অন্য পত্রিকা থেকে

প্রবাসীদেরকে ইনসাল্ট করার দায়ভার কেন নেবে বাংলানিউজ?

মাঈনুল ইসলাম নাসিম: পাঠকনন্দিত বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কমের ‘দায়িত্ববোধ’ নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশ কমিউনিটিতে। লিডিং এই পোর্টালটির কন্ট্রিবিউটিং এডিটর মাহমুদ হাফিজ কর্তৃক লিখিত মুটে থেকে মিলিয়নেয়ার বা কুলি থেকে কোটিপতি শিরোনামে ২৮ আগস্ট ২০১৫ প্রকাশিত চরম বিতর্কিত আর্টিকেলের প্রেক্ষিতে আজ ক্ষুব্ধ ফ্রান্স সহ বিভিন্ন দেশের প্রবাসী বাংলাদেশীরা।

জনকন্ঠ খ্যাত একসময়ের সুপরিচিত সাংবাদিক মাহমুদ হাফিজ ব্যক্তিগত সফরে ঢাকা থেকে প্যারিসে ঘুরতে এসে স্বপ্রণোদিত হয়ে মুখোমুখি হন ইউরোপের জনপ্রিয় কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব, অল ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ এসোসিয়েশন আয়েবা’র মহাসচিব কাজী এনায়েত উল্লাহর। আলাপচারিতায় তাঁর কাছ থেকে জীবনের গল্প শুনে বুঝে হোক না বুঝে হোক তথা ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক ‘চটকদার’ শিরোনাম করার খেসারতে একদিকে যেমন বিভিন্ন দেশের প্রবাসীদেরকে বেহুদা ‘হেয়’ করা হয়েছে, তেমনি বাংলানিউজের দায়বদ্ধতাকেও প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ফ্রান্স-বাংলাদেশ ইকোনমিক চেম্বারের প্রেসিডেন্ট এবং ঢাকা-প্যারিস ভিত্তিক বাংলাদেশ বিজনেস কনসালটিংয়ের ডিরেক্টর জেনারেল কাজী এনায়েত উল্লাহ উচ্চশিক্ষার জন্য ৩৭ বছর আগে তথা ১৯৭৮ সালে প্যারিসে আসার পর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে অন্য সবার মতো প্রথম কয়েক বছর ‘পার্টটাইম জব’ করেন এবং ১৯৭৮-৮৫ ঐ সময় তিনি বেশ ভালো অংকের অর্থ সঞ্চয় করতে সক্ষম হন। সরোবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্নের পর সঞ্চয়কৃত অর্থ আশির দশকেই রিয়েল এস্টেট ও রেস্টেুরেন্ট সহ বিভিন্ন ব্যবসায় কাজে লাগান মেধাবী বাংলাদেশী কাজী এনায়েত।

কঠোর পরিশ্রম আর মেধা-যোগ্যতা ধ্যান-জ্ঞান-সাধনা-অধ্যবসায়েরর গুণে মূলতঃ আশির দশক থেকেই তিনি ‘স্বীকৃত কোটিপতি’ হলেও ২০-২৫ বছর পর অনেকটা হঠাৎ করেই ‘কুলি থেকে কোটিপতি’ এমন চটি শিরোনাম ব্যবহার করে অগণিত পাঠক-ভিউয়ার্সদের সস্তা দৃষ্টি আকর্ষণের অপচেষ্টা চালানো হয়েছে বাংলানিউজের ঐ বিশেষ আর্টিকেলে। নেক্কারজনক এই ঘটনায় তাই ক্ষুব্ধ-ব্যথিত-মর্মাহত-লজ্জিত ইউরোপের বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশীরা। মাহমুদ হাফিজ এবং বাংলানিউজ কারো কাছেই এমন হতাশাজনক ‘কন্ট্রিবিউশন’ আশা করেননি রেমিটেন্সের উৎস প্রবাসী বাংলাদেশীরা।

ইউরোপে গত ২০ বছরের প্রবাস জীবনে এখানকার ৩০টি দেশের শতাধিক সিটিতে নিয়মিত যাতায়াতের সুবাদে বিভিন্ন দেশের কম করে হলেও ৪০ জন প্রবাসী বাংলাদেশী মিলিয়নেয়ারের সাথে চেনাজানার সুযোগ হয়েছে আমার, যাঁদের কেউই পেশায় ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-প্রফেসর-আর্কিটেক্ট-ব্যারিস্টার নন। রোম-লন্ডনে এমন বেশ কয়েকজন স্বনামধন্য ‘সেলিব্রেটি’ বাংলাদেশী কোটিপতি রয়েছেন যাঁরা হয়তো একসময় মাংসের দোকানে কসাইয়ের কাজ করে কিংবা মাছের দোকানে মাছ কাটার পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে মাছ ইমপোর্ট করে বহু বছর আগেই মিলিয়নেয়ার এমনকি মাল্টিমিলিয়নেয়ারও হয়েছেন।

একসময় ‘অডজব’ করে তাঁদের কেউ কেউ আজ যেমন সিআইপি হয়েছেন, তেমনি ব্যাংকের মালিকানাও নিয়েছেন যাঁর যাঁর যোগ্যতায়। নিজ নিজ দেশে তাঁরা সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন বাংলাদেশ স্টাইলে ‘কালো টাকা’ কামিয়ে নয়। ফ্রান্সের সুপ্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশী কাজী এনায়েত উল্লাহও তিন যুগ আগে ছাত্রাবস্থায় প্যারিসে ট্রান্সপোর্ট প্রতিষ্ঠান বা লোডিং-আনলোডিং কোম্পানিতে পার্টটাইম কাজ করার সুবাদে ২০১৫ সালে এসে আজ চটি পত্রিকার মতো ‘কুলি থেকে কোটিপতি’ এমন চটকদার শিরোনামের শিকার হয়েছেন। অনিচ্ছা সত্বেও তাই অপ্রীতিকর এই মন্তব্য প্রতিবেদনের অবতারণা।

রাইট-আপ বা অর্টিকেল পাবলিককে ধরাতে বা ‘ক্যাচি’ করতে ‘চটুল’ তথা সস্তা হেডলাইন ব্যবহার করতে হবে কেন ? যদি এর বিকল্প না থাকে, তবে ইউরোপে বসবাসরত বাংলাদেশী কোটিপতিদের ওপর লিখতে গেলে সবার ক্ষেত্রেই শিরোনাম করতে হবে হবে ‘কসাই থেকে কোটিপতি’ বা ‘বুচার থেকে বিলিয়নেয়ার’ নয়তো ‘মাছ কাটতে কাটতে কোটিপতি’ বা ‘মাছ ব্যবসায়ী থেকে বিলিয়নেয়ার’ সহ আরো কতকি ! বাংলানিউজ যেহেতু চটি পত্রিকা নয় এবং বিশ্বব্যাপী লাখো পাঠককুলের ভালোবাসায় সিক্ত, তাই অনেকেরই প্রশ্ন ‘প্রবাসীদেরকে ইনসাল্ট করার দায়ভার কেন নেবে বাংলানিউজ’ ?

‘কুলি থেকে কোটিপতি’ শিরোনামে যদি ব্রেকিং নিউজও করা হয়, সেক্ষেত্রেও এই ধরণের ‘নেগেটিভ এপ্রোচ’ থেকে দূর প্রবাসে কারো উৎসাহিত বা অনুপ্রাণিত হবার মিনিমাম সুযোগ নেই। কারণ নবাগত প্রবাসীদেরকে ‘কুলি’ বা ‘কসাই’র কাজে আমরা কেন অনুপ্রাণিত বা উৎসাহিত করবো ? ইউরোপের প্রতিটি দেশের প্রতিটি শহরেই যেখানে সরকারীভাবে ‘স্কিল্ড জব’ ট্রেনিং নেয়ার সুযোগ রয়েছে, সেখানে যথাযথ প্রশিক্ষন নেয়া সাপেক্ষে ‘অডজব’ না করে ভালো কাজ পেতে পারেন যে কেউ। শুধু ইউরো-পাউন্ডের পেছনে না ছুটে ‘স্কিল্ড জব’ ট্রেনিং আমরা নিচ্ছি কি নিচ্ছি না, সেটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে এবং উৎসাহব্যঞ্জক লেখালেখিও হতে পারে এক্ষেত্রে।

বিভিন্ন দেশের প্রবাসীদের অভিমত, স্টিভ জবস বা বিল গেটস জীবদ্দশায় কোন্ পাহাড়ের মাটি কেটেছেন বা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর কেন ম্যাট্রিক পরীক্ষার পয়সা জোগাড় করতে পারেননি, এসব মুখরোচক গল্পাবলী সারা বিশ্বের ১ কোটি প্রবাসী বাংলাদেশীদের চ্যাপ্টারে ‘বাইফোর্স’ চাপিয়ে জগাখিচুড়ি পাকাবার সুযোগ নেই। প্রেক্ষাপটও শতভাগ ভিন্ন। ‘চা বিক্রেতা থেকে প্রধানমন্ত্রী’ এটা নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে লিখাই যায় কারণ তিনি এই সেদিন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। কাজী এনায়েত উল্লাহ বা ইউরোপের স্বীকৃত বাংলাদেশী কোটিপতিরা এই সেদিন বনে যাওয়া ‘নব্য-কোটিপতি’ নন কেউই।

৬টি মহাদেশের ১০০টির বেশি দেশের প্রবাসী বাংলাদেশীদের সাথে আমার ইন্টিমেট নেটওয়ার্ক। আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়াতে আমার কাছের লোকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক খ্যাতিমান বাংলাদেশী প্রফেসর-সায়েন্টিস্ট-ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-প্রযুক্তিবিদ রয়েছেন যাঁরা অনেকেই ছাত্রাবস্থায় রেস্টুরেন্টে গ্লাস-প্লেট ধৌতকরণের কাজ করেছেন। তাই বলে তাঁদের উপর যখন লিখবো তখন রাইটআপকে ‘ক্যাচি’ করতে চটুল হেডলাইন খুঁজতে হবে ? এর নামই কি সচেতন সাংবাদিকতা বা দায়িত্বশীল লেখনী ? একজন সচেতন প্রবাসী এবং ফ্রিল্যান্স লেখক-সাংবাদিক-অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে এ ধরণের যে কোন কুরুচিপূর্ন অভিরুচির তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানাই বিবেকের দায়বদ্ধতা থেকে।

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close