ফিচার

ব্রিটেন বনাম বাংলাদেশের পুলিশ: ঘুষি ও ঘুষ সমাচার

এক. দিন তারিখ স্মরণ নেই। যতদূর মনে পড়ে ২০০৩ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ। ব্রিটেনে তখন সপ্তাহব্যাপী খ্রিস্টমাসের উৎসব চলছে। অফিস অদালত, দোকানপাট বন্ধ। রাত ১১টা। পূর্ব লন্ডনের ইলফোর্ড টাউন সেন্টারের একটি বাস স্টপে দাঁড়িয়ে আছি। পাশেই একটি পাব (মদ বার)। সেখান থেকে গান ও মিউজিকের শব্দ ভেসে আসছে। বাসের জন্য অপেক্ষা করছি।

কিন্তু ততক্ষণে গন্তব্যমুখী রুটে যে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে তা জানতাম না। প্রায় ঘন্টা খানেক বাসের অপেক্ষায় আছি। এমন সময় আচমকা দূর্ঘটনার মুখোমুখী হলাম। পার্শ্ববর্তী ঐ পাব থেকে একদল উশংংখল যুবক বেরিয়ে এসে আমার পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলো। কিছু শ্বেতাঙ্গ, পাকিস্তানী ও কৃষ্ণাঙ্গ যুবক। ওদের একজন আকস্মিক আমার মুখে একটি ঘুষি মেরে বসলো। কিছু বুঝে উঠার আগেই অন্যজন আরো একটি। আমি তখন কিংকর্তব্যবিমুঢ়। দৌঁড় দিতেই ফিরে দেখি পুলিশের গাড়ি সাক্ষাৎ দন্ডায়মান। একজন পুলিশ বেরিয়ে এসে গাড়ির দরজা খুলে আমাকে ভেতরে ঢুকালেন।

এদিকে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে হামলাকারী যুবকেরা দিলো দৌঁড়। পুলিশও ছুটলো পিছু পিছু। খানিক দৌঁড়ে দুজনকে আটক করে ফেললো। এরই মধ্যে পুলিশের অভিযানে যোগ দিলো আরো দুটো গাড়ি। আমাকে একটি গাড়িতে তোলা হলো। হামলাকারী দুই যুবককে তোলা হলো অন্যটিতে । ঘুষির আঘাতে আমার নাক দিয়ে রক্ত ঝরছে।

পুলিশকে বললাম, কোড ইউ প্লীজ টেইক মি টু দ্যা হসপিটাল। পুলিশ বলল, নো ওয়ারি। উই হ্যাভ অলরেডি কলড এম্বুল্যান্স। তাঁদের গাড়িতে করে ইলফোর্ড পুলিশ স্টেশনে পৌঁছে দেখলাম আমাদের আগেই সেখানে এম্বুল্যান্স ও প্যারামেডিক টিম পৌঁছে অপেক্ষা করছে। পুলিশ আমার ঠিকানা আর মোবাইল নাম্বার রেখে এম্বুলেন্সে তুলে দিলো। আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো নিকটবর্তী হাসপাতালে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে রেডব্রিজে আমার ঘরে পৌঁছে দেয়া হলো।

জীবনে এই প্রথম এ ধরনের দূর্ঘটনার মুখোমুখি হলাম। তাছাড়া লন্ডন এসেছি মাত্র মাস দেড়েক আগে। পরিবার ও বন্ধুবান্ধব ছাড়া একাকী একটি বাসায় থাকি। শুধু মনে হচ্ছিলো কেন এ ঘটনার শিকার হলাম।

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙ্গলো পুলিশের ফোন পেয়ে। পুলিশ প্রথমে আমার শারীরিক অবস্থা জানতে চাইলো। বললো, আমি কেমন। চিকিৎসা হয়েছে কি? বললাম ভালো। এবার পুলিশ আমাকে ইলফোর্ড থানায় গিয়ে ঘটনার বিবরণ বা স্টেটমেন্ট দিতে বললো। বললাম, মানসিক অবস্থা ভালো নেই। বাইরে বেরুতে মন চাচ্ছে না।

পুলিশ বললো, তুমি চাইলে আমরা তোমার ঘরে আসতে পারি। বললাম, আজ না এলে ভালো হয়। বরং কাল বিকেল ৫টায় আমি পুলিশ স্টেশনে এসে স্টেটমেন্ট দিয়ে যাবো।

পরদিন ঠিক সময়মতো পুলিশ স্টেশনে পৌঁছলাম। রিসেপশনে গিয়ে নাম বলার কিছুক্ষণের মধ্যে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন একজন ইন্সপেক্টর। সম্বোধন করলেন এভাবে- হ্যাই মাহমুদ, হাউ আর ইউ? হোয়াট এবাউট ইউ? এরপর ভেতরে নিয়ে গেলেন। চা, পানি ও কফি অফার করলেন। বললাম এক গ্লাস পানি খাবো। তিনি নিজে উঠে গিয়ে পানি নিয়ে এলেন।

এরপর একটি নোটবুক ও রেকর্ডার নিয়ে এসে আমার সম্মুখে বসলেন। একটি ছোট টেবিলের ওপাশে পুলিশ অফিসার, এ পাশে আমি। আমার কাছে তিনি ঐ দিনের ঘটনার বিস্তারিত জানতে চাইলেন। আমি বিস্তারিত বর্ণনা দিলাম। তিনি সবকিছু নোট করলেন। ঘটনাসংক্রান্ত বেশ কিছু প্রশ্নও জানতে চাইলেন।

বিশেষকরে হামলাকারী যুবকদের আনুমানিক বয়স, উচ্চতা, গায়ের রঙ, চুলের ধরন ইত্যাদি জানতে চেয়ে মূলত আটক দুই যুবক আসলেই ঘটনার সাথে জড়িত কি-না তা নিশ্চিত হতে চাইলেন। দীর্ঘ ইন্টারভিউ শেষে তিনি আমাকে বিদায় দিলেন। শুধু বললেন, ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে দু’জনকে আটক করা হয়েছে।

ওরা এখন জামিনে আছে। তাদেরকে আদালতে হাজির করা হবে। বিচারের ব্যাপারে আমাকে পরে জানানো হবে। আমি চলে এলাম। পুলিশের চমৎকার ব্যবহারে মন বেশ ফুরফুরে হয়ে উঠলো। নিশ্চত হলাম, হামলকারীদের সাজা হবে, ন্যায় বিচার পাবো।

এরপর পেরিয়ে গেলো অনেক দিন। আর কোনও খবর নেই। দীর্ঘ অপেক্ষার পর একদিন মামলার ব্যাপারে জানতে চেয়ে পুলিশকে একটি চিঠি লিখলাম। চিঠি পোস্টিংয়ের পরের সপ্তাহেই উত্তর এলো। চিঠিতে আমাকে ধৈর্য্য ধরার অনুরোধ জানিয়ে বলা হয়েছে, বিষয়টি এখনও আদালতে বিচারাধীন। সময়মতো আমার সাথে যোগাযোগ করা হবে। এ নিয়ে আমার চিন্তার কোন কারণ নেই। এরপর কেটে গেলো আরো কতদিন। ঘটনাটি ভুলেই যাচ্ছিলাম।

হঠাৎ একদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে লেটার বক্সে একটি খাম পেলাম। হাতে নিয়ে দেখলাম মেট্রোপলিটন পুলিশ থেকে প্রেরিত চিঠি। বেশ কৌতুহল নিয়ে খুললাম। দেখলাম ভেতরে একটি চিঠি ও ১০০ পাউন্ডের একটি চেক। চিঠিতে বলা হয়েছে, আদালতে আমার অনুপস্থিতিতেই এ ঘটনার বিচার সম্পন্ন হয়েছে। আমাকে সাক্ষি দিতে ডাকা হয়নি, কারণ ওরা ঘটনার দায় স্বীকার করে নিয়েছিলো। ঘটনার সময় ওরা মাতাল ছিলো, বুঝতে পারেনি কী করেছে। আদালত তাদেরকে ১৫৫ পাউন্ড জরিমানা ও তিন দিনের কারাদণ্ড দিয়েছেন।

এর মধ্যে ৫৫ পাউন্ড আদালতের খরচ আর ঘুষির ক্ষতিপুরণ ১০০ পাউন্ড। এই হলো ব্রিটেনে রাস্তায় বাসের জন্য অপেক্ষমান কোন এক ব্যক্তিকে ঘুষি মারার বিচার। এবার সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে প্রতিপক্ষের হামলায় আমার এক স্বজনের মাথা ফাটার পর থানায় মামলা করার বিচিত্র অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে চাই।

দুই.

মাস ছয়েক আগের কথা। একদিন দুপুরে গ্রামের বাড়ি থেকে আকস্মিক একটি কল এলো। জানতে পারলাম আমার এক স্বজন প্রতিপক্ষের হামলায় আহত হয়েছেন। মাথায় টর্চ লাইটার দিয়ে আঘাত করে রক্তাক্ত করা হয়েছে। আমি তাঁকে দ্রুত ওসমানী হাসপাতাল নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলাম। থানায় মামলা করতেও বললাম। কয়েকজন আহত স্বজনকে নিয়ে হাসপাতালে গেলেন।

অন্যরা এলেন থানায় মামলা করতে। ওসি সাহেবের সাথে দেখা করলে তিনি বললেন, মামলাটি ড্রাফট করে নিয়ে আসতে হবে। ওনারা স্থানীয় একজন উকিলের কাছে গেলেন। উকিল সাহেব সবকিছু শুনে বললেন, ড্রাফট লিখতে ৫ হাজার টাকা লাগবে। অনেক দর-কষাকষির পর শেষতক তাঁকে ৩ হাজার টাকায় রাজি করা হলো। তিনি বাদী পক্ষের কাছ থেকে ঘটনার বর্ণনা শোনলেন।

এরপর মনের মাধুরী মিশিয়ে একখানী এজহার রচনা করলেন। এবার হাতেলেখা এজহারটি কম্পিউটার দোকানে নিয়ে গিয়ে কম্পোজ করানো হলো। এরপর নিয়ে যাওয়া হলো থানায়।

ওসি সাহেব একনজর চোখ বুলিয়ে জানতে চাইলেন এজহারটি কে লিখেছে। উকিল সাহেবের নাম জানালে তিনি বললেন, এই এজহার দিয়ে মামলা হবে না। বক্তব্য পরিবর্তন করতে হবে। তিনি নিজেই উকিল সাহেবের মোবাইলে কল দিলেন। বললেন, আপনি এজহারে লিখেছেন মাথায় লাঠি দ্বারা আঘাত করা হয়েছে।

এভাবে লিখলে তো কোন আসামী ধরাই যাবে না। আপনি বরং লাঠির স্থলে লিখে দেন ধারালো দা দিয়ে উপর্যূপুরি কুপিয়ে মারাত“ক আহত করা হয়, রোগীর অবস্থা আশংকাজনক। উকিল সাহেব বললেন, আসল ঘটনা তো বাদীর মাথায় মেগা-লাইটার দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। আমি নিজ দায়িত্বে লাইটারকে লাঠি বানিয়ে দিয়েছি।

কিন্তু এবার লাঠিকে ধারালো দা বানালে মামলা কি আদালতে টিকবে? জবাবে ওসি সাহেব বললেন, আদালত পরের ব্যাপার। আগে আসামী ধরার ব্যবস্থা হোক। আপনি বরং লাঠির স্থলে দা লিখে দিন। উকিল সাহেব বললেন, আপনি যাই বলেন আমার আপত্তি নেই। তবে মামলা আদালতে টিকলেই হলো।

এবার বাদী পক্ষ মোটরসাইকেল যোগে ফের উকিল সাহেবের বাড়ি গেলেন। উকিল সাহেব কলমের খোঁচায় এবার লাঠিকে দা বানিয়ে দিলেন। কিন্তু ততক্ষণে বাজারে কম্পিউটার দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। কী আর করা। অগত্যা আরো ৩ মাইল ড্রাইভ করে দোকানমালিককে বাড়ি থেকে নিয়ে আসতে হলো। লাঠির স্থলে দা টাইপ করে নতুন এজহার প্রিন্ট করা হলো। কম্পিউটার দোকান থেকে ফের যাওয়া হলো থানায়। ওসি সাহেবের কাছে এহজার দেয়া হলো। মামলা রুজু হবে।

কিন্তু এবার তিনি শোনালেন অন্য কথা। বললেন, মামলা কি আর এমনিতেই হয়ে যাবে? খরচ লাগবে না? বাদী পক্ষ জানতে চাইলেন কত দিতে হবে। ওসি সাহেব বললেন, আপাতত ২০ হাজার টাকা দিলেই চলবে। এতো বেশি কেন- জানতে চাইলে তিনি বললেন, একটা মামলায় অনেক খরচ আছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা নেবে, কনস্টেবলদের দিতে হবে, দিতে হবে উপরওয়ালাদের। আরো অনেকেরই ভাগ আছে। অবশেষে অনেক অনুরোধ করে ১৫ হাজার টাকা দেয়ার পর মামলা রুজু করা হলো।

তখন গভীর রাত। আসামী ধরতে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু পুলিশের গাড়ি নেই। সাব ইন্সপেক্টর বললেন, গাড়ীর ব্যবস্থা করতে হবে। গভীর রাতেও বাদী পক্ষকে একটি গাড়ির ব্যবস্থা করতে হলো। এবার একজন সাব ইন্সপেক্টর আর ৪জন কনস্টেবল বের হলেন আসামীর বাড়ি অভিমুখে। রাতে আসামীদেরকে তাদের বাড়িতে পাওয়া গেলো না। পুলিশ আসামীর পরিবারের লোকজনকে শাসালেন, গালিগালাজ করলেন। ঘটনাস্থল থেকে মামলার বাদীকে ফোন করে গালিগালাজ ও শাসানোর হৈ-হল্লা শোনালেন। এরপর ফিরে এলেন থানায়।

বাদীকে বললেন, মামলাটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় রুজু হয়েছে। ধারাগুলোও ঠিকমতো বসেছে। আসামীকে ধরতে পারলেই কোর্টে চালান দেবো, সহজে আর জামিন পাবে না। যখনই চাইবেন, অভিযান চালাবো। এখন আর বেশি লাগবে না, যাতায়াত খরচ বাবদ প্রতি অভিযানে ৪ হাজার করে দিলেই চলবে।

এদিকে মামলা হওয়ার পরদিন এলাকার চেয়ারম্যান ও মেম্বারসহ মুরব্বীরা জমায়েত হলেন ঘটনাটি সালিশ করে দিতে। এক লক্ষ টাকা আমানত রেখে বিচার। বিচারে নিম্পত্তি হলো। এবার মামলা তুলে নিতে হবে। বাদীপক্ষ কাগজে স্বাক্ষর দিলেন মামলা তুলে নেয়ার পক্ষে।

বিবাদী পক্ষ থানায় গিয়ে বললেন, এলাকার চেয়ারম্যান ঘটনাটি শেষ করে দিয়েছেন, আমরা মামলাটি তুলে নিতে চাই। সব শোনে ওসি সাহেব বললেন, বেশ তো ভালোই, শুধু শুধু মামলা মোকদ্দমা করে অর্থ অপচয় করবেন কেন? তবে মামলা তুলে নিতে হলেও কিছু খরচ লাগবে। জানতে চাইলেন, কত।

ওসি সাহেব বললেন, বেশি লাগবে না। আপনারা তো আর মামলা করবেন না, তুলবেন। ৫ হাজার টাকা দিলেই চলবে। অবশেষে ৪ হাজার টাকা দিয়েই মামলা তুলে নিতে হলো।

এই হলো বাংলাদেশে একটি মামলার বিবরণ। বৃটেনে আহত হওয়ার পর পুলিশ এম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে পাঠায়। নিজেদের তাগিদে ভিকটিমের এজহার নেয়। চা, কফি অফার করে। কোন কিছু না জানিয়েই তদন্ত করে। আদালতে চার্জশীট দেয়। বিচারকার্য হয়। দোষীদের জেল জরিমানা হয়। আহত ব্যক্তিকে ১শ পাউন্ড ক্ষতিপুরণও দেয়া হয়।

কিন্তু বাংলাদেশে মাথা ফাটানোর পরও ৩ হাজার টাকা দিয়ে নিজেকে এজহার লিখাতে হয়। থানাকে মামলা রেকর্ড করার জন্য এককালিন ১৫ হাজার টাকা দিতে হয়। এরপর প্রতিটি অভিযানের জন্য বরাদ্দ রাখতে হয় ৪ হাজার টাকা করে। আবার আপোষ-নিম্পত্তি হওয়ার পর মামলাটি তুলে নিতে দিতে হয় আরো ৪ হাজার টাকা। এই হলো বাংলাদেশের পুলিশি সেবার নমুনা, এই হলো আইনী সেবার চিত্র।

লেখক: তাইছির মাহমুদ, সম্পাদক, সাপ্তাহিক দেশ।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close