জানজুয়াসহ সব পশ্চিমা অফিসারকে গ্রেফতার করা হলো। এরপর অন্যান্য ব্যাটেলিয়নের বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের ফোন করলেন, কিন্তু অনেককেই পেলেন না। এ পর্যায়ে তিনি বেসামরিক বিভাগে টেলিফোন অপারেটরকে ফোন করে ডিসি, এসপি, কমিশনার, ডিআইজি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের জানাতে অনুরোধ করেন যে, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অষ্টম ব্যাটালিয়ন বিদ্রোহ করেছে।

টেলিফোন অপারেটর মেজর জিয়ার এ অনুরোধ সানন্দে গ্রহণ করেন। এ পরিস্থিতিতে মেজর জিয়া অষ্টম ব্যাটেলিয়নের অফিসার, জেসিও জোয়ানদের জড়ো করলেন। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তখন রাত আনুমানিক ২টা ১৫ মিনিট। তিনি ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন।

ঘোষণায় বললেন, “আমি মেজর জিয়াউর রহমান প্রভিশনাল প্রেসিডেন্ট ও লিবারেশন আর্মি চিফ হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য দেশবাসীকে আহ্বান জানাচ্ছি। বাংলাদেশ স্বাধীন। আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে অবতীর্ণ হলাম। আপনারা যে যা পারেন, সামর্থ্য অনুযায়ী অস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। আমাদেরকে লড়াই করতে হবে এবং পাকিস্তানি বাহিনীকে দেশ ছাড়া করতে হবে।”

মেজর জিয়া ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে যান। বেতার কর্মীরা মেজর জিয়াউর রহমানকে পেয়ে উত্ফুল্ল হয়ে ওঠেন। কিন্তু কি বলবেন তিনি? একটি করে বিবৃতি লেখেন আবার তা ছিঁড়ে ফেলেন। এদিকে বেতার কর্মীরা বারবার ঘোষণা করছিলেন যে, আর পনের মিনিটের মধ্যে মেজর জিয়াউর রহমান ভাষণ দেবেন। প্রায় দেড় ঘণ্টায় তিনি তৈরি করেন তাঁর ঐতিহাসিক ঘোষণাটি। সেটা তিনি বাংলা এবং ইংরেজিতে পাঠ করেন।

এই ঘোষণা ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ দিল্লির ‘দি স্টেটস্ম্যান’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।   আমাদের দেশে বহুল প্রচারিত একটি বিতর্ক আছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা কে করেছেন ? দেশে বড় দুটি দল , একটি বিএনপি অপরটি মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বাধীন দল আওয়ামী লীগ । তাদের প্রত্যেকের দাবি তাদের নেতার পক্ষে । এমন একটি বিষয় যা স্বাধীনতার বিশেষ একটি মান মর্যাদার সাথে জড়িত, এমন একটি বিষয় নিয়ে বিতর্ক করা কখনই উচিত নয় ।

কিন্তু আমাদের দেশে অনুচিত অনেক কিছু ঘটে যা বিশ্বে আর কোন দেশে ঘটে না । যেমন, স্বাধীনতার মহান নেতাকে গালি দেয়া , দেশ নিয়ে বিতর্ক করা , ইত্যাদি .।এর সাথে স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে এই বিতর্ক কোন নূতন ঘটনা নয় । তবে আমাদের এই বিতর্কের ফলে জাতি দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে । এই পিছিয়ে পড়া জাতি কি করে মাথা তুলে দাঁড়াবে যদি কোন একতা না থাকে ?   জিয়াউর রহমান ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এনিয়ে কোনো বিতর্কের কোন সুযোগ নেই। জিয়াউর রহমান সেদিন সাত কোটি বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

বাংলাদেশের স্বাধীণতার ঘোষনা তৎক্ষালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ দেওয়ার কথা থাকলেও তা দিতে তারা ব্যর্থ হয়েছিলেন। এ জন্য ২৬ মার্চ জিয়াউর রহমান এই ঘোষনা দিয়ে জাতিকে মুক্তি সংগ্রামের দিকে দাবিত করেছিলেন। এই ঘোষনা কারো প্রেরিত বার্তা ছিলোনা বরং জিয়াউর রহমানের নিজের লিখা বার্তা ছিলো। জিয়াউর রহমান রণাঙ্গনে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন এবং জেড ফোর্সের প্রধান হিসেবে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ থেকে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় মহান বিজয়। বিশ্ব মানচিত্রে ঠাঁই করে নেয় বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্র। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান ব্যারাকে ফিরে যান এবং সেনাবাহিনীর নিয়মিত চাকরিতে যোগ দেন।

তাঁর ডাকে দেশের সর্বস্তরের মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশ স্বাধীন করেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যদি যুদ্ধে জয়লাভ করত তাহলে জিয়াউর রহমানকে ফাঁসিতে ঝুলতে হতো। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতারের পরমুহুর্তে মেজর জিয়ার দুঃসাহসিক আত্মপ্রকাশ। মেজর জিয়াই মরহুম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করে শেখ মুজিবকে ইতিহাসের মহানায়ক হওয়ার ক্ষেত্র টেকসই করে সম্প্রসারিত করেছেন। আজকাল স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক নিরর্থক এবং নিতান্তই কূট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের হাতিয়ার মাত্র। মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা আছে বিশ্বজুড়ে।

ততকালীন মেজর জিয়া পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষ ত্যাগ করে একাত্তরের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজ কানে শুনেছেন জিয়ার কন্ঠে ঘোষিত স্বাধীনতার বাণী। শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নয় বর্হিবিশ্বের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কেও জিয়াউর রহমানের দেয়া স্বাধীনতার ঘোষণা ধরা পড়ে। আর সেভাবেই সন্নিবেশিত হয় তাদের নথিতে। অবমুক্তকৃত সিআই এর গোপন দলিলে সেই সত্যটিই প্রকাশ পেয়েছে মাত্র।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার, ভারতের প্রেসিডেন্ট মোরারজী দেশাইও জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক বলে উল্লেখ করেছেন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামে এবং বিভিন্ন সময় উচ্চারিত হয়েছে এ প্রসঙ্গটি। জিয়াউর রহমান একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা লগ্নে চট্টগ্রামের কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ২৬ মার্চ নিজ দায়িত্বে এবং ২৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার কথা

১৯৮২ সালে নভেম্বর মাসে প্রথম প্রকাশিত স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রের ১৫ খন্ডে উল্লেখ রয়েছে। জিয়ার কণ্ঠে স্বাধীনতার অমোঘ ঘোষণা সিআইএর মত লন্ডনের সাপ্তাহিক গার্ডিয়ান সহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও সংবাদ মাধ্যম লিপিবদ্ধ করে রেখেছে।জিয়ার তেজোদীপ্ত কন্ঠের ঘোষণা শুনেছেন এমন লক্ষ লক্ষ মানুষ এখনো বাংলাদেশের মুক্ত বাতাসে নি:শ্বাস ফেলছেন।

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেনানায়ক ও আওয়ামী লীগ নেতা জেনারেল কেএম শফিউল্লাহ, মেজর রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম, সৈয়দ আলী আহসান, ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলাম, আনিসুজ্জামান, রাও ফরমান আলী, মেজর জেনারেল সুখবন্ত সিং, মেজর জেনারেল লছমন সিং, লে. জেনারেল মতিন, জেনারেল সুবিদ আলী ভূঁইয়াসহ অনেকেই তাদের নিজগৃহে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জিয়ার কন্ঠে স্বাধীনতা ঘোষণা প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন।

জিয়া একাত্তরের ২৬ মার্চ সন্ধ্যা ৭:৪৫ মিনিটে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙ্গররত অবস্থায় একটি জাপানী জাহাজ থেকে অষ্ট্রেলিয়া রেডিওতে জিয়ার ঘোষণার বার্তাটি পাঠানো হয়। অস্ট্রেলিয়া রেডিও জিয়ার ঘোষণাটি প্রথম প্রচার করে। এরপর বিবিসি’তে প্রচারিত হওয়ার পর তা পর্যায়ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে।   জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণার প্রমাণ মিলে ভারতের ততকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বক্তব্যেও।

১৯৭১ সালের ৬ নভেম্বর নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনারে বক্তৃতায় এক জায়গায় ইন্দিরা গান্ধী বলেন, শেখ মুজিব এখনো বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি। তিনি চাচ্ছেন সমস্যার একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান, যার সুযোগ এখনো আছে। ‘ইন্ডিয়া সিকস’ (ওহফরধ ঝববশং) নামক বইতে ইন্দিরা গান্ধীর এ বক্তব্যটি সংকলিত হয়েছে।১৯৭৮ সালে ভারত সফরকালে দিল্লিতে জিয়াউর রহমানের সম্মানে আয়োজিত ভোজ সভায় ভারতের ততকালীন প্রেসিডেন্ট নীলম সঞ্জীব রেড্ডি জিয়াকে বলেন, সর্বপ্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা করে আপনি বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন।

প্রয়াত ঔপন্যাসিক হুমায়ুন আহমেদ তার “জোসনা ও জননীর গল্প” উপন্যাসের (১৮২-১৮৩) পাতায় জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে লিখেছেন।এরকম অনেক উদাহরণ ও প্রমাণ রয়েছে দেশে বিদেশে বইপুস্তকে-দলিল দস্তাবেজে, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিদের উক্তিতে। একাত্তরে ২৬ মার্চ শেখ মুজিব গ্রেফতার হন পাকবাহিনীর হাতে। এমতাবস্থায় তার পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার মতো সুযোগ ও সময় কোনটাই ছিলো না।

সেদিন শেখ মুজিবের কন্ঠের স্বাধীনতা ঘোষণার কথা কেউ শুনেননি। তাতে কিবা আসে যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তিতে শেখ মুজিবের ভূমিকা ও অবদান অবিস্মরণীয়। স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে না পারার কারণে তার মর্যাদা বিন্দুমাত্র ম্লান হওয়ার কোন অবকাশ নেই।   অথচ এমন একটি স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত সত্যকে মিথ্যে প্রমাণিত করার যারপরনাই চেষ্টা চলছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ।

দেশের আপামর জনসাধারণের আস্থা ও বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করে কোর্ট-কাচারী, মামলা-মোকদ্দমা এমনকি রাষ্ট্রীয় সংবিধান পাল্টিয়ে জিয়াউর রহমানকে তার প্রাপ্য মূল্যায়ন ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করার অপচেষ্টায় রত বর্তমান সরকার। বিকৃত করা হচ্ছে ইতিহাস। প্রতিহিংসার করাত চালিয়ে জাতিকে চিড়ে ফেলার চেষ্টা কখনো শুভ হতে পারে না। ইতিহাসে যার যেখানে স্থান সেখানে অবশ্যই তাকে সমাসীন করতে হবে।

কাউকে অবমূল্যায়ন, অবমাননা করে কিংবা একজনের জায়গায় অন্যকে প্রতিস্থাপিত করে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। অসুস্থ রাজনীতির বহমান এ ধারা দেশ ও জাতিকে কোথায় নিয়ে ঠেকাবে সে আশংকাই আজ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এ বিভেদ বিভ্রান্তি ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেড়িয়ে আসতে হলে জাতীয় নেতৃবৃন্দকে তাদের নিজ নিজ মর্যাদার আসনে বসাতে হবে। জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সিপাহশালার।

তিনি ছিলেন, এগার হাজার প্রতিরোধকারী সেনার কমান্ডার। সেটাই ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পরবর্তীতে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ জাতির উদ্দেশে একটি বক্তব্য দেন, যেটি প্রচারিত হয় ১১ এপ্রিল ১৯৭১ স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে। সেখানে তাজউদ্দীন আহমদ বলেন First announced through Major Ziaur Rah-man, to set up a full Fledged operational base from which it is administering the liberated areas. (Bangladesh Documents, Vol-I, Indian Government, page 284).

বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ (মরহুম) অলি আহাদ তার “জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৭-৭৫” বইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে লেখেন, “…আমি জনাব আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর সহিত নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করিতাম তাহার বাসায় রাত্রিযাপন করিতে গিয়ে তাহারই রেডিও সেটে ২৭ মার্চ চট্টগ্রাম বেতারকেন্দ্র হইতে মেজর জিয়াউর রহমানের কণ্ঠস্বরে স্বাধীন বাংলার ডাক ধ্বনিত হইয়াছিল। এই ডাকের মধ্যে সেই দিশেহারা, হতভম্ব, সম্বিতহারা ও মুক্তিপ্রাণ বাঙালি জনতা শুনিতে পায় এক অভয়বাণী, আত্মমর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে ঝাঁপাইয়া পড়িবার আহ্বান, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের লড়াইয়ের সংবাদ।”

ভারতে সরকারী ওয়েব সাইটে বলা আছে “While the where abouts of Mujib remained unknown, Major Ziaur Rahman announced the formation of the provisional government of Bangladesh over radio Chittagong. আর মার্কিন ষ্টেট ডিপার্টমেন্টের বিবৃতি On march 27 the clandestine radio an-nounced the formation of a revolutionary army and provisional government under the leader-ship of Major Ziaur Rahman”. মুক্তিযুদ্ধের ৫ নাম্বার সেক্টরের কমান্ডার মেজর মীর শওকত আলী (বীর-উত্তম) লিখেছেন, ” অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডার জিয়াউর রহমান বিদ্রোহ ঘোষণা করলে এবং পরে স্বাধীনতাযুদ্ধের ডাক দিলে আমি সানন্দে যুদ্ধে যোগদান করি।

” আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর রফিক-উল ইসলাম (বীর-উত্তম) তার A tale of Millions বইয়ের ১০৫-১০৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, “২৭ মার্চের বিকেলে তিনি (মেজর জিয়া) আসেন মদনাঘাটে এবং স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।”

একজন পাকিস্তানী সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়েছিলেন’ বলে সম্প্রতি দালিলিক সত্য প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। সংস্থাটির ওয়াশিংটনস্থ সদর দফতর সম্প্রতি বাংলাদেশ বিষয়ক গোপন দলিল অবমুক্ত করলে এ বিষয়ে গত ৯ডিসেম্বর ঢাকায় প্রথম আলো পত্রিকায় সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান এর লেখা একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ওয়াশিংটন থেকে গত ৮ ডিসেম্বর প্রেরিত নিবন্ধে মিজানুর রহমান খান সিআইএর গোপন দলিলের বরাত দিয়ে লিখেন- ‘সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হলেও জিয়া ছিলেন ক্যারিশমেটিক নেতা ।

প্রায় ছয় বছরের নেতৃত্বে এক আশাবিহীন দরিদ্র ও বিশৃংখল অবস্থা থেকে তিনি বাংলাদেশকে সমস্যা মোকাবিলা করার উপযোগী করে তুলেছিলেন।’ ১৯৮২ সালের নভেম্বরে প্রস্তুত সিআইএ’র বাংলাদেশ বিষয়ক হ্যান্ডবুকে দেশের প্রথম দশকের রাজনীতি মূল্যায়ন করে বলা হয়, জিয়াউর রহমানের হত্যাকান্ড বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে। পর্যাপ্ত সামরিক নেতৃত্বের ঘাটতির সুযোগে সামরিক বাহিনী একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

সিআইএর গোপন দলিলে জিয়াউর রহমানের প্রশংসার পাশাপাশি বলেছে ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রাজনীতিকরণকে তিনি আরো বিস্তৃত করেছিলেন।’   শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, যিনি সামরিক বাহিনীর উর্দি ছেড়ে নিজেকে বেসামরিক ব্যক্তিতে পরিণত করেছেন। এর আগেও তিনি আরেকবার উর্দি ছেড়েছিলেন, সেটা ২৬ মার্চ উই রিভোল্ট বলার মাধ্যম। জিয়া সৈনিক ছিলেন আজীবন, যে অর্থে একজন সৈনিক সব সময় যিনি যুদ্ধে থাকেন, থাকেন যুদ্ধক্ষেত্রে। সেই যুদ্ধ পাকিস্তানের দুঃশাসন থেকে অবরুদ্ধ বাংলাদেশকে মুক্ত হাওয়ায় শ্বাস নেওয়ার ব্যবস্থা করে। বাংলাদেশ বুক ভরে শ্বাস নেয়, তারা জানালা খুলে দেয়। বাংলাদেশকে অস্পষ্ট মেরুদ- থেকে একটা শক্ত মেরুদন্ডের ওপর দাঁড় করান তিনি।

জিয়া অস্বাভাবিক রাষ্ট্র পাকিস্তান কে যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক রাষ্ট্র বাংলাদেশের সৃষ্টি করেন। আবার সেই বাংলাদেশে যখন একদলীয় বাকশাল আর রাহুর গ্রাসের মধ্যে পড়ে তখন তাকে মুক্ত করেন।   তিনি ছিলেন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতীক। দেশ, মাটি ও মানুষের জন্যে আমৃত্যু নিবেদিতপ্রাণ এই ব্যক্তিত্বের পরিচিতি সর্বজনবিদিত। দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক, অসাধারণ দেশপ্রেমিক, অসম সাহসী ও সহজ-সরল ব্যক্তিত্বের প্রতীক হিসেবে জিয়াউর রহমান ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

২৫ মার্চের কালরাত্রিতে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী যখন এদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর বর্বরের মতো ঘৃণ্য হামলা চালায় তখন এর আকস্মিকতায় দিশেহারা হয়ে পড়ে সবোর্স্তরের জনগণ। ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তানী বাহিনীর বর্বর আক্রমণের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করে ২৭ মার্চ চট্টগ্রামস্থ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন।

১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে তিন সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হন। তিনি সেনা সদস্যদের সংগঠিত করে পরবর্তীতে তিনটি সেক্টরের সমন্বয়ে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে যুদ্ধপরিচালনা করেন।   বৃহত্তর চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা জেলার কিয়দংশে মুক্তিপাগল মানুষকে মেজর জিয়া সংগঠিত করেন এবং পরবর্তীতে ‘জেড ফোর্সের’ অধিনায়ক হিসেবে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নেতৃত্ব দেন সেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে। দীর্ঘ নয় মাস মরণপণ লড়াই করে অজির্ত হল সবুজ জমিনে ওপর রক্তলাল সূর্যখচিত পতাকাসমৃদ্ধ স্বাধীন বাংলাদেশ- আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। লাখো শহীদের পবিত্র রক্ত আর হাজার হাজার মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অজির্ত হল এদেশের স্বাধীনতা।

গণতন্ত্র এখানে সুপ্রতিষ্ঠিত হবে, শোষন বঞ্চনার অবসান ঘটবে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জিত হবে এবং আত্মনির্ভরশীল ও মর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে আমরা বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াব- এই ছিল সেদিনের স্বপ্ন, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।   স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমান যুদ্ধের পরিক্লপনা ও তার বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন। ১৯৭১ এর জুন পর্যন্ত ১ নং সেক্টর কমান্ডার ও তারপর জেড-ফোর্সের প্রধান হিসেবে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহন করেন।

অসীম সাহসিকতা ও জীবনের ঝুঁকি নিয়েই জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে শুরু করে প্রতিটি পর্বে তিনি ছিলেন নির্ভীক। যখন রাজনৈতিক নেতারা সিদ্ধান্তহীনতায় ছিলেন, তখন সেনাবাহিনীর একজন মেজর এসে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন; জীবনবাজি রেখে সশস্ত্র যুদ্ধ করেন। সেক্টর কমান্ডার হিসেবে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন; বীর উত্তম খেতাব পান। স্বাধীনতার পর তিনি ফের সৈনিক জীবনে ফিরে যান। সেনাবাহিনীতে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।

স্বাধীনতার পর প্রথমে তিনি কুমিল্লা ব্রিগেড কমান্ডার এবং ১৯৭২ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডেপুটি চীফ-অফ-স্টাফ নিযুক্ত হন। ১৯৭২ সালে কর্নেল, ১৯৭৩-এর মাঝামাঝি ব্রিগেডিয়ার এবং শেষ দিকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন।

স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের প্রধান হিসেবে জিয়াউর রহমান এ দেশের মানুষের কাছে প্রথম পরিচিত হলেও পরে তিনি বাংলাদেশের একজন বরেণ্য রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হন। যুদ্ধবিধ্বস্থ দেশকে রাজনৈতিক ঐকতানে নিয়ে আসা ও সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর কারণে তিনি আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে আখ্যা পান।

তিনি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠনের মধ্যদিয়ে দেশে উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতির সূচনা করেন। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের নতুন দর্শন উপস্থাপন করেন জিয়াউর রহমান। তিনি ১৯ দফা কর্মসূচি দিয়ে দেশে উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতি এগিয়ে নিয়ে যান। ৯ আগস্ট প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯ দফা বাস্তবায়নে সারাদেশে ১৮টি কমিটি গঠন করেন।

প্রতিটি কমিটির প্রধান হিসেবে একজন মন্ত্রীকে দায়িত্ব দেয়া হয়   শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা   দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিম্নলিখিত ১৯ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করেছিলেনঃ

১। সর্বোতভাবে দেশের স্বাধীনতা, অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।

২। শাসনতন্ত্রের চারটি মূলনীতি অর্থাৎ সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের সমাজতন্ত্র জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে প্রতিফলন করা।

৩। সর্ব উপায়ে নিজেদেরকে একটি আত্বনির্ভরশীল জাতি হিসেবে গড়ে তোলা।

৪। প্রশাসনের সর্বস্তরে, উন্নয়ন কার্যক্রম এবং আইন-শৃংখলা রক্ষার ব্যাপারে জনসাধারনের অংশগ্রহন নিশ্চিত করা।

৫। সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামীন তথা জাতীয় অর্থনীতিকে জোরদার করা।

৬। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পুর্ণ করা এবং কেউ যেন ভুখা না থাকে তার ব্যাবস্থা করা।

৭। দেশে কাপড়ের উৎপাদন বাড়িয়ে সকলের জন্য অন্তত মোটা কাপড় সরবরাহ নিশ্চিত করা।

৮। কোন নাগরিক গৃহহীন না থাকে তার যথাসম্ভব ব্যাবস্থা করা।

৯। দেশকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করা ।

১০। সকল দেশবাসীর জন্য নূন্যতম চিকিৎসার বন্দোবস্ত করা।

১১। সমাজে নারীর যথাযোগ্য মর্যাদা প্রতষ্ঠা করা এবং যুব সমাজকে সুসঙ্গহত করে জাতি গঠনে উদ্বুদ্ধ করা।

১২। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেসরকারী খাতে প্রয়োজনীয় উৎসাহ দান।

১৩। শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি সাধন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির স্বার্থে সুস্থ শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক গড়ে তোলা।

১৪। সরকারি চাকুরীজীবিদের মধ্যে জনসেবা ও দেশ গঠনের মনোবৃত্তিতে উৎসাহিত করা এবং তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন করা।

১৫। জনসংখ্যা বিস্ফোরন রোধ করা।

১৬। সকল বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা এবং মুসলিম দেশগুলির সাথে সম্পর্ক জোরদার করা।

১৭। প্রশাসন এবং উন্নয়ন ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় সরকাররে শক্তিশালী করা।

১৮। দুর্নীতিমুক্ত ন্যায়নীতিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করা।

১৯। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকল নাগরিকের অধিকার পূর্ন সংরক্ষণ করা এবং জাতীয় ঐক্য এবং সংহতি সুদৃঢ় করা।

১৯৭৭ সালে তিনি প্রণয়ন করেন ১৯ দফা কর্মসূচি। জিয়াউর রহমান ঘোষিত এই ১৯ দফা ছিল তার উন্নয়নের মূলমন্ত্র। প্রেসিডেন্ট জিয়ার সময়ে দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে যে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে, তার পেছনে গাইডলাইন হিসেবে কাজ করেছে ১৯ দফা। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি এমন একটি দল যা শহীদ জিয়ার দক্ষতা প্রজ্ঞা ও বিচক্ষনতার প্রতিফলনেই সুনির্দিষ্ট কর্মসূচী ভিত্তক একটি সুসাংগঠনিক ও গনমানুষের আশা আকাংখায় প্রতিফেলিত বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল।

শহীদ জিয়ার ১৯ দফা কর্মসূচিই শুধু একটি দলের জন্মের আতুর ঘরই নয় বরং ইহাই আধুনিক গনতান্ত্রিক বাংলাদেশের সর্বপ্রথম মাইলফলক যার উপর ভিত্তি করেই দেশে মুজিব শাসনের রুদ্ধ গণতন্ত্রের পূর্নযাত্রা শুরু হয় এবং দেশে শুরু হয় বহুদলীয় গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা। তাই বাংলাদেশে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক বলা হয়ে থাকে। বাংলাদেশে বিএনপি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট নিয়েই একমাত্র সুনির্দিষ্ট কর্মসূচী ভিত্তক গড়ে তোলা রাজনৈতিক দল।

গণভোটে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতি জনগণের আস্থা   ৩০ মে ’৭৭ অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং তার ১৯ দফা কর্মসূচি ও নীতির প্রতি দেশবাসী বিপুল আস্থা জ্ঞাপন করেন। ১২ হাজার ২৬৪টি কেন্দ্রের ভোটের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোট ভোটের সংখ্যা ১ কোটি ৯২ লাখ ৯ হাজার ৬০টি। এর মধ্যে ১ কোটি ৮৯ লাখ ৯৩ হাজার ৯২টি ‘হ্যাঁ’ সূচক ভোটের সংখ্যা। ‘না’ সূচক ভোটের সংখ্যা ২ লাখ ১৫ হাজার ৯৬৮টি।

সকল ক্ষমতার উত্স জনগণ তাদের আস্থার রায় জানিয়েছেন স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর সৈনিক এবং নবীন প্রত্যাশায় উদ্দীপ্ত বাংলাদেশের স্বর্ণালি অভিজ্ঞতার নায়ক মেজর জেনারেল জিয়াকে, জনগণ তাদের রায় দিয়েছেন স্বাধীনভাবে।   শুধু রাজনীতিবিদরাই নন, জিয়াউর রহমানও বালাদেশের স্বাধীনতার জন্য সেই তরুণ বয়স থেকেই নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তত রেখেছিলেন।

এ প্রসঙ্গে তিনি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবসে “একটি জাতির জন্ম“ শিরোনামে নিবন্ধে জিয়াউর রহমান লিখেছেন ..“স্কুল জীবন থেকেই পাকিস্তানীদের দৃষ্টিভঙ্গির অস্বচ্ছতা আমার মনকে পীড়া দিতো। আমি জানতাম, অন্তর দিয়ে ওরা আমাদের ঘৃণা করে।—বাঙালিদের বিরুদ্ধে একটা ঘৃণার বীজ উপ্ত করে দেওয়া হতো স্কুল ছাত্রদের শিশু মনেই।—সেই স্কুল জীবন থেকে মনে মনে আমার একটা আকাংখাই লালিত হতো, যদি কখনো দিন আসে, তাহলে এই পাকিস্তানবাদের অস্তিত্বেই আমি আঘাত হানবো..পাকিস্তানী পশুদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার, দুর্বারতম আকাংখা দুর্বার হয়ে উঠতো মাঝে মাঝেই। উদগ্র কামনা জাগতো পাকিস্তানের ভিত্তি ভূমিটাকে তছনছ করে দিতে। কিন্তু উপযুক্ত সময় আর উপযুক্ত স্থানের অপেক্ষায় দমন করতাম সেই আকাংখাকে ”।

তার প্রতিষ্ঠিত বিএনপি দেশের মানুষের প্রিয় দল হিসেবে ’৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ, ’৯১ সালের পঞ্চম সংসদ ও ষষ্ঠ এবং অষ্টম সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অধীনে অনুষ্ঠিত ’৮৬ সালের তৃতীয় ও ’৮৮ সালের চতুর্থ এবং এছাড়া সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ক্ষমতাসীন মহাজোটের অধীনে অনুষ্ঠিত একতরফার দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপিসহ দেশের অধিকাংশ দল। এই নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীই ছিল না।

বাকি ১৪৭ আসনের নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৫ থেকে ১০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি ছিল বলে বিভিন্ন সংগঠন দাবি করে। নির্দলীয় সরকারের দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটসহ অন্যান্য বিরোধী দলও এই নির্বাচন বর্জন করে। একতরফার এই নির্বাচনে সমর্থন জানায়নি দেশী-বিদেশী কোনো সংস্থাই।

ভোটারবিহীন সেই নির্বাচনের পর থেকেই বিরোধী জোট দ্রুত সবার অংশগ্রহণে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে।     ৭১ সালে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা যেমন এ দেশের মুক্তিকামী মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছিল, তেমনি ’৭৫ সালে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব যখন হুমকির মুখে, তখন সিপাহি-জনতার অভ্যূত্থান হয়। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসীন হন। তিনি একদলীয় বাকশালের পরিবর্তে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন।

পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এনে জিয়াউর রহমান চীনসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন সম্পর্কের সূচনা করেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাতটি দেশকে নিয়ে ‘সার্ক’ গঠনের উদ্যোগ তারই। ওআইসিকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর সংহতি জোরদার করার জন্য তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত বিএনপি সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৮১ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে মর্মান্তিকভাবে শাহাদাতবরণ করেন।

মুক্তিযুদ্ধে সাহসী অবদানের জন্য স্বাধীনতার পর তৎকালীন সরকার তাকে বীরউত্তম খেতাবে ভূষিত করে। রাষ্ট্রের যথোপযুক্ত দর্শন ও নেতৃত্বের অনুপস্থিতি আজ স্পষ্ট। নেতৃত্ব ক্ষমতাকেন্দ্রিকতার নেশায় ডুবে আছে, যা জাতিকে বারবার সঙ্কটের মুখোমুখি করছে। নির্দ্বিধায় বলা যায়, দেশ ও মানুষকে নিয়ে জিয়াউর রহমান যেভাবে ভেবেছেন, কাজ করেছেন, রাষ্ট্রের দার্শনিক ভিত্তি তৈরি করেছেন, সবকিছুর ঊর্ধ্বে দেশকে গুরুত্ব দিয়েছেন—এসবের মাধ্যমে তিনি এক ব্যতিক্রমী রাষ্ট্রনায়কের আসনে বসেছেন।

তিনি দেশ গড়ার ভিশনকে ক্ষমতা ও সময়ের মাপকাঠির বাইরে রেখেছিলেন। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ভিত্তি মূলত জিয়াউর রহমানই গড়ে তুলেছেন। এজন্য একদিকে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ ও অন্যদিকে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ নীতিতে কাজ করেছেন।   জিয়াউর রহমান এমন একজন নেতা ছিলেন যিনি দেশের সব দুর্যোগ ও সঙ্কটময় মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতা বিপ্লবের মাধ্যমে দেশ ও জাতির সঙ্কটময় মুহূর্তে জিয়াউর রহমান দেশের গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। স্বাধীনতার স্বপ্ন ছিল গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মানুষের মৌলিক চাহিদার বাস্তবায়ন।

কিন্তু স্বাধীনতার পর যখন দেশবাসী দেখতে পেল, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ১৯৭৫ সালে ২৫ জানুয়ারি সোনার হরিণ নামের গণতন্ত্রকে হত্যা করে বাকশাল কায়েম করা হয়েছে, তখন জিয়াউর রহমানের হাতেই ১৯৭৬ সালে রাজনৈতিক দলবিধির অধীনে আওয়ামী লীগ, জাসদ, ন্যাপ (ভাসানী), ন্যাপ (মোজাফফর), জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিসহ (কমরেড মণি সিংহ) বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো রাজনীতি করার সুযোগ পেল। সেই কারণেই জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

২১ এপ্রিল ১৯৭৭ সালে জিয়া বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ অধীষ্ঠ হন। রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন জিয়া দেশে আবার গণতন্ত্রায়নের উদ্যোগ নেন। তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র চালুর সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৭৬ সালের ৮ মার্চ মহিলা পুলিশ গঠন, ১৯৭৬-এ কলম্বোতে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন সম্মেলনে যোগদান করেন এবং বাংলাদেশ ৭ জাতি গ্রুপের চেয়াম্যান পদ লাভ করে। ১৯৭৬ সালেই তিনি উলশি যদুনাথপুর থেকে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন উদ্বোধন করেন।

১৯৭৬-এর ২৯ নভেম্বর তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৭৬-এ গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন, ১৯৭৭-এর ২০ ফেব্রুয়ারি একুশের পদক প্রবর্তন, এপ্রিলের ২১ তারিখ বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ গ্রহণ।

১৯৭৮ সালের ৩ রা জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিয়াউর রহমান জয়লাভ করেন। এই নির্বাচনে মোট ১০জন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেনঃ

১। জনাব আজিজুল ইসলাম

২। জনাব আবুল বাশার

৩। প্রিন্সিপাল এ, হামিদ (এম.এস.সি)

৪। হাকিম মাওলানা খবিরুদ্দিন আহমেদ

৫। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান (বি,ইউ, পি,এস,সি)

৬। জেনারেল (অবঃ) মুহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানি

৭। জনাব মোঃ আব্দুস সামাদ

৮। জনাব মোঃ গোলাম মোর্শেদ

৯। শেখ মোঃ আবু বকর সিদ্দিক

১০। সৈয়দ সিরাজুল হুদা ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ২জন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেনঃ

(ক) মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানঃ তিনি জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন। জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট ৬টি দলের সমন্বয়ে ছিল। জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল, জাতীয় আওয়ামী পার্টি (ভাসানী), ইউনাইটেড পিপল্স পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, বাংলাদেশ লেবার পার্টি এবং বাংলাদেশ তফসিলি জাতি ফেডারেশন।

(খ) জেনারেল (অবঃ)এম.এ.জি.ওসমানীঃ তিনি জাতীয় জনতা পার্টির চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি মনোনীত হয়েছিলেন,গণ ঐক্য জোট এবং ৫টি রাজনৈতিক জোটের যথাঃ জাতীয় জনতা পার্টি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, জাতীয় আওয়ামী পার্টি রাজনৈতিক জোটের যথাঃ জাতীয় জনতা পার্টি,বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ,জাতীয় আওয়ামী পার্টি (মোজাফ্ফর), বাংলাদেশ পিপলস লীগ, গণ আজাদী লীগ।

এখানে উল্ল্যেখ যে, এ নির্বাচন ১১ জন প্রার্থী মনোনয়ন দাখিল করেন। ২ জনের মনোনয়নপত্র বাছাই –এ বাদ পড়ায় বৈধভাবে মনোনীত প্রার্থীর সংখ্যা ৯ জন। ১ জন আপীল দাখিল করায় ও তাঁর আপীল গৃহীত হওয়ায় এবং কোন প্রার্থী প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বীর সংখ্যা ১০ জন ছিল।এরপর মে মাসে ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা এবং আস্থা যাচাইয়ের জন্য ৩০ মে গণভোট অনুষ্ঠান ও হাঁ-সূচক ভোটে বিপুল জনসমর্থন লাভ করেন।   বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল(বিএনপি)

১৯৭৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সংক্ষেপে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে বেগম খালেদা জিয়া এর চেয়ারপারসন (Chairperson)। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এই দলের সমন্নয়ক ছিলেন এবং এই দলের প্রথম চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এর প্রথম মহাসচিব ছিলেন। জিয়ার এই দলে বাম, ডান, মধ্যপন্থি সকল প্রকার লোক ছিলেন।

বিএনপির সবথেকে প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এর নিয়োগ পদ্ধতি। প্রায় ৪৫% সদস্য শুধুমাত্র রাজনীতিতে নতুন ছিলেন তাই নয় তারা ছিলেন তরুণ। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিকাল ৫টায় রমনা রেস্তোরাঁয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠাতা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র পাঠের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের যাত্রা শুরু করেন। জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তিনি ঘোষণাপত্র পাঠ ছাড়াও প্রায় দুই ঘণ্টা সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

সংবাদ সম্মেলনে নতুন দলের আহ্বায়ক কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি প্রথমে ১৮ জন সদস্যের নাম এবং ১৯ সেপ্টেম্বর ওই ১৮ জনসহ ৭৬ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেন। এখানে উল্লেখ্য, বিএনপি গঠন করার আগে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) নামে আরেকটি দল তৎকালীন উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে সভাপতি করে গঠিত হয়েছিল।

২৮ আগস্ট ১৯৭৮ সালে নতুন দল গঠন করার লহ্ম্য জাগদলের বর্ধিত সভায় ওই দলটি বিলুপ্ত ঘোষণার মাধ্যমে দলের এবং এর অঙ্গ সংগঠনের সকল সদস্য জিয়াউর রহমান ঘোষিত নতুন দলে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।তিনি রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২৯৮টি আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয়লাভ করে।

নির্বাচনে অংশ নিয়ে মালেক উকিলের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ৩৯টি ও মিজানুর রহমান চৌধুরির নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২টি আসনে জয়লাভ করে। এছাড়া জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ৮টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ১টি ও মুসলিম ডেমোক্রেটিক লীগ ২০টি আসনে জয়লাভ করে।

দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতির কথা বিবেচনা করে তিনি সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ সংযোজন করেছিলেন। এই জিয়াউর রহমানই প্রথম আমাদের স্বাধীন জাতিসত্তার পরিচয়ে বিশ্বে পরিচিত করেছিলেন তার ঐতিহাসিক দর্শন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে। আমরা জাতি হিসেবে বাঙালি নয়, বাংলাদেশী। পশ্চিম বাংলার জনগোষ্ঠীও তো বাঙালি।

জাতীয়তা যদি বাঙালি হয় তাহলে বাংলাদেশ যে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ তা বিশ্ববাসী বুঝতে অক্ষম হবে। জিয়াউর রহমান মূলত বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী দর্শনের ভিত্তিতে সব ধর্মের, সব বর্ণের, সব মতের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে বাংলাদেশকে একটি আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর বিশ্বে বাংলাদেশ যে তলাবিহীন ঝুড়ির খেতাব পেয়েছিল, তার দুর্নাম ঘোচাতে তিনি শক্তহাতে দেশের হাল ধরেছিলেন। সামরিক উর্দি খুলে জনগণের কাছাকাছি পৌঁছতে পেরেছিলেন। বন্যা ও খরা থেকে বাঁচার জন্য এবং জমিতে সেচ প্রদানের জন্য তিনি খাল খনন কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন।

ফারাক্কার অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তিনি এন্টি ফারাক্কার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। তার সময়ে সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে প্রকট খাদ্য ঘাটতির দেশ হয়ে ওঠে খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশ। জিয়াউর রহমানের সময়ই এদেশ থেকে চাল রফতানি করা হয়েছিল বিদেশে। তার সময় বন্ধ কল-কারখানা সচল হয়। কল-কারখানা, অফিস-আদালত ও ক্ষেত-খামারে সর্বক্ষেত্রেই প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে। দেশের জনগণ সত্যিকারের স্বাধীনতার স্বাদ অনুভব করতে শুরু করে।

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশ গড়ার জন্য। নিজে হাতে খাল কেটেছেন, গাছ লাগিয়েছেন, রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে এমন দৃষ্টান্ত বিশ্বে বিরল। শিক্ষা বিস্তারে তার অবদান অতুলনীয়। দেশের ৯০ ভাগ মানুষ মুসলমান। মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকীকরণ করেছেন। মেধার স্বীকৃতি, লালন ও বিকাশের জন্য তার পদক্ষেপ ছিল প্রশংসনীয়। বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জনকারীদের নিয়ে নৌবিহার করেছেন, তাদের সঙ্গ দিয়েছেন ও দেশের জন্য তাদের দায়িত্ব এবং কর্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

পররাষ্ট্রনীতিতেও জিয়াউর রহমান সফল ছিলেন। সব বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা ও মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা ছিল তার পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য। ১৯৮১ সালে তৃতীয় ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে ৩ সদস্যবিশিষ্ট আলকুদস কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয় বাংলাদেশ।

ইরাক-ইরান যুদ্ধাবসানের উদ্দেশ্যে গঠিত নয় সদস্যবিশিষ্ট ইসলামী শান্তি মিশনে তিনি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তিনি শুধু বাংলাদেশের নেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন মুসলিম বিশ্বের একজন জনপ্রিয় নেতা। তার সময়েই বাংলাদেশ ১৯৭৮ সালে জাপানের মতো শক্তিধর দেশকে পরাজিত করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য পদ লাভ করে।

তিনি বাংলাদেশের মানুষের মহামুক্তির সনদ ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন এবং এই ১৯ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য বিএনপি গঠন করেন। দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার জন্য যে সময়ের প্রয়োজন ছিল, তিনি সেই সময়টুকু পাননি।

যারা এদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে অপছন্দ করত, জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তাকে ঈর্ষা করত, এদেশ বিশ্বের মানচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক যারা তা চাইত না, সেই দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠীর ইশারায় কিছু বিপথগামী সেনা কর্মকর্তারা এদেশের জনপ্রিয় প্রাণপ্রিয় নেতা জিয়াউর রহমানকে হত্যা করল। ১৯৮১ সালের ৩০ মে ঘাতকের তপ্ত বুলেট তার হৃদস্পন্দন স্তব্ধ করে দিল।

দেশ বিরোধী ঘাতক চক্র ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা “র ” এর সহযোগীতায় নির্মম ভাবে শহীদ করে প্রেসিডেন্টকে। তার শাহাদাতে জাতি কলংকিত। সেদিনই আমরা সেই কলংক থেকে মুক্ত হতে পারব যেদিন আমরা গড়তে পারব জিয়ার স্বপ্নের সেই সোনার বাংলাদেশ।   সাদামাটা প্রকৃতির মানুষ ছিলেন তিনি। পোশাক-পরিচ্ছেদ ও আহারে তার কোনো বিলাসিতা ছিল না। তিনি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, দুই পুত্র, আত্মীয়স্বজনকে এদেশের মানুষ খুব একটা চিনতেন বলে মনে হয় না।

তার দুই পুত্র লেখাপড়া করতো সাধারণ মানের স্কুলে। তার মৃত্যুর পর নিজস্ব সম্পদ হিসেবে তার পরিবার-পরিজনের জন্য কিছুই রেখে যেতে পারেননি। এমন কি তার পরিবারের মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁই ছিল না। তত্কালীন সরকার মানবিক কারণে বর্তমান ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বাসভবনটি বেগম খালেদা জিয়াকে বরাদ্দ দেয়। যে বাড়ি থেকে জিয়া পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে সততার এই উদাহরণ বর্তমান বিশ্বে বিরল।

আসলে জিয়াউর রহমান সততা ও দেশপ্রেমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এক কালজয়ী মহান নেতা। একটি জাতি গঠন ও দেশকে উন্নয়নের চরম শিখরে নিয়ে যাওয়ার জন্য একজন সত্ ও দেশপ্রেমিক নেতাই যথেষ্ট।বহুদলীয় গনতন্ত্রের প্রবর্তক শহীদ জিয়া ছিলেন বাংলার আকাশের সবচেয়ে উজ্জল নক্ষত্র।

স্বাধীনতা উত্তর দুর্ভিক্ষ পিড়িত জনগন শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর যখন শুধু অনিষচয়তা আর হতাশা ছাড়া আর কিছুই চোখে দেখছিলনা , ঠিক তখনই জিয়া জালিয়েছিলেন আশার আলো, বাংলাদেশের জনগন বুকে বেধেছিল অনেক বড় স্বপ্ন।   পঁচাত্তরের এক কালো সময়ে জিয়াউর রহমান সামনে চলে আসেন। সময় তাকে জাতীয় ভূমিকায় টেনে আনে।

সেটাও ছিল এক অন্ধাকারাচ্ছন্ন সময়। সশস্ত্র বাহিনীর একটি অংশের বিদ্রোহে এবং আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় তত্কালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হন। জাতি এক চরম সঙ্কটের মুখোমুখি হয়। এমন এক দিকনির্দেশনাহীন সময়ে সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান জাতীয় ভূমিকায় আবির্ভূত হন। সেখানেও তিনি নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়েছেন।

কিন্তু দূরদর্শিতা, দেশপ্রেম ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞা তাকে সফলতার শীর্ষে নিয়ে গেছে। সিপাহী-জনতার বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ‘জাতীয় ঐক্যের প্রতীক’-এর মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে সিপাহী-জনতা। ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের মাধ্যমে এ দেশের রাজনীতির গতিপথ নতুন করে নির্মাণ করে। তত্কালীন সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য রাতের আঁধারে বিদ্রোহ করে। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ নিজেকে সেনাপ্রধান হিসেবে ঘোষণা দিয়ে ৩ নভেম্বর সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে বন্দী করেন।

ওইদিন জাতীয় চার নেতাকেও জেলখানায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাককে পদচ্যুত করে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেয়া হয়। ৩ নভেম্বর জিয়াউর রহমান বন্দী হওয়ার পর ৭ নভেম্বর পর্যন্ত এ চারদিন দেশ ও দেশের জনগণ দুঃসহ পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে অতিক্রম করে। ৬ নভেম্বর রাত প্রায় ১টার সময় সশস্ত্র বাহিনীর পুনরুত্থানবাদী চক্রের বিরুদ্ধে বীর জনগণ, সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনীর সিপাহীরা বিপ্লব ঘটিয়ে বন্দী মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেন। সিপাহী ও জনতার মিলিত বিপ্লবে চার দিনের দুঃস্বপ্নের ইতি হয়।

আওয়াজ ওঠে ‘সিপাহী-জনতা ভাই ভাই’, ‘জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’। ৭ নভেম্বর সিপাহী বিপ্লবের ফলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নিরাপদ হয়। জিয়াউর রহমান আবার সেনাবাহিনীপ্রধানের দায়িত্ব নেন। এরপর তিনি সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার যেমন উদ্যোগ নেন, তেমনি সময়ের প্রয়োজেন তিনি দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম, সমাজনীতি, নৈতিকতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই তিনি সফলতার স্বাক্ষর রাখেন। রাজনীতিতে অস্থিরতা কাটিয়ে একটি সমন্বিত সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। সামরিক ব্যক্তি হয়েও তিনি রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন।

সাধারণত মিলিটারি শাসকরা রাজনীতিকদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেন এবং সূক্ষ্ম রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে সামরিক সিদ্ধান্ত প্রয়োগের চেষ্টা করেন। কিন্তু জিয়াউর রহমান রাজনীতি ও সমরনীতির প্রভেদ বুঝতেন। দেশের একটি অন্ধকার সময়ে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পেয়ে ১৯৭৫ সালের ২৩ নভেম্বর জাতির উদ্দেশে দেয়া দ্বিতীয় ভাষণেই জেনারেল জিয়াউর রহমান অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেন।

জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম জননির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। যে রাষ্ট্রপতি তার জীবদ্দশায় গেছেন কৃষকের পর্ণকুটিরে, শ্রমিকের বস্তিতে। গ্রামে গ্রামে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে সাধারণ মানুষের দুঃখ কষ্টের কথা জেনে তা সমাধান করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর সৃষ্টিশীল নেতৃত্ব, দুরদর্শী রাজনৈতিক চিন্তা, জনসাধারণকে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান করার পদক্ষেপ এবং নিজের প্রশ্নাতীত সততা তাঁকে এক যুগে তার সমসাময়িক কালের ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত করে।

আবার ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে’র ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল গঠনের মাধ্যমে তিনি রাজনীতিতে সব মতের মানুষের সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন। ১৯৭৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সংক্ষেপে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে বেগম খালেদা জিয়া এর সভানেত্রী।‘দেশ’ ও ‘মানুষ’ই তার রাজনীতির প্রধান প্রতিপাদ্য ছিল। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও আদর্শের পরিচয় একটি বক্তৃতার মাধ্যমে আমি তুলে ধরছি।

১৯৭৬ সালের ১৩ মার্চ রামপুরা টেলিভিশন ভবনে বেতার ও তথ্য বিভাগের পদস্থ অফিসারদের এক সমাবেশে জেনারেল জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, ‘আমরা সকলে বাংলাদেশী। আমরা প্রথমে বাংলাদেশী এবং শেষেও বাংলাদেশী। এই মাটি আমাদের, এই মাটি থেকে আমাদের অনুপ্রেরণা আহরণ করতে হবে। জাতিকে শক্তিশালী করাই আমাদের লক্ষ্য। ঐক্য, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, নিষ্ঠা ও কঠোর মেহনতের মাধ্যমেই তা সম্ভব।’ (দৈনিক বাংলা, ১৪ মার্চ, ১৯৭৬)

মিথ্যা প্রতিশ্রুতির অপরাজনীতি দ্বারা জনগণকে প্রতারিত করে স্বাধীনতাত্তোর ক্ষমতাসীন মহল যখন মানুষের বাক-ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে হরণ করে গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছিলো, দেশকে ঠেলে দিয়েছিলো দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে-এমনি জাতির এক চরম সংকটময় মুহূর্তে সৈনিক জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবে শহীদ জিয়া ক্ষমতার হাল ধরেন। ক্ষমতায় এসেই মানুষের হারানো অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পূনঃপ্রতিষ্ঠা করেন, নিশ্চিত করেন মানুষের বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা।

উৎপাদনের রাজনীতি প্রবর্তন করে তিনি দেশকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী করে গড়ে তুলতে সক্ষম হন। তাঁর তীব্র গণতান্ত্রিক চেতনা এবং দেশকে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে মর্যাদার আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। শহীদ জিয়া ছিলেন আধিপত্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক আপোষহীন দেশপ্রেমিক। তাই দেশ বিরোধী ষড়যন্ত্রকারীরা নিজেদের নীলনক্শা বাস্তবায়নের কাঁটা ভেবে জিয়াকে নির্মমভাবে হত্যা করে। কিন্তু তার এই আত্মত্যাগ জনগণের মধ্যে গড়ে উঠেছে দেশবিরোধী চক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে এক ইস্পাতকঠিন গণঐক্য।

শহীদ জিয়ার বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী দর্শনেই আমাদের জাতিসত্ত্বার সঠিক স্বরূপটি আবিষ্কৃত হয়-যা আমাদের ভৌগোলিক জাতিসত্ত্বার সুনির্দিষ্ট পরিচয় দান করে। বিশ্ব মানচিত্রে আমাদের আত্মপরিচয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখারও সাহসী অঙ্গীকার।   জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ‘জাতীয় সেনাবাহিনী’ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। প্রশিক্ষণ, কঠোর পরিশ্রম ও কর্তব্যনিষ্ঠা দ্বারা অফিসারদের নিজ নিজ পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও তাদের মাঝে দেশপ্রেম জাগাতে অসামান্য অবদান রাখেন তিনি। ধর্মীয় মূল্যবোধকে প্রাধান্য দিয়ে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আত্মবিশ্বাসী করে তোলেন তাদের।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সামরিক বাহিনীর একটা ক্ষুদ্র গ্রুপ দ্বারা সংঘটিত অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হলেও এটা সত্য যে, তিনিই সামরিক বাহিনীতে ঐক্য ও সংহতি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। উন্নত প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্রশস্ত্রের সমন্বয়ে এবং সম্মানজনক বেতন-ভাতা প্রদানের মাধ্যমে তিনি সামরিক বাহিনীর মনোবলকে উন্নত স্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন।     আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দুর্বল-শক্তিশালী সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছেন।

ভারত, চীন, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরবসহ সবার সঙ্গে পারস্পরিক সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপন করতে যথেষ্ট সফলতা দেখিয়েছেন। দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি বৈদেশিক নীতি নির্দিষ্ট ও বাস্তবায়ন করেন। জোটনিরপেক্ষ এবং ইসলামী দেশগুলো ও বিভিন্ন উন্নয়নকামী দেশের সম্মেলনে তার ব্যক্তিগত এবং সক্রিয় অংশগ্রহণে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে বিশেষ গতি সঞ্চারিত হয়।

ব্যক্তিগত কূটনীতি দ্বারা তিনি বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা কাটিয়ে তুলতে সক্ষম হন।     রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বৈদেশিক নীতির দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলকে তিন ভাগে আলোচনা করা যায়। প্রথমত, তিনি জাতিসংঘকে কেন্দ্র করে একটি বিশ্বব্যাপী শান্তির আবহ তৈরি করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের কর্মকাণ্ড পরিচালিত করেন। জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির উন্নয়ন ঘটান।

এর ফলেই বাংলাদেশ ১৯৮০ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়। তিনি উপমহাদেশের জন্য একটি স্থানীয় শান্তিকাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো নিয়ে আসিয়ানের মতো সংস্থা গড়ার উদ্যোগ নেন, যা পরবর্তীকালে সার্ক নামে প্রতিষ্ঠা পায়।

রাষ্ট্রপতি জিয়ার পররাষ্ট্র নীতির আরেকটা লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যকে বহুমুখীকরণ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ ও সাহায্যকে উত্সাহিত করা। তার শাসনকালে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার নিরলস প্রচেষ্টার প্রশংসা করে বিশ্বের বিভিন্ন পত্রিকা।

ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনালের সুজান গ্রিন ঢাকা থেকে পাঠানো এক ডেসপাচে লিখেছিলেন, ‘সাম্যের প্রতীক ও সত্ লোকরূপে ব্যাপকভাবে গণ্য জিয়াউর রহমান স্ব্বনির্ভর সংস্কার কর্মসূচি শুরু করে বাংলাদেশের ভিক্ষার ঝুড়ি ভাঙার প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছেন।’ মালয়েশিয় দৈনিক ‘বিজনেস টাইমস’-এ প্রকাশিত ওই ডেসপাচে বলা হয়, ‘অতীতে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত করেছিল যে মহাপ্লাবী সমস্যাগুলো, প্রেসিডেন্ট জিয়া কার্যত সেগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ৪ নভেম্বর ১৯৭৯)

ওই সময় নিউইয়র্ক টাইমসের এক সংখ্যায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা, স্বনির্ভরতা অর্জন এবং উত্পাদন দ্বিগুণ করার ব্যাপারে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অক্লান্ত প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করা হয়। কাজের জন্য জনগণকে সংগঠিত ও অনুপ্রাণিত করতে প্রেসিডেন্ট জিয়া প্রায়ই গ্রামে-গঞ্জে সফর করেন।

‘জনগণের সঙ্গে সংযোগ রক্ষায় বাংলাদেশী নেতা’ শিরোনামে মাইকেল টি ক্যাফম্যানের এ রিপোর্টে গ্রামাঞ্চলে সপ্তাহে তিন-চারবার সফরের সময় জিয়াউর রহমানের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিবরণ দেয়া হয়। এ সময় বাংলাদেশের নিরাপত্তা কৌশল নিয়েও বিশ্ববাসী উচ্চ ধারণা পোষণ করে।

বাংলাদেশের নেতৃত্বের প্রতি বহির্বিশ্বের আস্থা সৃষ্টি হয়।   কমনওয়েলথ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান   বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সামনে এগিয়ে নিতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্ব নেতৃত্বকে বারবার তাগাদা দিতেন। ১৪ ফ্রেব্রুয়ারি ১৯৭৮ কমনওয়েলথ সম্মেলনের মূল অধিবেশনে তিনি বলেন, ‘বৃহত্তর সক্রিয় সহযোগিতার মাধ্যমে নতুন ও ন্যায়সংগত এক বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

এজন্য একক ও যৌথ স্বনির্ভরতা অর্জনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষমতা বাড়াতে হবে।’ এ লক্ষ্যে তিনি আঞ্চলিক দেশগুলোকে ৬ দফা উদ্যোগ গ্রহণের প্রস্তাব দেন।   নিরাপত্তার ক্ষেত্রে শহীদ জিয়ার আরেকটা অবদান হলো নাগরিক বাহিনী গঠনের চিন্তা বাস্তবায়ন করা। তিনি এক কোটি নারী ও পুরুষকে সাধারণ সামরিক প্রশিক্ষণ দানের লক্ষ্যে গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) গঠনের মাধ্যমে দেশগঠন ও নিরাপত্তায় ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দেন।

জিয়াউর রহমানের গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করার পদক্ষেপ ছিল বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। কৃষকদের স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়ন প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বিশেষ প্রচার পেয়েছিল। জিয়াউর রহমান আমলানির্ভর প্রকল্প না করে স্থানীয় নেতাদের দ্বারা কৃষককে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।

এতে কৃষকের মধ্যেও ব্যাপক উত্সাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়।   সবচেয়ে বড় বিষয় হলো রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রবর্তন করেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক প্লাটফর্মে থেকে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তিনি এদেশের মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবোধ জাগানোর প্রয়াস চালান। অনেকটা সফলও হন তিনি।

এ জাতীয়তাবাদী দর্শনই একটি জাতি ও দেশের রক্ষাকবচ।     জিয়া প্রবর্তিত উন্নয়নের রাজনীতির কতিপয় সাফল্য:   সকল দলের অঃশগ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান; জাতীয় সংসদের ক্ষমতা বৃদ্ধি; বিচার বিভাগ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়া; দেশে কৃষি বিপ্লব, গণশিক্ষা বিপ্লব ও শিল্প উৎপাদনে বিপ্লব; সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের লেক্ষ্য স্বেচ্ছাশ্রম ও সরকারী সহায়তায়র সমন্বয় ঘটিয়ে ১৪০০ খাল খনন ও পুনর্খনন।

গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রবর্তন করে অতি অল্প সময়ে ৪০ লক্ষ মানুষকে অক্ষরজ্ঞান দান; গ্রামাঞ্চলে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা প্রদান ও গ্রামোন্নয়ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী (ভিডিপি) গঠন; গ্রামাঞ্চলে চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি বন্ধ করা; হাজার হাজার মাইল রাস্তা-ঘাট নির্মাণ; ২৭৫০০ পল্লী চিকিৎসক নিয়োগ কের গ্রামীণ জনগণের চিকিৎসার সুযোগ বৃদ্ধিকরণ; নতুন নতুন শিল্প কলকারখানা স্থাপনের ভেতর দিয়ে অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত দূরীকরণ।

কলকারখানায় তিন শিফট চালু করে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি; কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও দেশকে খাদ্য রপ্তআনীর পর্যায়ে উন্নীতকরণ; যুব উন্নয়ন মন্ত্রাণালয় ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুব ও নারী সমাজকে সম্পৃক্তকরণ; ধর্ম মন্ত্রণালয় প্রতিষ্টা করে সকল মানুষের স্ব স্ব ধর্ম পালনের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধিকরণ; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সৃইষ্ট করে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধন; তৃণমূল পর্যায়ে গ্রামের জনগণকে স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করণ এবং সর্বনিম্ন পর্যায় থেকে দেশ গড়ার কাজে নেতৃত্ব সৃষ্টি করার লেক্ষ্য গ্রাম সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের আসনলাভ; তিন সদস্যবিশিষ্ট আল-কুদস কমিটিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি; দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে ‘সার্ক’ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ গ্রহণ; বেসরকারিখাত ও উদ্যোগকে উৎসাহিতকরণ; জনশক্তি রপ্তানি, তৈরী পোশাক, হিমায়িত খাদ্য, হস্তশিল্পসহ সকল অপ্রচলিত পণ্যোর রপ্তানীর দ্বার উন্মোচন; শিল্পখাতে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রের সম্প্রসারণ। যে গার্মেন্ট ও টেক্সটাইলের ওপর আমাদের অর্থনীতি আজ দাঁড়ানো, তার গোড়াপত্তন করেন জিয়া   জিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতার সময় সংক্ষিপ্ত—পাঁচ বছরের একটু বেশি।

এই স্বল্প সময়ে তিনি যুগান্তকারী সব কাজ করে গেছেন। তাঁর সঙ্গে আমি ভারতবর্ষের ইতিহাসের সেই পাঠান সম্রাট শেরশাহের অনেক মিল খুঁজে পাই। শেরশাহের শাসনভার ছিল এমনই সংক্ষিপ্ত। কিন্তু জনকল্যাণে, সাধারণ মানুষের মঙ্গলে তাঁর কীর্তিগুলো ছিল যেমন অভিনব, তেমনই অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী প্রভাবের, যা আজও তাঁর দূরদর্শিতার স্বাক্ষর বহন করে চলেছে। জিয়া জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিটি বিষয়ে একটি বড় রকমের ঝাঁকুনি দিয়ে গেছেন।

রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, নারী, শিশু—সবকিছুতেই একটা বিপ্লব ঘটিয়ে গেছেন। গোটা জাতিকে তিনি একাত্তরের মতো একতাবদ্ধ করতে পেরেছিলেন। একটি দৃঢ় জাতীয় সংহতি সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। পরিচয়-সংকটে আক্রান্ত হীনম্মন্যতায় ভোগা জাতিকে তার সত্যিকারের পরিচয় এবং তার আপন স্বাধীন স্বকীয়তার পরিচিতি তিনি উন্মোচন করতে পেরেছিলেন। সে পরিচিতি বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের সংমিশ্রণে হাজার বছরের যে রসায়ন, তারই আবিষ্কার তিনি ঘটিয়ে ছিলেন। নাম দিয়েছিলেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এই জাতীয়তাবাদের ওপরই প্রতিষ্ঠিত তাঁর মন, মনন ও চেতনা—তাঁর রাজনৈতিক দর্শন।

তাই তাঁর প্রিয় গান, যা তিনি আপন মনে গুন গুন করে গাইতেন, ‘আমার জীবন বাংলাদেশ আমার মরণ বাংলাদেশ।’   আন্তর্জাতিক সম্পর্ক   প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ম নেয়ার পর জিয়া বাংলাদেশের কূটনৈতিক নীতিমালায় বিশেষ পরিবর্তন আনেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বাংলাদেশের প্রতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরাশক্তির দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে বিশেষ একটি কূটনৈতিক অবস্থানের সৃষ্টি হয়, যার ফলে বাংলাদেশের সাথে প্রতিবেশী ভারত সহ সোভিয়েত ইউনিয়নের বন্ধুমনা অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক নৈকট্য গড়ে উঠেছিল।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আন্তর্জাতিক স্নায়ুযুদ্ধের তৎকালীন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির উল্লেখযোগ্য সংস্কার করেন যার দুটি মূল দিক ছিল সোভিয়েত ব্লক থেকে বাংলাদেশের সরে আসা ও মুসলিম বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক স্থাপন করা। জিয়াউর রহমান সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্যাতীত পূবের আরেক পরাশক্তি চীনের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনে উদ্যোগী হন। তাঁর পররাষ্ট্রনীতি সংস্কার প্রক্রিয়ার আওতায় আরও ছিল বাংলাদেশের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আরব বিশ্বের সাথে সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ, যে সম্পর্কে স্বাধীনতার পর থেকেই শৈতল্য বিরাজ করছিল।

মধ্যপ্রাচ্যের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সুবিধা ও উপকারিতা বাংলাদেশ আজও পুরোমাত্রায় উপভোগ করছে, কেননা বর্তমানে সৌদি আরব সহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যে বিপুল পরিমাণ বাংলাদেশী প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মস্থলে পরিণত হয়েছে তার রূপরেখা জিয়াই রচনা করে গিয়েছিলেন। এক্ষেত্রে সৌদি আরব সহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের সাথে স্থাপিত সম্পর্ক অনেকটা অর্থনৈতিক হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সাথে স্থাপিত সম্পর্কে সামরিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক ইস্যুগুলোও প্রাসঙ্গিক ছিল। বিশেষ করে চীনের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করার মাধ্যমে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর পূণর্গঠনের কাজ অনেকটা তরান্বিত করেছিলেন।

বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর অস্ত্রাগারের দিকে তাকালে সেই সত্যই প্রতিফলিত হয়। সামরিক পূণর্গঠনের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর সাথে উন্নত কূটনৈতিক সম্পর্কের কারণে জিয়া রাষ্ট্রীয় বিমান পরিবহন সংস্থা বিমানের আধুনিকীকরণও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

প্রাথমিক ভাবে এসব সংস্কার বৃহত্তর প্রতিবেশী ভারতের সাথে সামান্য দূরত্ব সৃষ্টির ইঙ্গিত বহন করলেও জিয়াউর রহমান যে আঞ্চলিক সহায়তাকে গুরুত্ব দিতেন সেই সত্যের প্রতিফলন ঘটে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহায়তা সংস্থা (সার্ক) গঠনে তাঁর উদ্যোগ ও অবদানের মধ্য দিয়ে। যেহেতু ভারত সে সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের অত্যন্ত বন্ধুভাবাপন্ন ছিল, স্নায়ুযুদ্ধের অপরপক্ষ অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশ কূটনৈতিক নৈকট্য ভারতের সাথে দূরত্ব সৃষ্টির একটি কারন হতে পারত। চীনের সাথে বাংলাদেশের তৎকালীন সদ্যস্থাপিত সুসম্পর্কও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন যে আঞ্চলিক প্রতিযোগীতার বদলে সহযোগীতা স্থাপিত হলে বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিতে দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবে যারা ফলে বাংলাদেশ সহ এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলো উপকৃত হবে। এই লক্ষ্যে তিনি সার্কের রূপরেখা রচনা করেন যা পরে ১৯৮৫ সালে বাস্তবে রূপ নেয় ও প্রতিষ্ঠিত হয় সার্ক।

প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পাওয়ার পর জিয়াউর রহমান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন। ল্যাংকাস্টার হাউসে কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের সম্মেলনে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জনগণের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবের জন্য তিনি ৫ দফা ফর্মুলা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১৯৭৭ সালের ১০ জুন লন্ডনে কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের সম্মেলনে জিয়াউর রহমান আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলের সংগ্রামী জনসাধারণকে বর্ণবাদী সংখ্যালঘু সরকারের কাছ থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্য অর্জনের সহায়তা করার জন্যে একটি সুুনির্দিষ্ট বাস্তব ও জরুরি কার্যক্রম গ্রহণের আহ্বান জানান।

প্রতিবেশী বার্মার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৭৭ সালের ২১ জুলাই রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চারদিনের সফরে সেদেশে যান। চারদিনের সফরে বাণিজ্য, সংস্কৃতি, সীমান্ত এবং সমুদ্রসীমাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তারা আলোচনা করেন। বিশেষ করে দু’দেশের মধ্যে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছেন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ২৬ জুলাই তিন দিনের সফরে সৌদি আরব যান।

বাদশা খালেদের সঙ্গে বৈঠক করে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে মুসলিম বিশ্বের উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করতে ঐক্যমত হন। ১৯৭৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মিসরীয় প্রেসিডেন্টের এক ভোজসভায় যোগ দেন। সেখানে তিনি অধিকৃত আরব ভূখণ্ড থেকে ইসরাইলি সৈন্য সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং ফিলিস্তিনি জনগণের নিজস্ব আবাসভূমি প্রতিষ্ঠাসহ তাদের সব অধিকারের স্বীকৃতি প্রদানই মধ্যপ্রাচ্যে সুষ্ঠু ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ বলে উল্লেখ করেন।

দেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখতে জিয়াউর রহমানের ভারত সফর   ১৯ ডিসেম্বর ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান ফারাক্কা চুক্তি স্বাক্ষরকালীন সমঝোতা ও সহযোগিতার মনোভাব অক্ষুণ্ন রাখার জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানান। ভারতে দু’দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় সফর উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সম্মানে ভারতীয় রাষ্ট্রপতি আয়োজিত ভোজসভায় তিনি এ আহ্বান জানান।

ওই ভোজসভায় ভারতের রাষ্ট্রপতি সঞ্জীব রেড্ডি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে উদ্দেশ করে বলেন, “Your position is already assure in the anneal of the history of your country as a brave freedom fighter who was the first declare the independence of Bangladesh.” (জিয়াউর রহমান একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা এবং সর্বপ্রথম বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দানকারী হিসেবে আপনার মর্যাদা এরই মধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত।) [Bangladesh in International Politics, by M. Shamsul Haq, 1993, P-96.]

এই সফরে ২০ ডিসেম্বর এক যুক্ত ইশতেহার ঘোষণা করা হয়। ইশতেহারে বাংলাদেশ-ভারত সমতা, সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার ভিত্তিতে উভয় দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন ও জোরদার করতে দৃঢ় সংকল্পের কথা উল্লেখ করা হয়।

তোষামোদবিমুখ জিয়াউর রহমান   প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছুটে গিয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা শুনতেন। তাদের কাছ থেকে সমাধানেরও পরামর্শ নিতেন। সরকার বা প্রেসিডেন্টের প্রশংসায় যারা ব্যস্ত থাকতেন, জিয়াউর রহমান তাদের পছন্দ করতেন না। এমনকি দেশের বিভিন্ন স্থানে মতবিনিময় কিংবা জনসভায় বক্তারা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে নিয়ে নানা রকম প্রশংসামূলক অভিধা দিয়ে তোষামোদ শুরু করলে তিনি তাদের বক্তৃতা বন্ধ করে দিতেন।

তোষামোদী নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে মাইক কেড়ে নেয়ার মতো দৃষ্টান্তও স্থাপন করেন জাতীয়তাবাদী রাজনীতির এই প্রাণপুরুষ। ১৯৭৮ সালের ৮ জানুয়ারি তিনি সন্দ্বীপ থানার ডাকবাংলোতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সেখানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জিয়াউর রহমানকে নানা অভিধায় ভূষিত করে শুভেচ্ছা বক্তব্য দিতে থাকলে তিনি থামিয়ে দেন। জিয়া বলেন, ‘অলংকরণ ও অভিধা দিয়ে জনগণের পেট ভরবে না।

তাই জনগণের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে হবে।’     প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদতবরণ   ১৯৮১ সালের ৩০শে মে গভীর রাতে সার্কিট হাউসে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের হাতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হন।   চট্রগ্রামে বিএনপির উপদলীয় কোন্দল নিরসনের লক্ষ্যে ২৯ মে সকালে পতেঙ্গা বিমান বিন্দরে পৌছলেন রাষ্ট্রপতি জিয়া ।

তার সফরসঙ্গী ছিলেন বি চৌধুরি, মহিবুল হাসান, নাজমুল হুদা, ড: আমিনা , নৌ বাহিনীর প্রধান এম এ খান প্রমুখ । চট্রগ্রাম সার্কিট হাউজে হাল্কা নাস্তা সেরে বারান্দায় আলোচনায় বসলেন বিএনপি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে । বেলা সাড়ে বারটার দিকে জুম্মা নামাজের বিরতি । সাদা পাঞ্জাবি -পায়জামা পরে চকবাজারের নন্দনপুরা মসজিদে নামাজ আদায় করেন জিয়া । নামাজ শেষে উপস্থিত মুসল্লীদের সাথে কুশল বিনিময় করে ফিরে আসলেন সার্কিট হাউজে ।

দলীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দুপুরের খাবার সেরে ঘন্টা দেড়েক বিশ্রাম নেন । বিকালে চবির ভিসি, অধ্যাপকবৃন্দ, আইনজীবি, সাংবাদিক প্রমুখ আগত অতিথীদের সাথে আড়াই ঘন্টা আলাপ করেন । তারপর স্থানীয় বিএনপির দুই উপদলের সাথে আলাদাভাবে রাত ৯ টা থেকে ১১ টা পর্যন্ত আলোচনা করেন ।

এর মধ্যে চট্রগ্রামের ডিসি ও পুলিশ কমিশনারের সাথে আইন শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন । রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত চিকিৎসক লে কর্নেল মাহতাবুল ইসলাম তার খাবার পরখ করে শেষ করলে রাত ১১টার একটু পরে জিয়াকে রাতের খাবার দেয়া হয় । ডিনার শেষে ঢাকায় তার স্ত্রী খালেদার সঙ্গে টেলিফোনে মিনিট পনেরো কথা বলেন জিয়া । জীবনের আলো নিভে যাবার ৫ঘন্টা আগে ঘরের আলো নিভিয়ে ঘুমুতে গেলেন জিয়া । নিশ্চিন্তে বিছানায় নিদ্রায় গেলেন তিনি । ওদিকে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করতে এগিয়ে আসছে ঘাতক দল । বাইরে তখন তুমুল ঝড় বৃষ্টি আর বিদ্যুতের ঝলকানি ।রাত আড়াইটার দিকে কালুরঘাটস্থ রেডিও ট্রানসমিটারের কাছে হাজির হল ঘাতক দল ।

ঘাতকদলের নেতৃত্ব দেয় লে. কর্নেল মতিউর রহমান । ঘাতকদল তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে আক্রমন পরিচালনার পরিকল্পনা নেয় । মতি থাকল দ্বিতীয় দলে যারা প্রথমদলকে পেছন থেকে সহায়তা দিবে । রাত সাড়ে তিনটার সামান্য কিছু পরে দল তিনটি প্রচন্ড বৃষ্টির মাঝে আস্তে আস্তে গাড়ি চালিয়ে এগুতে থাকে । ঘাতকদল বিনাবাঁধায় সার্কিট হাউজে ঢুকে পড়ে । ভীতি সঞ্চার করতে রকেট ল্যান্সার থেকে ফায়ার ও গ্রেনেড চার্জ করা হয় আর মেশিনগানের গুলি চালানো হয় ।

পাহারারত ৪৪ জন পুলিশের ১ জন নিহত, ১২ জন আহত ও বাকিরা আত্মগোপন করেন । রাষ্ট্রপতির গার্ড রেজিমেন্টের সৈন্যরা তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিল । যে দুজনের রাষ্ট্রপতির কক্ষের সামনে পাহারা দেবার কথা তাদের আগেই খতম করে দেয়া হয় । রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা কর্মকর্তা লে. কর্নেল আহসান ও ক্যাপ্টেন হাফিজ দু’তলায় রাষ্ট্রপতির শয়নকক্ষের পেছনের কক্ষে ঘুমাচ্ছিলেন । রকেটের আওয়াজে তারা জেগে উঠে । রাষ্ট্রপতিকে বাচাতে তারা তাদের অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ পাবার আগেই ঘাতকদের গুলিতে নিহত হন । ঘাতকদলটি ঐ সময় দুতলায় রাষ্ট্রপতির ৯ নম্বর কক্ষ খুজতে শুরু করে ।

ঘাতকদলের একজন ঐ কক্ষের দরজা ভেঙ্গে ফেলতেই ঘরে ড. আমিনাকে আবস্কার করেন । ফলে রাষ্ট্রপতির খোজে ওরা এদিক ওদিক ছুটাছুটি করতে থাকে । তারা ইতিমধ্যে বুঝতে পারে রাষ্ট্রপতি আছেন ৪ নম্বর রুমে । ঘাতকদলের একজন ঐ কক্ষের বারান্দার দিকে দরজা লাথি দিতে ভাঙ্গতে চেষ্টা করে ।   গোলাগুলি আর চিৎকার চেচামেচিতে উঠে বসলেন চকিতে জিয়া । কি ব্যাপার ? ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে বেরিয়ে এলেন দরজা খুলে , পরনে রাতে শয্যার পোষাক ।

গভীর আত্মপ্রত্যয় আর অগাধ আস্থা নিয়ে বেরিয়ে এলেন ।   কি চাও তোমরা? কাছে দন্ডায়মান লে. মোসলেহউদ্দিন রীতিমত ঘাবরে যান । সে জিয়াকে আশ্বস্ত করে-‘‘স্যার আপনি ঘাবরাবেন না । এখানে ভয়ের কিছু নেই ।’’   মোসলেহউদ্দিনের ঠোট থেকে জিয়ার প্রতি আশ্বাসবানী মিলিয়ে যাবার আগেই লে. কর্নেল মতিউর রহমান তার এসএমজি থেকে অতি কাছ থেকে ব্রাশ ফায়ার করেন জিয়ার শরীরের ডানদিক একেবারে ঝাঝরা করে ফেলে ।

দরজার কাছেই মুখ থুবরে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন জিয়া । এরপর মতি তার বন্দুকের নল দিয়ে জিয়ার প্রাণহীন দেহ উলটিয়ে নেয় । তারপর ক্ষিপ্তপ্রায় মতি জিয়ার মুখমন্ডল আর বুকের উপর তার এসএমজির ট্রিগার টিপে রেখে ম্যাগাজিন খালি করে তার খুনের নেশা মেটায় । আনুমানিক চার থেকে সাড়ে চারটায় জিয়ার মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে । জিয়াকে খুন করে ঘাতকদল ঝটপট সার্কিট হাউজ ছেড়ে চলে যায় ।

পরেরদিন দৈনিক বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, ‘সরকার গভীর দুঃখের সঙ্গে ঘোষণা করছে যে, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম ৩০ মে শনিবার ভোরে চট্টগ্রামে কিছু দুষ্কৃতিকারীর হাতে নিহত হয়েছেন। প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা রক্ষী ও অপর কয়েকজন সফরসঙ্গীও এই মর্মান্তিক ঘটনায় নিহত হন। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় নিহত ব্যক্তিদের প্রকৃত সংখ্যা ও পরিস্থিতি সম্পর্কে সামগ্রিক তথ্য জানা যায়নি।’ নির্মমভাবে হত্যা করার পর দুষ্কৃতিকারীরা জিয়াউর রহমানের মরদেহ সকাল সাড়ে ১০টায় চট্টগ্রাম শহর থেকে ১৭ মাইল দূরে রাঙ্গুনিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পাশে পাহাড়ের ঢালুতে কবর দেয়।

ওই কবরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ওই ঘটনায় নিহত কর্নেল আহসান ও ক্যাপ্টেন হাফিজের লাশও রাখা হয়। জিয়াউর রহমানের মৃতদেহ রাখা হয় ওই দুজন সেনা অফিসারের মাঝখানে। ১ জুন বেলা ১১টায় সেনাবাহিনীর তত্কালীন কর্মকর্তা আ স ম হান্নান শাহর নেতৃত্বে জিয়াউর রহমানের মৃতদেহ তোলা হয়। ওইদিন বিকাল পৌনে ৪টায় বিমান বাহিনীর একটি বিমানে চট্টগ্রাম থেকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃতদেহ ঢাকায় আনা হয়।

এ সময় দেশজুড়ে এক বেদনাঘন শোকার্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বিমানবন্দর থেকে জিয়াউর রহমানের কফিনটি একটি সামরিক যানে সেনানিবাসের শহীদ মঈনুল রোডের বাসভবনে আনা হয়।

সেনানিবাসের ১ নং গেট থেকে শহীদ মঈনুল রোডের বাসভবন পর্যন্ত রাস্তার দু্’পাশে বিমান বাহিনীর সদস্যরা শ্রদ্ধাবনতভাবে দাঁড়িয়ে সম্মান দেখান। আর গেটের বাইরে সমবেত হয় হাজার হাজার মানুষ। কফিনটি বাসভবনে আনার পর এখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। বেগম খালেদা জিয়া, দুই ছেলে তারেক রহমান এবং আরাফাত রহমান, আত্মীয়-পরিজন এবং অপেক্ষমাণ লোকজন কান্নায় ভেঙে পড়েন। বিকাল ৫টায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কফিন সংসদ ভবনে নেয়া হলে সেখানেও তার লাশ একনজর দেখার জন্য শোকার্ত মানুষের ঢল নামে। এ পরিপ্রেক্ষিতে জনসাধারণের দেখার সুবিধার জন্য এদিন (১ জুন) রাতে সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার করা হয়।

ফলে রাত ৯টা পর্যন্ত শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লাশ দেখার জন্য পুরনো জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে সমবেত হয় লাখ লাখ মানুষ। মানুষের ঢলে এয়ারপোর্ট রোড, ফার্মগেট, মহাখালী রেলগেট, বাংলামোটর এলাকা পর্যন্ত যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এসব এলাকা ও আশপাশের এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। রাতে মহিলা, গৃহিণী এমনকি শিশুরা পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের লাশ একনজর দেখার জন্য ভিড় জমায়।

পরদিন ২ জুন সকাল ১১টা পর্যন্ত কফিনটি তেজগাঁও সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে রাখা হলে একই অবস্থার সৃষ্টি হয়। সেখানে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অগণিত মানুষ শহীদ জিয়াকে শেষবারের মতো একনজর দেখেন। এদিন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার দাফন সম্পন্ন হয়। শাহাদতের পর জিয়াউর রহমানকে স্মরণ স্বাধীনতার ঘোষক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদতের পর জাতি শোকে মূহ্যমান হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ গড়ার এই কারিগরকে বিনম্র শ্রদ্ধা জানায় সারা জাতি। গণমাধ্যমে ফলাও করে তার শাহাদতের খবরের পাশাপাশি কর্মময় জীবন নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

একই সঙ্গে পত্রিকাগুলো মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের অসামান্য অবদান, স্বাধীনতার ঘোষণা, একটি নৈরাজ্যকর অবস্থা থেকে রাষ্ট্রের স্থিতিশীল অবস্থা ফিরিয়ে আনা, একদলীয় বাকশালের পরিবর্তে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে জিয়াউর রহমানের সাফল্য ইত্যাদি উল্লেখপূর্বক সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। ২ জুন দৈনিক আজাদ ‘একটি কফিনের পাশে বাংলাদেশ’ শিরোনামের খবর ৮ কলামজুড়ে প্রকাশ করে।

আর দৈনিক ইত্তেফাক এদিন ‘ঢাকায় প্রেসিডেন্ট জিয়ার মৃতদেহ : অগণিত মানুষের শ্রদ্ধাঞ্জলি’ এবং ‘রাঙ্গুনিয়া পাহাড়ের পাদদেশে জিয়ার লাশ চাপা দেওয়া হয়’ শিরোনামে দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর পরদিন অর্থাত্ ৩ জুন দৈনিক আজাদ প্রধান খবর হিসেবে ‘এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান’ : পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাষ্ট্রপতি জিয়ার লাশ দাফন’ শিরোনামে ৮ কলামে প্রকাশ করে।

এর পরদিন ৪ জুন বৃহস্পতিবার দৈনিক আজাদ ‘প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ইন্তেকালে জাতীয় সংসদে সর্বসম্মত শোকপ্রস্তাব গৃহীত : বিশ্ব এক বিপ্লবী সমাজ সংস্কারক হারাইল’ শিরোনামে প্রধান খবর হিসেবে ৮ কলামে প্রকাশ করে। আর এদিন দৈনিক ইত্তেফাক ‘সংসদে শোক প্রস্তাব গৃহীত : জিয়া ছিলেন গণতন্ত্রের বিশিষ্ট সাধক জাতীয়তাবাদী চিন্তার অগ্রনায়ক’ শিরোনামে প্রধান খবর হিসেবে প্রকাশ করে।

এসব প্রতিবেদনে বলা হয়, আধুনিক বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ স্থপতি মরহুম প্রেসিডেন্ট একজন নিঃস্বার্থ দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিমুক্ত সত্, নিষ্ঠাবান, পরিশ্রমী, ধর্মপ্রাণ, সদালাপী ছিলেন। মৃত্যুর পূর্বপর্যন্ত তিনি নিজের পরিবারের কথা চিন্তা না করে দেশ ও জনগণের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করেন। অনুরূপ আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত দুনিয়ায় বিরল।     বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একাংশের হাতে কেন প্রেসিডেন্ট জিয়া নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন? আজ এ প্রশ্নের জবাব অত্যন্ত জরুরি।

১৯৭৫ সালে সিপাহি-জনতার ষড়যন্ত্রবিনাশী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় অভিষিক্ত হওয়ার পর জিয়াউর রহমানের মনোজগতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। তার চিন্তার জগতে শুধু সেনাবাহিনী বা চাকরি নয়—দেশের রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতিসহ সবকিছু অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। চিন্তার জগতের এই প্রসারতার প্রতিফলন ঘটে তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে।   জিয়াউর রহমান নিহত হয়েছিলেন তারই প্রিয় সহকর্মী ও অনুগতদের হাতে। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না।

অতীতের ঘটনাবলির পর্যালোচনায় দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর প্রথমটি হচ্ছে ষড়যন্ত্র, অপরটি হচ্ছে সেনানায়ক থেকে তার জননায়কে উত্তরণ। ষড়যন্ত্র তত্ত্বটিকে বহুল আলোচিত মনে হলেও এটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাস্তবচিত্রের প্রতিফলন। এক্ষেত্রে কথাটিকে ষড়যন্ত্র না বলে একটি রাষ্ট্রের বিরাগভাজন হওয়াকেও উল্লেখ করা যেতে পারে। জিয়াউর রহমানের একটি বড় অন্যায় ছিল তিনি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে চেয়েছিলেন।

তিনি জানতেন, একটি রাষ্ট্র যদি তার ইচ্ছা অনুযায়ী পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে, তাহলে সে রাষ্ট্রটি সার্বভৌমত্বের মর্যাদা অর্জন করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেসব রাষ্ট্রনায়ক এই নীতি অনুসরণ করেছেন, তাদের অধিকাংশকেই নির্মম পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নাম ইন্দোনেশিয়ার ড. সুকর্ণ, শ্রীলঙ্কার বন্দরনায়েক, পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং ইরাকের সাদ্দাম হোসেন।

এরকম আরও অসংখ্য উদাহরণ আছে। এই একই অপরাধে সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছিলেন চিলির প্রেসিডেন্ট আলেন্দে এবং বর্তমানে হুমকির মুখে আছেন ভেনিজুয়েলার হুগো শ্যাভেজ।     জিয়াউর রহমান কি ভারত ও আমেরিকাবিদ্বেষী ছিলেন? বিষয়টিকে এত সরলীকরণ করা সম্ভব নয়। উভয় ক্ষেত্রে তিনি চেয়েছিলেন জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন না দিয়ে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নির্মাণ করতে।

আবার এটাও সত্যি, জিয়াউর রহমানের অনেক সিদ্ধান্তই প্রতিবেশী ভারতসহ অনেকের উষ্মার কারণ হয়েছিল। এই অঞ্চলে ভারত যেহেতু আঞ্চলিক প্রাধান্য বিস্তার করতে চায়, তাই তার আকাঙ্ক্ষা এ অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলো তাকে গুরু বলে মেনে নেবে। এর পাশাপাশি ভারত তার জাতীয় স্বার্থকেও অনেক বড় করে দেখে। এ কারণেই মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী এখন আর ভারতের মাথাব্যথার কারণ নয়। ভারত এখন মিয়ানমারের সেনাশাসকদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে অনেক বেশি তত্পর। জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীন পথচলার কারণে বাংলাদেশ জগত্সভায় মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

এর পর আসে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে তার অনুসৃত নীতির প্রসঙ্গ। প্রথমে যে বিষয়টি আলোচনা করা প্রয়োজন, তা হচ্ছে তার জননির্ভর রাজনীতি। সামরিক শাসন দীর্ঘায়িত না করে তিনি গণরাজনীতিকে উদ্ধার করেন ১৯৭৫-পূর্ব সময়ে পতিত পঙ্কিল আবর্ত থেকে। একই সঙ্গে তিনি নিজেও বেরিয়ে আসেন সেনা প্রভাব থেকে এবং রাজনীতিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন ব্যক্তির কাছে। জিয়াউর রহমানের আগে ব্যক্তি আসত রাজনীতির কাছে।

কিন্তু তিনি রাজনীতিকে নিয়ে যান ব্যক্তির কাছে। যেটা রাজনীতিবিদ ও সেনা কর্মকর্তাসহ অনেকের মনোকষ্টের কারণ হয়েছে। এ কারণেই তার খণ্ডিত উদ্ধৃতি ব্যবহার করে তাকে ভিলেন বানানোর চেষ্টা করেন ওইসব ব্যক্তি, যারা বিভিন্ন কলাকৌশলে জনগণের ওপর তাদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে চান। বাংলাদেশের সব রাজনীতিবিদের মধ্যে জিয়াউর রহমানই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি দেশের লাখো লাখো মানুষের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন, তাদের দুয়ারে গিয়েছেন, দিন ও রাতে তাদের সুখ-দুঃখের কাহিনী শুনেছেন এবং পরামর্শ দেয়ার চেষ্টা করেছেন।

জনরাজনীতির যে ধারার সূত্রপাত ঘটে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে, তাকে হত্যার মধ্য দিয়ে সেই ধারার অবসান ঘটে। জনগণের কাছে পৌঁছতে পেরে জিয়াউর রহমান অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত যেটা আর কেউ স্থাপন করতে পারেননি। এই জনরাজনীতির উন্মেষই জিয়াউর রহমানের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আমলা ও সেনাবাহিনীসহ সমাজের বিভিন্ন সুবিধাভোগী গোষ্ঠী, যারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তাদের কাছে জনরাজনীতির বিকাশ হুমকির মত। জিয়াউর রহমান মোহিনী ব্যক্তিত্ব দিয়ে জনগণের মনোজগতকে বদলে দিয়েছিলেন।

অবশ্য স্বাধীনতা যুদ্ধে তার ভূমিকা এক্ষেত্রে প্রভাবকের কাজ করেছে। বাংলাদেশের জনগণের কাছে জিয়াউর রহমানকে পরিচিত করাতে হয়নি। নিয়তির বরপুত্র অথবা কর্মের সফল পুরুষ যাই হোক না কেন, তা জিয়াউর রহমানকে যে আসনে বসিয়েছে তা অনেকেরই উষ্মার কারণ। তারা এখনও জিয়াউর রহমানকে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি মনে করেন এবং এ কারণে লাখ লাখ মানুষের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের পর সমাহিত এই মানুষটিকে নিয়ে মাথাব্যথার অন্ত নেই। তাই এখনও তার চরিত্র হননের প্রচেষ্টা একটি মহলে বিশেষভাবে সক্রিয়।   তত্কালীন আইনপ্রণেতাদের চোখে জিয়াউর রহমান।

জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের ৩ জুন নির্বাচনে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর তিন বছর পর ১৯৮১ সালের ৩ জুন তার ওপর সংসদে শোকপ্রস্তাব উত্থাপিত হয়। ওই বছরের ২ জুন প্রেসিডেন্ট জিয়ার নতুন সংসদ ভবন পরিদর্শন করার সময়সূচি ছিল।

আর ওই ২ জুনই তার লাশ এই নতুন সংসদ ভবনের সামনে আনা হয়। তার জানাজায় সেদিন লাখ লাখ মানুষ শরিক হয়। সংসদ ভবন সংলগ্ন ক্রিসেন্ট লেকের পাশেই তাকে দাফন করা হয়। ৩ জুন জাতীয় সংসদে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শোকপ্রস্তাবের ওপর তত্কালীন জাতীয় নেতারা বক্তৃতা করেন। তাদের মন্তব্যেই উঠে আসে কেমন মানুষ ছিলেন জিয়াউর রহমান। একজন রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন।

কেমন ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক, একজন মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিক হিসেবে। জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার চার দিনের মাথায় দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের সপ্তম অধিবেশনের অষ্টম বৈঠকে তত্কালীন স্পিকার মির্জা গোলাম হাফিজ শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করেন।

এই শোকপ্রস্তাব সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এর আগে সংসদের সরকারি ও বিরোধী দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মোট ১৩ জন সংসদ সদস্য জিয়াউর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বক্তব্য দেন। তারা জাতির সামনে তুলে ধরেন জিয়াউর রহমানের অমর কীর্তি। ১৯৮১ সালের ৩ জুন সকাল সাড়ে ১০টায় সংসদের বৈঠক শুরু হয়। কোরআন তেলাওয়াতের পর স্পিকার গোলাম হাফিজ শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করেন।

ওইদিন সব কার্যসূচি স্থগিত রেখে শোকপ্রস্তাবের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সরকারি, বিরোধী দল ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের যেসব সদস্য বক্তব্য দেন, তারা হলেন— সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা আছাদুজ্জামান খান, মুসলিম লীগ সংসদীয় দলের নেতা খান এ সবুর, জাসদ নেতা শাজাহান সিরাজ, আইডিএল নেতা মাওলানা আবদুর রহীম, ড. মো. ওসমান গনি, আতাউর রহমান খান, আওয়ামী লীগ (মিজান) নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরী, রফিকউল্লাহ চৌধুরী, ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, রাশেদ খান মেনন ও মোহাম্মদ তোয়াহা।

জিয়াউর রহমানকে নিয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টা সংসদে আলোচনা হয়। শোকপ্রস্তাবের ওপর আলোচনায় তত্কালীন গণতন্ত্রী পার্টির এমপি ও বর্তমানে আওয়ামী লীগের নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত (সিলেট-২) সংসদে বলেন, ৩০ মে থেকে ৩ জুন যে লাখ লাখ জনতা শুধু ঢাকা নগরীতেই নয়, গোটা বাংলাদেশে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করেছে, তার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, আমাদের সাবেক রাষ্ট্রপতি (জিয়াউর রহমান) বাংলাদেশের মানুষের কত কাছাকাছি এবং প্রাণপ্রিয় ছিলেন।

এটা বলতে যদি কেউ কুণ্ঠাবোধ করেন, এটা তার মানসিক দৈন্য এবং তার রাজনৈতিক বিচক্ষণতার অভাব বলে আমি মনে করি। এই যে লাখ লাখ জনতার স্রোত কেন এসেছিল এই লাশটির পাশে, কেন এসেছিল জানাজায় ও গায়েবি জানাজায়? এসেছিল একটি মাত্র কারণে— সাবেক রাষ্ট্রপতির সততার প্রতি অভিনন্দন ও শ্রদ্ধা জানাতে। ওই যে কোটি কোটি মানুষের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে আমরা গণতন্ত্রের কথা বলে এসেছিলাম এবং যে কথা বলে আমরা বিশ্ববিবেকের সমর্থন পেয়েছিলাম এবং তাকেই আমরা সংবিধানে গৃহীত করেছি।

বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দলীয় সংসদ সদস্য এ এস এম রাশেদ খান মেনন (বাকেরগঞ্জ-৯) বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আমার পরিচয়। তাকে সেভাবেই আমি দেখেছি, তাকে সেভাবেই আমি সম্মান করেছি। তার সঙ্গে তার যে কীর্তি, সেই কীর্তি অমর এবং অক্ষুণ্ন থাকুক—এটা কামনা করি।   জিয়াউর রহমানের আরেকটি বড় অবদান আধুনিক বাংলাদেশ নির্মাণের পথ চলার সূত্রপাত।

জিয়াউর রহমান তার সব কর্মকাণ্ড দিয়ে বাংলাদেশকে একটি আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিলেন, যার অসংখ্য উদাহরণ এখনও টিকে আছে। এই আধুনিকীকরণের প্রয়াসও জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হতে অন্ধকারের শক্তিকে উত্সাহিত করেছিল। জিয়াউর রহমান বেঁচে আছেন তার কর্মের মাধ্যমে। যদিও সেসব কর্মের বহু প্রতীককে মুছে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু সে উদ্যোগ জনসমর্থন লাভ করেনি। ঘোষণা দিয়ে অথবা পরিপত্র জারি করে জনমন থেকে তাদের প্রিয় নেতার নাম মুছে ফেলা যায় না।   জিয়াউর রহমানকে ঢাকার শেরে বাংলা নগরে এরপর তাকে রাজধানী ঢাকায় জাতীয় সংসদের উত্তর পাশে চন্দ্রিমা উদ্যানে দাফন করা হয়।

২০০২ সালের ডিসেম্বরে চন্দ্রিমা উদ্যানে শহীদ জিয়ার সমাধিস্থল ঘিরে মাজার কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয় । প্রেসিডেন্ট জিয়ার জানাজায় বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জনসমাগম ঘটে যেখানে প্রায় ২০ লক্ষ্যাধিক মানুষ সমবেত হয়।   রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বাংলাদেশের জনগণের মাঝে অভূতপূর্ব শোকের ছায়া নেমে আসে। গণমানুষের এ শোক জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও নীতির প্রতি দেশবাসীর ব্যাপক সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।

বেগম খালেদা জিয়া   প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদত জনতাকে বেদনাবিধুর করে তোলে। এই শাহাদত রাষ্ট্রযন্ত্রকে এক রকম বিকল করে দেয়। এই শাহাদত গণসংগঠন বিএনপিকে স্থবির করে তোলে। প্রাথমিকভাবে জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়াকে তার উত্তরাধিকারী ভাবা হলেও শোকবিহ্বল খালেদা জিয়াকে দিয়ে তা সম্ভব ছিল না। উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে প্রথমত রাষ্ট্র এবং পরবর্তীকালে দলের কাণ্ডারি নির্ধারণ করা হয়। ৩০ মে ’৮১ প্রেসিডেন্ট জিয়া শাহাদতবরণ করলে বিচারপতি আবদুস সাত্তার বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান।   কৃত্রিম বিশৃংখলা, দুর্নীতির ডামাডোল এবং সন্ত্রাসের মহড়া দিয়ে অবশেষে সেনাবাহিনী প্রধান এইচএম এরশাদ সেনা অভ্যুত্থান ঘটান। মাত্র তিন মাস আগে নির্বাচিত একটি সরকারকে সরিয়ে রাতের আঁধারে এইচএম এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন। জাতি ষড়যন্ত্রের গভীর নিগড়ে নিপতিত হয়।

অবশেষে বিশ্বাসঘাতকরা এরশাদীয় মন্ত্রিসভায় যোগ দেন, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির ধারক ও বাহকরা সুবিধাবাদী অবস্থান গ্রহণ করেন এবং কতিপয় ত্যাগী নিঃস্বার্থ নেতাকর্মী তোপের মুখে পড়েও বিএনপির রাজনীতিকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। বিচারপতি আবদুস সাত্তারের নেতৃত্ব বিএনপিকে ক্রমেই পিছিয়ে দেয়। বিএনপিকে ষড়যন্ত্র এবং নিষ্ক্রিয়তা থেকে রক্ষার জন্য সাধারণ মানুষের সুপ্ত ইচ্ছা, কর্মীদের দাবি এবং কিছু শীর্ষ নেতার উদ্যোগের ফলে বেগম খালেদা জিয়া অবশেষে বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণে সম্মত হন। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণ করে একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ৮ জানুয়ারি ’৮২ বেগম খালেদা জিয়া সংবাদপত্রে দীর্ঘ বিবৃতি দিয়ে রাজনীতিতে পা রাখেন।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেনেন্ট জেনারেল এরশাদ বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করলে বেগম খালেদা জিয়া এর বিরোধিতা করেন। এরপর ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে খালেদা জিয়া বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। ১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল দলের বর্ধিত সভায় তিনি প্রথম বক্তৃতা দেন। এরপর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮৪ সালের ১০ মে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় পার্টির চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন খালেদা জিয়া। এরপর থেকেই মূলত বিএনপির পূর্ণ বিকাশ ঘটে। ১৯৮৩ সালের খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সাত দলীয় ঐক্যজোট গঠিত হয়। এই সময় এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। বেগম জিয়া প্রথমে বিএনপিকে নিয়ে ১৯৮৩ এর সেপ্টেম্বর থেকে ৭ দলীয় ঐক্যজোটের মাধ্যমে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। একই সময় তার নেতৃত্বে সাত দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন পনের দলের সাথে যৌথভাবে আন্দোলনের কর্মসূচী শুরু করে। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ দফা আন্দোলন চলতে থাকে।

কিন্তু ১৯৮৬ সালের ২১ মার্চ রাতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিধান্ত নিলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে বাঁধার সৃষ্টি হয়। ১৫ দল ভেঙ্গে ৮ দল ও ৫ দল হয়। ৮ দল নির্বাচনে যায়। এরপর বেগম জিয়ার নেতৃত্বে ৭ দল, পাঁচ দলীয় ঐক্যজোট আন্দোলন চালায় এবং নির্বাচন প্রত্যাখান করে। স্বৈরশাসকের অধীনে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করার মধ্য দিয়ে বেগম জিয়া তার আপোষহীনতার বৈশিষ্ট্য প্রমাণ করেন।

১৯৮৭ সাল থেকে খালেদা জিয়া “এরশাদ হটাও” নামে এক দফার আন্দোলন শুরু করেন। এর ফলে এরশাদ সংসদ ভেঙ্গে দেন। পুনরায় শুরু হয় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। দীর্ঘ আট বছর একটানা নিরলস ও আপোসহীন সংগ্রামের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন বেগম খালেদা জিয়া।

দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, গণতন্ত্রের জন্য আপোষহীন বেগম জিয়াকে দেশের মানুষ ভালোবেসে দেশনেত্রী উপাধি দেন। তিনবার প্রধানমন্ত্রী হওয়া বেগম জিয়া সর্বপ্রথম ১৯৯১ সালের ১৯ মার্চ পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারে প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। আওয়ামী লীগ সহ সব বিরোধী দল এই নির্বাচন বয়কট করলে ঐ সংসদ ১৫ দিন স্থায়ী হয়। খালেদা জিয়া এই সংসদেরও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

এরপর ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চারদলীয় ঐক্যজোট বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। এবং বেগম খালেদা জিয়া তৃতীয়বেরের মত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। নানা ঘাত-প্রতিঘাতে সর্বাধিক সময় দেশ পরিচালনাকারী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তার সংগ্রামী জীবনে মোট চার বার গ্রেফতার হন।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর প্রথম, ১৯৮৪সালের ৩ মে দ্বিতীয়, ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর তৃতীয় এবং সর্বশেষ ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ১/১১ -র জরুরি অবস্থার সময় বেগম জিয়া গ্রেফতার হন। সরকারে থাকা অবস্থায় খালেদা জিয়া নারী শিক্ষা, দারিদ্র বিমোচন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্কোন্নয়নে দৃঢ় ভূমিকা পালন করেন। সেই সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন সার্কের চেয়ারপারসন হিসেবে।

বেগম জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈত্রিক নিবাস ফেনী জেলার ফুলগাজীতে। পিতা-মাতার পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ১৯৬০ সালের আগস্টে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বেগম জিয়া আরাফাত রহমান কোকো ও তারেক রহমানের জননী। তার দুই ছেলের মধ্যে বড় তারেক রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ১ম ভাইস-চেয়ারম্যান।

তার কনিষ্ঠ ছেলে আরাফাত রহমান কোকো ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি মালায়া হাসপাতালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান।আরাফাত রহমান একজন ব্যবসায়ী ছাড়াও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও সিটি ক্লাবের সাথে যুক্ত ছিলেন। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিকশিত নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বর্তমান সময়েও এগিয়ে চলেছেন জনগনের অধিকারের আন্দলন নিয়ে। আজ তার একটাই দাবি তত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে আগামি নির্বাচন।

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ক্ষনজন্মা রাষ্ট্রনায়ক। নানা কারণে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ে স্থান করে নিয়েছেন। তার সততা, নিষ্ঠা, গভীর দেশপ্রেম,পরিশ্রমপ্রিয়তা, নেতৃত্বের দৃঢ়তা প্রভৃতি গুণাবলি এ দেশের গণমানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করেছিল। তিনি ছিলেন একজন পেশাদার সৈনিক। তা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের কাছে তার যে গ্রহণযোগ্যতা ছিল অন্য কোনো রাষ্ট্রনায়কের ভাগ্যে তা জোটেনি। মাত্র ছয় বছর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন জিয়াউর রহমান।

কিন্তু সাধারণ মানুষ তার ওপর ছিল প্রচণ্ড আস্থাশীল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তার ওপর মানুষের এই আস্থায় কোনো চিড় ধরেনি।   একজন জিয়াউর রহমান যদি বার বার এদেশে ফিরে আসতো!!!!!!! আজকের বাংলাদেশের যে টুকু অর্জন সেতো এই মহান নেতার দূরদর্শী নেতৃত্বের হাত ধরে। তলা বিহীন ঝুড়ি থেকে সবুজ বিপ্লবের বাংলাদেশ। স্বপ্নদ্রষ্টা তো একজনই যার নাম জিয়া। মা বাবার আদরের কমল।

সেদিন জিয়া মরেনি..মরে গিয়েছিল একটি বাংলাদেশ। এই ক্রান্তিকালে জিয়ার মত নেতার বড্ড বেশী প্রয়োজন। আধুনিক বাংলাদেশ গড়তে, লোভের উর্ধে উঠা এক রাষ্ট্রনায়ক-যাকে বলি বাংলার রাখা রাজা। অহংকার না থাকা একজন জিয়াই দেখিয়েছেন কিভাবে মাটির মানুষ হওয়া যায়, কিভাবে সর্বস্ব দিয়ে দেশকে ভালোবাসা যায়।মাটির সাথে, মানুষের সাথে সম্পর্ক থাকলে জিয়ার মতো সাফারী পড়েই মাটিতে বসে পরা যায়।

জাতির বর্তমান দুর্বিসহ ক্রান্তিকালে মেজর জিয়ার মতো একজন কালজয়ী বহুদলীয় গণতন্ত্রের কান্ডারীর নিরন্তর প্রয়োজন। জিয়াউর রহমানের কর্ম ও আদর্শকে ধারণ করে আছে তার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। তার মৃত্যুদিনে আনুষ্ঠানিকতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তার রাজনীতির অনুসরণ। বিএনপির বর্তমান তরুণ শক্তিকে জানতে ও উপলব্ধি করতে হবে, কেন জিয়াউর রহমান এদেশের কোটি মানুষের হৃদয়ে আসন গেড়েছেন।

এই উপলব্ধিই বিএনপিকে শক্তি অর্জনে সাহায্য করবে।   মাত্র তিনি বছর রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকে তিনি দেশের কৃষি, শিক্ষা, শিল্পসহ সকল ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ দুর্ভিক্ষের রাষ্ট্র থেকে খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জন করে। শিল্প ক্ষেত্রে তিনিই প্রথম বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পের গোড়াপত্তন করেন। বৈদেশিক যোগাযোগ ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তিনি দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে সার্ক গঠন করেছিলেন। দেশ ও জাতি গঠনে জিয়াউর রহমানের এসব অবদানের কারণেই তিনি জাতির মধ্যে চিরকাল বেঁচে থাকবেন। মিশে থাকবেন এ জাতির সমগ্র অস্তিত্বের সঙ্গে।

আজ দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে। দেশবিরোধী নানা চুক্তি ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বর্তমান সরকার জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে চলেছে। দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি নিয়ে হাহাকার চারদিকে। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। দেশজুড়ে চলছে গণহত্যা. গুম, গুপ্তহত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, নিপীড়ন ও নির্যাতনের মহোৎসব। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত করে নির্লজ্জ দলীয়করণের মাধ্যমে নিপীড়িত জনমানুষের আইনি প্রতিকার পাওয়ার পথও রুদ্ধ। প্রশাসন আজ্ঞাবহ হওয়ার কারণেই স্থবির হয়ে পড়েছে।   দেশে বর্তমানে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

এই অবস্থায় আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না। জনগণের অধিকার আদায়ে তাদের দুঃখ-কষ্ট লাঘবে এবং দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য বিএনপি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের এখন মূল লক্ষ্যই হচ্ছে গায়ের জোরে বাতিল করা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।   জিয়াউর রহমান আজ বেঁচে নেই, কিন্তু আছে তার রেখে যাওয়া ১৯ দফা কর্মসূচি, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের দর্শন, তার সততা, দেশপ্রেম, জনগণের ভালোবাসা, তার প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি।

আরও আছে তার যোগ্য উত্তরসূরি ও তার সহধর্মিণী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপার্সন, জনগণের আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই আগামী দিনে দেশপ্রেমিক জিয়ার সব আদর্শ, ভাবনা, চিন্তা ও উদ্দেশ্যের বাস্তবায়ন হবে। বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে একটি আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে যা শহীদ জিয়ার স্বপ্ন ছিল।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close