ফিচার

চোখ হারানো ট্রেনযাত্রীর আর্তনাত ও রাষ্ট্রের দায় অথবা গণপরিবহনে অরাজকতা ও যাত্রীর নিরাপত্তা

অবস্থা দেখে মনে হয়, দেশটা যেন অপরাধের চারণভূমিতে পরিণত হয়ে গেছে। সমাজে প্রত্যেহ অপরাধ জগতে নিউ ডাইমেনশন হচ্ছে। গেল শনিবার দুপুরে পত্রিকার পাতায় একটি সংবাদের শিরোনাম দেখেই চমকে উঠি। সহজেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না- আমাদের সমাজে এ ধরনের ঘটনাও ঘটতে পারে।

সেই ছোটকাল থেকে জেনে এসেছি ট্রেন হলো জনসাধারণের চলাচলের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পরিবহন। সেই বেনিয়া ব্রিটিশরা চালু করার পর থেকেই জনগণের এর প্রতি আস্থা অব্যাহত রয়েছে। যদিও বর্তমানে এখাতটি রাজনীতিবিদ-আমলাদের যৌথ বাণিজ্যিক মনোভাবে হাবুডুবু খাচ্ছে অনিয়ম-দুর্নীতির অথৈ সাগরে।

আমরা প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় আনন্দ-বেদনার কত ধরনেরই তো সংবাদ পাঠ করি, অনেক সময় পত্রিকায় শিরোনাম হয়েছে চোর-ডাকাতের চোখ উপড়ে ফেলার ঘটনা, দ্বন্দ্ব-মারামারিতে কখনো হাত, পা, রগ কিংবা কান কেটে নেয়ার ঘটনা। যদিও ওইগুলোও কোনোভাবে কাম্য নয়। ট্রেন-বাসে বচসা, হাতাহাতি ও মারামারির কথাও অহরহ শুনে আসছি, তবে ট্রেনে টিকেট কিংবা ভাড়ার জন্য টিকেটচেকার কর্তৃক কোন যাত্রীর চোখ উপড়ে ফেলার ঘটনা ইতোপূর্বে বিশ্বের কোথাও ঘটেছে বলে আমার জানা নেই।

পত্রপত্রিকা পাঠে যা জানতে পেলাম তাতে, শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশ্য ছেড়ে যাওয়া ট্রেনের যাত্রী আব্দুল হাকিমের (৪০) সাথে টিকেট নিয়ে টিকিটচেকার সোহেল মিয়ার তর্ক হয়। এক পর্যায়ে সোহেল কলম দিয়ে ট্রেনযাত্রী হাকিমের ডান চোখে আঘাত করে। এতে হাকিমের চোখ বেরিয়ে আসে। প্রচুর রক্তক্ষরণ সেখানেই জ্ঞান হারান হাকিম। পাগলা স্টেশনে ট্রেন থামলে টিকিট চেকার সোহেল নেমে দৌঁড়ে পালিয়ে যায়।

পরে ট্রেনে থাকা যাত্রীরা হাকিমকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করে। পরে তাকে ঢাকার ইসলামিয়া হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তিনি এখন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। আহত হাকিম ফতুল্লার পাগলা এলাকায় অবস্থিত আকবর রোলিং মিলের একজন শ্রমিক।

সেখানকার চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, হাকিমের জীবন শঙ্কামুক্ত থাকলেও হারনো চোখটি আগের মত ফিরে পাবার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তাঁর উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। ফলে ঘটনাটি যেভাবেই ঘটুক না কেন যাত্রীদের জন্য এর চেয়ে নির্মমতা আর কী হতে পারে।

যতদূর জেনেছি, গেল দুইদিনেও এস কে ট্রেডিংয়ের ওই টিকিট চেকার সোহেল গ্রেফতার হয়নি। এব্যাপারে রেল কর্তৃপক্ষ, রেল পুলিশ ও এস কে ট্রেডিং কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হলেও তাদের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। দুইদিনে চোখ হারানো হতভাগা যাত্রী হামিদের খোঁজ্ও নেয়নি কেউ। মিডিয়াতেও সেভাবে আসেনি ঘটনাটি। শ্রমিক হাকিমের টিকেট না কাটার পেছনে অনেক কথা থাকতে পারে, ধরেই নিলাম টিকেট না কেটে তিনি অপরাধ করেছেন।

সেজন্য রেলওয়ের বিধি অনুযায়ী তার শাস্তি হতে পারতো। কিন্তু ভাড়ার জন্য কলম দিয়ে আঘাত করে তার চোখ নষ্ট করে দেয়া কোনো সভ্য সমাজে হতে পারে না। এটা খুবই নির্মম ও ন্যাক্কারজন ঘটনা। এটেম টু মার্ডার অপরাধও বটে।

ফলে এ বিষয়ে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টদের এতটা নীরবতা থাকার কথা কি! আজ এই জায়গায় হাকিম না হয়ে সমাজের কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা কোনো রাজনৈতিক নেতার সন্তান ভিকটিম হলে কী হতো! এতক্ষণ পর্যন্ত ঘাতক পালিয়ে থাকার সুযোগ পেতো কি? অবশ্যই না। তাহলে হাকিম একজন খেটে খাওয়া শ্রমিক হওয়ার কারণেই কি এর সুষ্ঠু বিচার পাবেন না? এক্ষেত্রে রাষ্ট্র, সরকার ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কি কোনো দায়বদ্ধতা নেই?

এই পথে ট্রেনের নিয়মিত চলাচলকারী যাত্রীদের অনেকেরই অভিযোগ, বেসরকারী খাত এস কে ট্রেডিংয়ের তত্ত্বাবধানে চলাচলরত ট্রেনের টিকিট চেকাররা সবসময়ই যাত্রীদের সঙ্গে অসদাচরণ করে আসছে। অনেক সময় সামান্য ছলছুতায় যাত্রীদের গায়ে হাতও তোলে। কেউ প্রতিবাদ করলে তারা চার-পাঁচজন একত্রিত হয়ে যাত্রীদের লাঞ্ছিত করেন।

এমন কি ঢাকাগামী যাত্রীদের কেউ এসব নিয়ে প্রতিবাদ করলে কমলাপুরে রেলস্টেশনে নামার পর এস কে ট্রেডিংয়ের গেটে থাকা প্রহরীদের দিয়ে যাত্রীদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয় এবং তাদের আটকিয়ে থানা হাজতের ভয় দেখিয়ে টাকা পয়সা হাতিয়ে নেয়ারও ঘটনা প্রায়ই ঘটছে।

এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, ঢাকার বিভিন্ন কলেজে অধ্যয়নরত ছাত্রীরা ট্রেনের এসব টিকিটচেকার ও কমলাপুর রেল স্টেশনের গেটে থাকা এস কে ট্রেডিংয়ের প্রহরীদের দ্বারা উত্যক্ত ও লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাও হরহামেশা ঘটে থাকে। যাত্রীদের অভিযোগ, এসব বিষয়ে রেল কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার নালিশ করেও তারা এসবের কোনো প্রতিকার পায়নি। এজন্যই ওরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। শুধু এ পথেই নয়, দেশের প্রায় সব এলাকাতেই যাত্রীরা নিগৃহীত হচ্ছেন ট্রেন লিজ নেয়া প্রতিষ্ঠানের লোকজনের দ্বারা।

প্রসঙ্গত যেদিন থেকে রাষ্ট্র ব্যবসার মানসিকতা নিয়ে ঐতিহ্যবাহী এই সেক্টরকে বেসরকারি খাতে লিজ দেয়ার বন্দোবস্ত করেছে সেদিন থেকেই এর বারটা বাজিয়েছে। মন্ত্রী-এমপিরা মুখে রেল সেবার নানা কল্পকাহিনী বললেও বাস্তবে কী ঘটছে তা তারা জানেন না কিংবা জানার চেষ্টাও করেন না।বর্তমানে যাত্রীদের পিঠে চাবুক মেরেও ভাড়া আদায় করার চেষ্টা করা হচ্ছে। যার প্রমাণ হতভাগা হাকিমের চোখ হারানোর ঘটনা।

শুধু ট্রেনেই যে এসব ঘটছে তা নয়, রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী সরকারি বিআরটিসি বাসগুলোতেও প্রতিনিয়ত ঘটছে লঙ্কাকাণ্ড। এ কথা সবারই জানা, অন্য যে কোনো বেসরকারি সার্ভিসের চেয়েও বিআরটিসি বাসে বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।

এক্ষেত্রে যাত্রীরা ভাড়ার তালিকা চাইলে যাত্রীদের যথেচ্ছাভাবে লাঞ্চিত করা হচ্ছে। প্রসঙ্গত, গতকাল শনিবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে মহাখালি থেকে আসাদগেটে যাচ্ছিলাম নতুনবাজার-নবীনগর রুটের বিআরটিসি বাসে চড়ে। কিছুদূর যাওয়ার পরই সুপারভাইজার গাবতলীগামী একযাত্রীর সাথে ভাড়া নিয়ে বচসায় লিপ্ত হন। যাত্রীর কাছে মহাখালি থেকে গাবতলী ভাড়া চাওয়া হয় ৩০ টাকা, যাত্রী তা দিতে না চাইলে একপর্যায়ে যাত্রীকে মারধর করার পর চলন্তবাস থেকে গলা ধাক্কাদিয়ে নামিয়ে দেয়া হয়। অথচ মহাখালী থেকে গাবতলী যেতে অন্য যেকোনো সার্ভিসে ১০ থেকে ২০ টাকার বেশি ভাড়া আদায় করা হয় না।

এছাড়া মহাখালি থেকে শাহাবাগ পর্যন্ত বিআরটিসি বাসে আদায় করা হচ্ছে ১০টাকা, অথচ উত্তরা থেকে ছেড়ে আসা ৩ নম্বরবাসসহ যে কোনো সার্ভিসে ৬-৭ টাকার বেশি ভাড়া আদায় করা হয় না। ফলে এ নিয়ে প্রতিনিয়ত যাত্রীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন বিআরটিসি লিজ নেয়া প্রতিষ্ঠানের মাস্তানদের কাছে। অথচ আমাদের বাকপটু সেতু ও যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাহেব প্রতিনিয়ত সুলভ যাত্রীসেবার কথা উল্লেখ করে মিডিয়ায় বাগড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে সস্তা কৃতিত্ব নেয়ার চেষ্টা করছেন।

এছাড়া বাসের ফিটনেস পরীক্ষার নামে রাজধানীতে চলছে এক ধরনের অরাজকতা। চলছে ট্রাফিক পুলিশ প্রশাসনের অন্যরকম বাণিজ্য। আর এতে মেনেজ করে লক্করঝক্কর বাসও চলছে সিটিংসার্ভিস বলে। আর ওইসব বাসে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে যথেচ্ছভাবে। এসব কিছু যেন দেখার কেউ নেই। এতে যেমন গণপরিবহনে বেশি ভাড়া আদায়ের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে তেমনি যাত্রীদের দুর্ভোগও বেড়েছে।

এছাড়া নতুন বাস না নামিয়েই এ ধরনের অভিযানের সিদ্ধান্ত নেয়ার ফলে নগরীতে জনসাধারণের চলাচলের জন্য পরিবহন সঙ্কট দেখা দিয়েছে। সারাদিন যেমন-তেমন বিকাল থেকে রাত ৯-১০টা অবধি অফিস ফেরত ঘরমুখো মানুষের কী যে দুর্ভোগ তা চোখে না দেখলে ভাষায় ব্যক্ত করে কাউকে কোনোভাবেই বুঝানোর উপায় নেই ।

শাহাবাগ, বাংলামোটর, কারওয়ানবাজার, ফার্মগেট ও মহাখালিসহ নগরীর প্রধান প্রধান স্পর্টে একটি বাস থামলে অন্তত: ২০০ থেকে ৩০০ মানুষ বাসে ওঠার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে নারী-শিশু ও প্রতিবন্ধীদের কী অবস্থা তা সহজেই অনুমেয়। এছাড়া পাবলিকবাসে নারীদের যৌন হয়রানির ঘটনাতো অহরহ ঘটছেই।

যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও খবর হয়েছে।তাই আমাদের বাকপটু সেতু ও যোগাযোগ মন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানাবো- আমাদের এসব কষ্টের কথা বিশ্বাস না হলে দয়া করে সন্ধ্যার দিকে কারওয়ানবাজার, ফার্মগেট ও মহাখালির মতো দু’একটি স্পর্টে একটু ঘুরে আসেন। তবেই বুঝতে পারবেন আপনারা নগরবাসীকে কতটা ভালোসেবা দিয়ে চলেছেন।

এক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য হলো- টিকেটচেকারের হাতে চোখ হারানো ট্রেনযাত্রী আব্দুল হাকিমের আজকের এই করুণ পরিণতির দায় সরকার ও রেল কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। ফলে অবিলম্বে এ ঘটনার সাথে জড়িত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। সেই সাথে ভিকটিম আব্দুল হাকিমের উন্নত চিকিৎসার দায়ভারও সরকারকেই করতে হবে। অন্যথা এ ঘটনা সমাজে একটি খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

সবশেষে, ট্রেন, বাস ও লঞ্চসহ গণপরিবহনে চলমান অরাজকতা বন্ধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। আশা করি- প্রধানমন্ত্রী জনসাধারণের দুর্ভোগ লাঘবে এবং গণপরিবহনে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

লেখক: ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান, শিক্ষা ও সমাজ বিষয়ক গবেষক এবং কলাম লেখক। ই-মেইল:sarderanis@gmail.com

Tags

এ সম্পর্কিত অন্যান্য সংবাদ

ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট করেছে সাইন সফট লিমিটেড
Close