ফিচার

গুম নাগরিক নিরাপত্তার হুমকি ও রাষ্ট্রের দায়

গেল রোববার বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে গেল গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে ‘ইন্টারন্যাশনাল ডে অব দ্য ভিকটিমস অব এনফোর্সড ডিজঅ্যাপেয়ারেন্স’ বা আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। দিবসটি বেশ মনোযোগ সহকারেই পর্যবেক্ষণ করছিলাম।

সকাল থেকে নজর রাখিছিলাম- এইদিনে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক, স্বেচ্ছাসেবী মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে কে কি কর্মসূচি পালন করে, এ নিয়ে কে কী বলেন, আর ভিকটিমদের পরিবারের সদস্যরাই বা কিভাবে দিবসটি অতিবাহিত করেন সেদিকে। এক্ষেত্রে আমাদের রাষ্ট্র ও সরকারের লোকজনই বা কী ধরেনর ভুমিকা পালন করে। বলা যায়, এভাবেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়েই আমার সারাদিন কেটেছে।

অবশ্য একটি মানবাধিকার সংগঠনের আয়োজনে জাতীয় প্রেসক্লাবে একটি অনুষ্ঠানে আমার যোগ দেয়ার কথা ছিল। বেশ কয়েকদিন আগেই নিমন্ত্রণ পেয়ে প্রস্তুতিও নিয়েছিলাম। কিন্তু আগের রাতেই গণমাধ্যমের খবরে জানতে পারি প্রেসক্লাব কর্তৃপক্ষ বুকিং বরাদ্দ বাতিল করায় অনুষ্ঠানটি স্থগিত করেছে আয়োজক সংগঠন।

সারাদিন যেমন তেমন বিকাল থেকে মনটা আমার মনটা খুব খারাপ। টেলিভিশনের পর্দায় গুমের শিকার ভিকটিম পরিবারের সদস্য নারী-শিশুদের স্বজন হারানোর বেদনায় হৃদবিদারক কান্না দেখে নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি।এই কষ্ট যে তাদের জন্য কতটা বেদনাদায়ক তা একমাত্র ভিকটিম পরিবারের সদস্যরাই বুঝতে পারেন। তবে কিছুটা

অনুভব করতে পেরেছিলাম বছর দুয়েক আগে একটি মানবাধিকার সংগঠনের এনফোর্সড ডিজঅ্যাপেয়ারেন্স প্রোগামে কিছুদিন কাজ করার সুবাদে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি গুমের ঘটনার তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে রীতিমত বিস্মিত হয়ে যাই রাষ্ট্রের নির্মমতা দেখে।

আজও স্মরণে আছে রাজশাহী কলেজের এক ছাত্র গুমের নিষ্ঠুর ঘটনার কথা।অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানতে পারি, কিভাবে সরকারের একটি বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা গভীর রাতে জাগ্রত করে অস্ত্র হাতে দিয়ে স্বজনদের সামনে থেকে তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে পরবর্তীতে তা অস্বীকার করেছিল।

অবশ্য দীর্ঘ প্রায় বছর দেড়েক পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল দেশের অন্য একটি এলাকায়। থাক এসব কথা, ভিকটিম ও তার পরিববারের নিরাপত্তাজনিত কারণেই এ নিয়ে বেশি কিছু বলার সুযোগ নেই।

ফলে ৩০ আগস্ট দিবসটি মনোযোগ দিয়েই পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করছিলাম জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে আমাদের রাষ্ট্র কী ধরনের ভুমিকা পালন করে। ঠিকই লক্ষ্য করলাম, অন্যান্য আন্তর্জাতিক দিবসে আমাদের রাষ্ট্রের হর্তাকর্তরা গণমাধ্যমে বাণী প্রদান, নানা কর্মসূচী গ্রহণ করলেও রোববার আন্তর্জাতিক গুম দিবসে এমনটি চোখে পড়েনি। আমি যদি দেখতে ভুল না করে থাকি তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো ছাড়া আর কোনো মহল এ নিয়ে কোনো কর্মসূচি পালন করেছে কিংবা পালন করার সাহস করেছে বলে আমার জানা নেই।

এমন কি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকেও তেমন কোনো কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায়নি। রাষ্ট্রীয়ভাবে তো দিবসটি পালন করা হয়নি বরং একটি মানবাধিকার গঠনের কর্মসূচি পালনে পরোক্ষভাবে বিঘ্ন সৃষ্টির অভিযোগও উঠেছে।

জানিনা, এটা কতটা সত্য, তবে এই দিবস পালনে সরকারের অনীহা সংশ্লিষ্টদের ধারণার পেছনে যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে। এর চেয়েও বেশি বিস্মতি হয়েছি আমাদের বিজ্ঞ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মুখ থেকে গুমের সংজ্ঞা আর এদেশে গুম বলে কিছু নেই কথাটি শোনে।

গুম বাংলাদেশে একটি বহুল আলোচিত অপরাধ হলেও গুম দিবসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের দাবি- গুম হওয়ার পেছনে সরকারের কোন হাত নেই। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একটি গণমাধ্যমকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, গুমের ঘটনার সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনী জড়িত নয়। কোন গুম আমাদের এখানে হয় না, তারা আত্মগোপন করে।

এর স্বপক্ষে যুক্তি তুলে কিছুকাল আগে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ নিখোঁজ হবার পর তাকে ভারতে পাওয়া যাবার ঘটনার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘আর্থিক, সামাজিক বা রাজনৈতিক কারণে অনেকে আত্মগোপন করে, আর লোকে মনে করে যে সে গুম হয়ে গেছে। এধরনের কথিত ‘গুমের ঘটনার’ বেশিরভাগ লোককেই পরে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা ফিরে এসেছেন। মুক্তিপণ আদায়ের জন্য অনেক সময় আটকের ঘটনা ঘটে।

সন্ত্রাসীরা এসব কর্মকান্ড করে। এগুলো কি গুম নাকি? তবে পুলিশ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এদের উদ্ধার করেছে, সত্য উদ্ঘাটন করেছে।’

গুমের শিকার অনেকের পরিবার থেকে সরকারি বাহিনীর পরিচয় ও তাদের গাড়ি ব্যবহার করেও এসব ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে যে অভিযোগ করা হয়, সে ব্যাপারে মন্ত্রী মি. কামাল বলেন, ‘সরকারি বাহিনী যাদের এ্যারেস্ট করে তাদের সময়মতই আদালতে তোলা হয়। আমি জোর গলায় বলতে পারি মানবাধিকার সংস্থাগুলো যেসব কথা বলছে তা তারা অনেকসময় না জেনেই বলছে। গুম শব্দটা এক্ষেত্রে ‘এপ্রোপ্রিয়েট’ বা যথাযথ নয়’।

ফলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জাতিসংঘ কর্তৃক গুমের সংজ্ঞার আলোকে আমার যে ধারণা ছিল, সে ধারণাকে একেবারে পাল্টে দিলেন আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অথচ জাতিসংঘের কমিটি অন এনফোর্ডস ডিজ-অ্যাপিয়ারেনসেস এবং দ্য ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনফোর্সড অর ইনভলান্টারি ডিজ-অ্যাপেয়ারেনসেস অনুযায়ী- An enforced disappearance is defined by three cumulative elements: (1) Deprivation of liberty against the will of the person; (2) Involvement of government officials, at least by acquiescence; (3) Refusal to acknowledge the deprivation of liberty or concealment of the fate or whereabouts of the disappeared person.

অর্থাৎ কোনধরনের আভাস ইঙ্গিত ছাড়াই হঠাৎ করেই সরকারি বাহিনী বা প্রশাসনের লোক পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া কিংবা অন্য যেকোনোভাবে এসব ঘটনায় জড়িত থাকে সরকারি লোকজন। পরবর্তীতে ভিকটিমদের অবস্থান বা পরিণতি সম্পর্কে তাদের পরিবারের লোকজন কিছুই জানতে পারে না। অনেকে জীবিত অবস্থায় হয়তো ফিরে আসে কিন্তু তারা

পরবর্তীর্তে কোন কথাবার্তা কিছুই বলে না। কি হয়েছিল, কোথায় গিয়েছিল, কারা এবং কেন তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, এর কোন কিছুই প্রকাশ করতে চায় না। আজকাল বাংলাদেশের এই ধরনের গুমের ঘটনা বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশের একটি মানবাধিকার সংগঠনের দেয়া

তথ্য মতে, চলতি বছর বাংলাদেশে অন্তত ৩৬ টি এবং গত আট বছরে ৩৩০ টি গুমের ঘটনা ঘটেছে। জাতিসংঘের দেয়া তথ্য মতে, গেল দুই বছরে সারা বিশ্বে মোট ২৪৬টি গুমের ঘটনা নিয়ে তারা কাজ করেছে। ফলে বাংলাদেশে এ পরিস্থিতি খুবই ধরেই নিলাম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা শতভাগ সত্য- বাংলাদেশে গুম বলে কিছুই নেই, এক্ষেত্রে সরকারি আইন শৃঙ্খলাবাহিনীও খুবই স্বচ্ছ, তারা এসব কর্মকান্ডের সাথে জড়িত নেই।

তবে আমাদের প্রশ্ন হলো- গেল কয়েক বছরে ৩৬৬ জন লোক কোথায় হারিয়ে গেল, কারা নিয়ে গেল? অন্তত: এই তথ্যটুকু জানার অধিকার তো স্বজনদের রয়েছে। আর এ ব্যাপারে অনুসন্ধান করার দায়িত্বতো রাষ্ট্রেরই।

কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র সর্বদা এসব ঘটনা অস্বীকার করে আসছে। এরই অংশ হিসেবে রোববার আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গণমাধ্যমে যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে ভিকটিম পরিবারের সদস্যদের যেমনটি চরম হতাশ করেছে, তেমনি এসব ঘটনার সাথে জড়িতদের পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। এতে আগামী দিনে গুমের ঘটনা না কমে বরং বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

এতে সাধারণ নাগরিক জীবনেও এক ধরনের চরম উদ্বেগের সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু এমনটি আমাদের চোখে পড়েনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শোনে আমার যা মনে হয়েছে তাতে, গুম আর অপহরণকে তিনি একাকার করে এ বিষয়ে অনেকটাই নিজের দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা করেছেন। পরোক্ষভাবে এসব ঘটনায় জড়িত আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের এক ধরনের দায়মুক্তির পক্ষে তিনি সাফাই গেয়েছেন।যা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় আইনের শাসনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

অথচ আমরা আশা করেছিলাম এই দিনে স্বজন হারানো ভিকটিম পরিবারের সদস্যদের রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কিছুটা হলেও শান্তনা দেয়া হবে। আজকের একবিংশ শতাব্দী জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির উৎকর্ষতার দিক থেকে অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ। তাই এই সময়কে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে উন্নত সভ্যতার যুগ বলে ধরা হয়। আমরা জানি, পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে সবল কর্তৃক দুর্বলের উপর নানাভাবে অত্যাচার-নির্যাতন হয়ে আসছে।

দার্শনিক থমাস হবস ও জ্যাঁ জ্যাক রুশোর মতে, তাই মানুষ একটি সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে প্রকৃতির রাজ্য (Natural State) ছেড়ে সিভিল রাষ্ট্রে পদার্পণ করে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সবলের নির্যাতন থেকে দুর্বলের রক্ষা। কিন্তু সেই নির্যাতন কী থেমেছে? না, থামেনি। বরং নাগরিকের বহুল কাঙ্খিত সিভিল রাষ্ট্রই এখন নির্যাতকের ভুমিকায়।

একবিংশ শতাব্দীর এই সভ্য যুগে রাষ্ট্র কর্তৃক নাগরিকদের নির্যাতনের যতগুলো কৌশল রয়েছে এর মধ্যে গুম, গুপ্তহত্যা, ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার ও হেফাজতে নির্যাতন কিংবা নির্যাতনে নাগরিকের মৃত্যু অন্যতম। তবে এরমধ্যে সবচেয়ে নির্মম ও নিষ্ঠুরতম হলো এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স। কেননা, গুমের আগ মুহূর্তেও একজন ভিকটিম জানে না তার শেষ পরিণতি কি? তেমনি পরিবারের সদস্যরাও জানেনা।

ফলে একটি ভিকটিম পরিবারকে স্বজন হারানোর এই বেদনা যুগের পর যুগ বহন করতে হয়। আর এর ফলে অনেক পরিবার ধবংসের মুখে পতিত হয়। আমরা জানি, এক সময় নাৎসি জার্মানি, মধ্য ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে স্বৈরশাসকরা গুম ও গুপ্তহত্যার হোতা হিসেবে আবির্ভূত হতেন। তারা তাদের শাসনক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতেই মূলত: নাগরিকদের সাথে এ ধরনের নিষ্ঠুরতম আচরণ করতো। ওই স্বৈরশাসকদের বিদায় হয়েছে অনেক আগেই, কিন্তু আজও আমরা তাদের কর্মের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই।

যা একবিংশ শতাব্দীর সভ্যতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। গুমের মত একটি অপরাধ কোনো সুস্থ সমাজ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাম্য হতে পারে না। জাতিসংঘ ২০০২ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত কাজ করে গুমবিরোধী যে আন্তর্জাতিক সনদ রচনা করেছে (ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর প্রটেকশন অব অল পারসন্স অ্যাগেইনেস্ট এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স) তাতে ইতোমধ্যেই ৪৩টি দেশ সনদটি গ্রহণ করে এবং ৯৩টি দেশ অনুস্বাক্ষর করে। তা সত্ত্বেও গুম হতে সবার সুরক্ষা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক এই সনদটি বাংলাদেশ গ্রহণ করেনি।

এমনকি অনুস্বাক্ষর না করায় এই দেশ এখন গুমের চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলছে, আইনকানুন-প্রশাসন এখন আর জবাবদিহীতার মধ্যে না থাকায় গুমের শিকার মানুষজনের পরিবারবর্গ আজ ন্যায়বিচার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছে।

দিবসটি উপলক্ষে জাতিসংঘের কমিটি অন এনফোর্ডস ডিজ-অ্যাপিয়ারেনসেস এবং দ্য ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনফোর্সড অর ইনভলান্টারি ডিজ-অ্যাপেয়ারেনসেস এর বিবৃতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গুম হওয়া ব্যক্তিদের জরুরি ভিত্তিতে খুঁজে বের করার আহ্বান জানায় জাতিসংঘ। বিবৃতিতে বলা হয়, গুম আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন, ২০০২ (রোম স্ট্যাটিউট) এর অধীনেও অপরাধ। কোনো দেশে যদি এই রোম স্ট্যাটিউটের অধীন অপরাধের বিচার না হয়, তাহলে রোমে অবস্থিত

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তার বিচারের ব্যবস্থা করতে পারবেন। এছাড়া গুম হওয়া ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে খসড়া চুক্তি করাসহ পদ্ধতিগতভাবে সব রকম ব্যবস্থা নিতে সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

বলা যায়- জাতিসংঘের এসব দাবিকে বাংলাদেশ সরকার বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। ফলে দিনদিন এই বর্বরোচিত কর্মকাণ্ডের চর্চা এখানে বেড়েই চলেছে। শত শত ভিকটিম এ রকম ঘটনার শিকাল হলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দেয়া এ সংখ্যাটা সামান্যই। বাকি ঘটনাগুলোর কথা প্রতিশোধ ও নিরাপত্তার ভীতির কারণেই কখনো রিপোর্ট হয় না।

এতে ভিকটিম পরিবারের সদস্যরা থানায় জিডি করতে চাইলেও জিডি নেয়া হয় না, মামলা করতে গেলে মামলা নেয়া হয় না। প্রতিবাদে কোনো কর্মসূচি পালন করতে গেলে তাতেও বাধা দেয়া হচ্ছে। এ নিয়ে বেশি উচ্চবাচ্য করলে পুনরায় পরিবারের অন্য সদস্যকেও গুমের হুমকি দেয়া হচ্ছে।

এ নিয়ে প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে দফায় দফায় যোগাযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছে না তারা। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষ্য মতে খুব স্বল্প সংখ্যক লোক ফিরে এসেছে, কিছু লোকের লাশ পাওয়া গেছে, অন্য কিছু লোককে নতুন করে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

তাদের দাবি, যারা ফিরে এসেছেন, তারা যে বিভীষিকাপূর্ণ বর্ণনা দিয়েছেন তা নিরাপত্তার জন্যই প্রকাশ করা যায় না।

ফলে আমাদের রাষ্ট্র সরকার এ বিষয়ে যাই বলুক না কেন, আজ রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক চর্চা ও আইনের শাসনের অভাবেই এ সব ঘটনা ঘটছে। অন্যথা কেউ এসব ঘটনা ঘটিয়ে পার পেত না। রাষ্ট্রে যখন আইনের শাসন সুনিশ্চিত হয়, তখন একদিকে যেমন অপরাধ প্রবণতা কমে আসে, অন্যদিকে আইনবহির্ভূত গুম ও হত্যাকাণ্ডের প্রয়োজন হয় না।

রাষ্ট্রে আজ নাগরিকরা নিরাপত্তাহীন। বর্তমানে ঘরের বাইরে বের হওয়া বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। ফলে এসব গুমকে যেভাবেই সংজ্ঞায়িত করা হোক না কেন, রাষ্ট্র এর দায় এড়াতে পারে না। আর সরকার ও আইন শৃংখলা বাহিনী যেভাবেই এসব এসব ঘটনাকে এড়ানোর চেষ্টা করুক না কেন- যেভাবে একের পর এক মানুষ গুম হচ্ছে কোনো সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজের পরিচয় হতে পারে না।

ফলে বর্তমানে এসব ঘটনায় প্রতীয়মান হয় যে, বর্তমানে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি কতটা নাজুক। এখানে মানুষের জানমালের স্বাভাবিক নিরাপত্তা ক্রমেই সংকোচিত হচ্ছে।

সবশেষে বলবো, এই একবিংশ শতাব্দীতে শুধু আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে কিছু উন্নতিকেই কোনো দেশের সার্বিক উন্নতি হিসেবে ধরা হয় না। সার্বিক উন্নতির জন্য মানবাধিকার সূচক অন্যতম ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। তাই সরকারের প্রতি আহবান জানবো-অবিলম্বে গুমের মতো একটি নিষ্ঠুরতম অপরাধ বন্ধে জাতিসংঘের সনদটি অনুস্বাক্ষর করা এবং ইতোমধ্যে সংঘটিত ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য।

অন্যথা বিচারহীনতা আর দায়মুক্তির এই সংস্কৃতি জাতিকে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করবে। এর মাশুল একদিন আমাদের সবাইকে গুণতে হবে।

লেখক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান, গবেষক ও কলামলেখক । ই-মেইল:sarderanis@gmail.com

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close